Ananda ALo
Ultimate magazine theme for WordPress.

নারী ক্রিকেটে হার না মানা সালমা

মামুনুর রহমান

নারিকেল গাছের ডাল কেটে ব্যাট বানিয়ে ক্রিকেট খেলা শিখেছেন তিনি।বাবা মায়ের চার সন্তানের চতুর্থ তিনি। দূরন্ত, আর গেছো বলতে যা বোঝায় তেমনটি তার স্বভাব। নিজের মন যা চাইতো তাই করতেন। বাড়ির পাশের ছোট্ট মাঠে সারাদিন খেলাধুলা নিয়ে কেটেছে তার শৈশব। ছেলে কি মেয়ে সবার সাথে হৈ হুল্লোড় করে বেড়ানোর জন্য বকাও শুনতে হয়েছে অনেক। মেয়ে মানুষ খেলবে না কেন? খেলবে, তবে ক্রিকেট কেন? এ নিয়ে বাবা মায়ের ছিল নিষেধ মাখা প্রশ্ন। কিন্তু কে শোনে কার কথা? মাথার উপর সূর্য তখন খাড়া। গ্রীষ্মের গরমে দুই ব্যাটসম্যান আর বোলার বাদে বাকিরা গাছের ছায়ার নিচে ফিল্ডিংয়ে অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু ব্যাটসম্যান অবিচল। দূর্দান্ত গতিতে ছুটে আসা বল মাঠ ছাড়া করাই যেন তার একমাত্র কাজ। কখনো উঠিয়ে মারেন ছয়ের জন্য কখনো গড়িয়ে মারেন চারের জন্য। আর ওভারের শেষ বলে সিঙ্গেল নিয়ে আবার নিয়ে নেন স্ট্রাইক। নিশ্চয়ই চিনতে পেরেছেন যাঁর কথা বলছি? হ্যা, খুলনার মিলকি গ্রামের হালকা ছিপছিপে গঠনের নারী ক্রিকেটার সালমা খাতুনের কথা বলছি।
গ্রামের মানুষেরা কখনোই ভালো চোখে দেখেননি তার ক্রিকেট খেলা। খালি পায়ে কোমরে ওড়না পেচিয়ে ছেলেদের সাথে একটি মেয়ে ক্রিকেট খেলবে বড্ড বেমানান দেখায় তাদের কাছে। গ্রামবাসীর তীর্যক প্রশ্নের মুখে নিরুত্তর থাকতে হয় জন্মদাতা বাবা ও মাকে। বাবা মায়ের এই নিরুত্তর থাকাই সালমাকে উৎসাহ দিয়েছিল অল্পস্বল্প। গ্রামে তো মেয়েদের ক্রিকেট ছিলনা। তাই এগারো জনের টিমে একমাত্র মেয়ে ক্রিকেটার হিসেবে ছেলেদের সাথে খেলতে হয়েছে তাকে। এ নিয়েও কত্তো কানাঘুষা। ছেলেদের পারফর্ম্যান্সের সাথে সালমার পারফর্মন্স থাকতো সমানে সমান। কোন ভাবেই হালকা ভাবে নেয়ার সুযোগ ছিলো না তাকে। বিস্তর সমালোচনার জন্ম হয় সালমার ক্রিকেট খেলা নিয়ে। মন খারাপের পাল্টাটা যেই না ঝুলে যেতে শুরু করতো সালমা পাশে পেতেন তাঁর মামাদের। আবারও স্বপ্নের পথ ধরে হাঁটতে শিখে যেতেন সালমা। নারকেলে ডাল কেটে টেনিস বল দিয়ে ক্রিকেট খেলা শুরু করা সালমা খাতুন আজ বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের কান্ডারী। গ্রামের মানুষেরা সালমার ক্রিকেট খেলা নিয়ে কতোই না খারাপ মন্তব্য করেছিল। আর আজ তারাই সালমাকে এক নজর দেখার জন্য প্রচন্ড উত্তাপেও ঠায় দাঁড়িয়ে থাকেন। ২০১১ সালের ২৬ নভেম্বর আয়ারল্যান্ড নারী ক্রিকেট দলের সাথে ওয়ানডে ক্রিকেটে অভিষেক হয় সালমার।

সম্পর্কিত

একই দলের সাথে ২০১২ সালে ডাবলিনে টি২০ ক্যারিয়ার শুরু করেন সালমা খাতুন। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাস ঘাটলে তিনিই সর্বপ্রতম ক্যাপ্টেন যার হাত ধরে কোন আন্তর্জাতিক ট্রফি এসেছে আমাদের হাতে। এশিয়া কাপে শক্তিশালী ভারতকে ধরাশায়ি করে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল অর্জন করেছে এশিয়ার শিরোপা। যা গত কয়েকবার ছুঁতে ছুঁতে ছোঁয়া হয়নি বাংলাদেশ পুরুষ ক্রিকেট দলের। নিন্দা কে প্রয়োজনে রুপ দিয়েছেন সালমা। আজ বাংলাদেশের অসংখ্য নারী ক্রিকেটার সালমা হতে চায়। জাহানারা হতে চায়। সালমার নারী ক্রিকেটার হওয়া দেশের জন্য গর্বের। সামনে থেকে নিজেও যেমন এগিয়ে চলেছেন সাথে এগিয়ে নিচ্ছেন দেশের ক্রিকেটকে। অসংখ্যবার প্রায় হেরে যাওয়া ম্যাচ গুলো নিজেই টেনে এনেছেন জয়ের পথে। সালমা খাতুন বাংলাদেশের প্রথম নারী ক্রিকেটার যিনি বিশ্বজুড়ে সেরা অলরাউন্ডার হতে পেরেছেন। তাঁর অসাধারন নৈপুন্যে আইপিএল খেলার সুযোগ পান তিনি। ট্রেইলব্লেজার্স এর হয়ে আইপিএলে সালমার খেলাতেই যেন চ্যাম্পিয়ন দলটি। টাইগ্রেস অধিনায়ক সালমার প্রথম আইপিএল মিশনে তার দলের চ্যাম্পিয়ন হওয়া, নিশ্চিত ভাবে বলা যায় আগামী দিন গুলোতে সালমা সহ বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটকে আরও বহুদূর এগিয়ে নেবে। আইপিএলের ফাইনাল ম্যাচটিতে সালমার পারফরম্যান্স ছিল অনন্য।
ক্রিকেটের স্বীকৃত তিন ফরম্যাটের মধ্যে টেস্ট হলো ঠান্ডা মেজাজের ক্রিকেট। সাদা পোশাক আর লাল বল। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ৫০ ওভার ও ২০ ওভারের দুই ফরম্যাটে খেলছে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট। ২০০৭ সালে নারী দল প্রথম ওয়ান ডে ম্যাচ খেললেও ওয়ানডে মর্যাদা এসেছে ২০১১ সালে। বিশ্ব ক্রিকেটের বিভিন্ন আসরে তারপরই অংশ নিতে পারি আমরা। ২০১৮ সালে ভারতকে হারিয়ে এশিয়া কাপ ঘরে এনেছে সালমা-জাহানারা ও রুমানাদের বাংলাদেশ যা এখনও পুরুষ দল পারেনি। ওয়ানডে তে ভালো করার পথ ধরেই বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল পেলো টেস্ট স্বীকৃতি। যেখানে সামনে থেকে দলকে এগিয়ে রাখার ভূমিকায় রয়েছেন সালমা খাতুন, জাহানারা। টেস্ট খেলার সুযোগ পাওয়ায় নারী ক্রিকেট আরও এগুবে।
নারী ক্রিকেটের পাইপ লাইন তৈরি হবে। প্রতিবন্ধকতা গুলো ভেঙে বেরিয়ে আসবে প্রতিভা। টুর্নামেন্টের সংখ্যা বাড়বে। উন্নত হবে বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট। বাংলাদেশের ক্রিকেট। বলে মনে করেন সালমা খাতুন।