Home Blog Page 2

শফিউল বারী : স্থাপনা শিল্পে খ্যাতিমান একজন স্ট্রাকচারাল ডিজাইন বিশেষজ্ঞ

অধ্যাপক ড. মো: শফিউল বারী। বাংলাদেশের খ্যাতিমান একজন শিক্ষাবিদ ও স্ট্রাকচারাল ডিজাইন বিশেষজ্ঞ। দীর্ঘ তিন দশক এর বেশি সময় ধরে শিক্ষাবিদ হিসেবে পাঠদান ও গবেষনার পাশাপাশি ভৌত স্থাপনার নকশা, নির্মাণ, মেরামত ও রক্ষানবেক্ষণে পরামর্শক হিসেবে কাজ করে চলেছেন। ১৯৮২ সালে বুয়েট থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংএ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পাস করার পর তিনি লেকচারার হিসেবে বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে যোগ দেন। ১৯৮৪ সালে বুয়েট থেকে তিনি স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। ১৯৮৭ সালে তিনি যুক্তরাজ্যের গ্লাসগো ইউনিভার্সিটি থেকে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর ওপর গবেষনা করে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯৮ সাল থেকে তিনি বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করছেন। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশের তিনি আজীবন ফেলো। এবার শাহ্ সিমেন্ট নির্মাণে আমিতে তাকে নিয়ে প্রতিবেদন। লিখেছেন মোহাম্মদ তারেক

অধ্যাপক ড. মো: শফিউল বারীর গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইল জেলার ধনবাড়ি গ্রামে। তার বেড়ে ওঠা ময়মনসিংহ জেলায়। বাবার নাম মরহুম ডা: আব্দুল বারী ফকির। তিনি একজন চিকিৎসক ছিলেন। মা মরহুম হোসনে আরা গৃহিনী। তিন ভাই এক বোনের মধ্যে শফিউল বারী সেঝ। বড় ভাই সাইফুল বারী একজন ডাক্তার। বড় বোন নাজমা আক্তার তিনিও একজন ডাক্তার। আর ছোট ভাই মাসফিউল বারী জনতা ব্যাংকের জিএম। ছোটবেলা থেকেই শফিউল ইঞ্জিনিয়ার হবার স্বপ্ন দেখতেন। হয়েছেনও সফল। বাবা-মার ইচ্ছা আর নিজের আগ্রহ থেকেই প্রকৌশলী হওয়া তার।
ময়মনসিংহ জেলা স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন ১৯৭৪ সালে। ১৯৭৬ সালে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এইচএসসি পাস করে ভর্তি হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। ১৯৮২ সালে তিনি বুয়েট থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পাস করে বের হওয়ার পর লেকচারার হিসেবে যোগ দেন বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। ১৯৮৪ সালে বুয়েট থেকেই মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। এরপর উচ্চ শিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্য সরকারের বৃত্তি নিয়ে পাড়ি জমান যুক্তরাজ্যে। ১৯৮৭ সালে যুক্তরাজ্যের গ্লাসগো ইউনিভার্সিটি থেকে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮৮ সালে দেশে ফিরে এসে তিনি আবার শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৯৮ সাল থেকে তিনি অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের তিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এর নানা বিষয়ে হাতে কলমে শিক্ষা দিচ্ছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করছেন। দীর্ঘ তিন দশকের বেশি কর্মজীবনে অধ্যাপক শফিউল বারী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে বেশ কিছুর মতো বিভিন্ন গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন।

অধ্যাপক ড. মো: শফিউল বারী দীর্ঘ তিন দশক ধরে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ কাজ করে যাচ্ছেন সততা ও নিষ্ঠার সাথে। বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এ গবেষণা, পরীক্ষা ও পরামর্শ ব্যুরো (বিআরটিসি) এর সদস্য হিসেবে হালকা স্টিল, কংক্রিট, ইট, বালু, সিমেন্টের নিয়মিত পরীক্ষার সাথে জড়িত। রাবার প্লাস্টিকের জন্য অপ্রচলিত পরীক্ষাগার পরীক্ষায়ও জড়িত তিনি। এছাড়াও বুয়েটের একজন বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ও পরামর্শক হিসেবে ছোট-বড় বেশ কিছু প্রকল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে কাজ করেছেন। যেমনÑ বৈদ্যুতিক সরবরাহ কর্তৃপক্ষের জন্য চর বাউসিয়ার পাওয়ার ট্রান্সমিশন লাইনের রিভার ক্রসিং টাওয়ারের বিশ্লেষণ এবং ভিত্তি নকশা, টাঙ্গাইলে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ১৬০ ফুট উচ্চ টেলিকম টাওয়ারের ভিত্তি স্থাপনের নকশা, চট্টগ্রামের খাগড়াছড়িতে পাহাড়ের শীর্ষে ওভার হেড ওয়াটার ট্যাঙ্কের কাঠামোগত নকশা, তেজগাঁও এ কোহিনূর কেমিক্যাল কোম্পানী লিমিটেড এর বিদ্যমান কারখানা বিল্ডিংয়ের সম্ভাব্য উল্লম্ব বর্ধনের উপর বিশ্লেষণ, চেকিং এবং প্রতিবেদন প্রস্তুত করন, চট্টগ্রামের কাপ্তাই হাইড্রোলিক প্ল্যান্টে নতুন ইনস্টল করা কার্গো ট্রান্সফার সিস্টেমের ভিত্তি, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় ক্ষতিগ্রস্থ অঞ্চলে গ্রামীণ আবাসন মডেল বিকল্প-২, সিরাজগঞ্জে গ্রামীণ টেক্সটাইলস মিলস লিমিটেডের কাঠামোগত নকশা, সিলেটের মৌলভীবাজারে ওভারহেড ওয়াটার ট্যাঙ্কের কাঠামোগত নকশা, কাওরানবাজারে যমুনা তেল কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ের কাঠামোগত বিশ্লেষণ, ২৬ তলা গ্রামীন ব্যাংক প্রধান কার্যালয় ভবনের নকশা, মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় কাশেম টেক্সটাইলস মিলের কাঠামোগত নকশা তদন্ত,পূর্বাচলে ৮ তলা স্টোরিড বিল্ডিং, নাভানার ১৬ তলা স্টোরিড বিল্ডিং, এমবিএইচএল এর ১০ তলা বিল্ডিং বসুন্ধরা, রেস্টুরেন্ট পায়রা পাওয়ার প্ল্যান্ট প্রজেক্ট, ঢাকায় একোয়া পরামর্শদাতা ও অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের ১৬ তলা বানিজ্যিক ভবনের নকশা সহ অসংখ্য ভবনের স্ট্রাকচারাল ডিজাইন করেছেন তিনি। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বেশ কিছু প্রজেক্টের স্ট্রাকচালার ডিজাইনের অ্যাডভাইজার হিসেবে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি বেশ কিছু নতুন প্রজেক্টের কাজ করছেন।

১৯৮৪ সালে তিনি বিয়ে করেন। স্ত্রীর নাম শাহানা বেগম। তিনি সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। এই দম্পতি তিন কন্যা সন্তানের জনক-জননী। বড় মেয়ে সায়মা তাহসিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে মাস্টার্স করেছেন। দ্বিতীয় মেয়ে নায়মা তাসনিম। তিনি একজন ডাক্তার। ইংল্যান্ডে এমআরসিপিতে পড়াশোনা করছেন। তৃতীয় মেয়ে উমামা আফরিন কানাডায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এ মাস্টার্স করছেন।
এই শিক্ষাবিদ ও প্রকৌশলী তার কাজ সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে করতে ভালোবাসেন। নিজের পেশায় দায়বদ্ধ থেকে সেটাকে সততার সঙ্গে শেষ করতে চান।

স্মৃতিপটে রাবেয়া খাতুন

আলী ইমাম

১৯৬৬ সালে পনের বছর বয়সে আমি শিশু সংগঠন কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলার আহবায়ক নির্বাচিত হয়েছিলাম। আমার পূর্বে আহ্বায়ক ছিল তখনকার আর্ট কলেজের ছাত্র সৈয়দ আবুল বারক আলভী। পরবর্তী সময়ে ফরিদুর রেজা সাগরও আহবায়ক হয়েছিল। সাগরের সূত্র ধরেই তার মা প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের অন্তরঙ্গ সান্নিধ্যে যাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করি। রাবেয়া খাতুনের অসাধারণ ব্যক্তিত্ব আমাকে প্রবলভাবে আকৃষ্ট করেছিল। এই যোগাযোগ পর্বের সূচনাটাও ছিল যথেষ্ট কৌতুহলোদ্দীপক।
পরিচালক রোকনুজ্জামান খান (দাদা ভাই) এর সম্পাদনায় শিশুতোষ ঝলমলে একটি পত্রিকা কচি ও কাঁচা প্রকাশিত হত। সেই পত্রিকার একটি অভিনব বিজ্ঞাপন দৃষ্টি আকর্ষণ করল। ঐ রকমের বিজ্ঞাপন এর আগে আমার চোখে পড়েনি। বিজ্ঞাপনের পাতা জুড়ে এক কিশোর বালকের ছবি ছাপা হয়েছে। তার কপালে চুল লেপটে আছে। চোখ দুটো ছিল ভারি সুন্দর। নিস্পাপ সারল্য ভরা মুখ। নিচে লেখা- আমার নাম সাগর। আমার বোন কেকা। আমরা দুজন ছেলেধরার কবলে পড়েছিলাম। আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানের দুর্গম অঞ্চলে। আমাদের উদ্ধার করা নিয়ে একটি দুঃসাহসিক অভিযানমূলক ছায়াছবি তৈরি হয়েছে। ছবির নাম ‘দ্যা সন অব পাকিস্তান’। ছবিটি গুলিস্তান প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে ’৬৬ সালের ৫ই অক্টোবর। এই বিজ্ঞাপনিট কেটে নিয়ে হল কাউন্টারে দেখালে তোমরা বিনামূল্যে টিকিট পাবে।

চমকিত হবার মতো বিজ্ঞাপন। দাদা ভাইকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম যে এটা ধারণা দিয়েছেন ছবিটির পরিচালক ফজলুল হক। যিনি সাগরের পিতা। আর ছবিটির কাহিনিকার হলেন সাগরের মাতা প্রখ্যাত লেখিকা রাবেয়া খাতুন।
সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে যে সেটি হচ্ছে পাকিস্তানের প্রথম শিশুতোষ চলচ্চিত্র।
আমার ওপরে ভার পড়লো কচি-কাঁচার আসরের পাতার জন্য ছবিটিকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন লেখার।
রাবেয়া খাতুন তখন থাকতেন বাসাবোতে। দাদা ভাই টেলিফোনে রাবেয়া খাতুনের সাথে যোগাযোগ করে সাক্ষাৎকারের দিনক্ষণ ঠিক করে দিলেন। আমাকে বাসার অবস্থানটি জানিয়ে দিলেন।
সাগর কচি-কাঁচা মেলার সদস্য। দাদা ভাই-এর প্রবল ইচ্ছে ছবিটির ব্যাপক প্রচার হোক শিশুদের মাঝে। একটি শিশু চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে এটাই তো বিরাট ঘটনা। আবার ছবির খুদে নায়ক নিজেও কচি-কাঁচা মেলার সদস্য। এটার প্রচার পাওয়া মানেই হল এদেশের শিশু প্রতিভার স্বীকৃতি।
আমি উত্তেজনা অনুভব করছিলাম কাহিনিকারের সাথে পরিচিত হতে পারব জেনে। কারণ কাহিনিটি অ্যাডভেঞ্চার পূর্ণ। আর অ্যাডভেঞ্চারের প্রতি আমার রয়েছে দুর্মর আকর্ষন। আগ্রহ সহকারে কিশোর রহস্য রোমাঞ্চ কাহিনি খুঁজে খুঁজে পাঠ করি।
যথাসময়ে উপস্থিত হলাম বাসাবোর সাগরদের বাড়িতে। মাঠের কোনায় দোতলা একটি বাড়ি। সাগর তখন চেনা মুখ। রাবেয়া খাতুনের কাছে জানতে চাইলাম এ ধরনের অ্যাডভেঞ্চারপূর্ণ গল্প কেন লিখলেন। তিনি জানালেন শিশুরা যাতে সমস্যার সম্মুখীন হলে আতঙ্কগ্রস্ত না হয়ে মনোবল অটুট রাখতে পারে তা বোঝাতে চেয়েছি। রুদ্ধশ্বাস স্নায়ু টান টান কাহিনি। পশ্চিম পাকিস্তানের এক ভয়ংকর পার্বত্য এলাকার ছবিটির স্যুটিং হয়েছিল।
আসলেই ছবিটি দেখে দারুণ শিহরণ জেগেছিল। পদে পদে ছড়িয়ে রয়েছে উত্তেজনা। পটভূমি পশ্চিম পাকিস্তানের দুর্গম এলাকা। রাবেয়া খাতুন উল্লেখ করলেন বাংলা শিশুসাহিত্যের রোমাঞ্চকর গল্প কাহিনিগুলেঅর কথা। হেমেন্দ্র কুমার রায়ের ‘সখের ধন’, ‘কাপালিকের কবলে’, ‘তিব্বত ফেরত তান্ত্রিক’, ‘মিশমিদের কবচ’।
জানালে বুদ্ধদেব বসুও লিখেছেন ‘ছায়া কালো কালো’, রাত্রি তখন পিশাচের’।
রাবেয়া খাতুন কথা বলেন শান্ত কণ্ঠস্বরে। কিছুটা নিচু গলায়। তার প্রসন্ন মুখাবয়বে থাকে কৌতূহলের ছাপ। বোঝা যায় যে তিনি প্রবল ভাবে অনুসন্ধিত সু প্রকৃতির। যে কারণে আমি রাবেয়া খাতুনের সাথে কথা বলতে এতটা আগ্রহী হয়ে উঠলাম।

আমিও তাকে জানালাম নীহার রঞ্জন গুপ্তের গোয়েন্দা কীরিটি রায় কিভাবে পাঠকদের মোহাচ্ছন্ন করে রাখে। আরো একটি তথ্য জানতে পারলাম রাবেয়া খাতুনের কাছ থেকে। সেটি হল বাঙালি মহিলা লেখিকা প্রভাবতী দেবী স্বরস্বতী প্রথম বাংলা শিশুসাহিত্যে গোয়েন্দা কাহিনি রচনা করেন। যেগুলো ‘দেব সাহিত্য কুটি’র থেকে ‘প্রহেলিকা’ সিরিজ নামে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হত। সেদিন রাবেয়া খাতুনের সাথে কথা বলে আপ্লুত হলাম। জানতাম তিনি এ দেশের অন্যতম কথাসাহিত্যিক। ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘মধুমতী’তেই তিনি পাঠকদের চমকে দিয়েছিলেন। মধুমতী নদী তীরে বসবাসকারি চরম অবহেলিত, বঞ্চিত তাঁতি সম্প্রদায়ের দুঃখময় জীবনধারা নিয়ে রচিত উপাখ্যান। তার মত অমন আধুনিক ধাঁচের ভাষা নিয়ে কোন লেখিকা এ দেশে সাহিত্য চর্চা করেননি।
সাগরদের বাসায় গিয়েছিলাম খুদে নারকের সাক্ষাৎকার নিতে। কিন্তু তার মার সাথে আলাপের পর আমি যেন সাহিত্যের বিশাল বিস্তৃত এক ভুবনের নতুন দিগন্তের সন্ধান পেলাম। তার পঠন জগতটি ছিল বৈচিত্র্যমন্ডিত। বিচিত্র সব বিষয়ের প্রতি তার কৌতূহল। তিনি জানতে চাইছেন মানুষের রহস্যেঘেরা পৃথিবীর স্বরূপকে। আর তা জানাতে চাইছেন অন্যদের।
তার আগ্রহ রহস্য রোমাঞ্চময় ভুবনের দিকে। তাঁর শান্ত মুখ দেখে অবশ্য ধারনা করা যায় না যে তিনি দুর্গম অঞ্চলে যেতে আগ্রহী। ছবির কাহিনির পটভূমি নির্বাচন করলেন পশ্চিম পাকিস্তানের দুর্গম পার্বত্যাঞ্চল। স্যুটিং হয়েছিল পেশোয়ারের রহস্যঘেরা কিশসাখাািনর বাজারে। ছেলেধরার দলটি সাগর, কেকাকে জাহাজে করে নিয়ে গিয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। সোয়াত নদীর ধারের হলুদ পপরার বনে। ঝাউ, পাইন, দেবদারু, চিনার গাছের দু’পাশে দীর্ঘ পথ। সোয়াত্তের রাজধানী পার্বত্য নগরী মিং গোবাতে। কাহিনির ছেলেধরার একটি চক্রের সদস্য। পাকিস্তানের সব জায়গা থেকে ছোট ছেলে মেয়েদের সংগ্রহ করে নিয়ে যেত সীমান্ত শহর সোয়াতের মূল ঘাঁটিতে।
অপরূপ প্রাকৃতিক নিসর্গময় স্থানের প্রতি রাবেয়া খাতুনের আকর্ষণ। তাই কাথান উপত্যকার শ্যুটিং এর আয়োজন করা হয়েছিল। যেখানকার নদীতে ট্রডিট মাছ শিকার এক রোমাঞ্চকর ঘটনা।
রাবেয়া খাতুন চেয়েছিলেন শিশুরা বৈচিত্র্যময় অঞ্চলের সাথে পরিচিত হোক। এই দেখার তৃষ্ণাটি প্রবল ছিল রাবেয়া খাতুনের মাঝে। যে কারণে সমস্ত পৃথিবী চষে বেরিয়েছেন তিনি। তাঁর ভ্রমণ কাহিনিতে সেই স্বাক্ষর রয়েছে। তাঁর অভিজ্ঞতা আর উপলব্ধির নির্যাসকে প্রবহমান করতে চাইছেন অন্যদের মাঝে। প্রচুর বিচিত্র ঘটনার উল্লেখ করেছেন। সাগরকে জিজ্ঞেস করে জানলাম তার মায়ের কাহিনির গতিপ্রবাহে সে সম্পৃক্ত হতে পেরেছে। দারুণ ভালো লেগেছে কাহিনি। উত্তেজনা ছিল। ছেলে ধরাতে তাকে একবার জাহাজ থেকে সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলে দিতে চেয়েছিল। রাবেয়া খাতুনের কণ্ঠে আবেগ এলো। আমার দুই ছেলে মেয়ে সাগর আর কেকা খুব সহজ ভাবে, জড়তাহীন ভাবে অভিনয় করেছে।
আমার কাছে রাবেয়া খাতুনদের পরিবারটিকে ভীষন ভালো লাগল। ভীষন রুচিশীল। নিত্য নতুন উদ্ভাবনা শক্তির পরিচয় দিচ্ছে।

রাবেয়া খাতুন দুপুরে খেয়ে যেতে বল্লেন। চমৎকার খিচুড়ি রাধতে পারেন। সেদিন খাওয়ালেন মুগ ডালের খিচুড়ি। সাথে কৈ-কাসুন্দি।
আমি অকপটে আমার ভালো সাগার অনুভূতির কথা জানালাম। বল্লাম, আপনার সাথে কথা বলতে আমি হয়তো মাঝে মধ্যে আসব।
স্মিত হেসে রাবেয়া খাতুন জানালেন, অবশ্যই নিয়মিত আসবে। তুমিও দেখছি অনেক কিছু জানো। আমি তোমাদের কথা শুনতে চাই। জানতে চাই।
রাবেয়া খাতুনের সাথে আমার পরিচয়ের সূত্রটি অর্থময় হয়ে উঠল। এটি ছিল আমার জীবনের এক তাৎপর্যময় ঘটনা। সেই থেকে প্রায়ই চলে যেতাম সাগরদের বাসাবোর বাড়িটিতে। আমার অনেক মধুর স্মৃতি জমে রয়েছে ঐ বাড়িটিকে ঘিরে।
রাবেয়া খাতুনের সাথে আলাপ করে বহু বিষয় সম্পর্কে অবহিত হয়েছি। বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন সারাটি জনম ভরে। ঢাকার আদিবাসীদের জীবনধারা নিয়ে লিখেছিলেন, ‘বায়ান্নো গলির এক গলি’ উপন্যাসটি।
যখন মাত্র তের বছরের কিশোরী তখন থেকেই লিখছেন। কিশোরী বেলার পুরনো ঢাকায় বসবাস করার স্মৃতিকথা বলতে ভালোবাসতেন। বৃক্ষশোভিত ঢাকা নগরী ছিল প্রিয়। রাজারবাগের জলাভূমি। কমলাপুরের বিস্তৃত মাঠ। নারকেল কুঞ্জ।
রাবেয়া খাতুন জানতেন যে আমি আর আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মুনতাসীর মামুন পুরনো ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য জানতে উৎসাহী।
একদিন বল্লেন, তোমার বন্ধু মামুন পুরনো ঢাকার চার্লস ডয়েলির আঁকা যেসব দুস্প্রাপ্য ছবি প্রকাশ করেছে তা দেখলে তো রীতিমত রোমাঞ্চ জাগে। আমি মালিটোলার স্কুলে পড়েছি। সেখানকার গলির একেবারে শেষ মাথার দোতলা বাসভবনটির একটা আলাদা বৈশিষ্ট্য ছিল। বাড়িটি ছিল দোলাইখালের একদম পাড় ঘেঁষা। প্রাচীন বনেদী পরিবারের যোগ ছিল পানির সঙ্গে। মোগল আমলের ইসলাম খাঁর সময় থেকে এই খালের যোগাযোগ বড় নদী বুড়িগঙ্গার সাথে। একটা সময় ছিল তখন দোলাইখালের স্রোতের ধারা প্রতি বছর বইত। এই জলপ্রবাহ বংশাল, মালিটোলা, নাজিরা বাজার, আরমানিটোরা হয়ে আবার মিলেছিল বুড়িগঙ্গার সাথে।
আমি বিস্মিত হয়ে ভাবছিলাম আমার বন্ধু মুনতাসীর যে রকম ঢাকা নগরীর বিবর্তনের বিষয়ে আগ্রহী লেখিকা রাবেয়া খাতুনও তার চাইতে কোন অংশে কমনা।
পুরনো ঢাকার মহল্লা সংস্কৃতি, সর্দার, পঞ্চায়েত ব্যবস্থা প্রসঙ্গেও তার আগ্রহ ছিল। পুরো ঢাকা কয়েকটি মহল্লার বিভক্ত ছিল। ক্ষমতার গদিতে ছিলেন একজন করে সর্দার। যেমন কাদের সর্দার, আলা সর্দার, ইলিয়াস সর্দার।
আমি রাবেয়া খাতুনের সাথে কথা বলার সময় অনেক তথ্য নোট করে রাখতাম। এই গুণটি পেয়েছিলাম রাবেয়া খাতুনের কাছ থেকেই।
ঢাকা নগরীর সামাজিক ইতিহাসের বিবর্তন ছড়িয়ে আছে রাবেয়া খাতুনের বিভিন্ন লেখায়। একদিন বলছিলেন জিনজিরার ভগ্ন প্রাসাদের কথা। আক্ষেপ করছিলেন এই বলে যে জিনজিরার প্রাসাদটি রহস্যে ঘেরা হয়েই রইল। এর অনেক ঘটনাই আমাদের নিকটে অজানা।
পরিবতির্ত হওয়া ঢাকার প্রেক্ষাপট তার কাছে ছিল কৌতূহলের বিষয়।
তিনি লিখেছেন, কোথায় সেই স্রোতস্বিনী দোলাইখাল। পাননি আর রঙিন পালতোনা চালানী নৌকার বদলে চলছে ট্রাক, পাবলিক বাস। ঘোড়ার গড়ির জায়গায় চারদ ঢাকা তিন চাকার রিকশা।
প্রতিটি গেরস্ত ঘরের খোলা আঙিনা, দেয়ালের ধার ঘেঁষে কিছু গৃহপালিত গাছ যেমন সাজনা, শবরী, আম, করমচা, বরই থাকবেই। তার বদলে গলি কানা গলির দু’ধারে লম্বা লম্বা পাকা দালান। উঠোন নেই। বৃক্ষ নেই, নেই পুঁই, কুমড়া লডি-এর জাংলা। সেদিনের গলিপথের জন্য সূর্যের যে আলো ছিল অকৃপণ, এখন তা অদৃশ্য রেশনে উঠেছে। শুরু হয়েছে প্রতিবেশীর সঙ্গে অসুস্থ কখনো অসম প্রতিযোগিতা। অট্টালিকা আরও উচু করে কে কতোটা আলো হাওয়া হরণ করতে পারে।
ঢাকা নগরীর এই বিবর্তনের ধারাকে প্রত্যক্ষ করেছেন রাবেয়া খাতুন। বসবাস করেছেন বহু অঞ্চলে। প্রথমে থাকতেন পাতলা খান লেনের ঘুপচি বাড়িতে, তারপর পুরনো কোর্ট হাউস ষ্ট্রিট, শান্তিনগর, মগবাজার, মৌচাক। শেষে ছিলেন বনানির প্রসাদোপম সাগরের বাড়িতে। সেখানেই বার্ধক্যজনতি অসুস্থতায় বিকেল ৫টায় না ফেরার দেশে চলে যান। বিত্ত, বৈভব, প্রাচুর্য তাকে বিচলিত করতে পারেনি কখনও। তিনি যাপিত জীবনের বিত্তের আকর্ষনে তার জীবনের মূল্যবোধ এবং বিশ্বাস থেকে সরে যাননি। তার প্রিয় ছিল লেখার টেবিল। একেবারে পেশাদারী মনোভাব নিয়ে নিয়মিতভাবে সাহিত্যচর্চার একান্তভাবে নিমগ্ন থেকেছেন। এ যেন ছিল এক লঞ্চের সাধনা। অভীষ্ট লক্ষ্যে উপনীত হবার জন্য লেখনীতে শ্রম দিয়েছেন। নিমগ্ন কী করে পারো? একজন সাধিকার মতো জীবনকে অতিবাহিত করেছেন। কোনো প্রলোভনেই স্থানচ্যুত হননি। কিশোরীকালে তের বছর বয়সে সাহিত্য সৃষ্টির জন্য কলম হাতে তুলে নিয়েছিলেন।
রাবেয়া খাতুনের ব্যক্তিত্ব আমাকে আকর্ষন করলো। তিনি ঢাকা নগরীর বিবর্তনধারা সম্পর্কে কৌতূহলী। আমি জানালাম মুনতাসীর মামুন এ বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। তাঁর জন্য আমি মামুনের কাছ থেকে ঢাকা বিষয়ে অনেক বিচিত্র, আকর্ষনীয় তথ্য জোগাড় করে দিয়েছি। মামুনের সংগ্রহে থাকা দোলাইখালের কিছু দুস্প্রাপ্য ছবি দেখে খুশি হয়েছিলেন।
ঢাকার আদিবাসী সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা তাকে আকৃষ্ট করেছিল।
তিনি জানিয়েছেন, আমার শৈশব কৈশোরের অনেকখানি সময় কেটেছে পুরনো ঢাকার বিভিন্ন মহল্লায়। সবচেয়ে বেশি বছর রায় সাহেব বাজারে। তখন যানবাহন বলতে ঢাকার রাস্তায় বোঝাতো ঘোড়ার গাড়ি, চার চাকার, খালিকটা লম্বাটে বাক্স চেহারার। ভেতরে মাঝে পাদানি রেখে দু’ধারে বসার গদি। ঠেসেঠুসে জনা ছয় ওঠা যেতো। ঝিলমিল খড়খড়ি জানালা। কোচোয়ান কে ঢাকায় বলা হতো গাড়োয়ান। পুরুষ বা শিশুরা তার পাশে বসতে পারত। দু’দিকে দুটি বাতি। পেছনে কাঠের একটি বড় আসন থাকত। পালকির পর ঘোড়ার গাড়ির যাত্রা শুরু অবস্থাপন্ন ঘর থেকে। পেছনের ঐ জায়গাটি নির্ধারিত ছিল পাইক বরকন্দাজদের জন্য।
আমি রাবেয়া খাতুনের বিভিন্ন রচনায় ঢাকা নগরীর পরিবর্তনশীলতার পরিচয় পেয়েছি। আমি নিজেও বেড়ে উঠেছি পুরনো ঢাকার গলিতে। ঠাটারি বাজারের আমাদের পাশের বাড়িতে থাকতেন আনিসুজ্জামানেরা।
রাবেয়া খাতুন বল্লেন, বুড়িগঙ্গা থেকে ফুলবাড়িয়া রেল স্টেশন, এই তো ছিল নগীর ঢাকার ভৌগোলিক সীমানা। গ্রাম থেকে আসা লোকেরা দু আনার টিকেট কেটে সদরঘাটের রূপমহল হলে ঢুকে সিনেমা দেখত। ঢাকার মহল্লায় মহল্লায় ভাগ ভাগ আদিবাসী। সেই ঢাকা কি দ্রুত পালটে যাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে জীবনধারা।
আমার আর মামুনের আগ্রহের একটি বিষয় ছিল পরিবর্তিত ঢাকা। তাই রাবেয়া খাতুনের কৌতূহল মেটাতে আমি অনেক তথ্য-উপাত্ত সাংগ্রহ করে দিতাম। রাবেয়া খাতুন নোট নিতে পছন্দ করতেন। তাঁর কাছ থেকেই জেনেছিÑ ঢাকাইয়া ঝিদের বলা হত ‘মামা’। এ মামাদের সাথে কেউ খারাপ ব্যবহার করলে সে বাড়ি ঘেরাও হয়ে যেতো। মহিলারা দিনের বেলা রাস্তায় বেরুলে অবিশ্যি বোরকার আবরণ নিতো।
একদিন বল্লেন তার বাবার কথা।
আমার আব্বা ছিলেন অত্যন্ত সুকণ্ঠের অধিকারি। তিনি ছিলেন শখের গাইয়ে। ছুটির দিনে বসতেন হারমোনিয়াম নিয়ে। মহল্লাতে আবার হারমোনিয়অমের স্বর হারাম হিসেবে বিবেচিত। তার সেই খেদটা কখনও পূর্ণ হতো ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলে।
সেই ক্রমাগত বদলে যেতে থাকা ঢাকা নিয়ে আমরা কথা বলতাম। রাবেয়া খাতুন সেই সব হারিয়ে যাওয়া মানুষদের ছবি ধরে রেখেছেন। জানিয়েছেন কিশোরীকালে দেখা চানমল সর্দারের কথা। ধবধবে শাদা দাড়ি, বাবরি চুল, সুরমা পরা দু’চোখ, কল্লিদার পাঞ্জাবি, দুধবরণ রেঙ্গুনি লুঙ্গি, চামড়ার বেল্ট দিয়ে পরা।
তাঁর স্মৃতিতে হারিয়ে যাওয়া ঢাকা নগরীর ছবি খুঁজে পেতাম। এটি আমার এক মুগ্ধচারিতার বিষয় ছিল।
রাবেয়া খাতুন জানালেন তাদের মহল্লার কোবাকাম বলে পরিচিত রাজমিস্ত্রির কথা। যে ছিল শৈল্পিক জ্ঞানের অধিকারি। তার বাড়ির মাটির দেয়াল, টিনের চাল, কাঠের দরোজার আপন দুটি ঘরের সবখানে সুন্দর সব নকশা।
উঠোনের বিরাট সজনে গাছের ছায়ায় চট বিছিয়ে খেলতেন। সজনে তলা থেকে বেরিয়ে যেতেন। ঘুরতেন সারা পাড়া, বাজার, রাজপথ, পাশের কলতাবাজার, সেখানকার বরফ কল। পাড়ার উত্তর প্রান্তে বহমান ছিল দোলাইখান। বুড়িগঙ্গার সাথে মিশে বর্ষাকালে খালটি ফুলেফেঁপে রীতিমত বড় হয়ে উঠত। খাল দিয়ে ভেসে যেত রঙিন পাল তোলা মহাজনী নৌকা, ধীর বেগে নাওয়ের বহর।
গ্রীস্মকালে দোলাইখাল পরিণত হতো শীন ধারার। যা ঘিরে সবুজ গাছপালার বারোয়ারী সমারোহ ছিল।
কিশোরী রাবেয়া খাতুন খুব ঘুরতেন। সকলের বাড়িতে তখন উঠোন থাকত। সে মাটিতে ছিল সাধ্যমতো গাছপালা। শবরি আম, সাজনা ফুল, করমচা, কুল, জাম্বুরা সব আঙিনায় শোভা পেত।
কখনও যেতেন শহরের বাইরে কমলাপুর গ্রামে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। পল্টন ময়দানে ছিল গোরা সৈন্যদের ছাউনি।
সেই সময়ের ঢাকার বুকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঘোড়াদৌড়, ভয়াবহ মন্বন্তর সবই এসেছে।
ঢাকার আদিবাসিদের জীবনযাত্রা নিয়ে দীর্ঘ উপন্যাস লেখার বাসনা প্রকাশ করেছিলেন রাবেয়া খাতুন। তিনি লিখলেন সাহেব বাজার। দৈনিক আজাদ পত্রিকার সাহিত্য বিভাগে ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হতো। তাতে ছিল তার অন্তরঙ্গ আলোকে দেখা বিভিন্ন চরিত্র। পুরনো ঢাকার খান্দানী গাড়োয়ান বুড়ো সৈয়দ আলী। যার ছিল সতেজ চিন্তা। নবাবী আমল, ঊনচল্লিশের সেপ্টেম্বরে ইংরেজদের লড়াই, আকাল, বোমাতঙ্ক। তার ভেতরে জন্ম নেয়া নতুন এক পুঁজিবাদী শ্রেনি।
রাবেয়া খাতুন এ প্রসঙ্গে দার্শনিক সুলভ একটি উক্তি করলেন, আসলে আমরা সবাই আপন সময়ের নষ্ট প্রহরকে শুধু দেখে যাওয়া ছাড়া আর কোনও ভূমিকা রাখতে পারি না।
অথচ রাবেয়া খাতুন পাতার পর পাতা লিখে সেসব প্রহরগুলোকে ধরে রেখেছেন। তিনি অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে পরিবেশকে পর্যালোচনা করতে পারতেন। তাঁর ছিল বিস্ময়কর রকমের সৃষ্টিশীল এক ক্ষমতা। এই ক্ষমতার সাহায্যে ক্লান্তিহীনভাবে লিখে গেছেন তিনি। তাঁর এই সাধনার প্রতি বলা চলে, নিমগ্ন, কি করে পারো।
তিনি আর আমাদের মাঝে নেই। চলে গেছেন না ফেরার দেশে।
তাঁর কথা আমার স্মৃতি পটে লেখা। তার কথা মনে করে চোখ ভিজে যায়।
রাবেয়া আপা, আমি কখনও আপনাকে ভুলতে পারব না। আমার জীবনে আপনার মতো এতোটা আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন মহিলা আর চোখে পড়েনি। আপনি ছিলেন স্বাতন্ত্র্যে সমুজ্জ্বল। এই ছিলেন কথাটি লিখতে গিয়ে আমার চোখ পুনরায় জলে ভরে যায়। চোখ ভিজে যায়।

রাবেয়া খাতুন বাংলা সাহিত্যের নক্ষত্রের বিদায়

Rabeya-Khatun

রেজানুর রহমান
জীবনে এতো কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে একথা একবারও ভাবিনি। আনন্দ আলো এক যুগ অতিক্রম করেছে। এই দীর্ঘ পথে আনন্দ আলোর প্রতিটি সংখ্যার প্রচ্ছদমুখ অর্থাৎ কাভার স্টোরির আইডিয়া দিয়েছেন সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি, বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক, চ্যানেল আই এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর। মাসে আনন্দ আলোর দুটি সংখ্যা প্রকাশ হয়। কাভার স্টোরি নির্ধারনের ক্ষেত্রে কখনও কখনও সাগর ভাই-ই আইডিয়া তুলে ধরেন। অথবা আমি প্রস্তাব করলে তার পরামর্শ অনুযায়ীই কাভার স্টোরি নির্ধারণ করা হয়। এমনও হয়েছে সাগর ভাই দেশের বাইরে রয়েছেন। ফোনেই কাভার স্টোরির আইডিয়া নিয়ে কথা বলেছি। হয়তো এক সপ্তাহ ধরে নতুন কাভার স্টোরি নিয়ে ভাবছি। সাগর ভাই বড় জোর পাঁচ মিনিট সময় নিলেন। কাভার স্টোরির আইডিয়া চূড়ান্ত হয়ে গেল। ফলে কাভার স্টোরির ব্যাপারে অনেকটাই নির্ভার থাকি আমি। মাথার ওপর ফরিদুর রেজা সাগর আছেন। নির্ভরতার ছাদ। কাজেই আমার তো কোনো চিন্তা নাই। কিন্তু আনন্দ আলোর কাভার স্টোরি করা নিয়ে আমাকে যে এতো কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে সে জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না।
রাবেয়া খাতুন বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ লেখক। তিনি হঠাৎ করেই না ফেরার দেশে চলে গেলেন। বাংলা ভাষার এই সেরা লেখককে ঘিরে আনন্দ আলোর একাধিক সংখ্যা প্রকাশ হওয়া উচিৎ। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলা ভাষার এই সেরা লেখক হলেন আমাদের মা। মায়ের হঠাৎ মৃত্যু সন্তানদের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে একথা সবাই জানেন ও বোঝেন। কাজেই মায়ের মৃত্যুর পর-পরই তাঁকে নিয়ে ছাপার অক্ষরে কিছু করতে যাওয়া সত্যিই অনেক কষ্টের। কঠিন পরীক্ষাও বটে। তাঁর ওপর রাবেয়া খাতুনের মতো সেরা লেখক, গুণী ব্যক্তিত্বের ওপর কিছু করতে যাওয়াও তো অনেক সাহস ও প্রজ্ঞার ব্যাপার।

আমার মনে হলো সম্পাদক হিসেবে এই সাহস ও প্রজ্ঞা আমি খুঁজে পাচ্ছি না। সৌভাগ্যবশতঃ রাবেয়া খাতুনের স্নেহ পেয়েছি। তিনি আমাদের খালাম্মা। আমাদের মা। তাঁর ওপর ছাপার অক্ষরে কিছু করতে গিয়ে পাছে না ভুল করে ফেলি।
আমার মাথার ওপর নির্ভরতার বিশাল ছাদ হয়ে আছেন ফরিদুর রেজা সাগর। আনন্দ আলোর কোনো সিদ্ধান্তই তাকে ছাড়া কোনো দিন নেইনি। এবার কী করব? জিজ্ঞেস করব তাকে? কিন্তু কিভাবে? তিনি তো চিকিৎসার জন্য দুর দেশে অবস্থান করছেন। আমরা অনেকে খালাম্মার জন্য এখনও চোখের পানি সামলাতে পারছি না। আর মায়ের জন্য কতটা হাহাকার হচ্ছে আপন সন্তানদের সেটাতো সহজেই অনুমেয়। কল্পনায় বার বার সাগর ভাইয়ের মুখটা দেখার চেষ্টা করলাম। যখনই কল্পনা করি তখনই বুক ফেটে কান্না আসে। পৃথিবীর প্রত্যেক সন্তানই তার মাকে ভালোবাসে। কিন্তু ফরিদুর রেজা সাগর যেভাবে তাঁর মাকে ভালোবাসেন শ্রদ্ধা করেন সেটা বিরল। মা-ছেলের এমন মায়াময় সম্পর্ক আমি আর দেখিনি। এক অর্থে মা রাবেয়া খাতুন ছিলেন ফরিদুর রেজা সাগরের সব চেয়ে ভালো বন্ধু। সে কথা রাবেয়া খাতুন জীবদ্দশায় বলেছেনও। “সাগর আমার জীবন সংগ্রামের অন্যতম সহযোগী। এক অর্থে ও আমার বন্ধুও বটে”।
আমি পড়ে গেলাম মহা ভাবনার মধ্যে। রাবেয়া খাতুনকে নিয়ে আনন্দ আলোর বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ হবে। সেখানে ফরিদুর রেজা সাগরের পরামর্শ ছাড়া কি ভাবে এগুবো আমি? আনন্দ আলোয় নিজের রুমে বসে একটি লেখা লিখছিলাম। হঠাৎ এলো গোলাম মোর্তুজার ফোন। বিশিষ্ট সাংবাদিক গোলাম মোর্তুজা। সাপ্তাহিক এর সম্পাদক। ফোনে কথা কেটে কেটে আসছিল। যতটুকু বুঝলাম তাতে মনে হলা রাবেয়া খাতুন সম্পর্কে জানতে চাচ্ছে। হ্যালো… রেজানুর ভাই…. শুনতে পাচ্ছেন? রাবেয়া খালাম্মার খবর কী? হ্যালো…
মোর্তুজার কথা শুনে ভয়ে বুকের ভিতরটা ছাৎ করে উঠলো। কোনো দুঃসংবাদ কী? সাথে সাথে আমীরুল ইসলামকে ফোন দিলাম। আমীরুলই দুঃসংবাদটা দিলেন। বললেন, ‘আমরা বনানীতে সাগর ভাইয়ের বাসায়। তাড়াতাড়ি আসেন…. ফোন রেখে কি করবো ভাবছি। কান্না সামলাতে পারছি না। সাগর ভাইকে কী একটা ফোন দিব? পরক্ষনেই মনে হল তাকে ফোন দিয়ে কি বলব? এতক্ষণে তার বুকের ভেতরটা তো কষ্টের নদী হয়ে গেছে। আহারে! মাকে ছেড়ে থাকতে হবে বলে অসুস্থতা সত্বেও চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাচ্ছিলেন না। এই তো মাত্র কয়েকদিন আগেই ২৭ ডিসেম্বর ছিল রাবেয়া খাতুনের জন্মদিন। মায়ের জন্মদিনে একটি হৃদয় ছোয়া লেখা লিখেছিলেন। ছোট্ট লেখা। অথচ অনেক মায়া আর শ্রদ্ধায় উজ্জ্বল প্রতিটি শব্দ।

Rabeya-Khatun

“একটা কথা রয়েছেÑ পরিবারের অবস্থান থেকে তৈরি হয় পরবর্তী প্রজন্ম। একটা পরিবার বা পরিবারের মানুষগুলো কীভাবে বেড়ে ওঠে তার উপর নির্ভর করে সেই পরিবারের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। আর একটা পরিবার দাঁড়িয়ে থাকে আমাদের মতো দেশে মায়ের উপর। মায়ের শিক্ষা, মা যেভাবে পরবর্তী প্রজন্মকে শিক্ষিত করতে চান, জানাতে চান কীভাবে জীবন চলবে, ঠিক সেইভাবেই তৈরি হয় একটা নতুন প্রজন্ম।
আমরা চার ভাইবোন আজকে জীবনে যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখানটায় আমাদের মায়ের অবস্থান কোথায়! কথা ঘুরে ফিরে একটাইÑ বাঙালি পরিবারের মা এমন একটা অবস্থানে থাকে, সে অবস্থান থেকে ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যত নির্ধারিত হয়। আজকে আমাকে যদি আমাদের মা সম্পর্কে বলতে হয়, তাহলে বলার তো অনেক কিছুই রয়েছে। মা তো মা-ই হয়। সব মা-ই একই রকম। একই গুণ কিন্তু তার মধ্যেও প্রত্যেকটি মায়ের আলাদা রূপ আছে। একটা কথা ভেবে আমি খুব অবাক হই, বিস্মিত হইÑ আজকে যখন আমার মেঘনার ছোট মেয়ে আমার নাতনি একটা সকাল কনার সঙ্গে কাটায়, কনা বলেÑ এক সকালে এত যন্ত্রণা দেয়। সেখানে আমরা চার ভাইবোন আমার মাকে কী পরিমাণ যন্ত্রণা দিয়েছি! কারণ প্রায় পিঠাপিঠি ভাইবোন আমরা। সেটা যদি এখন আমরা ভাবি, তাহলে আমি বিস্মিত হই। কিন্তু তারচেয়েও বড় বিস্ময় আমার কাছে, আমি যখন দেখি আমার মায়ের লেখা বইগুলো আলমারিতে সাজানো রয়েছে, বইগুলো শুধু যে আম্মার লেখা তাই নয়, অনেক অনেক বই আমি ছোটবেলায় দেখেছি। এই বইগুলো তিনি পড়েছেন, পড়িয়েছেন আমাদের প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন।

টেলিভিশনের প্রায় সব অনুষ্ঠানই তিনি দেখেছেন। আমাদের দেখানোর ব্যাপারে উৎসাহ দিয়েছেন। আর সবচেয়ে বড় কথা, আম্মার যে বইগুলো রয়েছে সেই বইগুলো আমার ধারণা, এখন যদি কাউকে বলি যে, বইগুলো দেখে দেখে লেখো তাহলেও একজীবন লেগে যাবে শুধু সেটা কপি করতে। তাহলে আমার মা কখন আমাদের দেখলেন, কখন লিখলেন আর কখনই-বা আপনাদের সবার প্রিয় রাবেয়া খাতুন হয়ে উঠলেন। এই কখন সময়টা যদি খুঁজতে হয় তাহলে তো অনেক দশকের কথা বলতে হয়। এই এত লম্বা সময় ধরে তিনি কীভাবে কাজ করে যাচ্ছেন, উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন, অনেকের কথা ভাবছেনÑ সেটা আজকে তাঁর জন্মদিনে আমার জন্য আমাদের জন্য একটা বড় বিষয়।
সেজন্য এ অনেক বড় বিষয়ের সঙ্গে এই জন্মদিনে আমার মাকে অনেক শুভেচ্ছা। এখন আমার একটা আলাদা পরিবার রয়েছে। মেঘনার ছোট্ট মেয়েটি, যে এখন বলতে পারে না কথাÑ তার পক্ষ থেকেও অনেক অনেক শুভেচ্ছা।”
২৭ ডিসেম্বর ঘরোয়াভাবে মায়ের জন্মদিন পালন করে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান সাগর ভাই। নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস এর কয়েকদিন পর অর্থাৎ ৩ জানুয়ারি মৃত্যু হয় রাবেয়া খাতুনের। বড় মেয়ে কেকা ফেরদৌসী ও বড় জামাতা মুকিত মজুমদার বাবু ছাড়া পরিবারের আর কেউই দেশে ছিলেন না।
রাবেয়া খাতুনের মৃত্যু সংবাদ শোনার পর-পরই ছুটে গেলাম সাগর ভাইয়ের বনানীর বাসায়। ততক্ষণে সারা পৃথিবী জেনে গেছে রাবেয়া খাতুনের মৃত্যু সংবাদ। আমীরুল ইসলামকে দেখলাম বিদেশে সাগর ভাইয়ের সাথে কয়েকবার কথা বললেন। মন চাইছিল একবার সাগর ভাইয়ের সাথে কথা বলি। কিন্তু সাহস হল না। কী বলব তাকে? কান্না ছাড়া তো কিছুই প্রকাশ করতে পারব না। একবার মনে হলো কনা ভাবীর সাথে কথা বলি। পরক্ষনেই মনে হল, তিনি কি আমার ফোন ধরবেন? তাকেই বা কি বলব? প্রবাল ভাইয়ের কথা মনে পড়লো। ফোন করব কী? এবারও নিজেকে গুটিয়ে নিলাম। একবার মনে হল মামুন ভাইকে ফোন করি। পরক্ষনেই মনে হলÑ ফোন করে কি বলব? ফোন করার সাহস পেলাম না।
রাতে ঘুম হলো না। বার-বার খালাম্মার মায়াভরা মুখটা চোখের সামনে ভাসছে। ফোন করলেই কী যে এক মায়ায় জড়িয়ে জিজ্ঞেস করতেনÑ কী লিখছ? বাংলা ভাষার সেরা লেখক আমাকে জিজ্ঞেস করছেনÑ কী লিখছ? কতজনের ভাগ্যে এমন মায়াময় প্রেরনা জোটে।
সেই ছোটবেলায় আমার শিক্ষক পিতার মুখে রাবেয়া খাতুনের নাম শুনেছিলাম প্রথম। ছোট বেলায় দেখতাম আব্বা সময় পেলেই বই অথবা পত্রিকা পড়তেন। প্রতি মাসেই প্রিয় কবি, লেখকের নতুন বই কিনতেন। বইয়ের সাদা পাতায় বই কেনার তারিখ এবং সেদিনের অনুভূতির কথা লিখে রাখতেন। সৈয়দপুর শহরে নামকরা একটি পত্রিকার দোকান আছে। নিউজ কেবিন নামেই পরিচিত। শহরের শিক্ষিত মানুষদের আড্ডা স্থল ছিল এই পত্রিকা বিক্রির দোকানটি। দোকানের মালিকের এক ছেলে পড়তো শহরের নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সাবর্ডিনেট কলোনী প্রাইমারী স্কুলে। আব্বা ছিলেন ওই স্কুলের জনপ্রিয় শিক্ষক। ছাত্র-ছাত্রীরা তাকে শ্রদ্ধা ভরে ‘খেলার স্যার’ বলে ডাকতো। ছেলের স্কুলের শিক্ষক বলেই আব্বা নিউজ কেবিনে গেলে আলাদা সমাদর পেতেন। আব্বা নিউজ কেবিনে দাঁড়িয়েই সেদিনের দৈনিক পত্রিকা পড়তেন। তবে প্রতি সপ্তাহে চিত্রালী ও পুর্বাণী নামের সিনেপত্রিকা কেনা ছিল তার অভ্যাস। আর প্রতি মাসেই প্রিয় লেখকের বই কিনতেন। সম্ভবত আমি তখন ক্লাশ ফাইভের ছাত্র। একদিন দেখলাম আব্বা একটি বইপড়া নিয়ে দারুন ব্যস্ত। খাওয়ার সময়ও বইটি হাতে থাকে। ঘুমাতে যাবার আগেও বইটিকে হাত ছাড়া করতে চান না। বালিশের নীচে বই রেখে ঘুমান। এক ধরনের কৌতুহল জন্মায় আমার মাঝে। কিন্তু বড়দের ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে ছোটোদের নাক গলানোর কোনো মানে হয় না। সেজন্য খুব একটা আগ্রহ দেখাই না। কিন্তু আব্বাই বইটির নাম ও লেখকের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। আজ বইটির নাম মনে করতে পারছিনা। তবে লেখকের নাম স্পষ্ট মনে আছে। তিনি হলেন বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ লেখক রাবেয়া খাতুন। আব্বার আগ্রহেই আমি বই পড়ার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠি এবং এক সময় রাবেয়া খাতুন, সৈয়দ শামসুল হক, শওকত আলী, শওকত ওসমান, রাহাত খান, রশীদ হায়দার, রিজিয়া রহমান এবং ইমদাদুল হক মিলন আমার প্রিয় লেখক হয়ে ওঠেন। রাবেয়া খাতুনের মধুমতি উপন্যাস পড়ার পর থেকেই আমার ইচ্ছে জন্মায় জীবনে যদি সুযোগ পাই তাহলে একবার হলেও রাবেয়া খাতুনকে সামনা সামনি দেখব। তার পা ছুঁয়ে সালাম করবো। একদিন কথায় কথায় আমার ইচ্ছের কথা আব্বাকে বলেছিলাম। তিনিই সাহস দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, তোমার ইচ্ছে একদিন অবশ্যই পুর্ণ হবে।

একদিন সত্যি সত্যি স্বপ্নটা বাস্তবে ধরা দিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তি হয়েছি। সৌভাগ্যক্রমে তখনকার সময়ের দেশসেরা একমাত্র দৈনিক পত্রিকা ইত্তেফাকে ‘বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার’ হিসেবে যুক্ত হবার সুযোগ পেলাম। সাংবাদিক এবং লেখক হবো এই স্বপ্ন নিয়েই ঢাকায় এসেছিলাম। সে কারণে গণযোগযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র থাকাকালীন ইত্তেফাকে যুক্ত হই। ইত্তেফাকে কাজ করেছি একটানা ১৯ বছর। এর মধ্যে সৌভাগ্যক্রমে পরিচয় হয় দেশের বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক ফরিদুর রেজা সাগরের সাথে। আমার ধারনা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে। আর দৈনিক ইত্তেফাক স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে কিভাবে হাটতে হয় তার সাহস যুগিয়েছে। আর ফরিদুর রেজা সাগর আমার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে অবিচল থাকার অযুত প্রেরণা যুগিয়ে চলেছেন। একদিন কথায় কথায় দেশে একটি ভালো মানের বিনোদন পত্রিকা প্রকাশ করা যায় কিনা এব্যাপারে সাগর ভাইয়ের কাছে প্রস্তাব তুলেছিলাম। তিনি সেদিন কিছুই বলেননি। তবে বেশ কিছুদিন পর হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ধরো, আমরা একটি বিনোদন পত্রিকা বের করার সিদ্ধান্ত নিলাম। তুমি ইত্তেফাক ছেড়ে আসতে পারবে?
সাথে সাথেই জবাব দিলামÑ হ্যা পারব।
ভেবে বল।
দৈনিক পত্রিকা মানেই তো তখনকার দিনে ইত্তেফাকই সেরা। প্রচার সংখ্যায় সবার শীষে অবস্থান। জনপ্রিয়তার একটা মোহ তো আছেই। তাছাড়া আছে পেশাগত নিশ্চয়তা। কিন্তু আমার মাঝে একটা অস্থিরতা কাজ করতো। ভালো মানের একটি বিনোদন পত্রিকার অস্থিরতা। পাশের দেশের একাধিক বিনোদন পত্রিকা আমাদের দেশে বেশ জনপ্রিয়। ওরা পারলে আমরা কেন পারব না? মূলতঃ এই জেদ থেকেই আমার উনিশ বছরের বিশ্বস্থ ঠিকানা ইত্তেফাক ছেড়ে দিয়ে যুক্ত হলাম ইমপ্রেসের বিনোদন পাক্ষিক আনন্দ আলোয় সম্পাদক হিসেবে। আমার পরিবার ও সাংবাদিক বন্ধুদের অনেকেই সেদিন অবাক হয়েছিলেন। ইত্তেফাকের চাকরি ছেড়ে দিয়ে একটি পাক্ষিক বিনোদন পত্রিকায় যুক্ত হওয়া সত্যিকার অর্থে সাহসেরও ব্যাপার ছিল।
আসল কথায় আসি। আনন্দ আলোতে যুক্ত হওয়ার পরই মূলতঃ বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ লেখক রাবেয়া খাতুনের সাথে সাক্ষাতের সুযোগ ঘটে। আনন্দ আলোতে রাবেয়া খাতুনের একটি এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার ছাপতে চাই। সাগর ভাইকে ইচ্ছের কথা জানালাম। সাথে সাথেই তিনি ফোনে রাবেয়া খাতুনের সাথে কথা বললেন। ‘আম্মা, আনন্দ আলো আপনার একটা সাক্ষাৎকার নিতে চায়। সম্পাদক রেজানুর রহমান নিজেই আসবে’।
বোঝা গেল রাবেয়া খাতুন সম্মতি দিয়েছেন। পরের দিন বিকেল ৩টায় সাগর ভাইয়ের ইসকাটনের বাসায় যাবো বলে সিদ্ধান্ত হল।
রাতে ঠিকমতো ঘুম হল না। প্রিয় লেখকের সাথে দেখা হবে। প্রশ্ন সাজালাম। কিভাবে প্রশ্ন গুলো করবো তার একটা মহড়াও দিলাম। কিন্তু পরের দিন প্রিয় লেখকের মুখোমুখি হওয়ার পর মনে হল খামাখা টেনশনে ছিলাম সারা রাত। দরজা খুলে দিয়েছিল কাজের মেয়ে। ড্রয়িংরুমে বসিয়ে দিয়ে সে চলে গেল বাসার ভিতর। তারপর এক গাদা নাস্তা নিয়ে এলো। হঠাৎ ড্রয়িংরুমে ঢুকলেন রাবেয়া খাতুন। আমি বিস্ময়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছি। পোশাকে, চেহারায় বাঙালিয়ানার দ্যূতি ছড়িয়েছে। মুখে মায়া ছড়ানো হাসি।
কেমন আছো?
বললাম, ভালো আছি। তাঁর পা ছুঁয়ে সালাম করলাম। মনে হল তার পা দুটো যেন আমার মায়েরই পা। তিনিও আমার সামনে সোফায় বসলেন। মমতা ছড়ানো কণ্ঠে বললেন, মিষ্টি খাও!
আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর দিকে তাকিয়ে আছি। তিনি নিজেই আনন্দ আলোর প্রসঙ্গ তুললেন। বললেন, তোমাদের পত্রিকাটা অনেক ভালো হচ্ছে।
সত্যি কথা বলতে কী দশ/পনের মিনিটের ব্যবধানে আমার সকল ভয়-ভীতি, জড়তা দুর হয়ে গেল। সাক্ষাৎকার পর্ব শুরু হল। বাংলা ভাষার সেরা লেখকের সাথে কথা বলছি। একবারও মনে হল না আজই তাঁর সাথে প্রথম মুখোমুখি দেখা। মনে হল কতদিনের চেনা। সত্যি তো রাবেয়া খাতুনকে অনেক দিন ধরে চিনি তার লেখার মাধ্যমে। তবে আজ নতুন একটা সম্পর্ক হল। তাকে খালাআম্মা বলে ডাকার সৌভাগ্য হল। খালাআম্মা তো মায়েরই সমান। কী যে আনন্দ হচ্ছে।
নানা প্রসঙ্গে, নানা বিষয়ে বহুবার রাবেয়া খাতুনের মুখোমুখি হয়েছি। কম কথা বলতেন। কিন্তু যা বলতেন তার সরটাই জরুরি। বাহুল্য পছন্দ করতেন না। অহেতুক প্রশংসায় বিরক্ত হতেন! বড় ছেলে ফরিদুর রেজা সাগরের সাথে ছিল তার গভীর বন্ধুত্ব। এক সময় তাঁর জীবন সংগ্রামের প্রেরণা শক্তি হয়ে ওঠেন বড় ছেলে ফরিদুর রেজা সাগর।
একদিন কথায় কথায় বলেছিলেন, সাগর আমার পাশে না দাঁড়ালে আমি হয়তো এতো কিছু করতে পারতাম না। ছোট্ট বয়সেই ও আমার সাথে অনেক সংগ্রাম করেছে। এক অর্থে ও আমার বন্ধুও বটে।
লেখালেখির ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বিভাজন মোটেই পছন্দ করতেন না রাবেয়া খাতুন। একদিন কথায় কথায় বলেছিলেন, এই যে নারী লেখক বলা হয়। এটা কেন? পুরুষের বেলায় কি পুরুষ লেখক বলা হয়? লেখক তো লেখকই। তার আবার বিভাজন কী?
ভালো কলম, ভালো কাগজে লিখতে পছন্দ করতেন রাবেয়া খাতুন। তবে লেখার সেই পুরনো টেবিলটাকেই অনেক ভালোবেসে ফেলেছিলেন। জীবন পাল্টেছে, বাসা পাল্টেছে। আসবাবপত্র বদল হয়েছে। শুধুমাত্র লেখার সেই টেবিলটার বদল হয়নি। আমার সৌভাগ্য হয়েছে ঐতিহাসিক ওই টেবিলের সামনে বসে রাবেয়া খাতুনের সঙ্গে কথা বলার। জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনার লেখার টেবিল সেই আগের মতোই….
আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, এই টেবিলটাও আমার সংগ্রামী জীবনের অংশ। তাকে ছেড়ে থাকি কি করে?

Rabeya-Khatun

সহজ কথা যায় না বলা সহজে। ভেবেছিলাম রাবেয়া খাতুনকে ঘিরে অনেক কথা লিখব। কত স্মৃতি, কত কথা। সহজ-সরল জীবনাল্লেখ্য। কিন্তু সহজ কথা যায় না বলা সহজে।
৪ঠা জানুয়ারি রাবেয়া খাতুনের মরদেহ প্রথম নেওয়া হল বাংলা একাডেমিতে। ততক্ষণে ভীড় জমে গেছে দেশের সাহিত্য, সংস্কৃতিকর্মী সহ বিশিষ্টজনদের। একাধিক মন্ত্রীও এলেন। সবার চোখে কান্না। দুপুরে মরদেহ আনা হল চ্যানেল আই প্রাঙ্গনে। অসংখ্য শোকাতুর মানুষ নামাজে জানাজায় অংশ নিলেন। যাকে দেখি তিনিই কাঁদছেন। বিকেলে বনানী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হল বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনকে।
আমি তখনও একটা ঘোরের মধ্যেই আছি। বিশ্বাস হচ্ছিলো না রাবেয়া খাতুন নেই। বার-বার মনে হচ্ছিলো এটা দুঃস্বপ্ন। মন চাইছিলো সাগর ভাইয়ের সাথে কথা বলি। একবার ভাবি দুইবার পিছিয়ে যাই। কী বলব তাকে? সব চেয়ে বড় কথা তার সাথে কথা বলার সময় আবেগ ধরে রাখতে পারব না। কেঁদে ফেলব? তখন ব্যাপারটা হয়তো বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যাবে। হঠাৎ মনে হল রাবেয়া খাতুনের ওপর আনন্দ আলোর বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ হওয়া দরকার। এটা আনন্দ আলোর দায়িত্ব। কিন্তু সেজন্য তো পরিকল্পনা প্রয়োজন। কার সাথে পরিকল্পনা করব? সবাই তো শোকে মুহ্যমান। শ্রদ্ধাভাজন শাইখ সিরাজ, মুকিত মজুমদার বাবু ভাইয়ের সাথে কথা হল। কথা বললাম আমীরুল ইসলামের সাথে। আমীরুল কিছু পরামর্শ দিলেন। এবার সাহস করে ফোনে কথা বললাম সাগর ভাইয়ের সাথে। সাগর ভাই ফোনের ওপাশ থেকে হ্যালো বলতেই বুক ফেটে কান্না এলো আমার। কথা হল সামান্য! কিছু পরামর্শ দিলেন। শুরু হলো আনন্দ আলোর বিশেষ সংখ্যা প্রকাশের প্রস্তুতি।
প্রিয় পাঠক,
সবিনয়ে বলতে চাই রাবেয়া খাতুনের মতো কিংবদন্তী লেখকের ওপর আনন্দ আলোর একটি বিশেষ সংখ্যাই যথেষ্ট নয়। তাঁর জীবন ও সাহিত্যকর্মের ওপর ব্যাপক গবেষনা হওয়া প্রয়োজন এবং তরুণ পাঠকের মাঝে আরও বেশি বেশি রাবেয়া খাতুনকে উপস্থাপন করা জরুরি।
স্বল্প সময়ের মধ্যেও আনন্দ আলোর এই বিশেষ সংখ্যায় রাবেয়া খাতুনকে নিয়ে যাঁরা লিখেছেন তাঁদের প্রতি রইল অনেক কৃতজ্ঞতা।
না ফেরার দেশে অনেক ভালো থাকবেন খালাম্মা। মাগো, অনেক ভালো থেকো…

রাবেয়া খাতুন সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা মানুষ

আফজাল হোসেন
মানুষের জীবন একটাই। আসা যাওয়া করা দিনগুলো প্রায়ই সে জীবনে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে। সে ধারাবাহিক নতুনের কারণে জীবন বর্ণিল রয়, জীবনজুড়ে ঝিকমিক করে নতুনের স্বাদ। নতুন কষ্ট, শোক তার পিঠে নতুন উপলব্ধি- এ নিয়ম, প্রাত্যহিকতায় আমাদের বেঁচে থাকা আকর্ষণ হারায় না।
অনেক সৌন্দর্য, তার বিস্ময়ের ঘোর, বহু আনন্দ এবং হতাশার স্বাদও বেঁচে থাকাকে অর্থবহ, বিশেষ করে তোলে। জীবন, বেঁচে থাকা বিশেষ হয়ে ওঠে নানা রহস্যময়তার কারণেও। আপন মানুষ হারানোর বেদনাকে সে রহস্যময়তার অংশ মনে হয়।
আপন মানুষ হারানোর বেদনায় রহস্যময়তা কি, কেনো? আপন মানুষ চলে গেলে টের পাওয়া হয়, লাভার মত আগ্রাসী ভঙ্গীতে অনেক ঘন দুঃখ বুকের জমিন গ্রাস করে নিচ্ছে। এই অনুভব চিরকালীন। যাকে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান হতে হয়, জগতজমিনে থাকাকাকালীন নিজের সাধ্য সামর্থ দিয়ে নিজের কাছে কি পরিমানে বিশেষ ছিল সে মানুষটা, তা আগ্রহ ও আনন্দের সাথে জানান দেয়া হয় না। যা অবশ্য কর্তব্যের অংশ, জগতের বহুকিছুর গুরুত্ব দিতে গিয়ে সম্পর্কের জন্য যা করণীয়, তা করা হয়ে ওঠেনা। সম্পর্কের সুবাস অসচেতনতায় ফিকে হয়ে যায়।

কাছের মানুষ সহসা তারার দেশে উড়ে চলে গেলে আর কোনদিন দেখা হবেনা, এই বেদনার সাথে শোক বিহ্বল মনে কতরকমের প্রতিক্রিয়া জাগে। আরও বেশী সময় কেনো দিতে পারিনি তাঁকে, প্রশ্ন জাগে। জল ভেদ করে তিমির পিঠ যেমন ভুস করে জেগে ওঠে, তেমন করেই উত্তর মেলে- অবহেলা ছিল। সে বোধ গ্লানির সঞ্চার করে, মর্মের গভীরে ঢুকে পীড়া দেয়। তবু আমাদের বদল ঘটেনা, জীবন যেমন ছিল, থাকে তেমনই- এ এক অমোঘ রহস্য!
রাবেয়া খাতুন দেশের সন্মানিত কথাসাহিত্যিক। বন্ধুর মা এই পরিচয়ের কারণে নিকটের হওয়া সহজ হয়েছিল। তিনি লিখে যখন বিখ্যাত তখন শিল্পী হওয়ার তীব্র আকাঙ্খা নিয়ে আমি গ্রাম থেকে এসেছি শহরে। অজ পাড়াগাঁ থেকে সোজা রাজধানীতে। টলমল পা, আত্মবিশ্বাসের অভাব।
ছবি আঁকা, লেখালেখির বাতিকের কারণে রাবেয়া খাতুনের পুত্র ফরিদুর রেজা সাগরের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। পুরো পরিবারকে ভিতর ও বাইরে থেকে দেখার সুযোগ মেলে। তা ছিল বিশেষ। কারণ ভাই বোন বাবা মা, সবাই ছিল, ছিলেন বিশেষ। গ্রাম থেকে উজিয়ে আসা সেই আমার কাছে তা ছিল এক অপার বিস্ময়। টলমল কালে মানুষগুলোর উজ্জলতা আমার মলিনতায় পরিয়ে দিয়েছিল আলোর মালা।
দেশের সংস্কৃতি ভূবনে রাবেয়া খাতুন, ফজলুল হক ছিলেন বিশেষ। একজন লেখক অন্যজন সাংবাদিক, চলচ্চিত্র নির্মাতা। অতএব স্বাভাবিক ভাবেই ঢাকা শহরের সকল কৃতির সঙ্গে তাঁদের ওঠাবসা। মা রাবেয়া খাতুনের উপন্যাস ফেরারী সূর্য প্রকাশিত হবে। সে গ্রন্থের প্রচ্ছদ দেশখ্যাত শিল্পীদের কেউ আঁকবেন, এমনই হওয়ার কথা।
সাগর তার বাবার অফিসে নিয়ে গেলো আমাকে। তখন আর্ট কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আমি। পাশে দাঁড়ানো হ্যাংলা বন্ধুটাকে দেখিয়ে সাগরের আব্দার, ফেরারী সূর্যের প্রচ্ছদ ওকে দিয়ে আঁকাতে হবে। ভারী চশমার ওপার থেকে আমাকে নতুনভাবে দেখে নিয়ে বন্ধুর বাবা হাসলেন। এই হাসিটাকে বলা যায়, জীবনযাত্রায় দীপ্ত পায়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রথম অনুপ্রেরণা।

লেখক রাবেয়া খাতুন তা নাও মানতে পারতেন। ভাবতে পারতেন নামী দামী প্রচ্ছদশিল্পীর হাতেই তাঁর গ্রন্থের প্রচ্ছদ হওয়া উচিৎ। তা ভাবেননি। অখ্যাত আমি, খ্যাতিমানের গ্রন্থের প্রচ্ছদ আঁকতে পেরেছিলাম। এই গল্পে মানুষদের উদারতা চেনা হয়। স্বার্থের অংক কষে জীবনযাপন করা মানুষ ছিলেননা তাঁরা। তাঁদের জানা ছিলনা, বইয়ের প্রচ্ছদ আমাকে করতে দিলে কতটা সুন্দর করার সামর্থ আমার আছে কিন্তু নিজ সন্তানের কথায় আস্থা মিলেছিল। কতটা দৃঢ় বিশ্বাসের মানুষ তাঁরা ছিলেন, আজও ভেবে অবাক হতে হয়।
আমাদের স্বভাবের দৃঢ়তা ও দূর্বলতা কি তা আমরা ভেবে দেখা খুব জরুরী মনে করি না। স্বার্থপরের মতো জীবন, বেঁচে থাকাকে আমরা মন ডুবিয়ে উপভোগ করতেই চাই শুধু। ভোগ উপভোগের জন্য দাম দিতে হয়, কিছু কর্তব্যও থাকে, জানা থাকলেও ভুলে থাকি। মূহর্ত হুড়মুড়িয়ে আসে, তখন উপলব্ধি করতে পারি নিজের ত্রুটি। নিজে সন্তুষ্ট থাকার স্বার্থপর ইচ্ছা কতখানি ক্ষতিকর, তা বেদনাকে কতটা ভারী করে তা টের পাওয়া হয়। টের পেয়ে, উপলব্ধি করতে পেরে তখন অসহায় উপায়হীন লাগে।
এটা চেনা অচেনা রাবেয়া খাতুনকে সামান্য চেনার গল্প। সকলে তাঁকে খ্যাতিমান লেখক হিসাবে জানতেন। কারো কারো কাছে সাগর, প্রবাল, কেকা ও কাকলীর মা। মানুষের থাকে নানা পরিচয়। সব পরিচয়ের শেষে নানা মুখরতার মধ্যে থেকেও নিভৃতের, অজ্ঞাত মানুষ ছিলেন রাবেয়া খাতুন। ধীরস্থির, মিতভাষী আর সর্বদা মুখে লেগে থাকতো সামান্য একটুখানি হাসি। সে হাসি যেনো অপার এক রহস্যময়তা, তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রধান আকর্ষণ।
সময় জানতো, সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকা মানুষ তিনি। মধ্যবিত্ত, সাধারণ হয়েও চিন্তা চেতনায় ছিলেন অসাধারণ।
ছবি আঁকার ছাত্র, পুত্র সাগরের সাথে লেখালেখি করি, টেলিভিশনে অভিনয়, উপস্থাপনা করি- এসব তিনি জানতেন। যখন অভিনয়শিল্পী পরিচয়টা তৈরি হলো, ছেলের বন্ধুর প্রতি যে স্নেহ ভালোবাসা, তা বিশেষ হয়ে রইলো না। অবাক হয়ে লক্ষ্য করি, পুত্রের বন্ধু, এ পরিচয়ের চেয়ে নতুন অর্জন করা পরিচয়কেই বিশেষভাবে গন্য করে নিলেন।
অনুভব করেছি, হাত পা নাক চোখ অলা মানুষ পরিচয়ের মানুষের চাইতে, তিনি মানুষের বিশেষ অস্তিত্বকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া জরুরী মনে করতেন। বিস্মিত হয়েছি, চারপাশের মধ্যবিত্ত ধুলো কাদা থেকে বিস্তর দূরত্বে নিজেকে নিয়ে নিজ জগত কিভাবে গড়েছেন, কিভাবে প্রচলিতকে উপেক্ষা করে নিজের মতো করেই জীবনযাপন করেছেন!

যে মানুষ ছবি আঁকে, অভিনয় করে এমন পরিচয় বিশেষ সন্মানীয়, সমীহযোগ্য- মনে করতেন বলে ছেলের বন্ধু পরিচয়টা ক্রমে ফিকে হয়ে গিয়েছিল। তিনিও বন্ধুর মা- এ সম্পর্ক আঁকড়ে ধরে থাকেননি। বয়সের ভেদভাবনাও তাঁর মগজে ঠাঁই পাওয়ার কথা নয়। সৃজনশীল মন যেমন যতটা উন্মুক্ত হওয়ার কথা, ততটাই খাপখোলা ছিলেন। কতখানি আধুনিকমনষ্কতা, তাঁর লেখকসত্বা কতটা প্রবল ছিল, এই উদাহরণে স্পষ্ট হয়।
সম্পর্কের বিশেষ মূল্য দেবার প্রতি বিশেষ মনোযোগী নই আমরা। এই নির্মম সত্য অনুধাবন করা হয়, প্রিয় মানুষের তিরোধানে। তাঁকে হারানোর বেদনা দ্বিগুন হচ্ছে দুটো অসাধারণ স্মৃতির কথা ভেবে। একবার ইন্দোনেশিয়ায় ও আর একবার বগুড়া থেকে ঢাকার দীর্ঘ পথে গাড়িতে অনন্য রাবেয়া খাতুনকে আবিষ্কার করার সুযোগ ঘটেছিল। এমন অজস্র সুযোগে প্রতিবার নতুন করে তাঁকে জানতে পারতাম। চলে যাওয়ার পর মনে হচ্ছে সে চেষ্টা করিনি কেনো!
সৃষ্টিকর্তা রহস্য, তামাশাপ্রিয়। তিনি হারানোর বেদনা বিষাদে প্রিয় মানুষকে হাজার গুন বেশী অনুভব করার সাধ্য দেন।

জনপ্রিয় বিভাগ