SHARE

রেজানুর রহমান
কোথাও যদি আপনি গাড়ি নিয়ে ঢোকেন অর্থাৎ যদি বোঝা যায় যে আপনার গাড়ি আছে তাহলে গেটের দারোয়ানের বেশ সম্মান পাবেন। আপনাকে দেখলেই বিনীত ভঙ্গিতে বিশেষ কায়দায় হয়তো সালাম দিবে। দৌড়ে এসে গাড়ির দরজা খুলে দেবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়বে। আর যদি আপনি হেঁটে আসেন তাহলে দারোয়ানের অভ্যর্থনার ভাবভঙ্গিটা হবে অন্যরকম। প্রথমে সে আপনার চেহারার দিকে তাকাবে। পরনের পোশাক দেখবে। পায়ের জুতার দিকে তাকিয়ে নিয়ে গম্ভীর গলায় হয়তো জিজ্ঞেস করবেÑ কার কাছে যাবেন? আপনি হেঁটে এসেছেন। কিন্তু আপনার পরনের পোশাক বেশ দামী। পায়ের জুতা চকচক করছে। তাহলে আপনি দারোয়ানের সমীহ পাবেন। কার কাছে যাবেন? একথা সে জিজ্ঞেস করবেই। তবে কণ্ঠে থাকবে কোমলতা।
এফডিসির গেটে ঢুকতেই এরকম একটা পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেলাম। এফডিসিতে প্রায়ই আসি। গাড়িতে এলে গেটে তেমন একটা ঝামেলা হয় না। কিন্তু হেঁটে এলেই যত বিপত্তি…। কার কাছে যাবেন? কেন যাবেন? এ ধরনের নানান প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। এফডিসির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: আব্দুল করিম আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু! বহু বছর পর ঢাকা ক্লাবে চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিবেশক সমিতির একটি অনুষ্ঠানে তার সাথে দেখা। সেদিন তেমন কথা হয়নি। পরে একদিন তারই ফোন পেলাম। একদিন তার সাথে দেখা করতে এলাম এফডিসিতে। সেদিন গাড়িতে এসেছিলাম। গেটে কোনো সমস্যা হয়নি। এফডিসিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অফিসের সামনে গাড়ি থেকে নেমে গাড়ি ছেড়ে দেই। কারণ গাড়িতে আমার সাথে ছিলেন আমার স্ত্রী। তিনি চোখের অসুখে ভুগছেন। ডাক্তারের কাছে যাবেন। তাই গাড়ি ছেড়ে দিলাম।
ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সাথে অনেক কথা হলো। যার সবটাই ফেলে আসা জীবনের স্মৃতিচারণ। এবার হেঁটেই ফিরে যাচ্ছিলাম এফডিসি থেকে। গেটের দারোয়ানরা আমার দিকে তাকাচ্ছে। বয়স্ক একজন এগিয়ে এসে সাহস করে জিজ্ঞেস করলোÑ স্যার আপনি কী আমাদের এমডি সাহেবের কাছে এসেছিলেন?
হ্যা। কেন?
না, মানে আমাদের একটা ভুল হয়ে গেছে স্যার… আমরা আপনাকে চিনতে পারিনি। এমডি স্যার আপনার কথা বলে রেখেছিলেন। স্যরি স্যার, কিছু মনে করবেন না….
অথচ সেই দারোয়ানই আজ আমাকে যেন চিনতেই পারছে না। এফডিসির গেট দিয়ে ঢুকছি। গাড়ি আনিনি। রিকসায় এসেছি। রিকসা থেকে নেমে এফডিসির গেট দিয়ে ভিতরে যাব ভাবছি হঠাৎ সেই দারোয়ান জিজ্ঞেস করলোÑ কার কাছে যাবেন? আমি যেন একটু বিব্রত। অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বললামÑ ভাই আমি আপনাদের এফডিসিটা একটু দেখব! দারোয়ান এবার আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে নিয়ে বোধকরি দয়া দেখানোর ভঙ্গিতেই বলল, যান…
হঠাৎ এফডিসিতে ঢোকার প্রথম দিনের কথা মনে পড়ে গেল। আশির দশকের কথা। তখনকার দিনে এফডিসিতে ঢোকার প্রধান গেট ছিল পিছনে, রেল লাইনের ধার ঘেষে। সবেমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তি হয়েছি। নতুন সিনেমা মুক্তি পেলেই বলাকা হলে ঢুঁ মারি। নাটকের একটি সংগঠনের যুক্ত হয়েছি। তখনও দৈনিক ইত্তেফাকে যুক্ত হয়নি। অখন্ড অবসর। প্রায়ই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে হেঁটে হেঁটে এফডিসির দিকে আসি। উদ্দেশ্য একটাই, এফডিসিতে ঢুকব। সিনেমার স্যুটিং দেখব। কিন্তু পরিচিত কাউকেই খুঁজে পাচ্ছিলাম না যার হাত ধরে এফডিসিতে ঢুকতে পারব। প্রায়ই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাশ সেরে হেঁটে হেঁটে এফডিসির সামনে আসি। কিন্তু ইয়া বড় মোচওয়ালা দারোয়ানের ভয়ে গেট পর্যন্ত যাবার সাহস পাই না। কিন্তু ভাগ্যক্রমে একদিন একদল মানুষের ভীড়ে এফডিসিতে ঢোকার সুযোগ পেলাম। তখনও ফিল্মের “এক্সট্রা” শব্দটির সাথে আমার পরিচিত ঘটেনি। পরে বুঝেছি আমি যে মানুষগুলোর সাথে এফডিসিতে ঢুকে পড়েছিলাম তারা এসেছিল একটি ছবির গল্পের প্রয়োজনে দর্শক সারীতে অভিনয় করতে।
এফডিসিতে ঢোকার সুযোগ পেয়ে আমি তো অবাক। এতদিন যা ছিল কল্পনার তাই আজ বাস্তবে পরিণত হয়েছে। রূপালী পর্দায় যাদেরকে মন ভরে দেখি তারাই আমার চোখের সামনে হেঁটে বেড়াচ্ছে। এফডিসিকে মনে হল স্বর্গের উদ্যাণ। শান্তির জায়গা। যে দিকে চোখ যায় শুধু কর্মব্যস্ততা, হাসি আর আনন্দময় পরিবেশ। স্বপ্নের নায়ক-নায়িকাকে কত কাছ থেকে দেখছি। জীবন স্বার্থক!
সেই এফডিসিতেই আমি ঢুকেছি। কোথাও কর্ম চাঞ্চল্য চোখে পড়লো না। যেন শ্বশানের নীরবতা চারপাশে। এগিয়ে গেলাম সামনের দিকে। চোখে পড়লো শিল্পী সমিতির নির্বাচন উপলক্ষে দন্ডায়মারন দুটি প্রচার বোর্ড। একটি খুবই ছোট। অন্যটি অনেক বড়। ছোট বোর্ডটিতে জনপ্রিয় চিত্র নায়িকা মৌসুমীর ছবি। তাতে লেখা ‘শিল্পীকে তার আত্মসম্মানের জায়গায় দেখতে চাই’। মৌসুমীকে সভাপতি (স্বতন্ত্র) পদে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করুন।
বড় বোর্ডটিতে মিশা সওদাগর-জায়েদ খান পরিষদের ২১ জন প্রার্থীর ছবি। সবার ছবির নীচে স্থান পেয়েছে একটি কথাÑ “আপনাদের ভালোবাসাই আমাদের শক্তি।” মনে হঠাৎই যেন একটা প্রশ্ন জাগল। মিশা সওদাগর ও জায়েদ খান পরিষদে যারা প্রার্থী হয়েছেন দেখে মনে হচ্ছে তারা বেশ সংগঠিত। মৌসুমী একা তাদের বিপক্ষে দাঁড়ালেন কেন? মনোয়ার হোসেন ডিপজল, নায়ক রুবেল, আরমান, সুব্রত, ইমন, জ্যাকী আলমগীর, জাকির হোসেন, ফরহাদ হোসেন, নায়িকা রোজিনা, অঞ্জনা, অরুনা বিশ্বাস, আলী রাজ, বাপ্পা রাজ, আফজাল শরীফ, মারুফ, আসিফ ইকবাল, আলেকজান্ডার বো, জেসমিন ও জয় চৌধুরী সম্মিলিত ভাবে প্রার্থী হয়েছেন মিশা সওদাগর ও জায়েদ খানের প্যানেলে। সেখানে মৌসুমী কি একা লড়াই করে টিকতে পারবেন?
বেলা তখন ১টা। জোহরের আজান হচ্ছে। পাশেই রেল লাইন দিয়ে ঝক ঝক শব্দ তুলে চলে যাচ্ছে একটি রেল গাড়ি। এক সময় রেল গাড়ির শব্দ মিলিয়ে গেল। বিরাট এফডিসি প্রাঙ্গনে যেন কোনো সাড়া শব্দ নাই। ইতঃস্তত বিক্ষিপ্ত ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে দাঁড়িয়ে আছেন কিছু মানুষ। তাদের দেখে মনে হলো অলস সময় কাটাচ্ছেন। শিল্পী সমিতির অফিসে তখনও ব্যস্ততা শুরু হয়নি। ঢুকলাম চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সুন্দর ছিমছাম অফিসের ভিতর। সেখানে আড্ডা দিচ্ছিলেন এক সময়ের জনপ্রিয় চিত্র পরিচালক দেলোয়ার হোসেন ঝন্টু। পাশেই পরিচালক সমিতির সাধারন সম্পাদকের চেয়ারে বসে আছেন বিশিষ্ট চিত্র পরিচালক বদিউল আলম খোকন। তিনিই স্বাগত জানালেন। সমিতির অফিসে আগে থেকেই বসেছিলেন বেশ কয়েকজন চিত্র পরিচালক। যারা এক সময় সিনেমার পর্দা কাঁপিয়েছেন। প্রসঙ্গ তুলতেই তাদের কয়েকজন অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বললেন, এখন সিনেমা করে কি হবে? সিনেমার তো বাজার নাই। আরেকজন বললেন, দশ বছর আগে একটা সিনেমা করেছিলাম। তারপর আর কেউ ডাকেননি। আড্ডা চলতে থাকলো। কষ্ট-সুখের আড্ডা। সমিতির একটা অফিস আছে বলেই না সদস্যরা মাঝে মাঝে বেড়াতে আসেন। চা-সিঙ্গারা খান। আড্ডা মেরে চলে যান।
নাম প্রকাশে অনিñুক একজন চিত্র পরিচালক বললেন, অন্য কাউকে দোষ দিতে চাই না। আমরা সিনেমার মানুষেরাই আমাদের সিনেমার বারোটা বাজিয়েছি। এফডিসিতে এলে কান্না পায়। কী পরিবেশই না ছিল। আর এখন কি পরিবেশে আছি আমরা? সবাই চলচ্চিত্রকে ভালোবাসে। কিন্তু সব কিছুই লোক দেখানো। চলচ্চিত্রে দলবাজিই এখন সবার লক্ষ্য। সেজন্য দেখবেন অনেক সমিতির জন্ম হয়েছে। সিনেমার উন্নয়নের কোনো খবর নাই। সিনেমার খবর তৈরির ক্ষেত্রে কারও কোনো তাড়নাও নাই। কিন্তু দলবাজি অর্থাৎ কতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সবাই বেশ তৎপর। সিনেমা গোল্লায় যাক। দলবাজিই যেন অনেকের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্মানীত ওই পরিচালক ভাষনের মতোই কথা বলে যাচ্ছিলেন। মনোযোগ দিয়ে তার কথা গুলো শুনলাম। শেষে তিনি একটি কথা বলে থামলেন। “ভাই একটা কথা মনে রাখবেন সম্মান শ্রদ্ধা, মায়া আর ভালোবাসা ছাড়া কিন্তু কোনো শিল্পী টিকে না। পরিচালককে বলা হয় ক্যাপ্টেন অব দ্য শিপ। অর্থাৎ সিনেমার ক্ষেত্রে পরিচালক হলেন গুরুত্বপুর্ণ ব্যক্তি। যেদিন থেকে আমাদের চলচ্চিত্রে পরিচালকের সম্মান যেতে শুরু করেছে সেদিন থেকে আমাদের চলচ্চিত্রে দুর্গতিও বাসা বাঁধতে শুরু করেছে”।
সম্মান কি শুধু পরিচালকের গেছে? শিল্পীদের সম্মান কী আগের মতো আছে? প্রযোজককে বলা হয় একটি ছবির জন্মদাতা। তার বা তাদেরও কি সম্মান আছে আমাদের চলচ্চিত্রে? ক্যামেরাম্যানরা কি যোগ্য সম্মান পান এখন?
প্রশ্ন হলো, কে কাকে সম্মান দিবে? উত্তরটাতো খুবই সহজ। অতীতকালে আমাদের চলচ্চিত্রে কে কাকে কিভাবে সম্মান দিত? সেটা কি ভুলে গেছি আমরা। কাউকে সম্মান দিতে হবে না। আমরা কি সময়কে সম্মান দিতে রাজি আছি? অতীতকালে আমাদের সিনেমার জগতে ‘সময়কে’ আমরা খুবই শ্রদ্ধা করতাম। কলটাইম দশটা মানেই দশটা। কী নায়ক, কী নায়িকা কারও বেলায়ই সময়ের হেরফের হতো না। এখন কি সময়কে গুরুত্ব দেই আমরা? এমন কথাও তো শোনা যায়, শুটিং এর কলটাইম আছে সকাল ১০টা। নায়ক-নায়িকা হয়তো আসেন দুপুরের পর। তাহলে সিনেমা দাঁড়াবে কী করে?
বেলা ২টা বাজে। তবুও এফডিসিকে খা খা মনে হচ্ছে। তবুও বসে আছি বিরাট এক প্রত্যাশা নিয়ে….
(চলবে)