SHARE
Afsana-Mimi-Subarna

সুবর্ণা মুস্তাফা এক নামেই যাঁর ব্যাপক পরিচিতি। আর আফসানা মিমি তাঁর পরিচয়টাও বোধকরি লিখে প্রকাশের প্রয়োজন পড়ে না। অগ্রহ তারকা সুবর্ণা মুস্তাফার মুখোমুখি হয়েছিলেন অনুজ তারকা আফসানা মিমি। দু’জন তারকা প্রাণবন্ত একাধিক আড্ডায় প্রাণ খুলে মনের কথা ভাগাভাগি করেছেন এবং তা একজন রিপোর্টার এর দৃষ্টিতে লিপিবদ্ধ করেছেন আফসানা মিমি। আনন্দ আলোর পক্ষ থেকে দেশের গুণী তারকা দ্বয়কে অনেক শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা। সুবর্ণা মুস্তাফা ও আফসানা মিমির মধ্যে অন্তরঙ্গ কথোপকথনের প্রথম কিস্তি ছাপা হলো আনন্দ আলোর এই বিশেষ সংখ্যায়…
আফসানা মিমি: তোমার ভেতরের যে মানুষটা আছে তাকে কি আমরা কখনো ছুঁতে পেরেছি? অবশ্য ছুঁতে হবেই তেমন কোনো কথা নেই…
সুবর্ণা মুস্তাফা: হুম, সে মানুষটা নিশ্চয়ই আছে… কিন্তু এমনও তো হতে পারে যে আমার ভেতরের মানুষটা… এমন জায়গায় আছে যে আমি নিজেও কখনো পুরোটা ছুঁয়ে দেখিনি!
আফসানা মিমি: অটোবায়োগ্রাফি লেখার ইচ্ছে আছে কোনো দিন?
সুবর্ণা মুস্তাফা: আমি সে ভাবে ভাবিনি। কারণ আমি খুবই সাধারণ একটা জীবন যাপন করেছি, যাদের অটোবায়োগ্রাফি পড়েছি বা পড়তে আগ্রহী হবো তাদের জীবনে অনেক বড় বড় কাজ আছে।
আফসানা মিমি: হ্যাঁ, জানি তুমি ‘সিম্পল লিভিং অ্যান্ড হাই থিং কিং’ এ বিশ্বাসী। কিন্তু তুমি মানুষটা তো সাধারণও…
সুবর্ণা মুস্তাফা: সিম্পল লিভিং, হাই থিং কিং, ডুইং মাই থিং… অটোবায়োগ্রাফি আসলে অনেক বড় মানুষদের হওয়া উচিত। যা পড়ে মানুষ ইন্সপায়ারড হবে।
আফসানা মিমি: সুবর্ণা মুস্তাফা বড় মানুষ নন? বাংলাদেশের মানুষের কাছে সুবর্ণা মুস্তাফা অনেক বড় একটা নাম, অনেক বড় মাপের একজন মানুষ। আমরা যারা অভিনয়কে ভালোবেসেছি তাদের জন্য তুমিই তো অনুপ্রেরণা…
সুবর্ণা মুস্তাফা: কেউ যদি কখনও মনে করে… মানে আমার মনে করার চাইতে গুরুত্বপূর্ণ হলো, যদি কেউ সেটা মনে করে এবং আমার বায়োগ্রাফির ব্যাপারে আগ্রহী হয়, তখন আমার যতটুকুু সহযোগিতা করবার হয়তো করা যেতে পারে। কিন্তু আমার কখনো মনে হয়নি যে আমি বসে বসে নিজের আত্মজীবনী লিখবো…
আফসানা মিমি: কত বিস্তৃত আর বিশাল তোমার কর্মজীবন। অভিনয়ের জগতে তুমি একাই একটা ইন্সটিটিউশন। কত বছর হলো? মানে সেই শুরু থেকে আজ অব্দি…
সুবর্ণা মুস্তাফা: ১৪ বছর বয়স থেকে… ১৯৭৫ সালে শুরু… অবশ্য যদি শিশু শিল্পী হিসাবে যে কাজগুলো করেছি সেগুলোর কথা বলো তাহলে আরো আগে, ১৯৬৮-৬৯ সালে আম্মার হাত ধরে রেডিওর খেলা ঘরে… প্রথম টেলিভিশন নাটকে অভিনয় ১৯৬৯ সালে, সৈয়দ শামসুল হকের গল্প থেকে। প্রডিউসার ছিলেন মোহাম্মদ জাকারিয়া। তারপর নিয়মিত ছোটদের আসর ১৯৭১ পর্যন্ত । মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার পর একটা লম্বা সময়ের বিরতি। তারপর একেবারে বড়দের নাটক ‘বরফ গলা নদী’ ১৯৭৫ সালে। ভাগ্যিস শিশুশিল্পী হিসাবে কেউ আমাকে মনে রাখেনি… (হাসি) একমাত্র সাকসেসফুল শিশুশিল্পী হচ্ছে তারিন। ঈশিতাও সফল। তবে তারিনের সাকসেস টা ডিফারেন্ট লেভেলের। শিশু শিল্পীরা খুব ট্যাবুড থাকে… সো আই অ্যাম ভেরি হ্যাপি, নো বডি রিমেমবারস দ্যাট… ৭৫ সালে বিটিভির ‘বরফ গলা নদী’ আর ঢাকা থিয়েটার এক সাথে।
আফসানা মিমি: ১৯৭৫ মানে বিটিভির বর্তমান স্টুডিওতে, নাকি রামপুরায়?
সুবর্ণা মুস্তাফা: হ্যাঁ, তখনও পুরো স্টুডিও তৈরি হয়নি। আন্ডার কনস্ট্রাকশান ছিল ২ নম্বর, ৩ নম্বর ফ্লোর।
আফসানা মিমি: আর ৬৮-৬৯ সালে, তখনতো বিটিভি ডিআইটি ভবনে ছিল। শুনেছি তখন সব অনুষ্ঠান লাইভ হতো?
সুবর্ণা মুস্তাফা: লাইভ ছিল, কিছু রেকর্ডিংও হতো। হাফ রেকর্ডিং হয়েছে, হাফ লাইভ গেছে এমনটাও হয়েছে। ছোটদের আসর খুব মজা করে করতাম আমরা। তখন প্রডিউসার ছিলেন খালেদা ফাহমী, সাকিনা সারোয়ার, মুস্তাফা মনোয়ার। ওঁরা বড় বড় মানুষেরা সবাই তখন বাচ্চাদের নিয়ে কাজ করতেন। সে সময় মেকাপম্যান ছিলেন মোয়াজ্জেম ভাই, সালাম ভাইরা। একদিনের ঘটনা মনে আছে- সালাম ভাই সুন্দর মেকআপ করে দিয়েছেন আমাকে, সাকিনা সারোয়ার মেকআপ রুমে ঢুকেই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন ‘এক চড় দেবো’ তারপর সালাম ভাইকে বললেন মেকআপ উঠিয়ে দিতে। (হাসি) এই যে প্রডিউসার বলছেন চড় দেবো, বাবা-মা কিন্তু নির্লিপ্ত। তাঁরা এই সব বিষয় নিয়ে কখনও মাথা ঘামাতেন না, জানতেন বকুনি খাবার মতোই কিছু একটা হয়েছে নিশ্চয়ই। তবে আমার ছোট বেলায়ও বাবা-মা সব সময় সাথে যেতেন না। কবীর আনোয়ার ছিলেন, উনি বাসা থেকে নিয়ে আসতেন আবার পৌঁছে দিতেন।
আফসানা মিমি: সেই কবীর আনোয়ার, যিনি পরবর্তীতে চলচ্চিত্র পরিচালক?
Subarna-Mostafaসুবর্ণা মুস্তাফা: হ্যাঁ। বাদল রহমান, কবীর আনোয়ার, বেলাল আহমেদ, এরা সব বিটিভিতে প্রোগ্রাম অ্যাসিসট্যান্টস ছিলেন। উনারা আমাদের নিয়ে কাজ করতেন, খাওয়াতেন, আমরা ঘুমিয়ে গেলে উঠিয়ে দিতেন। ইট ওয়াজ রিয়েলি ফান! একবারতো গল্প শুনতে শুনতে আমি টেবিলের উপর শুয়েই পড়েছিলাম। কেউ একজন বলছিলেন উঠিয়ে দিতে। কবীর আনোয়ার বললেন, না বরং আলাদা করে শট নাও কী তন্ময় হয়ে গল্প শুনছে… চমৎকৃত হবার মতোই বিষয় কিন্তু, পরবর্তী জীবনে এই সব মানুষেরা কত সুন্দর সব কাজ করেছেন।
আফসানা মিমি: ছোটদের আসরের সুবর্ণা মুস্তাফা দেখতে কেমন ছিলেন?
সুবর্ণা মুস্তাফা: (হাসি) গুপলুস গাপলুস! গাল ফোলা ফোলা… হাসিটা বোধ হয় একই রকম আছে।
আফসানা মিমি: কোন ছবি ছাপা হয়েছে সেই সময়ের?
সুবর্ণা মুস্তাফা: হয়েছে, সারা ভাবি ছবি দেখে বলে ছিলেন খরগোশের বাচ্চার মতো… (হাসি) তারপর বিটিভির পরবর্তী সময়টায়তো খুবই হ্যাংলা পটকা টাইপ ছিলাম দেখতে। একটা কথা, আমি কিন্তু ছোটবেলা থেকেই ক্যামেরার সামনে খুব সাবলীল ছিলাম।
আফসানা মিমি: ব্যাপারটাতো জন্মগত ভাবেই হবার কথা তাই না?
সুবর্ণা মুস্তাফা: আমি টিভি ক্যামেরার কথা বলছি, স্টিল ক্যামেরার সামনে আমি কখনোই সাবলীল নই। আমার ভালো ছবি তুলতে পারতেন আলমাজী ভাই, আনোয়ার হোসেন, শফিকুল ইসলাম স্বপন, নাসির আলী মামুন।
আফসানা মিমি: নাসির আলী মামুনের তোলা কিছু দুর্দান্ত ফটোগ্রাফ দেখেছি তোমার।
সুবর্ণা মুস্তাফা: কখন যে অজান্তেই এত সুন্দর ছবিগুলো তুলে ফেলে সে… কখনো বলেনি ডানে তাকান বা একটু হাসেন কিংবা লাইট নেন।
আফসানা মিমি: ছোটদের আসরে কী কী হতো তখন?
সুবর্ণা মুস্তাফা: অনেক কিছু হতো। আমার কাছে সবচেয়ে স্মৃতিময় ৭১ সালের একুশে ফেব্রæয়ারির অনুষ্ঠান। মুস্তাফা মনোয়ার আয়োজন করেছিলেন বিশাল সেই অনুষ্ঠানের। শাহনাজ রহমত উল্লাহ, সাবিনা ইয়াসমিন এসেছিলেন গান শেখাতে। তখন সময়টা অন্যরকম ছিল।
আফসানা মিমি: আচ্ছা, সময় মানুষকে তৈরি করে না কি মানুষ সময়কে?
সুবর্ণা মুস্তাফা: মানুষও সময়কে তৈরি করে, সময়কে নিয়ন্ত্রণ করে। আবার অনেক সময় পারিপার্শ্বিকতাও মানুষের মানসিকতা নির্মাণ করে। দেখো ডিআইটি ভবনে শুটিং করতে গিয়ে আমরা ছোট ছোট বাচ্চারা তখন ঘুরছি-ফিরছি … দৌড়াচ্ছি… কখনো সিঁড়ি দিয়ে উপরে যাচ্ছি, নীচে নামছি, কারো মনেই হয়নি এই বাচ্চাটা অ্যাবিউজড হতে পারে… সময়টা অন্য রকম ছিল, ভীষণই অন্যরকম…
আফসানা মিমি: মানুষ কি সময়কে নষ্ট করতে পারে? নাকি বলবো ‘নষ্ট সময়ের মানুষেরা’?
সুবর্ণা মুস্তাফা: মানুষ সময়ের অপচয় করতে পারে অবশ্যই কিন্তু ‘নষ্ট’ হয় মানুষ নিজের কারণে। আমার বেড়ে ওঠার কথা যদি বলি, আমিতো সেই টিনএজ বয়স থেকে কাজ করছি। তখনতো খুব বেশি মেয়েরা থিয়েটার করতেন না। এখনতো অনেক মেয়েরা কাজ করেন। তখন ছিলেন ফেরদৌসি মজুমদার, আফরোজা বানু…
আফসানা মিমি: নাজমা আনোয়ার…
সুবর্ণা মুস্তাফা: হ্যাঁ নাজমা খালা। সারা যাকের, লাকী ইনাম আর ঢাকা থিয়েটারে তখন শিমুল ইউসুফ, নায়লা আজাদ নূপুর…
আফসানা মিমি: নিমা রহমান?
সুবর্ণা মুস্তাফা: নিমা থিয়েটারে এসেছে অনেক পরে। টেলিভিশনে আমাদের আগে কাজ করেছেও। যা বলছিলাম, অস্থিরতা সেই সময়েও ছিল। পারিপার্শ্বিকতা যাই থাকুক না কেন একজন মানুষের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে পরিবারের একটা বড় ভূমিকা থাকে যে তুমি কী করবে। আর তুমি কোনটা বেছে নেবে এই বিষয়টা ব্যক্তির উপর নির্ভর করে।
আফসানা মিমি: সময়টা তখনো অস্থির ছিল, কিন্তু সেই সময়ের অস্থিরতার একটা লক্ষ্য ছিল… একটা অর্জনের লক্ষ্য।
সুবর্ণা মুস্তাফা: হ্যাঁ একটা কিছু গড়ার লক্ষ্য…
আফসানা মিমি: এখনকার যে অস্থির সময় মনে হয় যেন সবকিছু ধ্বংস করার জন্য এই অস্থিরতা। ভীষণ নেগেটিভ একটা ইমপ্যাক্ট ফেলছে এই অস্থিরতা আমাদের চার পাশে..
সুবর্ণা মুস্তাফা: হ্যাঁ এখন কোন ক্রিয়েটিভিটি নেই। সত্তরের দশক থেকে আশির দশকের শেষ পর্যন্ত সময়টাকে বলা হয় ‘দ্যা গোল্ডেন এরা’… সেটা ছিল সত্যি কারের সোনালি সময় আমাদের শিল্প-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে। সেটা থিয়েটার, টিভি, সিনেমা, সাহিত্য, পেইন্টিং সর্বক্ষেত্রে।
আফসানা মিমি: নব্বইয়ের দশকে এসেও কিন্তু আমরা এসবের অনেক খানি পেয়েছি।
সুবর্ণা মুস্তাফা: তখন তো তোমরা সেই গতিটা পেয়েছিলে, ধরো একটা গাড়ির চাকা চলতে চলতে যে গতিটা থেকে যায়।
আফসানা মিমি: মোমেন্টাম?
সুবর্ণা মুস্তাফা: হ্যাঁ সেই মোমেন্টামটাতো অনেক দূর যাবে… অনেক দূর যায়…
আফসানা মিমি: আমার নিজের খুব অদ্ভুত লাগে। আমার শুরুটা নব্বইয়ের দশকের গোড়া থেকে। সেই সময়টা সুন্দর পার হয়ে আসলাম। ২০০০ সালের পর থেকে পরিবর্তনগুলো ঘটতে থাকলো। কিন্তু ২০১০ এরপর আমার চেনা পৃথিবীটা খুব অচেনা লাগে।
সুবর্ণা মুস্তাফা: সবকিছুই খুব দ্রæত দরকার সবার। আমরা সময়ই দিতে চাইনা কোনো কিছুর জন্যে। সবকিছুই আমাদের ইন্সট্যান্ট প্রয়োজন, ইন্সট্যান্ট কফির মতো। কিন্তু ইন্সট্যান্ট কফি, ইন্সট্যান্ট নুডলস প্রথম দু চারবার চলতে পারে তারপর তার আর কোনো আবেদন থাকে না। আচ্ছা তুই যে একবার নুডলস বানিয়ে খাইয়েছিলি সেই ২০০৬ এর ওয়ার্ল্ড কাপের সময়, আর তোর যে রান্না বান্নার কোন ধারণাই নেই সে বিষয় আমার জানা ছিল না। তুই যে নুডলসের পানি কমে যাওয়ায় কতগুলো ঠান্ডা পানি ঢেলে দিলি, তারপর নুডলস যে হালুয়া হয়ে গেল… (হাসি)
আফসানা মিমি: হি হি… মোটেই না… আমি রান্নাবান্না জানি। সেদিন ব্রাজিলের খেলা ছিলো, ব্রাজিল হারছিল। আর মাঝ রাতে তোমার ক্ষিধে পেল… তখন কী আর নুডলস রান্নায় মন থাকে! ভাবলাম আর্জেন্টিনার সাপোর্টারের জন্য অত কষ্ট করার কী দরকার… হি হি… তারপর ব্রাজিল হেরে যাবার পর আমার মনখারাপ দেখে উলটো তোমার সে কী মন খারাপ! আমাকে কত সান্ত¦নার বাণী শোনালে… আর তারপর দিন আর্জেন্টিনাও হারলো। হি হি… ব্যস সমতা! না হলে সেবার তোমার আর ফরীদি ভাইয়ের পচানি খেতে খেতে জান যেত… আবারতো আসছে সামনে খেলা দেখার উৎসব!
সুবর্ণা মুস্তাফা: এবার টাইমিং বেশ ভালো। জমিয়ে খেলা দেখা যাবে…
Golam-Mustafaআফসানা মিমি: ৭৫ সাল থেকে সুবর্ণা মুস্তাফার অন্যরকম এক পরিভ্রমণ শুরু হলো অভিনয়কে ঘিরে। ১৯৭৫ থেকে ২০১৮, প্রায় ৪৩ বছরের শুধুই অভিনয় জীবন। চাকুরী নয়, ব্যবসা নয়, কেবল অভিনয় টেলিভিশনে, মঞ্চে, সিনেমায়… যারা অভিনয় করছেন, করবেন তাদের জন্য তোমার অভিনয় জীবন পাঠের বিষয়। আমিতো বলবো অ্যাকাডেমিক্যালি পাঠের বিষয়।
সুবর্ণা মুস্তাফা: কেউ যদি পাঠ করতে আগ্রহী হন বা জানতে চান, আই অ্যাম রেডি টু শেয়ার।
আফসানা মিমি: বিটিভির নাটক, ঢাকা থিয়েটার, হলিক্রস স্কুল সব সমান তালে চলছিল, প্রতিদিনের রুটিন কি ছিল?
সুবর্ণা মুস্তাফা: তখন আমার রুটিন খুবই ইন্টারেস্টিং। সকালে ঘুম থেকে উঠে স্কুলে চলে যাই। (যে কারণে দুপুরে ঘুমানোর অভ্যাস হয়নি)। স্কুল থেকে ফিরে শাওয়ার, লাঞ্চ, হোমওয়ার্ক। বিকেল বেলা হয় থিয়েটারের রিহার্সেল না হয় বিটিভিতে রিহার্সেল, রেকর্র্র্র্র্ডিং। ফিরে এসে স্কুল ইউনিফর্মটা আয়রন করতে হতো। করতে হতোই। হোম ওয়ার্ক কিছু বাকি থাকলে সেগুলো শেষ করার পর খাওয়া-ঘুম ব্যস।
আফসানা মিমি: এইযে স্কুল ইউনিফর্ম আয়রন করতে হতোই। গোলাম মুস্তাফা এবং হোসনে আরা বিজুর কন্যা সুবর্ণা মুস্তাফার স্কুল ইউনিফর্ম আয়রন হয়তো না করলেও চলতো…
সুবর্ণা মুস্তাফা: হ্যাঁ… কিন্তু আমাদের সে সময় সেটা চলতো না।
আফসানা মিমি: হ্যাঁ সেটাই আমি বলছি যে, হয়তো সেটা না করলেও চলতো কিন্তু ডিসিপ্লিনের জায়গা থেকে না করলে চলতো না।
সুবর্ণা মুস্তাফা: এবং কথা ছিল সবকিছু করো… কিন্তু লেখাপড়া ঠিকমত না করলে সবকিছু বন্ধ। আমিতো কাজটা করতে এনজয় করছিলাম, খুবই এনজয় করছিলাম। আমি চাই নি যে, কাজটা বন্ধ হোক। সুতরাং দেখো দায়িত্বটা কিন্তু আমারই। পড়াশোনাও ঠিক মতো করে করতে হবে এবং বাইরে যে কাজটা করতে পছন্দ করছি সেটাও ঠিকমতো করতে হবে। কারণ কাজ যদি আপ টু দ্যা মার্ক না হতো আমার বাবা মা’কে তুই দেখেছিস, বলতো-‘থাক এসব করার দরকার নাই, এটা তুমি পার না’। বাবা-মা আমাকে টিভি তে অভিনয় করার অনুমতি দিলেন। থিয়েটার করতেও অনুমতি দিলেন। আমার লেখাপড়ার বাইরের সময়টা অদ্ভুত সুন্দর একটা জায়গায় যুক্ত হয়ে গেল। এবং সেখানে আমি কাদের পেলাম? টেলিভিশনে গিয়ে পেলাম আব্দুল্লাহ আল মামুনকে, আতিকুল হক চৌধুরীকে, মুস্তাফা মনোয়ারকে। আর থিয়েটারে গিয়ে পেলাম নাসির উদ্দিন ইউসুফকে, সেলিম আলদীনকে। তো ওইটা তো একটা বিশাল ঘটনা। আজকে আমি সুবর্ণা মুস্তাফা। এই সুবর্ণা মুস্তাফার পেছনে যেমন হুসনে আরা মুস্তাফার বিশাল অবদান এবং তারপরেই গোলাম মুস্তাফার কথা বলতে হবে। পাশাপাশি সমান অবদান হচ্ছে এই যে নামগুলো আমি বললাম সেই মানুষ গুলোর।
আফসানা মিমি: যেভাবে শিক্ষকরা অভিভাবকের মতো করেই আমাদের জীবনে ভূমিকা রাখেন।
সুবর্ণা মুস্তাফা: একেবারেই তাই।
আফসানা মিমি:সুবর্ণা মুস্তাফার জীবনের একদম প্রথম স্মৃতি কোনটা?
সুবর্ণা মুস্তাফা: প্রথম স্মৃতির ব্যাপার গুলো না খুবই অদ্ভুত হয়। স্মৃতিতে কি সেটা থাকে নাকি শুনে শুনে আমরা একটা দৃশ্যকল্প ভেবে নিই? আমারতো ৬০ সালে জন্ম। তাহলে ৬৫তে আমার বয়স কত? চার? ইন্ডিয়া-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় সাইরেন বাজলে সন্ধ্যাবেলা আমাদেরকে টেবিলের তলায় ঢুকিয়ে দেয়া হতো। এখন এইটা কি আমার স্মৃতিতে আছে নাকি শুনে শুনে হয়েছে জানিনা। তবে আমি যখন ক্লাস টু’তে পড়ি সে সময়টার কথা খুব ভালো মনে আছে। তখনই আমি বুঝে গেছি যে, আমার বাবা খুবই স্পেশাল একজন পার্সন।
আফসানা মিমি: হ্যাঁ এটাই আমি জানতে চাইছিলাম যে, শৈশবে কখন প্রথম মনে হলো যে বাবা একজন বিখ্যাত মানুষ?
সুবর্ণা মুস্তাফা: বুঝতে পারতাম আমি। বাড়িতে প্রচুর লোকজন আসতো। আমি তো একটু ট্যাটন টাইপের। চেহারা দেখে বোঝা যায় না, না?
আফসানা মিমি: যায়… (হাসি)। প্রথম বাবার সিনেমা দেখা হলো কখন?
সুবর্ণা মুস্তাফা: বোবার (বাবা) প্রথম সিনেমা মনে হয় হলে গিয়ে দেখেছি ‘কার বৌ’ নামে একটা ছবি। রাজ্জাক চাচা ঐ ছবিতে একজন বেবি ট্যাক্সি চালকের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। এবং আমার বাবা তখন বলেছিলেন যে, এই ছেলেটি একদিন এই দেশের ম্যাটেনি আইডল হবে।
আফসানা মিমি: বাহ্!
সুবর্ণা মুস্তাফা:আমাদের না, বেড়ে ওঠাটা একটু ডিফারেন্ট। উর্দু সিনেমা দেখা অ্যালাওড ছিল না। কোনো উর্দু সিনেমা হলে গিয়ে দেখিনি আমরা। প্রচুর ইংরেজি ছবি দেখতাম। তখন ওয়াল্ট ডিজনির প্রচুর সিনেমা আসতো মধুমিতায়। সেই সুইস ফ্যামিলি রবিনসন থেকে শুরু করে দ্যা মুন স্পিনার্স যা আসতো আমাদেরকে হলে নিয়ে গিয়ে দেখানো হতো।
আফসানা মিমি: তখন কি ইংরেজি ছবি শুধু মধুমিতাতেই রিলিজড হতো?
সুবর্ণা মুস্তাফা: হ্যাঁ। শুধু মধুমিতাতেই মনে হয়, কারণ আমরা মধুমিতাতেই দেখতাম।
আফসানা মিমি: বাবার সব ছবি কি দেখা হতো?
সুবর্ণা মুস্তাফা: না। তবে সে সময় আরও দেখেছি ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’।
আফসানা মিমি: এমিলের গোয়েন্দা বাহিনীতো আমরাও দেখেছি ছোটবেলায়। এটা খুবই মজার একটা ছবি। আমার সুযোগ থাকলে ছবিটা রিমেক করতাম। মুস্তাফা চাচাতো উর্দু এবং বাংলা দু’ধরনের ছবিতেই সমান তালে কাজ করেছেন, তাই না?
সুবর্ণা মুস্তাফা: সেটি বোধহয় এ কারণে যে আমার বাবার পাকিস্তানে বিশাল একটা ফ্যান ফলোইং ছিল। ৭১ সালের মার্চে তো বোবাকে হাতের কাছে পায় নি, তা না হলেতো সেদিনই ওরা বোবাকে মেরে ফেলতো।
আফসানা মিমি: ৭১ সালে তোমরা কোথায় থাকতে?
সুবর্ণা মুস্তাফা: এলিফ্যান্ট রোড। ইকবাল হলের ঠিক পেছনে, এখন যেটা জহুরুল হক হল। আমরা অনেক কিছুরই সাক্ষী। ১৯৭১ এর ২৫শে মার্চ কালরাত্রিরও সাক্ষী।
আফসানা মিমি: হ্যাঁ, আমি এই জায়গাটাতেই আসতে চাইছিলাম।
সুবর্ণা মুস্তাফা: তার আগে তো ৬৯, বঙ্গবন্ধু তখন জেলে। ৬৯-এর গণআন্দোলনে আমাদের বাসায় ইনু ভাইরা আসতেন। ইনু ভাই আমার কাজিন। মা’র ফুফাতো বোনের ছেলে। আমার বাবা-মা’র একটা ব্যাপার ছিল আমাদেরকে কখনও ‘এসব কথা বাচ্চাদের শোনা উচিত না’ এসব বলেননি।
আফসানা মিমি: সবকিছুই খুব উন্মুক্ত ছিল।
সুবর্ণা মুস্তাফা: হ্যাঁ। ৬৯-এর গণআন্দোলন। মিছিল হচ্ছে। লোকজন বাড়িতে আসছে, খাচ্ছে। এই কারফিউ দিয়েছে…
আফসানা মিমি: এক ধরনের উত্তেজনা চারপাশে?
সুবর্ণা মুস্তাফা: সেই সময়টায় আমরা গ্রিন রোডে থাকতাম। তখনতো এত বিল্ডিং ছিল না। রাস্তায় মিছিল মানে ১০ পাড়া শুনতে পাচ্ছে সেই মিছিল। তারপরে তো বঙ্গবন্ধু মুক্ত হয়ে গেলেন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে। ওই পুরো রাজনৈতিক আবহাওয়াটা সব সময়ই বাড়ির ভেতর ছিল।
আফসানা মিমি: তারপর যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো সেই সময়টা?
Golam-Mustafa-1সুবর্ণা মুস্তাফা: আহা, তার আগেতো ৭ই মার্চ। ৭ই মার্চের উত্তেজনাটাতো ডিফারেন্ট ধরণের। সবাই বসে আছে কখন বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনবে রেডিওতে। কিন্তু পাকিস্তান সরকার সেটা অফ করে দিয়েছিল।
আফসানা মিমি: অফ করে দিয়েছিল মানে?
সুবর্ণা মুস্তাফা: রেডিওতে শুনতে দেয়া হলো না। লাইভ রিলে করা হবে এভাবেই সব সেটআপ করা ছিল।
আফসানা মিমি: তখনতো রেডিও বাংলাদেশ হয়নি?
সুবর্ণা মুস্তাফা:তখন রেডিও পাকিস্তান শাহবাগে এবং তারা একদম ডিসাইডেড ছিল যে, তারা কোন ফোনও রিসিভ করবে না। সব ফোন নামানো ছিল। তো কেউ একজন বাই মিসটেক একটা ফোন উঠিয়ে রেখেছিল এবং যখন বলেছে যে রিলে করা যাবে না তখন রেডিও জাস্ট শাট ডাউন করে রেডিওর কর্মকর্তারা সব বের হয়ে গেছে।
আফসানা মিমি: শাট ডাউন?
সুবর্ণা মুস্তাফা: যেহেতু বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার করা যাবে না, তাহলে কিছুই প্রচারিত হবে না রেডিও থেকে। নট ইভেন নিউজ। সব বন্ধ করে চলে গিয়েছিল সবাই। কিন্তু পরের দিন আবার অনুষ্ঠান প্রচার করতে তারা বাধ্য হয়েছে।
আফসানা মিমি: সে সময় রাষ্ট্রের একটা চাপ ছিল। ৭ই মার্চের ভাষণ যখনই শুনি গায়ে কাঁটা দেয়।
সুবর্ণা মুস্তাফা: একদম!
আফসানা মিমি: ঐ জনতার ঢল, ঐ বজ্রকণ্ঠ…
সুবর্ণা মুস্তাফা: ইতিহাস বিকৃত করা তো আমাদের ঐতিহ্য…চিন্তা করো ৭ই মার্চে যেখানে বঙ্গবন্ধু ভাষণ দিয়েছিলেন সেখানে এখন শিশুপার্ক। আমি বিটিভির একটা অনুষ্ঠান করেছি গত ডিসেম্বরে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের উপরে বাইশটা পর্ব। সেখানে বিভিন্ন মানুষেরা এসেছেন এবং উনারা বলেছেন এবং আমরা বারবার বলেছি যে, এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, রমনা রেসকোর্সের মাঠে পরিণত করা হোক আবারও। এর আগের রূপটা তো আমাদের ইতিহাসের একটা বিশাল অংশ। তাই না? এই জায়গাটাকে আসলে হেরিটেজ পয়েন্ট হিসেবে আমাদের প্রিজার্ভ করে রাখা দরকার। আমি রেস খেলানোর কথা বলছি না। আর শিশুদের জন্য অন্য কোথাও আরেকটা পার্ক করে দেয়া হোক।
আফসানা মিমি: স্থানান্তরিত হয় তো। বাচ্চাদের জন্য আলাদা নতুন পার্ক হতেই পারে। তারপর পুরো একাত্তরকে কীভাবে প্রত্যক্ষ করেছো?
সুবর্ণা মুস্তাফা: তখন আমার বাবা, হাসান কাকু, রাজু আহমেদ,আলতাফ চাচা আরও অনেকে মিলে বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ গড়েছিলেন।
আফসানা মিমি: হাসান কাকু মানে হাসান ইমান?
সুবর্ণা মুস্তাফা: হ্যাঁ। সেই সময় বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ ট্রাকে করে ঘুরে ঘুরে একটা নাটক করছিল যেখানে একদম সরাসরি আর্মি ইউনিফর্মকে অবমাননা করা হয়। যা রাষ্ট্রদ্রোহীতার পর্যায়ে পড়ে, কিন্তু তা ছিল মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে, বাংলার সপক্ষে। আর আমরা টিভিতে দেখছিলাম যে, বঙ্গবন্ধু আলোচনায় যাচ্ছেন ইয়াহিয়া খানের সাথে এবং বের হচ্ছেন মুখ কালো করে। এদিকে খবর আসছিল যে পশ্চিম পাকিস্তানিরা চলে যাচ্ছে এবং ঢাকা এয়ারপোর্টে বড় বড় প্লেন নামছে। কার্গো প্লেনের মতো। আসলেতো সেসব প্লেনে করে এসেছে ট্যাঙ্ক… কারণ যে পরিমাণ ট্যাঙ্ক নামানো হয়েছিল অত ট্যাঙ্ক ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে ছিল না। অস্ত্র এসেছে, সৈন্য এসেছে। ২৫শে মার্চের ঐটুকুতো মনে আছে… প্রচÐ শব্দে ঘুম ভেঙেছে মধ্য রাত্রে এবং ঐ দৃশ্যটা দেখেছি জানলা দিয়ে… আকাশ পুরো লাল!