Home Blog Page 3

পঞ্চাশের শেষ নক্ষত্রটিও নিভে গেল : আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

৩ জানুয়ারি আমার মেয়ে বিনীতা চৌধুরীর জন্মদিন। লন্ডনে আমার বাসা থেকে বহুদূরে গ্রিনিচে থাকে। এই করোনার দিনে জন্মদিনেও একত্র হওয়ার সুযোগ নেই। তাকে টেলিফোনে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে লেখার টেবিলে বসেছি, ঠিক এই সময় খবরটি এলো- পঞ্চাশের দশকের শেষ নক্ষত্রটিও নিভে গেছে। লন্ডনে তখন দুপুর হয়নি। কুয়াশার মতো বৃষ্টিঝরা দিন। এমন দিনে মন এমনিতেই ভারাক্রান্ত থাকে। আর ঠিক সেই সময় ঢাকা থেকে টেলিফোনে খবরটি পেলাম, রাবেয়া খাতুন আর নেই।
প্রথমে ভেবেছিলাম, মৃত্যুটা বুঝি করোনায় হয়েছে। তারপর জানলাম, আমাদের অন্য কয়েকজন খ্যাতিমান বুদ্ধিজীবীর করোনায় মৃত্যুর মতো রাবেয়া খাতুনের মৃত্যু করোনায় নয়। এতে অবশ্য সান্ত্বনা পাওয়ার কিছু নেই। সব মৃত্যুই মৃত্যু। বাস্তব সত্যটি হচ্ছে, রাবেয়া খাতুনকে আমরা হারিয়েছি। বাংলা সাহিত্য রাবেয়া খাতুনকে হারিয়েছে। এটি যে আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের কত বড় ক্ষতি সে কথা পরে সুযোগ পেলে লিখব। এখন ব্যক্তিগত শোক আর ক্ষতির কথাই বলছি।

রাবেয়া খাতুনের সঙ্গে আমার শেষ দেখা বেশ কয়েক বছর আগে। ঢাকায় ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে (তখন বোধ হয় নাম ছিল রূপসী বাংলা) তাঁর জন্মদিন পালিত হচ্ছিল। ঢাকার শিল্পী-সাহিত্যিকরা উপচে পড়েছিলেন সেখানে। আমি হঠাৎ গিয়ে হাজির হয়েছিলাম। মঞ্চে বসা রাবেয়া খাতুনকে সম্রাজ্ঞীর মতো দেখাচ্ছিল। তিনি অবশ্যই ছিলেন সাহিত্যের সম্রাজ্ঞী। বয়স হয়েছে। চেহারায় তার চিহ্ন নেই। পঞ্চাশের দশকে সওগাতের সাহিত্য বৈঠকে তাঁকে যেমন দেখেছি, তেমনি আছেন। তবে চুল পেকেছে। চেহারায় তারুণ্যের শ্রীটা একটু নিষ্প্রভ।
তাঁকে সম্মাননা জানানোর জন্য আমাকে যখন ডাকা হলো, আমি তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেছিলাম, রাবেয়া খাতুন আমাদের সাহিত্যজগতের প্রভাবতী দেবী সরস্বতী। আর সেলিনা হোসেন হচ্ছেন আশাপূর্ণা দেবী। সেলিনা হোসেন আমাদের চেয়ে বয়সে ছোট। কিন্তু তাঁর কলমের ঐশ্বর্য অনেক। আমি তাঁর জন্মদিনের সভায় যাওয়ায় রাবেয়া খাতুন অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন। সভামঞ্চে তাঁর পাশেই আমাকে বসতে দেওয়া হলো। তিনি আমার কুশল সংবাদ নিয়ে জানতে চাইলেন কী লিখছি? বললাম, রাজনীতির ছাইপাঁশ নিয়ে লিখছি। আপনার মতো কলমে সোনা ফলাতে পারিনি। রাবেয়া হেসে বললেন, যা ফলিয়েছেন তা-ই যথেষ্ট। সভামঞ্চে বসে নিম্নকণ্ঠে আরো কিছু আলাপ, যেমন আমার বাড়িতে খিচুড়ি খেতে আসবেন কবে? বলেছি, রাবেয়া, এবার আসতে পারব না, তবে লন্ডন থেকে আবার যখন আসব, তখন নিশ্চয় আপনার সঙ্গে দেখা করব।

সেই আমাদের শেষ দেখা এবং শেষ আলাপ। তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম আলাপের কথাও মনে আছে। তখন ফজলুল হকের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়নি। সম্ভবত ১৯৫১ সালের প্রথম দিকের কথা। পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলীতে ছিল মাসিক সওগাত ও সাপ্তাহিক বেগমের অফিস। এই অফিসে প্রতি মাসে একবার পূর্ব পাকিস্তান সংস্কৃতি সংসদের উদ্যোগে সাহিত্যসভা হতো। আর প্রায় প্রতিদিনই হতো ওই অফিসে পঞ্চাশের তরুণ শিল্পী-সাহিত্যিকদের আড্ডা। মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন চা-নিমকপাড়া জোগাতেন।
প্রচণ্ড আড্ডা বসত প্রতিদিনই। রবীন্দ্রনাথ থেকে বড় সব কবিকেই তখন আমরা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতাম। এই আড্ডায় নিয়মিত আসতেন শামসুর রাহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ, হাসান হাফিজুর রহমান, ফজলে লোহানী, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, মুর্তজা বশীর, সাইয়িদ আতিকুল্লাহ, আল মাহমুদ, মুস্তাফা নূরউল ইসলাম এবং আরো অনেকে। মাঝেমধ্যে আসতেন মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী এবং কোনো কোনো দিন ড. কাজী মোতাহার হোসেন।
এই আড্ডায় একদিন এক তরুণী এলেন। কার সঙ্গে এসেছিলেন মনে নেই। তিনি সঙ্গে তাঁর লেখা একটি ছোটগল্প নিয়ে এসেছিলেন। সেটি আড্ডায় পড়লেন। সবার তাক লেগে গেলেন। সেই পঞ্চাশের দশকে ঢাকার মেয়েরা যখন ঘোমটা থেকে বেরিয়ে আসেনি, তখন এক তরুণীর কলম থেকে এমন গল্প বের হওয়া। গল্পটি গ্রামীণ পরিমণ্ডলে লেখা হয়েছিল। সেই গল্পে ছিল গ্রামের এক চাষি বউয়ের জীবন সংগ্রামের কাহিনি। গল্পটি শুনে আলাউদ্দিন আল আজাদ লাফিয়ে উঠলেন। রাবেয়াকে বললেন, আপনার লেখায় সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা চমৎকার ফুটেছে। আপনার চরিত্রগুলো বলিষ্ঠ। আলাউদ্দিন আল আজাদ তখন চরম বামপন্থী ছিলেন। গল্পে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা কতটা ফুটিয়ে তোলা যায়, তার চেষ্টা করছেন। রাবেয়া তাঁকে বললেন, সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা কী আমি জানি না। আমি জীবনের বাস্তবতা এই গল্পে ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছি। তাঁর জবাব শুনে আমি চমৎকৃত হয়েছি। নিজেই যেচে তাঁর সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। সেই পরিচয় ক্রমে গভীর বন্ধুত্বে পরিণত হয়েছিল।
আরেক দিন সওগাত অফিসের ওই আড্ডায়ই সবাই রাবেয়া খাতুনকে একটি গান শোনানোর জন্য ধরলেন, বললেন, আপনি এত ভালো গল্প যখন লেখেন, তখন নিশ্চয়ই ভালো গান গাইতেও জানেন। রাবেয়া বারবার মাথা নেড়ে জানালেন, তিনি গান জানেন না। কিন্তু সবাই নাছোড়বান্দা। তখন রাবেয়া গাইলেন একটি রবীন্দ্রসংগীত ‘ওরে নতুন যুগের ভোরে’। এরপর রাবেয়া প্রায়ই সওগাতের আড্ডায় আসতেন। কথাশিল্পী হিসেবে তখনই তাঁর প্রতিষ্ঠা অর্জন শুরু।
মাঝখানে হঠাৎ রাবেয়া খাতুন সওগাতের সাহিত্যসভায় আসা বন্ধ করেন। সবারই আশা, তিনি শিগগিরই আবার নতুন গল্প নিয়ে আসবেন আড্ডায়। তাঁকে কোথায় পাব, আমরা জানি না। তিনি শিক্ষকতা করতেন, সাংবাদিকতা করতেন, তা আমরা সঠিকভাবে জানতাম না। এই সময় একদিন ইত্তেফাকের পুরনো অফিসে তাঁর সঙ্গে আমার দেখা। তিনি চলে যাচ্ছিলেন, আমাকে দেখে থামলেন। দুজন ইত্তেফাক অফিসের ভেতরে গিয়ে বসলাম।
সময়টা ভাষা আন্দোলনের বছর ১৯৫২ সালের জুন মাস। জিজ্ঞেস করলাম, সওগাতের আড্ডায় আপনাকে দেখি না কেন? তিনি বললেন, কিছু কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। তার পরই স্মিত হেসে বললেন, ‘আমি বিয়ে করতে যাচ্ছি।’ আমি চমকে উঠে বললাম, কাকে বিয়ে করছেন? রাবেয়া খাতুন বললেন, ফজলুল হককে।
ফজলুল হককে আমি তখন চিনতাম সিনেমা ও সিনেমা সাংবাদিকতা নিয়ে আগ্রহী এক যুবক হিসেবে। ১৯৫২ সালের জুলাই মাসে তাঁদের বিয়ে হয়। তারপর ফজলুল হকের সঙ্গেও ভালোভাবে পরিচিত হয়ে উঠি। অসম্ভব আমুদে আর অমায়িক মানুষ ছিলেন ফজলুল হক। তাঁর ভেতরেও যে সাহিত্য প্রতিভা ছিল, তা কিছুদিনের মধ্যে আমরা জানতে পারি। তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়, তিনি বাংলাদেশে চলচ্চিত্রশিল্পের অগ্রদূত। তাঁর সিনেমা পত্রিকাটি বাংলাদেশে প্রথম সিনে সাহিত্য মাসিক। অন্যদিকে পঞ্চাশের দশকে অজস্র গল্প-উপন্যাস রচনার সঙ্গে রাবেয়ার সম্পাদনায় বেরোত একটি মহিলা মাসিক অঙ্গনা।
আমি বিয়ে করে পুরান ঢাকার নারিন্দায় বাস করতে শুরু করি। রাবেয়া-ফজলুল হক দম্পতিও নারিন্দায় এসে বাস করতে শুরু করেন। তখন তাঁদের বাসায় তখনকার তরুণ সাহিত্যিকরা এসে আড্ডা দিতেন। জহির রায়হান তখন আমাদের মতো উঠতি সাহিত্যিক। কিন্তু ফিল্মের দিকে ঝোঁক বেশি। ফলে খুব দ্রুত রাবেয়া-ফজলুল হক দম্পতির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। রাবেয়া খুব চমৎকার খিচুড়ি রান্না করতেন। জহির রায়হানের খিচুড়ি খাওয়ার ইচ্ছা হলেই বলতেন চলুন গাফ্ফার, রাবেয়াদের বাসায় যাই। খিচুড়ি খাব। আর রাবেয়াও আমাদের দেখলেই খিচুড়ি রাঁধতে বসে যেতেন।
ঢাকায় রাবেয়ারা বহু বাসা বদল করে বাস করেছেন। সদরঘাটের কাছে ওল্ড স্ট্রিট, বনগ্রাম সব বাসার কথা আমার স্মরণে নেই। রাবেয়া ছোটগল্প ও উপন্যাস দুইয়েরই কুশলী শিল্পী। আমিও গল্প লিখি। সে জন্যই সম্ভবত আমাদের সখ্য একটু বেশি করে গড়ে উঠেছিল। আমার কাছে বিস্ময়ের ব্যাপার ছিল রাবেয়া খাতুনের সাহিত্য প্রতিভা। গ্রামীণ পরিমণ্ডলে সহজ-সরল জীবন আঁকতে আঁকতে তিনি কী করে বাংলাদেশের নির্মীয়মাণ মধ্যবিত্ত সমাজের সরল, অসরল, জটিল, কুটিল চরিত্র আঁকার নগরসভায় উঠে এলেন, তা বুঝতে আমার সময় লেগেছে। চরিত্রে যেমন ছিলেন প্রগতিশীল, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ছিলেন দৃঢ়নিষ্ঠ। তাঁর প্রতিভাও ছিল বহুমুখী। গল্প, উপন্যাস তো তিনি লিখেছেনই। তা ছাড়া লিখেছেন গবেষণাধর্মী লেখা। নাটক, কিশোরদের জন্য উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনি ইত্যাদি।

মুক্তিযুদ্ধের ওপরও তিনি অনুপম উপন্যাস লিখেছেন। লিখেছেন স্মৃতিকথা। এই স্মৃতিকথায় তিনি আমাকে উল্লেখ করেছেন একজন হিম্যান হিসেবে। কেন, তা আমি জানি না। তাঁর স্বামী ফজলুল হক শিশুতোষ চলচ্চিত্র ‘প্রেসিডেন্ট’ নির্মাণ করেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল মুক্তিযুদ্ধের ওপর একটি বড় চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন। এ জন্য তিনি ১৯৭১ সালে কলকাতায় অবস্থান করে মুজিবনগর সরকারের তথ্য বিভাগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কলকাতার পার্ক সার্কাসে বালু হাককাক লেনে ৯ মাস একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ আমার হয়েছিল। তিনি মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে অনেক অমূল্য তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন।
কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি আর ফিরে আসেননি। একবার কলকাতায় গিয়ে আমি জানতে পারি, তিনি আর বেঁচে নেই। আমার বড় বোনের কবর কলকাতার গোবরার কবরস্থানে। আমার বোনের কবরের কাছে ফজলুল হকও সমাহিত হয়েছেন। এখন ঢাকার মাটিতে সমাহিত হলেন তাঁর স্ত্রী রাবেয়া খাতুন। রেখে গেলেন যোগ্য পুত্র ফরিদুর রেজা সাগরসহ আরো তিন সন্তান।
জীবনকালেই রাবেয়া তাঁর অসাধারণ বহুমুখী প্রতিভার জন্য স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদকসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। আমার আজকের লেখা তাঁর সাহিত্যকৃতির আলোচনা নয়। সে আলোচনা স্বতন্ত্রভাবে করতে হবে। আজ শুধু তাঁকে শেষ সম্মান জানানোর জন্য এই ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণা। রাবেয়া খাতুনের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে পঞ্চাশের শেষ নক্ষত্রটিও নিভে গেল বলে আমার ধারণা। আর শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজনকে আন্তরিক সমবেদনা জানাই।

পেশার দায়বদ্ধতায় মিজানুর রহমান

অধ্যাপক ড. মো: মিজানুর রহমান। বাংলাদেশের খ্যাতিমান একজন শিক্ষাবিদ, দূর্ঘটনা, পরিবহন ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ। দীর্ঘ দুই দশকেরও অধিক সময় ধরে শিক্ষাবিদ হিসেবে পাঠদান ও গবেষণার পাশাপাশি সড়ক ও রানওয়ে নির্মাণ, মেরামত ও রক্ষনাবেক্ষনে এবং সড়ক দূর্ঘটনা রোধকল্পে পরামর্শক হিসেবে কাজ করে চলেছেন। ১৯৯৬ সালে বুয়েট থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পাস করার পর পরই তিনি লেকচারার হিসেবে বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে যোগ দেন। ২০০০ সালে তিনি বুয়েট থেকে ট্রান্সপোর্টেশন ইঞ্জিনিয়ারিং এ মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। ২০০৪ সালে তিনি জাপানের ইয়োকোহামা ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ওপর গবেষনা করে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০১১ সাল থেকে তিনি বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করছেন। জাপানের টোকিও ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে ভ্রমণ করেন। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশের তিনি আজীবন ফেলো এবং বর্তমানে কেন্দ্রীয় কাউন্সিল মেম্বার। এছাড়াও বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউট (অজও) এবং ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (উগঞঈখ) এর পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়াও তিনি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশের গত মেয়াদে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিভিশনের ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। এবার শাহ্ সিমেন্ট নির্মাণে আমি তে তাকে নিয়ে প্রতিবেদন। লিখেছেন মোহাম্মদ তারেক

অধ্যাপক ড. মো: মিজানুর রহমানের জন্ম ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ফরিদপুর জেলার নগর কান্দা উপজেলার তালমা গ্রামে। বাবার নাম মো: নূরুল হক। তিনি স্বাধীনতা উত্তরকালে ফরিদপুর শহরের একজন সফল ব্যবসায়ী ছিলেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করার অপরাধে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পাক হানাদার বাহিনী আগুনে পুড়িয়ে দেয়। মা শিরীন হক গৃহিনী। তিন ভাই বোনের মধ্যে ড. মিজানুর ছোট। বড় বোন সাবিনা বেগম ও ছোট বোন রেশমা বেগম গৃহিনী। ছোটবেলা থেকেই ড. মিজানুর প্রকৌশলী হবার স্বপ্ন দেখতেন। হয়েছেনও সফল। নিজের আগ্রহ থেকেই প্রকৌশলী হওয়া তার। ফরিদপুর হাইস্কুল থেকে স্টার মার্কসহ এসএসসি পাস করেন ১৯৮৭ সালে। ১৯৮৯ সালে ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এইচএসসি পাস করে ভর্তি হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। বুয়েটে অধ্যায়নকালে শহীদ স্মৃতি হল ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরোপকারী ড. মিজানুর ছাত্র অবস্থায় তার সহপাঠীদের লেখাপড়া সহ নানান ভাবে সহায়তা করে সকলের প্রিয় ভাজন হয়ে ওঠেন।
১৯৯৬ সালে তিনি বুয়েট থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে সম্মানসহ প্রথম বিভাগে চতুর্থ স্থান অধিকার করে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পাস করেই লেকচারার হিসেবে যোগ দেন বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। ২০০০ সালে বুয়েট থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। এরপর উচ্চ শিক্ষার জন্য জাপান সরকারের বৃত্তি নিয়ে পাড়ি দেন জাপানে। ২০০৪ সালে জাপানের ইয়োকোহামা ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ওপর গবেষনা করে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বিদেশের নিরাপদ ও সুনিশ্চিত জীবনের মোহ ঝেড়ে ফেলে দেশে ফিরে আসেন দেশের জন্য কিছু করার স্বপ্ন নিয়ে। দেশে ফিরে এসে তিনি আবার শিক্ষকতা শুরু করেন। ২০১১ সাল থেকে তিনি অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের তিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এর নানা বিষয়ে হাতে কলমে শিক্ষা দিচ্ছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করছেন। ২০০৯ সালে তিনি জাপানের টোকিও ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে ভ্রমন করেন। কংক্রিট মিক্স ডিজাইন, সড়ক মহাসড়কে কংক্রিটের ব্যবহার, পুরাতন সড়ক নির্মাণে কংক্রিট এর ব্যবহার, টেকসই সড়ক নির্মাণ কৌশল, দূর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানও প্রতিকার, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার, ট্রাফিক সিগনাল ডিজাইন এবং আধুনিক রেলওয়ে নির্মাণ কৌশল ইত্যাদির বিষয়ে তিনি তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক উভয় ধরনের গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। দীর্ঘ দুই দশকের কর্মজীবনে অধ্যাপক মিজানুর রহমান বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, সড়ক দূর্ঘটনা, সড়ক ও রানওয়ে সম্পর্কিত পচাত্তরটির বেশী বিভিন্ন গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন। যার মধ্যে কয়েকটি কনফারেন্সে বেস্ট পেপার অ্যাওয়ার্ডস লাভ করেন। তিনি পনেরটিরও অধিক স্নাতকোত্তর থিসিস তদারকি করেছেন যার মাধ্যমে মাস্টার্স ডিগ্রি প্রদান করা হয়েছে। বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাঠ্যক্রমের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে তিনি অত্যন্ত সক্রিয়। তার উদ্যোগ ও সক্রিয়তায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এর ট্রান্সপোর্টেশন ডিভিশনের কোর্স ক্যারিকুরাম আধুনিকরণ করা হয়। ট্রান্সপোর্টেশন ডিভিশনের ল্যাবরেটরির আধুনিকীকরণ ও নিরাপদ করার ক্ষেত্রে তিনি কার্যকরী ভূমিকা পালন করেন। এ যুগের প্রথিত যশা প্রবীণ প্রকৌশলীবৃন্দের মধ্যে অধ্যাপক মরহুম আলমগীর মুজিবুল হক, জাতীয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী, অধ্যাপক মাজহারুল হক, অধ্যাপক মুহাম্মদ জাকারিয়া, অধ্যাপক শামীম জেড বসুনিয়া প্রমুখ তার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। মিজানুর বলেন, পেশাগত জীবনে আমি তাদের কাছাকাছি যেতে পারায় তাদের দর্শন গুলো আমি নিতে পেরেছি। উদার নৈতিক মানসিকতা, পরমত, সহিষ্ণুতা পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধ ও অন্যের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা এই জীবন দর্শনগুলো ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে প্রয়োগের চেষ্টা করি।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, দেশের যে কোনো প্রয়োজনে আমি আমার সাধ্যের মধ্যে কাজ করতে চাই। সেটা প্রকৌশলীর অবস্থান থেকে হোক বা শিক্ষকতার অবস্থান থেকে হোক। আমি দেশের জন্য গবেষণা, প্রকৌশল পেশা এবং প্রকৌশল শিক্ষার নীতি নির্ধারনী কাজে সহযোগিতা করতে চাই। আমি বাংলাদেশকে একটা সুখী, সমৃদ্ধশালী, অসাম্প্রদায়িক ও নিরাপদ দেশ হিসেবে দেখতে চাই। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতা যুদ্ধে আমাদের পূর্ব পুরুষরা ত্যাগ স্বীকার করে দেশকে স্বাধীন করেছেন। যার সুফল আমরা এখন ভোগ করছি। জাতি গঠনে আমাদেরকেও ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। পরবর্তী প্রজন্ম অবশ্যই এর সুফল ভোগ করবে।
অধ্যাপক মিজানুর রহমান বর্তমানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কল্যান পরিদপ্তরের পরিচালক এর দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া জাতীয় পর্যায়ে ২৪ কিলো মিটার দীর্ঘ ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্য হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও বুয়েটের একজন বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ও পরামর্শক হিসেবে ছোট বড় ১০০টির মতো প্রকল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। ঢাকার শাহ্জালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর, চট্টগ্রামের শাহ্ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর সহ কক্সবাজার বিমান বন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ ও মজবুতী করণ প্রকল্পে একজন পরামর্শক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। বাংলাদেশের গ্রামীন সড়কের মান উন্নয়নের সড়ক নির্মাণ ডিজাইন ম্যানুয়াল আধুনিকীকরন প্রকল্পের পরামর্শক দলের দল নেতা হিসেবে কাজ করা তার পেশা জীবনে একটি অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায়। এই ডিজাইন ম্যানুয়াল অনুমোদিত হওয়ায় গ্রামীন সড়কের নির্মাণ অনেক টেকসই হবে এবং সড়ক রক্ষনাবেক্ষন খরচ অনেক কমে যাবে বলে তিনি মনে করেন।
এছাড়া বঙ্গবন্ধু সেতুর টোল সংগ্রহের এডিট, লালন শাহ্ সেতুর পোস্ট ইভ্যালুয়েশন, মুন্সীগঞ্জের এপিআই পার্কের আভ্যন্তরীন সড়ক নেটওয়ার্ক, ১৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ প্রকল্প, ৮ কিলো মিটার দীর্ঘ পঞ্চবটী-মুক্তারপুর সেতু এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকায় অবস্থিত বিভিন্ন ভবনের টিআইএ, পটুয়াখালিতে লোহালিয়া সেতু, পায়রাপোর্ট সংযোগ সড়ক, পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ে ও ক্যানেল, মিরপুর ও গুলশান করিডোর এর যানজট নিরসন, সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরের সাথে গবেষণা, ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন বোর্ড এর ঢাকা শহরের দূর্ঘটনা হ্রাস, বিশ্ব ব্যাংকের পথচারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহ আরো অনেক প্রকল্প বাস্তবায়নে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন।
একজন দেশপ্রেমিক প্রকৌশলী হিসেবে ড. মিজানুর মনে করেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য এ দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং এর পরিচালনে অধিকতর শৃঙ্খলা আনা আবশ্যক। কেননা এ কারণে প্রতিবছর দেশের হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। তবে আশার কথা আমাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতু ২০২২ সালে যখন পুরোপুরি চালু হবে তখন যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর পজিটিভ ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই সেতু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশ যে উন্নত দেশ হবে, সে ক্ষেত্রেও এই সেতু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সব মিলিয়ে বলা যায়, স্বপ্নের এই সেতুকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ।

তিনি বলেন, এক্ষেত্রে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে বিরাজমান সমন্বয়হীনতা দূর করতে হবে। সড়ক উন্নয়নের পাশাপাশি রেল যোগাযোগও অনেক উন্নয়ন আবশ্যক। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলাকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে হবে। তিনি মনে করেন, সরকারের এই বিষয়ে আরও গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। কাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি রেলযাত্রী সেবার মান উন্নয়নেও আরো বেশী নজর দেয়া দরকার। তিনি বিশ্বাস করেন, এ ব্যাপারে যথাযথ পরিকল্পনা ও কার্যক্রম গ্রহণ করলে অদূর ভবিষ্যতে ঢাকা শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পাতাল রেলে আধা ঘণ্টার মধ্যেই নিশ্চিত ভাবে পৌছে যাওয়া যাবে, দ্রুত গতির ট্রেনে ঢাকা থেকে দেশের যে কোনো দূর প্রান্তে তিন/চার ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছানো সম্ভব হবে। অনুন্নত দেশের তকমা ঝেড়ে ফেলে বাংলাদেশ এখন আনুষ্ঠানিক ভাবে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে প্রবেশের পথে আছে। তার দৃঢ়বিশ্বাস, অদূর ভবিষ্যতে সেটাও পার হয়ে এক সময় বাংলাদেশ উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছে যাবে। তবে এ জন্য প্রয়োজন যোগাযোগ ব্যবস্থায় শৃংখলা ফিরিয়ে আনা ও সড়ক দূর্ঘটনা কাংখিত মাত্রায় কমিয়ে আনা।
অধ্যাপক মিজানুর রহমান ২০০০ সালে বিয়ে করেন। স্ত্রীর নাম ফারহানা নুর। তিনি ইডেন কলেজ থেকে ভূগোলে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। এই দম্পতি এক কন্যা ও দুই পুত্র সন্তানের জনক-জননী। বড় মেয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি স্কুলে ৯ম শ্রেণীতে ও দুই ছেলে ৭ম এবং ৩য় শ্রেণীতে অধ্যায়নরত। এই শিক্ষাবিদ, প্রকৌশলী ও দেশের অন্যতম একজন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ। তার কাজ সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে করতে ভালোবাসেন। নিজের পেশায় দায়বদ্ধ থেকে সেটাকে সততার সঙ্গে শেষ করতে চান।

বিদায় নাট্যমঞ্চের অধিপতি!

কোন পরিচয়ে তিনি বড়? একজন নাট্য ব্যক্তিত্ব? নাকি সংগঠক? নাকি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠ যোদ্ধা? অথবা নাট্য পরিচালক, তুখোর অভিনেতা, নাকি ঈর্ষনীয় কর্পোরেট তারকা? অথবা সবার প্রিয় ছটলু ভাই? দীর্ঘ দেহী, অসম্ভব হাসি-খুশী থাকা একজন মানুষ। সাধারনের ভীড়ে অনন্য সাধারন ব্যক্তিত্ব তিনি। নাম তার আলী যাকের। এক নামেই যার ব্যাপক পরিচিতি। দেশের প্রগতির্শীল সাংস্কৃতি আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব আরী যাকের। মঞ্চ ও গণ্য মাধ্যমের উজ্জ্বল নক্ষত্র দেশ বরেণ্য নাট্যজন। ১৯৪৪ সালের ৬ নভেম্বর চট্টগ্রামের রতনপুরে তাঁর জন্ম। পৈত্রিক বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীননগরে। চার ভাই-বোনের মধ্যে তৃতীয় আলী যাকের ঢাকার সেন্ট গ্রেগরী স্কুল থেকে ম্যাট্টিক ও নটরডেম কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অনার্স সহ স্নাতোকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন তিনি।
১৯৭২ সালে আরন্যক নাট্যদলের কবর নাটকে অভিনয়ের মধ্যদিয়ে নাটকের সাথে তাঁর পথচলা শুরু হয়। ১৯৭৩ সাল থেকে জড়িয়ে যান দেশের শীর্ষস্থানীয় নাট্য সংগঠন নাগরিকে। বাকী ইতিহাস, সৎ মানুষের খোঁজে, দেওয়ান গাজির কিসসা, নূরুলদিনের সারাজীবন, কোপেনিগের ক্যাপটেন, গ্রালিলিও, ম্যাকবেথ সহ অনেক আলোচিত মঞ্চ নাটকের অভিনেতা ও নির্দেশক তিনি। শেষ বয়সে এসে ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। তখন অভিনয় থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিলেও ২০১৯ সালে আবার তার অনেক পছন্দের নাটক গ্যালিলিওতে অভিনয় করেন। এই নাটকে বিশিষ্ট নাট্যজন আসাদুজ্জামান নূরের সাথে তার অভিনয় জুটি মঞ্চের দর্শকদের অনেক আগ্রহ ও আনন্দের বিষয়।
মঞ্চের পাশাপাশি টেলিভিশন নাটকের ক্ষেত্রেও একটা যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিরেন আলী যাকের। শারিরীক অঙ্গভঙ্গি দেখিয়ে নয় মুখে বলা সংলাপ আর অভিব্যক্তির যাদুকরী প্রতিভা ছড়িয়ে দর্শকদের মোহাচ্ছন্ন করতে পারতেন তিনি। আজ রবিবার, বহুব্রিহী, পাথর, দেয়াল সহ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক টেলিভিশন নাটকে তার অভিনয়ের দ্যূতি দর্শকদের হৃদয় ছুয়েছে পরম মমতায়। বেতারেও ৫০টিরও বেশী নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি। নদীর নাম মধুমতি ও লাল সালু চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় র্দশকদের মন ছুয়ে যায়।
সৌখিন আরোকচিত্রী হিসেবেও আলী যাকেরের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি এবং নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের সভাপতি ছিরেন। যুক্তরাজ্যের রয়াল ফটোগ্রাফিক সোসাইটির পুর্ন সদস্য নাট্যজন আলী যাকের পেয়েছেন একুশে পদক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, বঙ্গবন্ধু পুরস্কার, মনীর চৌধুরী পদক, মেরিল প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা, নয়েন বিশ্বাস পদক সহ একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার।
দেশীয় বিজ্ঞাপন শিল্পের পুরোধা ব্যক্তিত্ব আলী যাকের এশোয়টিক থ্রি সিক্সটি গ্রুপের চেয়ারম্যান ছিলেন। স্বনামধন্য অভিনয় শিল্প সারা যাকের তার প্রিয়তমা স্ত্রী। ছেলে বিশিষ্ট অভিনেতা ইরেশ যাকের ও একজন কর্পোরেট তারকা।
বেশ কয়েক বছর ধরে ক্যান্সারের সাথে লড়াই করছিলেন আলী যাকের। শেষ দিকে কিছুটা সুস্থও হয়েছিলেন। হাসপাতাল থেকে বাসায়ও নেয়া হয়েছিল। কিন্তু তাকে আর ধরে রাখা যায়নি। না ফেরার দেশের বাসিন্দাই হলেন তিনি। আলী যাকেরের বাবার ছিল বদলির চাকরি। পৈতৃক বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে হলেও বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসের কাজে এক শহর থেকে আরেক শহরে ঘুরতে থাকে তাঁদের পরিবার। আলী যাকেরের প্রথম স্মৃতি ফেনীতে। সেন্ট গ্রেগরি থেকে ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিক পাস করে তিনি ভর্তি হন নটর ডেমে, সেখান থেকে পাস করলেন ১৯৬২ সালে। পরে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি নেন। তখনই যুক্ত হন ছাত্ররাজনীতিতে, করতেন ছাত্র ইউনিয়ন। স্নাতক শেষ হওয়ার পর ১৯৬৭ সালে চলে যান করাচি। সেখানেই করেছিলেন প্রথম অভিনয়। সেখানকার জাহাঙ্গীর কোর্টে থাকতেন ছোট-বড় সরকারি আমলারা। বাঙালিদের সংখ্যাও কম ছিল না। সেখানেই নাটকে অভিনয় করেছিলেন তিনি। ১৯৬৯ সালে তিনি ফিরে আসেন ঢাকায়।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় আলী যাকের গেলেন ভারতে, নিলেন প্রশিক্ষণ। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র তখন একটি ইংরেজি সার্ভিস চালু করে। সেখানেই কাজ শুরু করেন তিনি, প্রচারণা চালিয়েছেন, হয়েছেন শব্দসংগ্রামী।
মুক্তিযুদ্ধের পর দেশে ফিরে আলী যাকের যোগ দেন আরণ্যক নাট্যদলে। ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটকে প্রথম অভিনয় করেন। ওই বছরেরই জুন মাসে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ে যোগ দেন তিনি। তখন থেকে নাগরিকই তাঁর ঠিকানা। ‘বাকি ইতিহাস’, ‘সৎ মানুষের খোঁজে’, ‘দেওয়ান গাজীর কিস্‌সা’, ‘কোপেনিকের ক্যাপটেন’, ‘গ্যালিলিও’, ‘ম্যাকবেথ’সহ অনেক মঞ্চসফল নাটকের নির্দেশক, নয়তো অভিনেতা ছিলেন তিনি। বিশ্বখ্যাত সব মঞ্চনাটক রূপান্তর করেছেন। মঞ্চের পাশাপাশি টেলিভিশন নাটকে অভিনয় করেও পেয়েছিলেন বিপুল জনপ্রিয়তা। টেলিভিশনে ‘আজ রবিবার’, ‘বহুব্রীহি’, ‘তথাপি’, ‘পাথর দেয়াল’সহ বহু নাটকে অভিনয় করেন তিনি। এ ছাড়া ৫০টির বেশি বেতার নাটক করেছেন তিনি। বেশ কিছু চলচ্চিত্রেও করেছেন অভিনয়। টেলিভিশনের জন্য মৌলিক নাটক লিখেছেন। সমসাময়িক বিষয়ে পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন, বেরিয়েছিল বই, যার মধ্যে আছে ‘সেই অরুণোদয় থেকে’, ‘নির্মল জ্যোতির জয়’। আলী যাকের শখ করে ছবিও তুলতেন।
আলী যাকের ছিলেন নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের সভাপতি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি, যুক্তরাজ্যের রয়াল ফটোগ্রাফিক সোসাইটির পূর্ণ সদস্য। পেয়েছেন একুশে পদক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, বঙ্গবন্ধু পুরস্কার, মুনীর চৌধুরী পদক, নরেন বিশ্বাস পদকসহ অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা। তাঁর স্ত্রী স্বনামধন্য অভিনয়শিল্পী সারা যাকের, পুত্র ইরেশ যাকের ও কন্যা শ্রেয়া সর্বজয়া, পুত্রবধূ মিম রশিদ, নাতনি নেহাকে নিয়ে তাঁর সংসার। বিজ্ঞাপনী সংস্থা এশিয়াটিক থ্রিসিক্সটি গ্রুপের চেয়ারম্যান তিনি।

আনসারী, প্রকৌশলী গড়ার কারিগর

অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী। বাংলাদেশের খ্যাতিমান একজন শিক্ষাবিদ এবং ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ। একজন অভিজ্ঞ প্রকৌশলী হিসেবে দীর্ঘ তিন দশক ধরে পাঠদান ও গবেষণার পাশাপাশি ভৌত স্থাপনার নকশা, নির্মাণ, মেরামত ও রক্ষনাবেক্ষণে পরামর্শক হিসেবে কাজ করে চলেছেন। ১৯৯১ সালে বুয়েট থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পাস করেই জুনে তিনি লেকচারার হিসেবে বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে যোগ দেন। ১৯৯৩ সালে বুয়েট থেকে তিনি জিওটেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। ১৯৯৬ সালে তিনি জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এ পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০০৬ সাল থেকে তিনি বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। বুয়েট-জিআইডিপাস (জাপান দুর্যোগ প্রতিরোধ ও নগর সুরক্ষা ইনস্টিটিউট) এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। বাংলাদেশ ভূমিকম্প সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি জেনারেলও ছিলেন। এ ছাড়াও তিনি উন্নয়নশীল দেশগুলির ভূমিকম্প ঝুঁকি হ্রাসের জন্য আন্তর্জাতিক প্রকৌশল উদ্যোগ (ডব্লিউ এস এস আই) এর পরিচালক। যা আন্তর্জাতিক ভূমিকম্প প্রকৌশল আইএইই দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। বাংলাদেশ সরকারের দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা কমিটিরও সদস্য। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশের তিনি আজীবন ফেলো। এবার শাহ্ সিমেন্ট নির্মাণে আমি তে তাকে নিয়ে প্রতিবেদন। লিখেছেন মোহাম্মদ তারেক

অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারীর গ্রামের বাড়ি পঞ্চগড় জেলায়। জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায়। বাবার নাম এটিএ আনসারী। তিনি সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। মা মনোয়ারা বেগম গৃহিনী। দুই ভাইয়ের মধ্যে আনসারী বড়। বাবা-মা চাইতেন তাদের সন্তান বড় হয়ে ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হবে। ঢাকা মেডিকেলে চান্স পাওয়া সত্ত্বেও তিনি ভর্তি হন বুয়েটে। তিনি হয়েছেন একজন সফল প্রকৌশলী। বাবা-মার অনুপ্রেরণা আর নিজের ইচ্ছা থেকেই প্রকৌশলী হওয়া তার। ঢাকার সেন্ট জোসেফ হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন ১৯৮২ সালে। ১৯৮৪ সালে ঢাকা কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এইচএসসি পাস করে ভর্তি হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। ১৯৯১ সালে বুয়েট থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পাস করেই লেকচারার হিসেবে যোগ দেন বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। ১৯৯৩ সালে বুয়েট থেকে জিওটেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। এরপর উচ্চ শিক্ষার জন্য জাপান সরকারের বৃত্তি নিয়ে পাড়ি দেন জাপানে। ১৯৯৬ সালে জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এ পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বিদেশের স্বপ্নযাত্রাকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে দেশে ফিরে এসে দেশের জন্য কিছু করার স্বপ্ন দেখেন। আবার শিক্ষকতা শুরু করেন। ২০০৬ সাল থেকে তিনি অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের তিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এর নানা বিষয়ে হাতে কলমে শিক্ষা দিচ্ছেন।
অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বিভিন্ন বিষয়ে গবেষনা করছেন। তার গবেষণা হলো নগর বিপর্যয় প্রশমন, যার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের শহর গুলির জন্য মাইক্রোজনেশন মানচিত্রের বিকাশ, বিল্ডিং, লাইফ-লাইন দূর্বলতার মূল্যায়ন, ফ্রি- ফিল্ড এবং সেতুর তথ্য থেকে শক্তিশালী স্থল গতির বৈশিষ্ট পর্যবেক্ষণ, সহজতর পরীক্ষামূলক কৌশলগুলির মাধ্যমে বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধ নির্মাণ, ঘূর্নিঝড়, বন্যা, আগুন ও টর্নেডোর মতো অন্যান্য নগর বিপর্যয়ের অধ্যয়ন ইত্যাদি।
র্দীঘ তিন দশকের কর্ম জীবনে অধ্যাপক আনসারী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রায় ২০০ টির মতো বিভিন্ন গবেষনা নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন। তিনি এ পর্যন্ত প্রায় ৫০ জন মাস্টার্স এবং ২ পিএইচডি ছাত্রের তত্ত্বাবধান করেছেন। তার বর্তমান গবেষণা হচ্ছে তৈরি পোশাক গুলির জন্য মূল্যায়ন পদ্ধতির বিকাশ, বেড়িবাঁধ এবং পোল্ডার গুলির ভূমিকম্প প্রতিক্রিয়া।
তিনি ডব্লিউএসএসআই এর পরিচালক। বাংলাদেশ সরকারের দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা কমিটিরও সদস্য। এ ছাড়াও বুয়েটের একজন বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ও পরামর্শক হিসেবে ছোট-বড় বেশ কিছু প্রকল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।

তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপুণ প্রকল্পে কাজ করেছেন। যেমন- পদ্মা সেতুর ভূমিকম্প নির্ধারণ, রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভূমিকম্প মূল্যায়ন, পদ্মা রেল লিঙ্ক প্রকল্পের ভূমিকম্প মূল্যায়ন। বঙ্গবন্ধু রেল ব্রিজ প্রজেক্ট, সিলেট বিবিয়ানা পাওয়ার প্ল্যান্ট প্রজেক্ট, কোয়াসটাল ব্লেট এরিয়াতে জিকা ফাউন্ডেড পোল্ডার অ্যাসেসমেন্ট প্রজেক্ট, রাজউকের ওয়ার্ল্ড ব্যাংক প্রজেক্ট, মেঘনা ঘাট পাওয়ার প্ল্যান্ট সহ অসংখ্য বিল্ডিংয়ের স্ট্রাকচারাল ডিজাইন করেছেন। এছাড়াও রাজউকের আরবান রেসিলেন্সী প্রকল্প ও রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ এই দুটি প্রকল্পে তিনি উপদেষ্টা কমিটির সদস্য। চেয়ারম্যান।
যে সব ভবন তৈরি হয়ে আছে সে গুলোকে কীভাবে ভূমিকম্প সহনীয় হিসেবে হড়ে তোলা যায়? এ প্রশ্নের উত্তরে অ্যধাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, শুরুতেই ভবন গুলোর ডিটেইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট বা বিস্তারিত প্রকৌশল মূল্যায়ন করে নিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে ভবনটি যেখানে রয়েছে সেখানকার মাটি পরীক্ষা করা, ভবনটির ফাউন্ডেশন বা ভিত্তির ওজন নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে কী না, ভবনের কলাম ও বিমে পর্যাপ্ত রড আছে কী না, কলামের ধারণক্ষমতা রয়েছে কি না ইত্যাদি বিষয় গুলো। এ গুলো পরীক্ষা করে ভবনে কোনো সমস্যা থাকলে সে গুলোর সমাধান করা যায়। ফেরোস্কেনিং ও ফোরকাটিংয়ের মাধ্যমে সহজেই এ পরীক্ষা করা যা।
সেটা কী ভাবে? শুরুতে ডিটেইলড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্টের ম্যাধমে সমস্যা চিহ্নিত করে নিতে হবে। এজন্য প্রতি বর্গফুটে খরচ হতে পারে ৫ থেকে ১০ টাকার মতো। অর্থাৎ ২০০০ বর্গফুটের ছয় তলা একটি ভবনের মূল্যায়ন করতে খরচ হবে মাত্র ৬০ হাজার টাকা। গড় হিসাব করলে এটা খুব বেশি নয়। মূল্যায়নের পর যদি কোনো সমস্যা থাকে, সে সমস্যা সমাধানের জন্য ভবনটিকে রেট্রোফিট করে নিতে হবে। রেট্রোফিট হলো এমন একটি প্রযক্তি যেটা দিয়ে পুরোনো ভবন না ভেঙে যথাযথ শক্তিশালী করা। এ পদ্ধীতিটি কিছুটা ব্যয় বহুল, যদিও নিরাপত্তার বিচারে সেটা অনেক বেশি নয়। এটি করতে প্রতি বর্গ ফুটে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। এ হিসাব ২০০০ বর্গফুটের ছয় তলা একটি ভবনের রেট্রোফিট করতে খরচ হবে ৬০ লাখ টাকা। ওই ভবনটি যদি ১০টি ফ্ল্যাটের একটি অ্যাপার্টমেন্ট হয় তাহলে প্রতি মালিকের খরচ হবে ছয় লাখ টাকা করে। নিরাপত্তার দৃষ্টি কোন দিয়ে দেখলে এটি খুব বড় ব্যয় নয়। রেট্রোফিট করার ক্ষেত্রে আমাদের দেশেও উদাহরণ রয়েছে এর মধ্যে ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সালে খাদ্য মন্ত্রনালয়ের একটি ভবনকে রেট্রোফিট করা হয়। এটি আগে চার তলা ছিল। কলাম ছিলই না। আরেকটা উদাহরণ হচ্ছে গুলশান শুটিং ক্লাবের উল্টো দিকে উইকে এআইডির একটা ভবন। আজকাল অনেক ভবন নতুন ভাবে রেট্রোফিট করা হচ্ছে। গত ৫ বছরের ২০০টি তৈরি পোশাক শিল্পের ভবন রেট্রোফিট করা হয়েছে।

আর আনন্দের সক্ষমতার কথা বলতে গেলে বলতে পারি যে আজ থেকে কয়েক বছর আগেও একটা ভবন ভূমিকম্প সহনীয় কী না, তা বলার মতো দক্ষ প্রকৌশলী আগে হয়তো ৫০ থেকে ১০০ জন ছিলেন আমাদের এখন সংখ্যাটি ৫০০ এর মতো হবে। এখন কমপক্ষে ৫০টি প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা এ বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।
নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে কী ধরনের সতর্কতা প্রয়োজন? এ প্রশ্নের উত্তরে অধ্যাপক আনসারী বলেন, ভবন নির্মাণে সতর্কতার ক্ষেত্রে অনেক গুলো বিষয় মাথায় রাখতে হবে। যেমন রি-ইনফোর্সড কংক্রিটের শুরুতে লোহার যে বেড় তৈরি করা হয়, সেটির টাই রডকে ১৩৫ ডিগ্রি কোণে বাঁকিয়ে ভেতরের দিকে ঢুকিয়ে দিতে হবে। এছাড়া ভবনের বিমের ও কলামের বিল্ডিংয়ের রডকে কোড অনুসারে ডিটেইলিং করার ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। এতে ভবন নির্মাণের ব্যয় সামান্য বেড়ে যেতে পারে। এছাড়া ভবন যদি প্রস্থের চেয়ে দৈর্ঘ্যে অনেক বেশি হয়, তাহলে এর বিভিন্ন অংশ আলাদা করা যেতে পারে। যেমন লিফটের অংশটুকু মূল ভবনের সঙ্গে সংযুক্ত না হলে ভালো হয়। আবার খেলায় রাখতে হবে, ঘরের জানালা যেন খুব বেশি বড় না হয়। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ হলো ইমারত নির্মান করা। বিল্ডিং কোডের মূল ব্যাপারটি হচ্ছে জীবনের নিরাপত্তা। এসব ভবন বিধ্বস্ত হলেও জীবন বেঁচে যাবে। কিন্তু এ জন্য প্রতি বর্গফুটে ৮০ থেকে ১০০ টাকা খরচ করাই যথেষ্ট। এ প্রক্রিয়ায় কিছু বাড়তি রড দিতে হবে। বিল্ডিংটা যাতে বাঁশের মতো হয়, বাঁশ যেমন মচকায়। ভাঙে না, তেমন করে তৈরি করতে হবে। এ ধরনের ভবনে ভূমিকম্প হলেও আমরা অবস্থান করতে পারব। এ ধরনের ভবনই আমাদের দেশে এখন অনেক বেশি। আমাদের এখানে পাঁচ হাজার টাকা বর্গফুটের ফ্ল্যাট যেমন রয়েছে তেমনি ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা বর্গফুটের ফ্ল্যাটও বিক্রি হচ্ছে। এত ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রতি বর্গফুটের ৮০ থেকে ১০০ টাকা বাড়তি ব্যয় খুবই নগন্য। আরেক ধরনের ভবন হচ্ছে, যে গুলোকে বলা হয় ইমিডিয়েট অকুপেনসি। বড় ঝাঁকুনিতেও একেবারেই ভাঙবে না। এ জন্য বর্গফুটে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা খরচ বাড়বে।

জিওটেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী মনে করেন ভূমিকম্প ঝুঁকি মোকাবিলা, দূর্যোগ প্রস্তুতি, দুর্যোগকালী করনীয় এবং দূর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য সমন্বিত ব্যবস্থা ও উদ্যোগের বিকল্প নেই। প্রতিরোধ ও প্রতিকারের ক্ষেত্রে যথাযথ উদ্যোগ নিলে ঝুঁকির পরিমানটিই কমিয়ে আনা যায়। আমরা তো ভূমিকম্প প্রতিরোধ করতে পারব না। কিন্তু সরকারের নীতিনির্ধারনী কর্মকান্ড, নিয়ন্ত্রক সংস্থা গুলোর তদারকি এবং মানুষের সচেতনতাই পারে বড় ক্ষয়-ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে।
১৯৯১ সালে তিনি বিয়ে করেন। স্ত্রী নাম সাদিয়া আফরোজ। এই দম্পতি তিন কন্যা সন্তানের জনক জননী। বড় মেয়ে মাইসুন মালিহা দেশের বাইরে থাকেন। দ্বিতীয় মেয়ে মুসফিকা আর্কিটেকচার নিয়ে পড়াশুনা করছে। আর ছোট মেয়ের নাম মুনিবা। এই শিক্ষাবীদ ও প্রকৌশলী তার কাজ সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে ভালোবাসেন।

জনপ্রিয় বিভাগ