SHARE

পানির অপর নাম জীবন। অথচ পানির কারনেই সংকটের মুখোমুখি বিশ্বের প্রায় দুইশ’ কোটি মানুয়ের জীবন। জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি একুশ শতকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে যে সমস্যাটি বিশ্ববাসীর কাছে গুরুত্বপুর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা হল পানি। জাতিসংঘের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ খাবার জন্য হয় পর্যাপ্ত পানি পায় না অথবা তাদের কাছে পৌঁছায় না বিশুদ্ধ পানি। আগামীতে বিশুদ্ধ পানির এই সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। ধারনা করা হচ্ছে ২০৫০ সাল নাগাদ পৃথিবীর মোট ৯শ’ ৩০ কোটি মানুষের মধ্যে ৭শ’ কোটিই পড়বেন বিশুদ্ধ পানির সমস্যায়। তার মানে প্রতি তিন জন মানুষের মধ্যে দুইজনই নিরাপদ পানির সংকটে ভুগবে। তখন বিশ্বব্যাপী দেখা দেবে ভয়াবহ পানি সংকট।

পানির অপর নাম যেমন জীবন, তেমনি মরণও। বিশুদ্ধ পানির অভাবে জীবন হয়ে উঠে ওষ্ঠাগত। অন্যদিকে অপরিশোধিত পানি মরণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পৃথিবীতে অপরিশোধিত বা দূষিত পানি পান করার ফলে প্রতিবছর ২০ থেকে ২২ লাখ মানুষ মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ে। শুধু তাই নয়, বিশুদ্ধ পানির অভাবে প্রতিদিন ৩০ হাজার শিশু তাদের জন্মের পঞ্চম দিন উপভোগ করার আগেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিচ্ছে। ২০০৫-২০১৫ আনত্মর্জাতিক পানি দশক এবং ২২ মার্চকে বিশ্ব পানি দিবস হিসেবে ঘোষণা করে জাতিসংঘ। বিশ্বব্যাপী পানি নিয়ে যে ভয়াবহ চিত্র, তার চেয়ে ভয়াবহ চিত্র অপেক্ষা করছে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে। প্রাকৃতিকভাবে যেসব এলাকায় পর্যাপ্ত নিরাপদ সুপেয় পানির উৎস ছিল সে জায়গাগুলোতেও বর্তমানে পানি সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। এ সঙ্কট আমাদের মানবিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পানির ভয়াবহ সংকটের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে এশিয়ার উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলো। যার প্রভাব পড়ছে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সামগ্রিক উন্নয়নের ওপরও। এমনকি নদীমাতৃক বাংলাদেশেও মনুষ্যসৃষ্ট নানাবিধ কারণে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটছে। আর সুপেয় পানির সংকট জনজীবনে বিপর্যয় ডেকে আনছে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়, বিশেষ করে বিভিন্ন অঞ্চলে নলকূপের পানি আর্সেনিক দূষণের কারণে দেশে নিরাপদ পানি সংকট উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর রাজধানী ঢাকার জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে দ্রুত বাড়ছে নিরাপদ পানির চাহিদা। চাহিদা মেটাতে নলকূপের মাধ্যমে ভূ-অভ্যনত্মর থেকে অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণে পানির সত্মর নেমে যাচ্ছে। অন্যদিকে নানা কারণে নদ-নদীর পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। ফলে প্রতিনিয়ত পানি সংকট আরও ঘণীভূত হচ্ছে। পানযোগ্য সুপেয় পানির অভাবে শহরের জনজীবনে মারাত্মক অচলাবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। একদিকে পানি সংকট, তার উপর যেটুকু পানি পাওয়া যাচ্ছে তা দুর্গন্ধময়। ফলে পানি খাওয়া তো দূরের কথা সাংসারিক অন্যান্য কাজেও ব্যবহার করা যাচ্ছে না। নগরবাসীদের মধ্যে অনেকের ধারণা পয়ঃনিষ্কাশন লাইনের সাথে ওয়াসার পাইপের সংযোগ কোন কারনে যুক্ত হওয়ায় হওয়ায় এমন দুর্গতির সৃষ্টি হয়েছে। ফলে নগরীর অনেক এলাকায় অপরিশোধিত, পচা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি খাচ্ছে নগরবাসী। পানি নিয়ে এই দুর্বিষহ ভোগানিত্মর পরিসমাপ্তি কোথায় কেউ বলতে পারছে না। শুষ্ক মৌসুমে পানি সঙ্কট তীব্রতর হয়ে ওঠে। এবং দূষিত পানি ব্যবহার করে মারাত্মক রোগে আক্রানত্ম হয়ে অনেকে মৃত্যুবরণ করে। গতবছরের মতো এবছরও প্রতিদিন প্রায় ৬০ কোটি লিটার পানি ঘাটতি নিয়ে গ্রীষ্ম মৌসুম শুরু হচ্ছে। ফলে রাজধানী জুড়ে দেখা দেবে তীব্র বিশুদ্ধ পানির সংকট। বাধ্য হয়ে দুষিত পানি পান করতে হচ্ছে রাজধানীর অনেক এলাকায় মানুষকে। ফলে অনেকে আক্রানত্ম হচ্ছেন নানাবিধ জটিল রোগে। গরম বাড়ার সাথে সাথে আইসিডিডিআরবিতে পানিবাহিত রোগীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে শুরু করেছে। জনজীবনে নিদারুন ভোগানিত্ম দেখা দিয়েছে বাধ্য হয়ে অনেকে সুপেয় বাজারজাত পানি উচ্চমুল্যে ব্যবহার করছে। ইদানিং সেটির উপর আস্থা রাখাও বড় কঠিন। কেননা বিএসটিআই এরকম ১০ টি প্রতিষ্ঠানকে দুষিত পানি বাজারজাত করার জন্য জরিমানা করেছে। শুধুমাত্র রাজধানীতে নয়, দেশের প্রত্যনত্ম অঞ্চলেও এ মৌসুমে পানির খুব বড় রকমের সংকট থাকে। শুষ্ক মৌসুম শুরুর আগেই সংকট নিরসনে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্দ্যোগ।

তাই সবার আগে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা নিতে হবে। কিছুদিন পরই শুরু হবে বর্ষা। এসময় নানা ধরনের রোগ জীবানু ঘুরে বেড়াবে আমাদের ঘর বাড়ি এবং আঙ্গিনায়। সেই জীবানুরা বাসা বাড়ির পানির ট্যাংকে ও পাত্রে রাখা পানিতে আশ্রয় নিবে। অসাবধানতাবসত সেই পানি পান করলে দেখা দিতে পারে মারাত্বক রোগ। বিশেষ করে ডাইরিয়া, কলেরা, আমাশয়, জন্ডিসের মতো মারাত্বক রোগ দেখা দিতে পারে। এ থেকে পরিত্রান পাওয়ার জন্য সবার আগে পানি বিশুদ্ধ করার উদ্যোগ নিতে হবে। বাসা বাড়িতে বড় কলসি বা পাতিলে পানি নিয়ে ১০০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় কমপক্ষে ১ঘন্টা ফুটাতে হবে। ফুটানো পানি ঠাণ্ডা করে ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রেখে প্রয়োজনের সময় ব্যবহার করা উচিৎ।

বিশুদ্ধ পানি পাওয়ার অনেক উপায় ইদানিং সচেতন মানুষ রপ্ত করেছে। চুলায় পানি ফুটানো ছাড়াও সাম্প্রতিক সাময়ে আধুনিক পদ্ধতিতে পানি বিশুদ্ধ করার ফিল্টার পাওয়া যাচ্ছে। ভালো মানের এই ফিল্টারের মাধ্যমেও পানি বিশুদ্ধ করা যায়। ফুটানো থেকে এই পদ্ধতি অনেকটা ঝামেলা মুক্ত। ফিল্টার রক্ষনাবেক্ষনেও সচেতন থাকতে হবে। কোনো ভাবেই যেন ফিল্টারের পানি ঢাকার সময় জীবানু আক্রানত্ম না হয়। গ্লাস বা ফিল্টারের মুখ পানি বাহিত রোগ বা দূষিত পানি পানে সবচেয়ে ঝুকির মধ্যে থাকে পরিবারের ছোট্ট শিশুরা। সব সময় শিশুকে বিশুদ্ধ পানি পানে উৎসাহিত করার পাশাপাশি তাদের প্রতি নজর দেয়া জরুরি। খাবার খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে হাত ধুলেই হবে না বিশুদ্ধ পানি দিয়ে হাত প্লেট ও চামচ ধুতে হবে। সর্বোপরি খাওয়া দাওয়া রান্নার কাজে বিশুদ্ধ পানি ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।