SHARE

বলিউডের হার্টথ্রব অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুত অকালে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেলেন । মহেন্দ্র সিং ধোনির জীবনীভিত্তিক বায়োপিক তার ক্যারিয়ার বদলে দেওয়া সিনেমা। পর্দার ধোনি আর নেই। অনেক স্মৃতি, ছবি, মনে রাখার মতো ঘটনা ফেলে রেখে তিনি চলে গেলেন অনন্তের পথে। এটা কেন হলো, কী করে হলো এসব হাজারো প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষায় ভক্তরা। পর্দার মতো ‘দ্য আনটোল্ড স্টোরি’ হয়েই তা থেকে যাবে হয়তো…

সংক্ষিপ্ত জীবনী

একেবারেই নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে নিজের মেধা আর পরিশ্রম দিয়ে বলিউডের অন্যতম চাহিদাসম্পন্ন তারকায় পরিণত হন সুশান্ত সিং রাজপুত। তার ইচ্ছা ছিল ইঞ্জিনিয়ার হবেন। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে পড়তেই শোবিজের ভূত মাথায় চেপে বসে। শুরু করেন মডেলিং দিয়ে। হিন্দি সিরিয়ালে ছোট চরিত্রও করেছেন। কিন্তু স্টার প্লাসের ‘কিস দেশ মে হ্যায় মেরা দিল’ সিরিয়ালের মধ্য দিয়ে ২০০৮ সালে প্রথম নজর কাড়েন সুশান্ত। এরপর ২০০৯ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত জিটিভিতে প্রচারিত ‘পবিত্র রিশতা’তে মানব চরিত্রে অভিনয় করে দর্শক মহলে তারকাখ্যাতি পান। সে সময় সহশিল্পী অঙ্কিতা লোখান্ডের সঙ্গে প্রেম, বিয়ে, নাচ বালিয়ে অনুষ্ঠানে জুটি হয়ে আসা ও পরে সেই সম্পর্ক বিচ্ছেদ নিয়ে আলোচিত হন তিনি। টেলিভিশনে সফলতার পর ২০১৩ সালে ‘কাই পো চে’ ছবিতে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বড়পর্দায় অভিষেক হয় সুশান্ত সিং রাজপুতের। যার জন্য সেরা নবাগত অভিনেতা হিসেবে ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড ঘরে তুলেছিলেন সুশান্ত। একই বছর পরিণীতি চোপড়ার সঙ্গে মুক্তি পায় তার সুপারহিট সিনেমা ‘শুদ্ধ দেশি রোমান্স’। ২০১৫ সালে ডিটেকটিভ থ্রিলার ‘বোমকেশ বক্সি’তে কাজ করেন তিনি। ৩৪ বছর বয়সী এই তারকাকে দেখা গেছে আমির খানের ‘পিকে’তে। তবে সুশান্ত সুপারস্টার হয়ে ওঠেন ভারতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক এম এস ধোনির জীবনী নিয়ে নির্মিত ‘এম এস ধোনি : দ্য আনটোল্ড স্টোরি’তে কাজ করে। এটি ছিল তার টার্নিং পয়েন্ট। এর সুবাদে ফিল্মফেয়ারে সেরা অভিনেতার মনোনয়ন পেয়েছিলেন তিনি। এছাড়াও সারা আলি খানের প্রথম সিনেমা ‘কেদারনাথ’, কৃতি শ্যাননের সঙ্গে ‘রাবতা’ সিনেমায় কাজ করেন। কাজের সময় দুই নায়িকার সঙ্গেই তার প্রেমের গুঞ্জন শোনা যায়। শ্রদ্ধা কাপুরের সঙ্গে দারুণ প্রশংসিত সিনেমা ‘ছিছোরে’ তার শেষ ছবি। শেষ দিকে তিনি উঠতি বলিউড অভিনেত্রী রিয়া চক্রবর্তীর সঙ্গে প্রেম করছিলেন বলে শোনা যায়।

ম্যানেজারের মৃত্যুর পাঁচ দিন পর তিনিও

মাত্র পাঁচ দিন আগে সুশান্তের ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী দিশা সালিয়ান ভবনের ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। দিশার মৃত্যুর শোক বা রহস্যের ভেদ করার পাঁচ দিনের মাথায় আত্মহননের পথ বেছে নেন সুশান্ত। এই দুই মৃত্যু নিয়ে রহস্যর দানা বাঁধতে শুরু করেছে। দিশা আত্মহননের আগে কোনো সুইসাইড নোট (চিরকুট) রেখে যাননি। তাই কী কারণে তিনি আত্মহনন করেছেন তা পরিষ্কার নয়। বলিউডে ভালো অবস্থানে থাকা সুশান্ত হঠাৎ বিধ্বংসী সিদ্ধান্ত কেন নিলেন তা কেউ বলতে পারছেন না। মৃত্যুর আগে সুশান্তও কোনো সুইসাইড নোট রেখে যাননি। ইতিমধ্যেই সুশান্তের বাড়ির পরিচারিকা ও বন্ধুদের জবানবন্দি নিয়েছে পুলিশ। অভিনেতার কল রেকর্ডও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

মৃত্যুর আগে সুশান্তের পোস্ট

সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের মনের কথা লিখতেন। কখনো কল্পবিজ্ঞান নিয়ে, কখনো আবার মহাজাগতিক বিষয় নিয়ে। এই বিষয়গুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতেন তিনি। শেষ যে ইন্সটাগ্রাম পোস্টটি ছিল তার, তাতেও যেন কোথাও সেই গভীর চিন্তার ছাপ ফেলেছেন তিনি। জীবনের দ্বন্দ্বের কথা উঠে এসেছে তাতে। ২০০২ সালে মাকে হারিয়েছিলেন সুশান্ত। সেই দুঃখ কিছুতেই ভুলতে পারেননি, শেষ পোস্টেও মায়ের কথা বলেছেন অভিনেতা। সুশান্ত শেষ ইন্সটাগ্রাম পোস্টে লিখেছেন, ‘চোখের জলে আবছা হয়েছে অতীত, ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে মুখে ফুটছে হাসি, আর জীবন যেন এই ভবিষ্যৎ ও অতীতের দোলাচলে কাটছে…মা।’ জানা যায়, ডিপ্রেশনের চিকিৎসা নিচ্ছিলেন অভিনেতা। মৃত্যুর পর সুশান্তের ফ্ল্যাটে গিয়ে চিকিৎসার কাগজ উদ্ধার করে পুলিশ। তারা অনুমান করছেন, হতাশায় আত্মহত্যা করেছেন অভিনেতা।

সহকর্মী ও ভারতজুড়ে শোকের ছায়া

বলিউডের তরুণ প্রজন্মের অন্যতম সফল তারকা অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের চলে যাওয়া কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তার সহকর্মী ও ভক্তরা। সুশান্তের প্রয়াণে শুধু বলিউডে নয়, বর্জ্রাঘাত হলো সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা তার ভক্ত ও গুনগ্রাহীদের মধ্যে। সবার মুখে শুধু একটাই কথা, বলিউডের এই অভিনেতার চলে যাওয়ার সময় এখনই নয়। অভিনেতা অক্ষয় কুমার শোক প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘এই খবরটি আমাকে একদম বাকরুদ্ধ করে দিয়েছে। আমার মনে আছে, সুশান্ত অভিনীত ‘ছিছোরে’ দেখার পর এর প্রযোজক সাজিদকে আমি বলেছিলাম, যদি আমি এই সিনেমা একটি অংশ হতে পারতাম। সুশান্ত সত্যিই একজন প্রতিভাবান অভিনেতা ছিলেন।’ ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন লিখেছেন, ‘এটি সত্যি হৃদয়বিদারক।’ সুপারস্টার গায়িকা নেহা কাক্কার লিখেছেন, ‘ইস! জীবনে যদি কম্পিউটারের মতো একটি আনডু অপশন
থাকত। তোমাকে মিস করব সুশান্ত।’ সুশান্তের ধোনি সিনেমার বাবার ভূমিকায় অভিনয় করা অনুপম খের লিখেছেন, ‘কী লিখব বুঝতে পারছি না। লেখার সময় হাতটি কাঁপছিল শুধু। যে মানুষটির জীবন সম্পর্কে অবিশ্বাস্যরকম ইতিবাচক অন্তর্দৃষ্টি ছিল, তার চলে যাওয়া মেনে নেওয়া সত্যিই কষ্টের।’

টেনিস তারকা সানিয়া মির্জা লিখেছেন, ‘তুমি বলেছিলে আমরা এক দিন একসঙ্গে টেনিস খেলব… তুমি যেখানেই গিয়েছো সবার মধ্যে হাসি ছড়িয়ে দিয়েছো। কিন্তু আমরা জানতেও পারলাম না তুমি কী নিয়ে কষ্টে ছিলে। এই পৃথিবী তোমাকে মিস করবে।’

এ ছাড়া শোক প্রকাশ করেছেন সংগীতশিল্পী আদনান সামি, তুলসি কুমার, অভিনেত্রী জ্যাকলিন ফার্নান্দেজ, দিয়া মির্জা, নিধি আগারওয়াল, জেরিন খান, দক্ষিণী তারকা জুনিয়র এনটিআর, কৃতি সুরেশসহ অনেকে।

এ শোকের ছায়া নেমেছে গোটা ভারতে। যেন শোক জানানোর ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন সুশান্তের সহকর্মী অভিনয়শিল্পী থেকে রাজনৈতিক নেতা, ক্রিকেটারসহ সর্বস্তরের মানুষ। তারা বলছেন, সুশান্ত যে গতিতে এগিয়ে চলছিলেন, তার অনেক দূর যাওয়ার সামর্থ্য ছিল।
ভারতীয় চলচ্চিত্রের এ নন্দিত অভিনেতার মরদেহ রোববার (১৪ জুন) তার মুম্বাইয়ের বান্দ্রার বাসায় ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। পুলিশ প্রাথমিকভাবে এটিকে আত্মহত্যা বলে ধারণা করছে। যদিও আত্মহত্যার কারণও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
সুশান্তের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোকাভিভূত হয়ে পড়েন ভারতের সিনেমাপ্রিয় কোটি মানুষ। শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েন সুশান্তের বলিউডের সহকর্মী, ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, তারকা ক্রীড়াবিদসহ প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ।

এ বিয়োগাত্মক খবর পেয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক বার্তায় বলেন, ‘সুশান্ত সিং রাজপুত… একজন দীপ্তিমান তরুণ অভিনেতার অকাল প্রয়াণ। তিনি টিভি এবং সিনেমায় সমানে দাপিয়ে কাজ করেছেন। বিশ্ব বিনোদন জগতে তার উত্থান অনেকের জন্য প্রেরণার এবং তিনি অনেক স্মরণীয় কাজ রেখে গেছেন। তার প্রয়াণে স্তম্ভিত। তার স্বজন ও ভক্তদের প্রতি সমবেদনা।’

ক্রিকেটের বরপুত্র শচিন টেন্ডুলকার টুইট বার্তায় লেখেন, ‘সুশান্ত সিং রাজপুতকে হারিয়ে ফেলার খবরে স্তম্ভিত ও ব্যথিত। কী প্রতিভাধর অভিনেতা ছিলেন তিনি। তার পরিবার ও প্রিয়জনদের প্রতি আমার সমবেদনা। তার আত্মার শান্তি হোক।’

বলিউডের তারকা অভিনেতা অক্ষয় কুমার টুইটারে লেখেন, ‘আমাকে এই খবর সত্যিই স্তম্ভিত ও বাকরুদ্ধ করে দিয়েছে। আমি ছিছোড়ে সিনেমাতে সুশান্ত সিং রাজপুতকে দেখছিলাম এবং ওই সিমেনার প্রযোজক আমার বন্ধু সাজিদকে বলছিলাম যে, আমি কেমন উপভোগ করেছি সিনেমাটা, তাকে এও বলেছিলাম যে, এই সিনেমার অংশ হতে না পারার আক্ষেপ হয়েছে আমার। কী দুর্দান্ত অভিনেতা ছিলেন… স্রষ্টা তার পরিবারকে এ শোক সইবার ক্ষমতা দিন।’

বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী মাধুরী দীক্ষিত টুইটারে তার শোক জানিয়ে বলেন, ‘সুশান্তের মতো এমন প্রতিভাধর ও দাপুটে অভিনেতাকে হারানোর খবর হৃদয় ভেঙে দেয়। তার সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো আমি জীবনভর মনে রাখবো। তার শোকাহত পরিবার ও বন্ধুদের প্রতি আমার আন্তরিক সমবেদনা।’

টেনিস তারকা সানিয়া মির্জা লেখেন, ‘সুশান্ত, হৃদয় ভেঙে গেল, তুমিই না বলেছিলে যে একদিন আমরা একসঙ্গে টেনিস খেলবো…তুমি ছিলে অনেক প্রাণোচ্ছল-আনন্দমুখর একজন মানুষ। যেখানেই যেতে সেখানেই হাসি ছড়িয়ে দিতে…যখন এটা লিখছি আমার হাত কাঁপছে…শান্তিতে থাকো বন্ধু আমার!’

সুশান্ত সিংয়ের সঙ্গে ‘এম এস ধোনি : দ্য আনটোল্ড স্টোরি’ সিনেমায় অভিনয় করা দিশা পাটানি তার টুইটারে শুধু হৃদয় ভেঙে যাওয়ার একটি ইমোটিকন বা চিহ্ন পোস্ট করেছেন।

এ খবর শুনে নন্দিত পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপ টুইট করে বলেন, ‘কী বলে… এটা সত্য নয়!’ মডেল ও অভিনেত্রী গওহর খান তার টুইটার বার্তায় বলেন, ‘হায় হায়…কী ঘটছে?’

ফেসবুক-টুইটারসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে দেখা যাচ্ছে শোকের ছায়া। সানি দেওল, সোনালী বেন্দ্রে, উর্মিলা মাতন্ডকর, প্রাচী দেশাইসহ অনেক অভিনয় তারকা শোক প্রকাশ করেছেন সুশান্ত সিং রাজপুতের চিরবিদায়ে।