Ananda ALo
Ultimate magazine theme for WordPress.

ছুটির দিনে বিশেষ আয়োজনে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা

আমীরুল ইসলাম

১.
যে কাউকে নিয়ে দু-চার লাইন লিখে ফেলা খুব সোজা। কিন্তু বন্যাদিকে নিয়ে কখনোই নয়। বন্যাদি খুব অন্য রকম ব্যক্তি। সুর ও বাণীর গহীনে তিনি নিরন্তর আত্মস্থ থাকেন।
বড় সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল থেকে তিনি এসেছেন। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তিনি প্রিয়তম ছাত্রী।ড. আনিসুজ্জামান তাঁর মামা। সুফিয়া কামালকে তিনি খালা ডাকতেন।দেশে বিদেশের স্বনামধন্য ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর মধুর সম্পর্ক। কলকাতার বাঙালি বিজ্ঞজন তাঁকে সম্মান দেন। রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভাবমাধুর্য ও সুরমাধুর্য তিনি তুলে ধরেছেন বিশ^ব্যাপী প্রায় একক কৃতিত্বে।সঙ্গীত পরিবেশেনায় তিনি যেমন অসাধারণ, সঙ্গীত শিক্ষাদানেও তিনি তেমনই আন্তরিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা সুরের ধারার ছাত্রছাত্রী বন্ধুদের কাছে তিনি কিংবদন্তিতুল্য। এভাবে অসংখ্য বাক্য সাজিয়ে বন্যাদির প্রশংসা করা যায়। কিন্তু বন্যাদি প্রশংসা ও ভালোবাসার প্রাবল্যে কখনো মুগ্ধ হন না। এক ধরনের উদাসীনতা এবং যে কোনো অনাগ্রহী বিষয়কে তিনি মধুর হাসি দিয়ে উপেক্ষা করতে পারেন। নিজের সত্য অবস্থান নিয়ে ধন্যবাদ সচেতন। অকারণ ভক্তিরস তিনি একেবারে পছন্দ করেন না।

তাই বন্যাদিকে নিয়ে কিছু লেখা সহজ নয়। আমার এই সামান্য জীবনের পরম প্রাপ্তি হচ্ছে যে, আমি বন্যাদির একনিষ্ঠ ভক্ত। আমার সময়কালে আমি বন্যাদির সাহচর্য পেয়েছি। দীর্ঘদিন ধরে বন্যাদির গান শুনে আসছি। বন্যাদির কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান প্রজাপতির মতো নৃত্য করে। ফুলের সৌরভ ছড়িয়ে দেয়।সেই বিখ্যাত বন্যাদির স্নেহ ভালোবাসার প্রশ্রয় পেয়েছি, এ আমার এক জীবনের অমূল্য প্রাপ্তি।বন্যাদির বড় বড় সাংগঠনিক কাজের আমিও একজন কর্মী হতে পারি, এ আমার বিরল সৌভাগ্য। রবীন্দ্রনাথের ১৫০ বছরের প্রকাশিত সম্পূর্ণ গীতবিতান কিংবা প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে হাজার কণ্ঠে বর্ষবরণ কিংবা চৈত্র সংক্রান্তির অনুষ্ঠানে একজন নিতান্ত কর্মী হিসেবে যখন কাজ করি তখন আনন্দে সম্পূর্ণ মন আচ্ছন্ন হয়ে থাকে।বন্যাদির নিষ্ঠা নিবেদন ও স্বপ্নময়তার পেছনে প্রতি মুহূর্তে অবগাহন করি।বন্যাদির নানামুখী কাজের সঙ্গে যখন আমারও সামান্য সংযোগ থাকে তখন গর্ব হয়।আমরা বন্যাদিকে অনেক শ্রদ্ধা করি।বন্যাদির স্টাইল, রুচি, সজ্জা, স্নিগ্ধতা এবং কথার ভঙ্গি আমাদের সারাক্ষণ মুগ্ধ করে রাখে। নানা বিষয়ে বন্যাদির আগ্রহ। বন্যাদি খুব উচ্চস্তরের মানুষ। আর যে বিষয়টা জানেন সেটা পূর্ণাঙ্গ জানেন। ভাসা ভাসা কথা বলতে তিনি পছন্দ করেন না। নিজেকে কখনো অকারণে জাহির করতে চান না। আর তাঁর সামনে যদি আমরা ভুল তথ্য দিয়ে কিছু বলতে থাকি তখনও বন্যাদি জোরালো প্রতিবাদ করবেন না। মৃদু হেসে বুঝিয়ে দেবেন তিনি এসবের সঙ্গে একমত নন। বন্যাদি বকাও দেন মধুরভাবে। অযৌক্তিক কোনো বিষয় নিয়ে যদি তর্ক শুরু হয় তবে বন্যাদি হয়তো সর্বোচ্চ বকা দেবেন এভাবে, ধুর… এত চেঁচাও কেন? তোমার সঙ্গে কথা বলা যায় না!বন্যাদির সঙ্গে কত স্থানে গিয়েছি। একে কি সৌভাগ্য বলব? নাকি সৌভাগ্যেরও অধিক।বন্যাদির সঙ্গে লন্ডনে রবীন্দ্রনাথের বাড়ি হ্যামাস্টিডে গিয়েছি। রবীন্দ্র-জীবনের কত গল্পই না তিনি শুনিয়েছেন।ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপে রবীন্দ্রস্মৃতি খুঁজে বেড়িয়েছেন।দ্বীপের নিজস্ব নৃত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সংযোগ হয়েছিল, অসাধারণ ব্যাখ্যা দিয়ে সেটা বুঝিয়েছিলেন। বন্যাদির সঙ্গে গিয়েছি ফ্রাঙ্কফুর্টে। সেখানেও এক রাজবাড়িতে রবীন্দ্রস্মৃতি ছড়িয়ে আছে। শিশুর মতো উৎসাহ নিয়ে বন্যাদি বিদেশি সুরে রবীন্দ্রনাথ কিভাবে ভাঙা গান লিখেছিলেন সে সম্পর্কে বলেছিলেন ফ্রাঙ্কফুর্টের সেই বাড়ির সামনে।

সম্পর্কিত

লেখা আহ্বান

আহারে, দেশের মানুষ!

পরীমনি কী বদলা নিলেন?

কলকাতার কথা বাদ দিলাম,বন্যাদির সঙ্গে গিয়েছি মংপু বা কালিম্পঙে।ঘুরেছি ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবা ও সাবিবেলাতে। ঘুরেছি নিউইয়র্কের টাইম স্কয়ার বা জ্যাকসন হাইটে। কক্সবাজার বা বান্দরবানে। দুবাই বা কাতারে। বন্যাদির সঙ্গে মক্কা-মদিনাতেও সফরসঙ্গী হয়েছিলাম। গিয়েছি সিডনিতে। পেছন পানে তাকিয়ে দেখি, জীবনের অনেক অংশজুড়ে বন্যাদির সঙ্গে আমরা জড়িয়ে আছি। ভ্রমণে কিংবা ছুটির হাওয়ায় বন্যাদি যে কী অসাধারণ ব্যক্তি সেসব আলাদা লিখতে হবে।বন্যাদির ব্যক্তিত্বে এক আশ্চর্য মধুরতা ছড়িয়ে থাকে।জীবনকে তিনি গভীর দার্শনিকতার সঙ্গে উপলব্ধি করেন। যে কোনো কিছুর বাস্তব ব্যাখ্যা দেন গভীর পর্যবেক্ষণের সঙ্গে। কারও ব্যবহারে মন খারাপ হলে, কখনো উত্তেজিত হলে, বন্যাদি আশ্চর্য দক্ষতায়, কথার মাধুর্য ছড়িয়ে আমাদের শান্ত করেন। জীবন ও মানুষকে রাবীন্দ্রিক দৃষ্টিতে দেখেন। তাই ব্যক্তি তাঁর কাছে সমষ্টিতে পরিণত হয়। সামান্য ঘটনাকে তিনি অসামান্য ব্যঞ্জনায় রূপায়িত করেন।চুপি চুপি বলি, বন্যাদি দেশের বাইরে গেলেই কোনো না কোনো উপহার সামগ্রী এনে দেন। মন আমাদের আনন্দে ভরে ওঠে। এসব উপহার সমগ্রী আমার ব্যবহার করা হয় না। এগুলো আমি সযতে সংরক্ষণ করে রাখি।বন্যাদির অকৃত্রিম শিশুহৃদয় আছে। ব্যক্তিত্বের আশ্চর্য সৌরভে তিনি আবিষ্ট করে রাখেন সকলকে। তাই দেখতে পাই, আমাদের সমাজের সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে সবাই বন্যাদিকে খুব ভালোবাসেন। পছন্দ করেন।আমাদের বস ফরিদুর রেজা সাগরের সঙ্গে বন্যাদির অকৃত্রিম বন্ধুতা। সাগর ভাই জানেন যে, আমরা বন্যাদিকে অনেক ভালোবাসি। তাই নানা আয়োজনে সাগর ভাই বন্যাদির সঙ্গে আমাদের যুক্ত করে দেন। এ জন্য সাগর ভাইয়ের প্রতিও আমরা অনেক কৃতজ্ঞ।বন্যাদির মধুর ভালোবাসা ও স্নেহের অনেক স্মৃতি, অনেক কথা, অনেক আলাপচারিতা। অনেক উজ্জ্বল সময়।বন্যাদিকে যখন দেখি, যখন গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করি, তাঁর ব্যক্তিত্বের কাছে বারবার নিবেদন করি, সমর্পণ করি নিজেকে। বন্যাদির গান যখনই শুনি তখনই প্রতি মুহূর্তে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির সামনে দাঁড়াই। আশ্চর্য হই। রবীন্দ্রনাথের গানের ভেতর দিয়ে দেখি জীবনখানি, বন্যাদির গানের ভেতর দিয়ে দেখি ভুবনখানি।শুধু একটাই আফসোস, প্রতিবার বন্যাদির গান শুনতে শুনতে এক ধরনের ব্যর্থ কল্পনা করি যে, হায় স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ যদি দিদির গান শুনতেন তবে ব্যাপারটা কেমন হতো?


আমার বন্ধুবান্ধব খুব ভালো করে জানে যে, এক বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, শেখ হাসিনা, একালের বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্রনায়কদের মধ্যে অতুলনীয় এক নেত্রী ছাড়া জীবিত দুইজন নারী-ব্যক্তিত্বকে আমি সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা ও সম্মান করি। একজন লেখক রাবেয়া খাতুন, যিনি চুরাশি বছরের তরুণী। খালাম্মা সম্বোধন করি। কিন্তু তিনি আমার বয়োজ্যেষ্ঠ বন্ধুর মত। আরেক ব্যক্তি রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। আমাদের প্রিয় বন্যাদি। বন্যাদি’কে ভালোবাসে না এমন সরল হৃদয়ের মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। বন্যাদি সকলের প্রিয়। সকলের ভালোবাসার মানুষ। প্রাণের মানুষ। বন্যাদির সাথে কাজে কর্মে, ভ্রমণে, অনুষ্ঠানে এমন ভাবে দ্রবীভ‚ত যে তাকে নিয়ে আলাদা করে কিছু লেখা সম্ভব নয়। আমরা তো বন্যাদির বৃহৎ পরিবারের অংশ। তাই কেউ যখন বন্যাদি ও সুরের ধারা নিয়ে কিছু লিখতে অনুরোধ করে তখন খুব বিব্রত হই। অনেক ভেবেচিন্তেও কোন পূর্ণাঙ্গ লেখা তৈরি করতে পারি না। সাগর ভাইয়ের খুব প্রিয়বন্ধু বন্যাদি। বন্যাদির প্রিয়বন্ধু সাগর ভাই। সাগর ভাইয়ের-প্রশ্রয়ে বন্যাদির সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা দিন দিন গভীরতর হয়ে উঠেছে।বন্যাদিকে আপন দিদির মতোই জ্ঞান করি। কতো অবিশ্বাস্য সুন্দর মুহূর্ত কাটিয়েছি তার সাথে তা লিখে বোঝাতে পারব না। কতোভাবেই না জড়িয়ে আছি বন্যাদির জীবনের সঙ্গে। অর্ক, নয়নতারা, টুসি আপা, উর্মি আপা, প্রিয়দর্শিনী, তুহিন, দীপকদা, স্বাতী সরকার, অনুশ্রী, তনুশ্রী, আঁখি হালদার, বিমলবাবু, হেলাল ভাই, রূপাদি, সুদেষ্ণাদি, মিন্টু দাদা এরকম অসংখ্য নাম। যারা লতায় পাতায় জড়িয়ে রাখে বন্যাদিকে। এতো সব বাঁধার প্রাচীর পেরিয়ে বন্যাদির হৃদয়ে স্থান নিতে হয়। ভক্তি ও ভালোবাসা দিয়ে বন্যাদির হৃদয় জয় করা সম্ভব। বন্যাদি বহুমাত্রিক চরিত্র।

বন্যাদি দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। বিশ্বসেরা রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী। যিনি নিজস্ব গায়কী, রবীন্দ্রসঙ্গীতের সম্পদ ও উপস্থাপনায় বাংলা গানকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। দেশ বিদেশের শত শত মঞ্চে শ্রোতাদের হৃদয়কে শাদা পাখির মত আকাশে উড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। আমার সৌভাগ্য হয়েছে অনেক বড় বড় মঞ্চে তার অনবদ্য পরিবেশনা উপভোগ করার। তার অনুষ্ঠান দেখার অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখলেও সেটা একটা পূর্ণাঙ্গ বই হয়ে যাবে। বন্যাদি সুরের ধারার পরিচালক। হাজার হাজার তার শিক্ষার্থী। তিনি একটি সঙ্গীত বিদ্যালয় স্থাপন করেছেন। তিনি রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার কাজ প্রায় শেষ করে এনেছেন। বিশাল কর্মযজ্ঞের মধ্যে তার দিন কাটে। কোন অবসরের ফুরসত পান না। এরই মধ্যে আড্ডা। আহার পর্ব। আত্মীয়তা। সামাজিক সম্পর্ক রক্ষা সবই করেন তিনি। বন্যাদি অনেক বড় স্বাপ্নিক। নিত্য নতুন স্বপ্ন দেখেন। হাজার কণ্ঠে বর্ষবরণ তারই স্বপ্ন। সুরের ধারা প্রতিষ্ঠা সেই স্বপ্নেরই বাস্তবতা। ‘ গীতবিতান’ আরেকটি মাইলফলক কাজ। বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের সম্পূর্ণ গীতবিতান ‘গীত’ হয়েছে তার নেতৃত্বে। এসবই তো চেনা বন্যাদির টুকরো টুকরো ছবি।
আরেক বন্যাদিকে নিয়ে কিছু বলা যাক। বন্যাদির ভেতর বসত করে আরেকজনা। বন্যাদি গাছপালা, লতা গুল্ম, ফুলফল অর্কিড খুব ভালোবাসেন। বিদেশ থেকে আসার সময় যত বাধা বিপত্তি থাকুক না কেন তিনি পছন্দের অর্কিড ঠিকই নিয়ে আসবেন। আর যদি কোন পাহাড়ি এলাকায় যান পুরো বাগান তিনি তুলে নিয়ে আসবেন। তার নিজস্ব বাসভ‚মিতেও বাগান আছে।বৃক্ষপ্রেমে বন্যাদি একেবারে বলাইয়ের মত। বন্যাদি খুব ভালো রাঁধুনী। বিশেষ করে ওরিয়েন্টাল রান্না। এই প্রসঙ্গে বলেছিলেন, হেলালের সঙ্গে যখন বিয়ে হয় তখন আমি রান্না জানতাম না। আর হেলাল আমার রান্না খেতেও চাইতো না। তখন রাগে অভিমানে বাংলাদেশ পর্যটনের রান্নার কোর্সে গিয়ে ভর্তি হলেন। নিয়মিত রান্না করেন না। কিন্তু যখন করেন অসাধারণ হয় স্বাদ-গুণে। আর যে কোন বড় ও বৈচিত্রময় রেস্টুরেন্টে বিদেশে যখনই খেতে বসেছি, খাওয়ার আইটেম দেখেই বন্যাদি রেসিপি বলে দেন অনর্গল। কোন খাবারের স্বাস্থ্যমান ও পুষ্টিগুণ কেমন সেটাও বলে দেন। বন্যাদি প্রচুর বই পড়তে ভালোবাসেন। ছোটবেলায় বাংলা কিশোর ক্লাসিক প্রায় পুরোটাই পড়েছেন। যে কোন বিষয়ের বই তিনি পড়তে ভালোবাসেন। পেরুর সভ্যতা, বারমুডা ট্রায়াঙ্গল, রবীন্দ্র-জীবনী, জেমস বন্ড, সুনীল, শীর্ষেন্দু যেকোন বইই তিনি পড়তে আনন্দ পান। আর যে কোন কাজের মতোই বই পড়াতেও তিনি সিরিয়াস। পুঙ্বখানুপুঙ্খ বইটা পড়েন। নতুন কোন বই পড়লেই শিশুর মতো উচ্ছস নিয়ে তিনি সব বর্ণনা দেন আমাদের। বন্যাদি ভ্রমণে খুব আনন্দ পান। প্রতি মাসেই চার পাঁচ বার তিনি আকাশে উড়াল দেন। কলকাতা তার দ্বিতীয় বাড়ি। বন্যাদির যে কোন ভ্রমণসূচী দেখলেই আমরাও ক্লান্ত হয়ে যাই। অনুষ্ঠান উপলক্ষে লন্ডন, নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন, প্যারিস, টোকিও, দুবাই, কাতার, থাইল্যান্ড, ব্রিস্টল কোথায় না ছুটছেন তিনি। ক্লান্তিহীন ছোটাছুটিতে কিন্তু কখনোই আনন্দের ছাপ তার চেহারা থেকে দূর হয় না। আমি ক্ষুদ্র মানুষ। বহুবার বন্যাদির ভ্রমণসঙ্গী হতে পেরেছি। মক্কা গিয়েছি ওমরাহ হজ্বব্রত পালন করতে। অনেকবার নিউইয়র্ক। ওখানে বন্যাদির একমাত্র কন্যাসন্তান প্রিয়দর্শিনী থাকেন। লন্ডনও গিয়েছি বেশ কয়েকবার। সেখানেও দিদির ছোটবোন থাকেন।
রবীন্দ্র স্মৃতিধন্য মংপু গিয়েছি। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, দুবাই, কাতার এসব তো শুটিং উপলক্ষে। কলকাতা যাই নানা ছলনায়। বন্যাদির সঙ্গে সুযোগ পেলেই ছুটে গেছি কলকাতায়। একবার জীবনে মজার একটা ভ্রমণে গিয়েছি দিদির সঙ্গে। ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবায়। আমি, সাগর ভাই আর বন্যাদি। সে এক আশ্চর্য ভ্রমণ অভিজ্ঞতা। আদ্দিস আবাবা থেকে হাজার মাইল দূরে লালিবেলা। পাহাড়ের উচ্চ দেশে খৃস্টানদের সুরক্ষিত গির্জা। সেখানে অনেকগুলো গির্জা। পরিচালনা করে থাকেন একদার মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ। এসব ভ্রমণে তো বন্যাদির সাথে আমরা ছিলাম। কিন্তু বছরে একবার হলেও বন্যাদির ভ্রমণসঙ্গী মার্কিন প্রবাসী সুদেষ্ণাদি। জাহাজে করে পনেরো দিন আলাস্কা দ্বীপ ঘুরে বেড়িয়েছেন। আবার সুদেষ্ণাদির সাথে ল্যাটিন আমেরিকান পেরুর মাৎসুপিসু সভ্যতা দেখতে গেছেন। মুগ্ধ নয়নে দিদির কাছে সেই গল্প শুনেছি। ইনকা সভ্যতার উপর ছোটবেলায় প্রেমেন্দ্রমিত্রের ঘনাদার গল্প পড়েছিলাম। সেই স্মৃতি অক্ষয় হয়েছিল। কিন্তু এ জীবনে মাৎসুপিৎসু যাওয়া হলো না। বন্যাদির চোখ দিয়ে মাৎসুপিসু দেখলাম। কদিন আগেই দিদি পুরো পরিবার নিয়ে গোয়ালিয়র ঘুরে এলেন। তার একমাত্র সন্তান অর্ক। অর্ক ফিরে এসে আনন্দ চিত্তে সেই ভ্রমণ-গল্প আমাদের শোনালো। আমি শুনেই উত্তেজিত। বন্যাদির পায়ের তলায় সর্ষে আছে। কয়েকদিনের বেশি তিনি স্থির থাকতে পারেন না। ছোটাছুটি শুরু করেন। বন্যাদির নিকটজনেরা ছাড়া কেউ জানে না তিনি কতো বড় আড্ডাবাজ। শান্তিনিকেতন জীবন থেকে শুরু হয়েছে তাবড় তাবড় ব্যক্তিত্বদের সাথে আড্ডা। সে গল্প শুনলেও তাজ্জব বনে যেতে হয়। সময় সুযোগ পেলেই মনোমত ব্যক্তিদের সাক্ষাৎ পেলেই বন্যাদি আড্ডায় মত্ত হয়ে ওঠেন। সকল মতের প্রতি তিনি শ্রদ্ধাশীল থাকেন। মতান্তর ঘটলেও তা প্রকাশ করেন না। আজকাল খেয়াল করেছি কারো ভুল তথ্যে, ভুল ব্যাখ্যায় মন খারাপ করেন না। খালি বলেন, বাদ দাও। জানে না কিছু। ব্যস এটুকুই।ইদানিং বন্যাদি কেমন যেন সন্ন্যাসীব্রত ধারণ করেছেন। চাওয়া পাওয়ার উর্ধ্বে ওঠা এক মানুষ।

বন্যাদির গল্প বলবার ক্ষমতা অসাধারণ। শান্তিনিকেতনের বর্ষা, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়শান্তিদেব ঘোষের গল্প কিংবা নবদ্বীপের ছিন্নবস্ত্র পরিহিত বৃদ্ধা বৈষ্ণবীর ভক্তিপ্রকাশ এসব গল্প বন্যাদির কণ্ঠে শোনা দরকার। সে এক বিরল অভিজ্ঞতা। বন্যাদির গল্প জীবন্ত ছবির মত। এবং প্রতিটা গল্পের ভেতরে গভীর নান্দনিকতা ও দর্শন থাকে।সবশেষে বলতে চাই, বন্যাদির রুচি¯িগ্ধতা। তার সারা অঙ্গে কোমলতা ছড়িয়ে থাকে। আর খুব দরদী হৃদয়ের মহিলা তিনি। তার ছাত্রছাত্রীদের উপকার করার জন্য সারাক্ষণ ব্যস্ত তিনি। কার চাকুরি দরকার, কার চিকিৎসা সুবিধা দরকার নানা কিছু নিয়ে তার ব্যস্ততা। বন্যাদি খুব সৌখিন মহিলা। শো পিস সংগ্রহ করতে খুব পছন্দ করেন। দেশ বিদেশ থেকে দামী দামী শো পিস সংগ্রহ করেন। ইদানিং তিনি পেইন্টিং সংগ্রহ করছেন। সিম্পল লিভিং হাই থিংকিং তার বৈশিষ্ট্য। তার সুপুত্র অর্ক যেমন আমেরিকায় রান্না বিষয়ে লেখাপড়া করেছে। কিন্তু ছেলেকে তিনি বৈভব দিয়ে নষ্ট করেননি। বন্যাদির পোশাকি রুচিও খুব অন্যরকম। আমরা কোনদিন বন্যাদিকে রুচিহীন ডিজাইনের শাড়ি পরতে দেখিনি। ৩০০ টাকা হোক কিংবা ৩ লক্ষ টাকা হোক সব শাড়িতেই বন্যাদিকে সমানভাবে মানিয়ে যায়। লম্বা একহারা গড়ন তার। আয়তলোচন। পুরু ফ্রেমের চশমা। নিজস্বতা আছে।গান যখন গাইতে থাকেন তখন যেন মনে হয় তিনি ঈশ্বরের সাধনায় মত্ত। যখন গান গাইতে থাকেন এক অপার্থিব সৌন্দর্য তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। কোন এক বসন্তের বাতাসে উড়তে থাকে তার চুলের গুচ্ছ। বিদায়ী বসন্ত। চৈত্রের শেষ সন্ধ্যা। বন্যাদি মঞ্চে গান গাইছেন। যেন স্বর্গ থেকে নেমে এসেছেন কোন দেবী। দেবী, তুমি কোথা হইতে আসিয়াছো? দেবী নিরুত্তর। ভুবন ভুলানো মুচকি হাসি দেন তিনি। এই আমাদের চিরচেনা বন্যাদি।