SHARE

রেজানুর রহমান
কথা উঠেছে, করোনার সংকট কাটিয়ে সবই তো খুলে গেল। জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে অফিস আদালত, ব্যবসা-বানিজ্যের সকল কিছুই খুলে গেছে। ট্রেন, বাস, লঞ্চ, উড়োজাহাজ চলছে। বাজারঘাট ব্যস্ত আগের মতই। কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত সহ পর্যটনের সকল ক্ষেত্রও খুলে দেয়া হয়েছে। নাটকের মঞ্চও খুলেছে। শুধু খোলেনি দেশের সিনেমা হল। এমনিতেই দেশের সিনেমা হলের সংখ্যা কমতে কমতে একটা উদ্বেগজনক পর্যায়ে নেমে গেছে। যাও সচল আছে তা নামকাওয়াস্তে। আর তাই সিনেমা হল খুলে দেয়ার কোনো লক্ষনই চোখে পড়ছে না। কথা প্রসঙ্গে একজন সংস্কৃতিসেবী অধ্যাপক বললেন, অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে এই দেশের সিনেমা হল অচিরেই জাদুঘরে দেখার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। অর্থাৎ কেমন ছিল সিনেমা হল তা দেখার জন্য, বোঝার জন্য হয়তো জাদুঘরে যেতে হবে।
অনেকে হয়তো ভাবছেন, এ কেমন কথা? এখনও আনন্দ-বিনোদনের প্রধান অনুষঙ্গই হল সিনেমা। কাজেই সিনেমা হল দেখার জন্য জাদুঘরে যেতে হবে কেন? এটা এক ধরনের বাড়াবাড়ি পর্যায়ের বক্তব্য হয়ে গেল না? যারা এধরনের কথা ভাবছেন তাদেরকে একবার বাস্তবতায় মুখোমুখি দাড়াতে বলছি। বলতে পারবেন এই দেশে এক সময় সিনেমা হলের সংখ্যা কত ছিল? উত্তরটা বলে দিচ্ছি। বেশী দিনের কথা নয়। ৫/৭ বছর আগেও এই দেশে সিনেমা হলের সংখ্যা ছিল ১৩ শ’রও অধিক। বর্তমানে তা কমতে কমতে ১০০’রও নীচে নেমে এসেছে। এর থেকেই অনুমান করা যায় দেশের সিনেমা শিল্পের অবস্থা এখন কেমন?
করোনার আতংকে দেশের সিনেমা হল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। বাস্তবতা হলো করোনা না এলেও এক সময় দেশের সিনেমা হল গুলো আপনা আপনিই বন্ধ হয়ে যেতো। করোনা এক অর্থে একটা সুযোগ করে দিয়েছে। অন্ততত একটা যুক্তি দেখানো যাচ্ছে যে, করোনা মহামারী সিনেমা শিল্পেও আঘাত হেনেছে। কিন্তু এটাতো কথার
কথা। আসলেই কি করোনার কারনে সিনেমা হল বন্ধ রয়েছে? নাকি ভালো সিনেমা নেই বলে সিনেমা হল বন্ধ রয়েছে?
৮০’র দশকের কথা ভাবুন তো একবার। প্রতি সপ্তাহেই একাধিক নতুন ছবি মুক্তি পাচ্ছে। নতুন ছবি মানেই হাউস ফুল অবস্থা। নতুন ছবি মানেই প্রযোজক পরিচালকের আর্থিক উন্নতি। বর্তমানে যদি এই পরিবেশ থাকতো তাহলে সবর আগেই দেশের সিনেমা হলই খুলে যেতো। সিনেমা সংশ্লিষ্ট মানুষ জনেরাই হল খোলা নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে দেন দরবার শুরু করে দিতেন। তর্কের খাতিরে সিনেমা শিল্পে জড়িত মানুষদের জীবন-জীবিকার কথা তুলতেন। সামাজিক ক্যাম্পেইন জোরদার করা হতো। কত কী যে হতো তা সহজেই ভেবে নেয়া যায়।
কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না কেন? কথায় আছে শিশু না কাঁদলে মাও তাকে বুকের দুধ খাওয়ায় না। কাজেই যে কোনো পরিবর্তনের জন্য আওয়াজ তুলতে হয়। সেই আওয়াজটা কই? বরং দেশের চলচ্চিত্র শিল্প দিনে দিনে আওয়াজহীন, গুরুত্বহীন হয়ে যাচ্ছে। এফডিসি ঠিকই আছে। পরিচালক, প্রযোজক, ক্যামেরাম্যান সহ শিল্পীরাও আছেন। শুধু নেই নতুন সিনেমা। তবে সিনেমার অঙ্গনে দলবাজির প্রতিযোগিতা দৃশ্যমান। কথা আছে ‘নাই কাজ তো খই ভাজ’। যেহেতু সিনেমা পাড়ায় সেই অর্থে কোন কাজ নেই। তাই বিভিন্ন সমিতির ব্যানারে দলবাজির চর্চা চলছে জোরে-শোরে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে দেখে নেওয়ার ঘৃন্য লড়াই করে যাচ্ছে নিয়মিত। ফলে এককালের দারুন ব্যস্ত এফডিসি এখন অনেকটাই পরচর্চা, পরনিন্দার মুক্ত ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। অথচ এমন তো হওয়ার কথা ছিল না।
একটা সময় ছিল এফডিসি অর্থাৎ সিনেমার নির্মাণ ক্ষেত্র দেখার জন্য দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মানুষজন ছুটে আসতো। ঢাকায় কোনো কাজে বেড়াতে এসেছে কেউ, দর্শনীয় স্থানের তালিকায় এফডিসিকে গুরুত্ব দিত। রাজধানীর কোনো সিনেমা হলে নতুন ছবি দেখার কর্মসূচিও থাকতো। অনেকে ঢাকার নামকরা সিনেমা হলে ছবি দেখে টিকেটের অর্ধেক অংশ সাথে করে নিয়ে যেত নিজের শহরে বন্ধুদেরকে দেখানোর জন্য। সেই সিনেমা এখন গুরুত্বহীন। হল বন্ধ। অধিকাংশ হল ভেঙ্গে মার্কেট হয়েছে। যাও দুয়েকটি আছে, ভালো সিনেমার অভাবে অচিরেই হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে।
তার মানে অবস্থাটা কি দাড়িয়েছে? এই দেশে শেষ পর্যন্ত কি সিনেমা টিকবেই না? এই প্রশ্নে অনেকেই হয়তো অবাক হচ্ছেন। আরে ভাই একটা দেশে সিনেমার মতো বড় বিনোদন ক্ষেত্র থাকবে না? আপনি কোন যুক্তিতে একথা বলছেন?
আমার কাছে অনেক যুক্তি আছে। যে ভাবে আমাদের সিনেমা জগত চলছে সেভাবে চললে অচিরেই বাংলাদেশের সিনেমা হারিয়ে যাবে। হ্যা, সিনেমা থাকবে। সেটা অন্য দেশের। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সিনেমা থাকবে। সিনেমা হয়ে যাবে ছোট পর্দার বিষয়। সিনেমা হল হয়তো বিলীন হয়ে যাবে।
বাস্তবতার নিরীখেই কথাগুলো বলছি। সিনেমা মানেই বড় হল ঘরে বড় পর্দায়, অন্ধকার পরিবেশে পারিবারিক বিনোদন। একটা সময় সিনেমা হলে সিনেমা দেখার জন্য প্রচন্ড লড়াই করে টিকেট কিনতে হতো দর্শককে। মুক্তির প্রথম সপ্তাহে নতুন ছবি দেখার সৌবাগ্য হতো না অনেকের। একই ছবি হলে চলতো সপ্তাহের পর সপ্তাহ। তবুও ভীড় কমতো না! এক্ষেত্রে সময়টা ছিল সিনেমার অনুকূল। পারিবারিক প্রদান বিনোদন বলতেই বোঝাত হলে গিয়ে সিনেমা দেখা।
হঠাৎই যেন পরিবেশটা বদলে গেল। দেশে ছিল একটাই টেলিভিশন চ্যানেলÑ বিটিভি। সেই জায়গায় ক্রমান্বয়ে টিভি চ্যানেলের সংখ্যা বাড়তে থাকলো। এক থেকে টিভি চ্যানেলের সংখ্যা গিয়ে দাড়াল ৩০-এ। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সরব হয়ে উঠলো। হাতের কাছেই চলে এলো বিনোদন দুনিয়া। সিনেমা দেখার জন্য কষ্ট করে হলে না গেলেও চলে। ৩০টি টিভি চ্যানেলের ১৫টিতেই প্রতিদিন একাধিক সিনেমা দেখানো শুরু হল। ফলে দর্শকদের আগ্রহ করে গেল সিনেমা হলের প্রতি। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে একের পর এক বন্ধ হতে থাকলো সিনেমা হল। আশঙ্কাজনক তথ্য হলো দেশের অনেক বিভাগীয় শহরেও এখন সিনেমা হল নাই। হল ভেঙ্গে মার্কেট গড়ে তোলা হয়েছে। ঢাকায় কাকরাইলের ঐতিহাসিক রাজমনি সিনেমা হল ভেঙ্গে মার্কেট গড়ে তোলা হচ্ছে। সরকারী নির্দেশ আছে সিনেমা হল ভেঙ্গে মার্কেট গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অবশ্যই একটি সিনেপ্লেক্স থাকতে হবে। রাজমনির ক্ষেত্রেও এই নিয়ম মানা হয়নি।
এই যে সিনেমা হল ভেঙ্গে মার্কেট গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটানো হলো। এজন্য কি কোনো প্রতিবাদ হয়েছে? কেউ কি সামান্যতম আওয়াজও করেছেন? না, কোনো আওয়াজ শোনা যায়নি। একথা তো সত্য, যে কোনো শিল্পের টিকে থাকার প্রথম শর্ত হলো তার গুরুত্ব প্রমান করা। অর্থাৎ দেশের মানুষের কাছে গুরুত্বপুর্ণ হয়ে ওঠাটাই আসল। দেশের সিনেমা কি সেই পর্যায়ে আছে এখন? অনেকেই হয়তো বলবেন, দেশের সিনেমা শিল্পকে এখন অনেক প্রতিবন্ধকতা ডিঙ্গিয়ে যেতে হচ্ছে। এক হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব। দুই. প্রায় প্রতিটি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রতিদিন সিনেমা প্রদর্শন। তিন. বিদেশী টিভি চ্যানেলের আগ্রাসন। স্বীকার করছি প্রতিটি কারণই অনেক গুরুত্বপুর্ণ। কিন্তু একথাতো সত্য, এখন যুগটাই হচ্ছে চরম প্রতিযোগিতার। শুধু সিনেমার ক্ষেত্রে নয়, দেশের অন্যান্য ক্ষেত্রেও চরম প্রতিযোগিতা চলছে। কাজেই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য নতুন নতুন পরিকল্পনা ও মেধার প্রয়োগ দরকার। তা কি আমাদের চলচ্চিত্রাঙ্গনে বিদ্যমান।
দেশে ৩০টি টেলিভিশন চ্যানেল। ২০টিতেই প্রতিদিন সিনেমা চলে। এটা একটা পরিবর্তন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও একটা পরিবর্তন এনে দিয়েছে। বিদেশী টেলিভিশনের আগ্রাসন আছে বলেই আমরা কি বসে থাকব?
এই করোনাকালে আমাদের চলচ্চিত্রের মানুষেরা কর্মহীন সময় কাটাচ্ছেন। তারা একবারও কি ভেবেছেন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কি ভাবে সামনের দিকে এগুবেন?
এখন চলছে কনটেন্ট নিয়ে লড়াইয়ের যুগ। আগের জমানায় সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখতে হতো। কারণ তখন বিকল্প কোনো মাধ্যম ছিল না। সিনেমা দেখতে হলে সিনেমা হলেই যেতে হতো। আর এখন মন চাইলেই নিজের মোবাইল ফোনেও ঘরে বসেই সিনেমা দেখা যায়। কাজেই কে যেতে চাইবে সিনেমা হলে? তবে এই প্রশ্নেরও উত্তর আছে। ঐযে বললাম কনটেন্ট। কনটেন্টই হলো আসল কথা। এখনও একটি ভালো সিনেমা দেখার জন্য মানুষ হলেই যেতে চায়। সেজন্য যে প্রস্তুতিটা দরকার যে পরিবেশ গড়ে তোলা দরকার তা কি আমরা গড়ে তুলতে পেরেছি।
চলচ্চিত্রকে যদি বলি একটি পরিবার তাহলে প্রশ্নটা এসেই যায় আমাদের চলচ্চিত্র পরিবার কি ঐক্যবদ্ধ। পরিবারের প্রতিটা সময় সমান যায় না। চড়াই উৎরাই থাকে। সংকট থাকে। তবে সংকটের সময় পরিবারের কর্মক্ষম, বিচক্ষণ মানুষেরাই পরিবারটিকে নিয়ে মাথা ঘামায়। ধরা যাক, বাবা-মা অনেক কষ্ট করে পরিবারের একটি ছেলে অথবা মেয়েকে মানুষ করেছে। পরিবারটি বিপদে পড়লে ওই ছেলে অথবা মেয়েটিই ভরসার আশ্রয়স্থল হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের চলচ্চিত্র পরিবারের ক্ষেত্রেও যদি তেমনটা ভাবি তাহলে অনেক গুলো প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়। আমাদের চলচ্চিত্র পরিবারেও অনেকে গুরুত্বপুর্ণ হয়ে উঠেছেন। চলচ্চিত্রে অভিনয় করেই নাম, যশ খ্যাতি, অর্থ-বিত্তের মালিক হয়েছেন। সঙ্গত কারনেই তার বা তাদের প্রতি চলচ্চিত্রাঙ্গনের অথবা চলচ্চিত্র পরিবারের অনেক আশা। বিপদের দিনে তারা অবশ্যই চলচ্চিত্র পরিবারের হাল ধরবেন।
সহজ কথায় বলি। আমাদের চলচ্চিত্রাঙ্গনের শীর্ষ নায়ক শাকিব খান একাই একশ। চলচ্চিত্র পরিবারের এই দুঃসময়ে তার কি কোনো ভূমিকা দেখতে পাচ্ছি আমরা? একা শাকিব খানই অনেক পরিকল্পনা গ্রহন করতে পারেন। ধরা যাক, শাকিব খান চলচ্চিত্রের এই দুঃসময়ে একটা ঐক্যের ডাক দিলেন তখন নিশ্চয়ই একটা পরিবর্তন ঘটবে? কোথায় সেই শাকিব খান এবং অন্যান্যরা। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চলচ্চিত্রের উন্নয়নে অত্যন্ত আন্তরিক। সিনেমা হলকে টিকিয়ে রাখার জন্য সরকারী সহায়তা দিবেন বলে ঘোষনা দিয়েছেন তিনি। এখন প্রশ্ন হলো, সিনেমা হল না হয় আধুনিক হল, সিনেমা হলের সংখ্যাও বাড়লো। কিন্তু সিনেমা হলে আমরা দেখাব কি? ভালো সিনেমা না হলে দর্শকতো সিনেমা হলে ফিরবে না। এক্ষেত্রে আছে কি কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা?
আগামী সংখ্যায় প্রকাশ হবে ফলোআপ প্রতিবেদন। প্রিয় পাঠক, একটা অনুরোধ করি। দেশের সিনেমা শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষেত্রে আপনার ভূমিকাও কিন্তু কম নয়। দেশের সিনেমা দেখুন। আশাকরি তাতেই একটা পরিবর্তন আসবে। বাংলা সিনেমার জয় হোক।