Home প্রতিবেদন প্রকৃতি কথা সাগরে ভাসছে গ্রাম: মুকিত মজুমদার বাবু

সাগরে ভাসছে গ্রাম: মুকিত মজুমদার বাবু

SHARE

 

বন্যার পানিতে ভাসছে লোকালয়।  অধিকাংশ ঘরবাড়ির আঙিনায় থৈ থৈ পানি।  ডুবে গেছে ফসলের মাঠ।  বিস্তীর্ণ জলরাশিতে কোমর ডুবিয়ে পানি কমার অপে¶া করছে নানান প্রজাতির বৃ¶।  তার ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে গেছে বন্যার পানি আটকে রাখার বাঁধ।  গত রাতে পানির প্রবল তোড়ে বাঁধ ভেঙে গেছে।  এখন রাস্তার দু’পাশেই পানি আর পানি।  কেঁচোসহ নানা প্রজাতির পোকা-মাকড় বাঁচার আশায় আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে উঁচু বাঁধের মাটিতে।  খাবার বেড়েছে পাখ-পাখালির।  তাদের ভেতর চলছে উৎসব উৎসব ভাব।  কলাগাছের ভেলা আর থেকে থেকে দু’একটা ডিঙি নৌকায় লোকালয় থেকে প্রয়োজনীয় কাজ সারতে উঁচু বাঁধে এসে নামছেন মানুষ।  তারপর ছুটছেন শহরের দিকে।  অনেকের ঘরে পানি ঢোকায় তারা আশ্রয় নিয়েছেন বাঁধের ওপর।  কাজ-কর্ম বন্ধ।  আয়-রোজগার নেই।  ত্রাণের আশায় অপে¶মান।  কিন্তু কতোটা ত্রাণ পাচ্ছেন তারা!

বন্যার পানি কোথাও কমছে অবার কোথাও বেড়েই চলেছে।  কোথাও আবার পাহাড়ি ঢলে ভেসে যাচ্ছে লোকালয়।   ¶তিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষক, ব্যবসায়ীসহ সর্বস্তরের জনসাধারণ।

আমরা বাঁধের ওপর দিকে গাড়িতে করে এগিয়ে চলছি শনশন বাতাস কেটে।  জানালা দিয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগের চিত্রধারণ কাজ চলছে।  কখনোবা এক্সক্লুসিভ ফুটেজের জন্য গাড়ি থামছে।  এরই ভেতরে ক্লিক ক্লিক করে ছবি তুলছেন আমাদের একজন সহকর্মী।  আমাদের দেখেই অনেকে এগিয়ে আসছেন ত্রাণের আশায়।  শেষে নিরাশ হয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে তাদের।  আমরা হাতের কাজ শেষ করে আবার ছুট দিচ্ছি গাড়িতে করে।

বাঁধের একটা জায়গায় এসে থেমে যায় গাড়ি।  এরপর আর এগোনো যাবে না।  গত রাতে এখানেই ভেঙে বাঁধের এপাশ ওপাশ সমান হয়ে গেছে পানিতে।  আমরা গাড়ি থেকে নামি।  চারপাশে তাকাতেই অঞ্চলটিকে মনে হয় ধু ধু সাগর।  আমাদের জন্য ইঞ্জিন চালিত নৌকা আগেই ঠিক করা ছিল।  ক্যামেরা, ট্রাইপড, ব্যাগসহ কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস-পত্তর তুলে লোকালয়ের দিকে এগোতে থাকি আমরা।  ইঞ্জিনের ভট ভট শব্দে কান ঝালাপালা।  গলগল করে কালো ধোঁয়া বেরোচ্ছে ইঞ্জিন থেকে।  সেই সাথে পোড়া তেল মিশে যাচ্ছে পানির সাথে।  একই সাথে শব্দ ও বায়ু দূষণ।  জলজ পরিবেশের ¶তি করছে এ ধরনের জলযান।

যাবার পথে একটা বাজারে থামে আমাদের নৌকা।  পানিতে তলিয়ে গেছে অধিকাংশ দোকান।  তারপরও পসরা সাজিয়ে বসে আছেন দোকানদাররা।  ক্রেতার সংখ্যা খুবই কম।  বাজারের একমাত্র টিউবয়েলটা পানির ভেতরও মাথা উঁচু করে নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করছে।  এখানে প্রচন্ডভাবে সুপেয় পানির অভাব।  দূষিত পানি পান করে পানিবাহিত রোগ দ্বারা যেকোনো সময় এ অঞ্চলের মানুষ আক্রান্ত হতে পারে।

পানিতে বিলি কাটতে কাটতে বাজার থেকে লোকালয়ের দিকে এগোতে থাকে আমাদের নৌকা।  চলতে থাকে চিত্রধারণের কাজ।  একদল বাচ্চা ছেলে মনের আনন্দে জলকেলি করছে।  গেরস্হ বাড়ির মধ্যবয়স্ক এক নারী খাবারের থালা-বাসন ধোয়ার কাজ সারছে বন্যার পানি দিয়ে।  আরেকটু এগিয়ে যেতেই চোখ চলে যায় অস্হায়ী উঁচু টয়লেটের দিকে।  সরাসরি মানুষের মল মিশে যাচ্ছে বন্যার পানির সাথে।  অসচেতনতার অন্ধকার মানুষকে কতখানি বিপদগ্রস্ত করে তুলতে পারে তারই চিত্র ফুটে উঠেছে তাদেরই কর্মকান্ডে।

দিনভর কাজ শেষে এবার ফেরার পালা।  লোকালয়, বাজার পেছনে ফেলে এগিয়ে চলছি আমরা বাঁধের দিকে।  ওখানে আমাদের জন্য গাড়ি অপে¶া করছে।  গাড়িতে সবকিছু তোলা হলেই ড্রাইভারের অপে¶ার পালা শেষ।  ও আবার ছুটে চলবে শহরের দিকে।  এই বন্যা দুর্গত মানুষের অপে¶ার পালাও একদিন শেষ হবে।  কিন্তু ততদিনে বন্যার্ত মানুষ ও দেশ উভয়ই ¶তিগ্রস্ত হবে।  প্রকৃতি র“ষ্ট হলে তার পরিণতি কীযে ভয়াবহ হতে পারে তা এ বন্যা দুর্গত মানুষদের দেখলে বোঝা যায়।  এই  ¶য়তির জন্য বিশেষভাবে প্রাকৃতিক কারণ দায়ী হলেও মানবসৃষ্ট কারণও কিন্তু কম দায়ী নয়।  আমরা অপরিকল্পিতভাবে নদী শাসন করছি, বাঁধ দিচ্ছি, নদীর প্রবাহ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিচ্ছি, নদী দখল করছি, তলদেশ ভরাট হতে সাহায্য করছি।  নদীমাতৃক এই দেশে কখনো দেখা দিচ্ছে পানির আকাল, আবার কখনো দগদগে ¶তের ঘা সৃষ্টি করছে দেশের গায়ে।  নদীকে আমাদের স্বার্থে ব্যবহার করতে হলে তাকে যেমন ইচ্ছেমতো চলতে দেয়া যাবে না; তেমনি ইচ্ছেমতো শাসন করাও যাবে না।  পরিকল্পিত নদী শাসনই দেশ ও জাতির জন্যে কল্যাণ বয়ে আনতে পারে।

লেখক: চেয়ারম্যান, প্রকৃতি জীবন ফাউন্ডেশন