Home শাহ্ সিমেন্ট নির্মাণে আমি স্মৃতিপটে রাবেয়া খাতুন

স্মৃতিপটে রাবেয়া খাতুন

SHARE

আলী ইমাম

১৯৬৬ সালে পনের বছর বয়সে আমি শিশু সংগঠন কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলার আহবায়ক নির্বাচিত হয়েছিলাম। আমার পূর্বে আহ্বায়ক ছিল তখনকার আর্ট কলেজের ছাত্র সৈয়দ আবুল বারক আলভী। পরবর্তী সময়ে ফরিদুর রেজা সাগরও আহবায়ক হয়েছিল। সাগরের সূত্র ধরেই তার মা প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের অন্তরঙ্গ সান্নিধ্যে যাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করি। রাবেয়া খাতুনের অসাধারণ ব্যক্তিত্ব আমাকে প্রবলভাবে আকৃষ্ট করেছিল। এই যোগাযোগ পর্বের সূচনাটাও ছিল যথেষ্ট কৌতুহলোদ্দীপক।
পরিচালক রোকনুজ্জামান খান (দাদা ভাই) এর সম্পাদনায় শিশুতোষ ঝলমলে একটি পত্রিকা কচি ও কাঁচা প্রকাশিত হত। সেই পত্রিকার একটি অভিনব বিজ্ঞাপন দৃষ্টি আকর্ষণ করল। ঐ রকমের বিজ্ঞাপন এর আগে আমার চোখে পড়েনি। বিজ্ঞাপনের পাতা জুড়ে এক কিশোর বালকের ছবি ছাপা হয়েছে। তার কপালে চুল লেপটে আছে। চোখ দুটো ছিল ভারি সুন্দর। নিস্পাপ সারল্য ভরা মুখ। নিচে লেখা- আমার নাম সাগর। আমার বোন কেকা। আমরা দুজন ছেলেধরার কবলে পড়েছিলাম। আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানের দুর্গম অঞ্চলে। আমাদের উদ্ধার করা নিয়ে একটি দুঃসাহসিক অভিযানমূলক ছায়াছবি তৈরি হয়েছে। ছবির নাম ‘দ্যা সন অব পাকিস্তান’। ছবিটি গুলিস্তান প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে ’৬৬ সালের ৫ই অক্টোবর। এই বিজ্ঞাপনিট কেটে নিয়ে হল কাউন্টারে দেখালে তোমরা বিনামূল্যে টিকিট পাবে।

চমকিত হবার মতো বিজ্ঞাপন। দাদা ভাইকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম যে এটা ধারণা দিয়েছেন ছবিটির পরিচালক ফজলুল হক। যিনি সাগরের পিতা। আর ছবিটির কাহিনিকার হলেন সাগরের মাতা প্রখ্যাত লেখিকা রাবেয়া খাতুন।
সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে যে সেটি হচ্ছে পাকিস্তানের প্রথম শিশুতোষ চলচ্চিত্র।
আমার ওপরে ভার পড়লো কচি-কাঁচার আসরের পাতার জন্য ছবিটিকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন লেখার।
রাবেয়া খাতুন তখন থাকতেন বাসাবোতে। দাদা ভাই টেলিফোনে রাবেয়া খাতুনের সাথে যোগাযোগ করে সাক্ষাৎকারের দিনক্ষণ ঠিক করে দিলেন। আমাকে বাসার অবস্থানটি জানিয়ে দিলেন।
সাগর কচি-কাঁচা মেলার সদস্য। দাদা ভাই-এর প্রবল ইচ্ছে ছবিটির ব্যাপক প্রচার হোক শিশুদের মাঝে। একটি শিশু চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে এটাই তো বিরাট ঘটনা। আবার ছবির খুদে নায়ক নিজেও কচি-কাঁচা মেলার সদস্য। এটার প্রচার পাওয়া মানেই হল এদেশের শিশু প্রতিভার স্বীকৃতি।
আমি উত্তেজনা অনুভব করছিলাম কাহিনিকারের সাথে পরিচিত হতে পারব জেনে। কারণ কাহিনিটি অ্যাডভেঞ্চার পূর্ণ। আর অ্যাডভেঞ্চারের প্রতি আমার রয়েছে দুর্মর আকর্ষন। আগ্রহ সহকারে কিশোর রহস্য রোমাঞ্চ কাহিনি খুঁজে খুঁজে পাঠ করি।
যথাসময়ে উপস্থিত হলাম বাসাবোর সাগরদের বাড়িতে। মাঠের কোনায় দোতলা একটি বাড়ি। সাগর তখন চেনা মুখ। রাবেয়া খাতুনের কাছে জানতে চাইলাম এ ধরনের অ্যাডভেঞ্চারপূর্ণ গল্প কেন লিখলেন। তিনি জানালেন শিশুরা যাতে সমস্যার সম্মুখীন হলে আতঙ্কগ্রস্ত না হয়ে মনোবল অটুট রাখতে পারে তা বোঝাতে চেয়েছি। রুদ্ধশ্বাস স্নায়ু টান টান কাহিনি। পশ্চিম পাকিস্তানের এক ভয়ংকর পার্বত্য এলাকার ছবিটির স্যুটিং হয়েছিল।
আসলেই ছবিটি দেখে দারুণ শিহরণ জেগেছিল। পদে পদে ছড়িয়ে রয়েছে উত্তেজনা। পটভূমি পশ্চিম পাকিস্তানের দুর্গম এলাকা। রাবেয়া খাতুন উল্লেখ করলেন বাংলা শিশুসাহিত্যের রোমাঞ্চকর গল্প কাহিনিগুলেঅর কথা। হেমেন্দ্র কুমার রায়ের ‘সখের ধন’, ‘কাপালিকের কবলে’, ‘তিব্বত ফেরত তান্ত্রিক’, ‘মিশমিদের কবচ’।
জানালে বুদ্ধদেব বসুও লিখেছেন ‘ছায়া কালো কালো’, রাত্রি তখন পিশাচের’।
রাবেয়া খাতুন কথা বলেন শান্ত কণ্ঠস্বরে। কিছুটা নিচু গলায়। তার প্রসন্ন মুখাবয়বে থাকে কৌতূহলের ছাপ। বোঝা যায় যে তিনি প্রবল ভাবে অনুসন্ধিত সু প্রকৃতির। যে কারণে আমি রাবেয়া খাতুনের সাথে কথা বলতে এতটা আগ্রহী হয়ে উঠলাম।

আমিও তাকে জানালাম নীহার রঞ্জন গুপ্তের গোয়েন্দা কীরিটি রায় কিভাবে পাঠকদের মোহাচ্ছন্ন করে রাখে। আরো একটি তথ্য জানতে পারলাম রাবেয়া খাতুনের কাছ থেকে। সেটি হল বাঙালি মহিলা লেখিকা প্রভাবতী দেবী স্বরস্বতী প্রথম বাংলা শিশুসাহিত্যে গোয়েন্দা কাহিনি রচনা করেন। যেগুলো ‘দেব সাহিত্য কুটি’র থেকে ‘প্রহেলিকা’ সিরিজ নামে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হত। সেদিন রাবেয়া খাতুনের সাথে কথা বলে আপ্লুত হলাম। জানতাম তিনি এ দেশের অন্যতম কথাসাহিত্যিক। ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘মধুমতী’তেই তিনি পাঠকদের চমকে দিয়েছিলেন। মধুমতী নদী তীরে বসবাসকারি চরম অবহেলিত, বঞ্চিত তাঁতি সম্প্রদায়ের দুঃখময় জীবনধারা নিয়ে রচিত উপাখ্যান। তার মত অমন আধুনিক ধাঁচের ভাষা নিয়ে কোন লেখিকা এ দেশে সাহিত্য চর্চা করেননি।
সাগরদের বাসায় গিয়েছিলাম খুদে নারকের সাক্ষাৎকার নিতে। কিন্তু তার মার সাথে আলাপের পর আমি যেন সাহিত্যের বিশাল বিস্তৃত এক ভুবনের নতুন দিগন্তের সন্ধান পেলাম। তার পঠন জগতটি ছিল বৈচিত্র্যমন্ডিত। বিচিত্র সব বিষয়ের প্রতি তার কৌতূহল। তিনি জানতে চাইছেন মানুষের রহস্যেঘেরা পৃথিবীর স্বরূপকে। আর তা জানাতে চাইছেন অন্যদের।
তার আগ্রহ রহস্য রোমাঞ্চময় ভুবনের দিকে। তাঁর শান্ত মুখ দেখে অবশ্য ধারনা করা যায় না যে তিনি দুর্গম অঞ্চলে যেতে আগ্রহী। ছবির কাহিনির পটভূমি নির্বাচন করলেন পশ্চিম পাকিস্তানের দুর্গম পার্বত্যাঞ্চল। স্যুটিং হয়েছিল পেশোয়ারের রহস্যঘেরা কিশসাখাািনর বাজারে। ছেলেধরার দলটি সাগর, কেকাকে জাহাজে করে নিয়ে গিয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। সোয়াত নদীর ধারের হলুদ পপরার বনে। ঝাউ, পাইন, দেবদারু, চিনার গাছের দু’পাশে দীর্ঘ পথ। সোয়াত্তের রাজধানী পার্বত্য নগরী মিং গোবাতে। কাহিনির ছেলেধরার একটি চক্রের সদস্য। পাকিস্তানের সব জায়গা থেকে ছোট ছেলে মেয়েদের সংগ্রহ করে নিয়ে যেত সীমান্ত শহর সোয়াতের মূল ঘাঁটিতে।
অপরূপ প্রাকৃতিক নিসর্গময় স্থানের প্রতি রাবেয়া খাতুনের আকর্ষণ। তাই কাথান উপত্যকার শ্যুটিং এর আয়োজন করা হয়েছিল। যেখানকার নদীতে ট্রডিট মাছ শিকার এক রোমাঞ্চকর ঘটনা।
রাবেয়া খাতুন চেয়েছিলেন শিশুরা বৈচিত্র্যময় অঞ্চলের সাথে পরিচিত হোক। এই দেখার তৃষ্ণাটি প্রবল ছিল রাবেয়া খাতুনের মাঝে। যে কারণে সমস্ত পৃথিবী চষে বেরিয়েছেন তিনি। তাঁর ভ্রমণ কাহিনিতে সেই স্বাক্ষর রয়েছে। তাঁর অভিজ্ঞতা আর উপলব্ধির নির্যাসকে প্রবহমান করতে চাইছেন অন্যদের মাঝে। প্রচুর বিচিত্র ঘটনার উল্লেখ করেছেন। সাগরকে জিজ্ঞেস করে জানলাম তার মায়ের কাহিনির গতিপ্রবাহে সে সম্পৃক্ত হতে পেরেছে। দারুণ ভালো লেগেছে কাহিনি। উত্তেজনা ছিল। ছেলে ধরাতে তাকে একবার জাহাজ থেকে সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলে দিতে চেয়েছিল। রাবেয়া খাতুনের কণ্ঠে আবেগ এলো। আমার দুই ছেলে মেয়ে সাগর আর কেকা খুব সহজ ভাবে, জড়তাহীন ভাবে অভিনয় করেছে।
আমার কাছে রাবেয়া খাতুনদের পরিবারটিকে ভীষন ভালো লাগল। ভীষন রুচিশীল। নিত্য নতুন উদ্ভাবনা শক্তির পরিচয় দিচ্ছে।

রাবেয়া খাতুন দুপুরে খেয়ে যেতে বল্লেন। চমৎকার খিচুড়ি রাধতে পারেন। সেদিন খাওয়ালেন মুগ ডালের খিচুড়ি। সাথে কৈ-কাসুন্দি।
আমি অকপটে আমার ভালো সাগার অনুভূতির কথা জানালাম। বল্লাম, আপনার সাথে কথা বলতে আমি হয়তো মাঝে মধ্যে আসব।
স্মিত হেসে রাবেয়া খাতুন জানালেন, অবশ্যই নিয়মিত আসবে। তুমিও দেখছি অনেক কিছু জানো। আমি তোমাদের কথা শুনতে চাই। জানতে চাই।
রাবেয়া খাতুনের সাথে আমার পরিচয়ের সূত্রটি অর্থময় হয়ে উঠল। এটি ছিল আমার জীবনের এক তাৎপর্যময় ঘটনা। সেই থেকে প্রায়ই চলে যেতাম সাগরদের বাসাবোর বাড়িটিতে। আমার অনেক মধুর স্মৃতি জমে রয়েছে ঐ বাড়িটিকে ঘিরে।
রাবেয়া খাতুনের সাথে আলাপ করে বহু বিষয় সম্পর্কে অবহিত হয়েছি। বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন সারাটি জনম ভরে। ঢাকার আদিবাসীদের জীবনধারা নিয়ে লিখেছিলেন, ‘বায়ান্নো গলির এক গলি’ উপন্যাসটি।
যখন মাত্র তের বছরের কিশোরী তখন থেকেই লিখছেন। কিশোরী বেলার পুরনো ঢাকায় বসবাস করার স্মৃতিকথা বলতে ভালোবাসতেন। বৃক্ষশোভিত ঢাকা নগরী ছিল প্রিয়। রাজারবাগের জলাভূমি। কমলাপুরের বিস্তৃত মাঠ। নারকেল কুঞ্জ।
রাবেয়া খাতুন জানতেন যে আমি আর আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মুনতাসীর মামুন পুরনো ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য জানতে উৎসাহী।
একদিন বল্লেন, তোমার বন্ধু মামুন পুরনো ঢাকার চার্লস ডয়েলির আঁকা যেসব দুস্প্রাপ্য ছবি প্রকাশ করেছে তা দেখলে তো রীতিমত রোমাঞ্চ জাগে। আমি মালিটোলার স্কুলে পড়েছি। সেখানকার গলির একেবারে শেষ মাথার দোতলা বাসভবনটির একটা আলাদা বৈশিষ্ট্য ছিল। বাড়িটি ছিল দোলাইখালের একদম পাড় ঘেঁষা। প্রাচীন বনেদী পরিবারের যোগ ছিল পানির সঙ্গে। মোগল আমলের ইসলাম খাঁর সময় থেকে এই খালের যোগাযোগ বড় নদী বুড়িগঙ্গার সাথে। একটা সময় ছিল তখন দোলাইখালের স্রোতের ধারা প্রতি বছর বইত। এই জলপ্রবাহ বংশাল, মালিটোলা, নাজিরা বাজার, আরমানিটোরা হয়ে আবার মিলেছিল বুড়িগঙ্গার সাথে।
আমি বিস্মিত হয়ে ভাবছিলাম আমার বন্ধু মুনতাসীর যে রকম ঢাকা নগরীর বিবর্তনের বিষয়ে আগ্রহী লেখিকা রাবেয়া খাতুনও তার চাইতে কোন অংশে কমনা।
পুরনো ঢাকার মহল্লা সংস্কৃতি, সর্দার, পঞ্চায়েত ব্যবস্থা প্রসঙ্গেও তার আগ্রহ ছিল। পুরো ঢাকা কয়েকটি মহল্লার বিভক্ত ছিল। ক্ষমতার গদিতে ছিলেন একজন করে সর্দার। যেমন কাদের সর্দার, আলা সর্দার, ইলিয়াস সর্দার।
আমি রাবেয়া খাতুনের সাথে কথা বলার সময় অনেক তথ্য নোট করে রাখতাম। এই গুণটি পেয়েছিলাম রাবেয়া খাতুনের কাছ থেকেই।
ঢাকা নগরীর সামাজিক ইতিহাসের বিবর্তন ছড়িয়ে আছে রাবেয়া খাতুনের বিভিন্ন লেখায়। একদিন বলছিলেন জিনজিরার ভগ্ন প্রাসাদের কথা। আক্ষেপ করছিলেন এই বলে যে জিনজিরার প্রাসাদটি রহস্যে ঘেরা হয়েই রইল। এর অনেক ঘটনাই আমাদের নিকটে অজানা।
পরিবতির্ত হওয়া ঢাকার প্রেক্ষাপট তার কাছে ছিল কৌতূহলের বিষয়।
তিনি লিখেছেন, কোথায় সেই স্রোতস্বিনী দোলাইখাল। পাননি আর রঙিন পালতোনা চালানী নৌকার বদলে চলছে ট্রাক, পাবলিক বাস। ঘোড়ার গড়ির জায়গায় চারদ ঢাকা তিন চাকার রিকশা।
প্রতিটি গেরস্ত ঘরের খোলা আঙিনা, দেয়ালের ধার ঘেঁষে কিছু গৃহপালিত গাছ যেমন সাজনা, শবরী, আম, করমচা, বরই থাকবেই। তার বদলে গলি কানা গলির দু’ধারে লম্বা লম্বা পাকা দালান। উঠোন নেই। বৃক্ষ নেই, নেই পুঁই, কুমড়া লডি-এর জাংলা। সেদিনের গলিপথের জন্য সূর্যের যে আলো ছিল অকৃপণ, এখন তা অদৃশ্য রেশনে উঠেছে। শুরু হয়েছে প্রতিবেশীর সঙ্গে অসুস্থ কখনো অসম প্রতিযোগিতা। অট্টালিকা আরও উচু করে কে কতোটা আলো হাওয়া হরণ করতে পারে।
ঢাকা নগরীর এই বিবর্তনের ধারাকে প্রত্যক্ষ করেছেন রাবেয়া খাতুন। বসবাস করেছেন বহু অঞ্চলে। প্রথমে থাকতেন পাতলা খান লেনের ঘুপচি বাড়িতে, তারপর পুরনো কোর্ট হাউস ষ্ট্রিট, শান্তিনগর, মগবাজার, মৌচাক। শেষে ছিলেন বনানির প্রসাদোপম সাগরের বাড়িতে। সেখানেই বার্ধক্যজনতি অসুস্থতায় বিকেল ৫টায় না ফেরার দেশে চলে যান। বিত্ত, বৈভব, প্রাচুর্য তাকে বিচলিত করতে পারেনি কখনও। তিনি যাপিত জীবনের বিত্তের আকর্ষনে তার জীবনের মূল্যবোধ এবং বিশ্বাস থেকে সরে যাননি। তার প্রিয় ছিল লেখার টেবিল। একেবারে পেশাদারী মনোভাব নিয়ে নিয়মিতভাবে সাহিত্যচর্চার একান্তভাবে নিমগ্ন থেকেছেন। এ যেন ছিল এক লঞ্চের সাধনা। অভীষ্ট লক্ষ্যে উপনীত হবার জন্য লেখনীতে শ্রম দিয়েছেন। নিমগ্ন কী করে পারো? একজন সাধিকার মতো জীবনকে অতিবাহিত করেছেন। কোনো প্রলোভনেই স্থানচ্যুত হননি। কিশোরীকালে তের বছর বয়সে সাহিত্য সৃষ্টির জন্য কলম হাতে তুলে নিয়েছিলেন।
রাবেয়া খাতুনের ব্যক্তিত্ব আমাকে আকর্ষন করলো। তিনি ঢাকা নগরীর বিবর্তনধারা সম্পর্কে কৌতূহলী। আমি জানালাম মুনতাসীর মামুন এ বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। তাঁর জন্য আমি মামুনের কাছ থেকে ঢাকা বিষয়ে অনেক বিচিত্র, আকর্ষনীয় তথ্য জোগাড় করে দিয়েছি। মামুনের সংগ্রহে থাকা দোলাইখালের কিছু দুস্প্রাপ্য ছবি দেখে খুশি হয়েছিলেন।
ঢাকার আদিবাসী সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা তাকে আকৃষ্ট করেছিল।
তিনি জানিয়েছেন, আমার শৈশব কৈশোরের অনেকখানি সময় কেটেছে পুরনো ঢাকার বিভিন্ন মহল্লায়। সবচেয়ে বেশি বছর রায় সাহেব বাজারে। তখন যানবাহন বলতে ঢাকার রাস্তায় বোঝাতো ঘোড়ার গাড়ি, চার চাকার, খালিকটা লম্বাটে বাক্স চেহারার। ভেতরে মাঝে পাদানি রেখে দু’ধারে বসার গদি। ঠেসেঠুসে জনা ছয় ওঠা যেতো। ঝিলমিল খড়খড়ি জানালা। কোচোয়ান কে ঢাকায় বলা হতো গাড়োয়ান। পুরুষ বা শিশুরা তার পাশে বসতে পারত। দু’দিকে দুটি বাতি। পেছনে কাঠের একটি বড় আসন থাকত। পালকির পর ঘোড়ার গাড়ির যাত্রা শুরু অবস্থাপন্ন ঘর থেকে। পেছনের ঐ জায়গাটি নির্ধারিত ছিল পাইক বরকন্দাজদের জন্য।
আমি রাবেয়া খাতুনের বিভিন্ন রচনায় ঢাকা নগরীর পরিবর্তনশীলতার পরিচয় পেয়েছি। আমি নিজেও বেড়ে উঠেছি পুরনো ঢাকার গলিতে। ঠাটারি বাজারের আমাদের পাশের বাড়িতে থাকতেন আনিসুজ্জামানেরা।
রাবেয়া খাতুন বল্লেন, বুড়িগঙ্গা থেকে ফুলবাড়িয়া রেল স্টেশন, এই তো ছিল নগীর ঢাকার ভৌগোলিক সীমানা। গ্রাম থেকে আসা লোকেরা দু আনার টিকেট কেটে সদরঘাটের রূপমহল হলে ঢুকে সিনেমা দেখত। ঢাকার মহল্লায় মহল্লায় ভাগ ভাগ আদিবাসী। সেই ঢাকা কি দ্রুত পালটে যাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে জীবনধারা।
আমার আর মামুনের আগ্রহের একটি বিষয় ছিল পরিবর্তিত ঢাকা। তাই রাবেয়া খাতুনের কৌতূহল মেটাতে আমি অনেক তথ্য-উপাত্ত সাংগ্রহ করে দিতাম। রাবেয়া খাতুন নোট নিতে পছন্দ করতেন। তাঁর কাছ থেকেই জেনেছিÑ ঢাকাইয়া ঝিদের বলা হত ‘মামা’। এ মামাদের সাথে কেউ খারাপ ব্যবহার করলে সে বাড়ি ঘেরাও হয়ে যেতো। মহিলারা দিনের বেলা রাস্তায় বেরুলে অবিশ্যি বোরকার আবরণ নিতো।
একদিন বল্লেন তার বাবার কথা।
আমার আব্বা ছিলেন অত্যন্ত সুকণ্ঠের অধিকারি। তিনি ছিলেন শখের গাইয়ে। ছুটির দিনে বসতেন হারমোনিয়াম নিয়ে। মহল্লাতে আবার হারমোনিয়অমের স্বর হারাম হিসেবে বিবেচিত। তার সেই খেদটা কখনও পূর্ণ হতো ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলে।
সেই ক্রমাগত বদলে যেতে থাকা ঢাকা নিয়ে আমরা কথা বলতাম। রাবেয়া খাতুন সেই সব হারিয়ে যাওয়া মানুষদের ছবি ধরে রেখেছেন। জানিয়েছেন কিশোরীকালে দেখা চানমল সর্দারের কথা। ধবধবে শাদা দাড়ি, বাবরি চুল, সুরমা পরা দু’চোখ, কল্লিদার পাঞ্জাবি, দুধবরণ রেঙ্গুনি লুঙ্গি, চামড়ার বেল্ট দিয়ে পরা।
তাঁর স্মৃতিতে হারিয়ে যাওয়া ঢাকা নগরীর ছবি খুঁজে পেতাম। এটি আমার এক মুগ্ধচারিতার বিষয় ছিল।
রাবেয়া খাতুন জানালেন তাদের মহল্লার কোবাকাম বলে পরিচিত রাজমিস্ত্রির কথা। যে ছিল শৈল্পিক জ্ঞানের অধিকারি। তার বাড়ির মাটির দেয়াল, টিনের চাল, কাঠের দরোজার আপন দুটি ঘরের সবখানে সুন্দর সব নকশা।
উঠোনের বিরাট সজনে গাছের ছায়ায় চট বিছিয়ে খেলতেন। সজনে তলা থেকে বেরিয়ে যেতেন। ঘুরতেন সারা পাড়া, বাজার, রাজপথ, পাশের কলতাবাজার, সেখানকার বরফ কল। পাড়ার উত্তর প্রান্তে বহমান ছিল দোলাইখান। বুড়িগঙ্গার সাথে মিশে বর্ষাকালে খালটি ফুলেফেঁপে রীতিমত বড় হয়ে উঠত। খাল দিয়ে ভেসে যেত রঙিন পাল তোলা মহাজনী নৌকা, ধীর বেগে নাওয়ের বহর।
গ্রীস্মকালে দোলাইখাল পরিণত হতো শীন ধারার। যা ঘিরে সবুজ গাছপালার বারোয়ারী সমারোহ ছিল।
কিশোরী রাবেয়া খাতুন খুব ঘুরতেন। সকলের বাড়িতে তখন উঠোন থাকত। সে মাটিতে ছিল সাধ্যমতো গাছপালা। শবরি আম, সাজনা ফুল, করমচা, কুল, জাম্বুরা সব আঙিনায় শোভা পেত।
কখনও যেতেন শহরের বাইরে কমলাপুর গ্রামে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। পল্টন ময়দানে ছিল গোরা সৈন্যদের ছাউনি।
সেই সময়ের ঢাকার বুকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঘোড়াদৌড়, ভয়াবহ মন্বন্তর সবই এসেছে।
ঢাকার আদিবাসিদের জীবনযাত্রা নিয়ে দীর্ঘ উপন্যাস লেখার বাসনা প্রকাশ করেছিলেন রাবেয়া খাতুন। তিনি লিখলেন সাহেব বাজার। দৈনিক আজাদ পত্রিকার সাহিত্য বিভাগে ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হতো। তাতে ছিল তার অন্তরঙ্গ আলোকে দেখা বিভিন্ন চরিত্র। পুরনো ঢাকার খান্দানী গাড়োয়ান বুড়ো সৈয়দ আলী। যার ছিল সতেজ চিন্তা। নবাবী আমল, ঊনচল্লিশের সেপ্টেম্বরে ইংরেজদের লড়াই, আকাল, বোমাতঙ্ক। তার ভেতরে জন্ম নেয়া নতুন এক পুঁজিবাদী শ্রেনি।
রাবেয়া খাতুন এ প্রসঙ্গে দার্শনিক সুলভ একটি উক্তি করলেন, আসলে আমরা সবাই আপন সময়ের নষ্ট প্রহরকে শুধু দেখে যাওয়া ছাড়া আর কোনও ভূমিকা রাখতে পারি না।
অথচ রাবেয়া খাতুন পাতার পর পাতা লিখে সেসব প্রহরগুলোকে ধরে রেখেছেন। তিনি অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে পরিবেশকে পর্যালোচনা করতে পারতেন। তাঁর ছিল বিস্ময়কর রকমের সৃষ্টিশীল এক ক্ষমতা। এই ক্ষমতার সাহায্যে ক্লান্তিহীনভাবে লিখে গেছেন তিনি। তাঁর এই সাধনার প্রতি বলা চলে, নিমগ্ন, কি করে পারো।
তিনি আর আমাদের মাঝে নেই। চলে গেছেন না ফেরার দেশে।
তাঁর কথা আমার স্মৃতি পটে লেখা। তার কথা মনে করে চোখ ভিজে যায়।
রাবেয়া আপা, আমি কখনও আপনাকে ভুলতে পারব না। আমার জীবনে আপনার মতো এতোটা আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন মহিলা আর চোখে পড়েনি। আপনি ছিলেন স্বাতন্ত্র্যে সমুজ্জ্বল। এই ছিলেন কথাটি লিখতে গিয়ে আমার চোখ পুনরায় জলে ভরে যায়। চোখ ভিজে যায়।