Home আরোও বিভাগ সম্পাদকের লেখা সবার জন্য একটি ধাঁধা!

সবার জন্য একটি ধাঁধা!

SHARE
Sompadoker-Lekha

এক তরুণ সোবহান সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। বাসায় ছিলেন না সোবহান সাহেব। বাসার কাজের ছেলে জয়নালের কাছে একটি চিঠি রেখে গেছে সেই তরুণ। এস এম এস, ফেসবুক আর ভাইবারের এ আধুনিক যুগে চিঠিতো বলা যায়, হারিয়েই যেতে বসেছে। অনেক দিন পর সোবহান সাহেবকে কেউ চিঠি লিখলো। আগ্রহ নিয়ে চিঠি খানা খুললেন সোবহান সাহেব। ছোট্ট চিঠি। হাতের লেখা সুন্দর, মুক্তোর মতো। চিঠি খানা পড়তে শুরু করলেন সোবহান সাহেবÑ

শ্রদ্ধাভাজনেষু, সালাম নিবেন। আপনার সঙ্গে দেখা করবো বলে এসেছিলাম। কিন্তু আপনাকে পেলাম না। আপনার সঙ্গে আমার দেখা হওয়া দরকার। বেশ জরুরি। চিঠিতে সবকিছু লেখা সম্ভব নয়। তবে আপনাকে একটা ক্লু ধরিয়ে দেই। আপনার সবচেয়ে প্রিয় একটি বিষয়… শুধু আপনার কেন, আমাদের সবারই প্রিয় বিষয় এটি। অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। বিষয়টি নিয়ে একটা আন্দোলন শুরু করা দরকার। এজন্যই আপনার সঙ্গে পরামর্শ করতে এসেছিলাম। চিঠি রেখে গেলাম। আমি প্রতিদিন বাংলা একাডেমিতে বইমেলায় থাকি। আমার বন্ধুর একটা বইয়ের স্টল আছে। স্টল নম্বর ৫২১। আমার নিজের কোনো মোবাইল ফোন নাই। তবে অনুরোধের একটি নাম্বার আছে। ০১৭৪৬৬১০০০৭. প্রয়োজনে কল করবেন। ইতি, আপনারই ¯েœহের শাহিদুল ইসলাম।

চিঠিখানা পড়ে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লেন সোবহান সাহেব। চিন্তার বেশ কয়েকটি কারণ আছে। কারণ এক. শাহিদুল নামে কাউকে তিনি চিনেন না। এই নামের কারও সঙ্গে দেখা হয়েছিল কি না তাও মনে পড়ছে না। দুই. এই ছেলে সোবহান সাহেবের বাসার ঠিকানা পেল কি করে? তিন. ছেলেটি বেশ রহস্যজনক একটা বিষয়ের উল্লেখ করেছে। ‘আমাদের সবার প্রিয় বিষয় এটি… অস্তিত্ব হারাতে বসেছে… কি সেই বিষয়? জয়নালকে ডাক দিলেন সোবহান সাহেব। পাশের ঘর থেকে ‘পড়িমড়ি’ করে ছুটে এলো জয়নালÑ জে আব্বা…

সোবহান সাহেব জয়নালকে কাছে ডেকে নিয়ে রহস্য জনক ভঙ্গিতে জানতে চাইলেনÑ

সে কবে এসেছিল?

জয়নাল বুঝতে না পেরে হাবাগোবার মতো জানতে চাইলÑ

কে আব্বা? কার কথা বলতেছেন?

সোবহান সাহেব এবার ধমক দিলেনÑ আরে গর্দভ… এই যে চিঠি… লোকটা কবে এসেছিল?

আইজ দুপুরে… আপনি বাসায় ছিলেন না।

সে দেখতে কেমন?

দেখতে একটু আউল্যা ঝাউলা। মাথায় ঝাকরা চুল, কাঁধে কাপড়ের ব্যাগ। কবি কবি ভাব…

চিঠি কি সে এই বাসাতেই বসে লিখেছে?

হ্যাঁ। কাগজ আর কলম চাইল। আমি দিলাম। খস খস কইর‌্যা চিঠি লিখল। হাতের লেখা সোন্দর…

জয়নালকে থামিয়ে দিলেন সোবহান সাহেব। জানতে চাইলেনÑ লোকটা কতক্ষণ ছিল আমাদের বাসায়?

বেশিক্ষণ না। বড় জোর ৫/৭ মিনিট। আপনার কথা জিগাইল। আমি বললামÑ স্যারে তো নাই। তখন সে বললÑ এক গøাস পানি খাওয়াতে পারেন। আমি পানি আইন্যা দিলাম। তারপর সে কাগজ কলম চাইল… অ্যাই আর কি!

সোবহান সাহেব সত্যি সতি ভাবনার মধ্যে পড়ে গেলেন? কি এমন বিষয় যা আমাদের সবার প্রিয়? ঐতিহ্য হারাতে বসেছে…

প্রিয় পাঠক, এটি একটি ধাঁধাও বলতে পারেন। কি এমন বিষয়, আমাদের সবার প্রিয়… ঐতিহ্য হারাতে বসেছে? ভাবতে থাকুন। আমরা বরং আনন্দ আলো কার্যালয় থেকে একবার ঘুরে আসি।

 

খ.

আনন্দ আলো কার্যালয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিতর্কের বিষয় সারাদেশে পরিবহন ধর্মঘট নিয়ে। এক পক্ষের বক্তব্য আনন্দ আলো একটি বিনোদন ভিত্তিক পত্রিকা। কাজেই এই পত্রিকায় পরিবহন ধর্মঘট নিয়ে আলোচনা করার কোনো যুক্তি নাই। অন্যপক্ষের মন্তব্যÑ আনন্দ আলো পরিবার ও বন্ধুর কথা বলে। পরিবহন ধর্মঘটে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পরিবারের মানুষেরা। কাজেই জন গুরুত্বপূুর্ণ এই বিষয়টিও আনন্দ আলোয় আলোচিত হওয়া উচিত। আলোচনাটা কীভাবে শুরু করবো? মনের ভিতর অনেক প্রশ্ন। আদালত একটি রায় দিয়েছে। এই রায়ে একজন ড্রাইভারের ফাঁসি হবে। এই রায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে চাইলে আদালতেই যেতে হবে এটাই তো নিয়ম। অথচ পূর্ব কোনো ঘোষণা ছাড়াই এই রায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করলো পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা। সরকারের দু’জন মন্ত্রী এব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আমাদের প্রশ্ন- দেশের আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে পূর্ব কোনো ঘোষণা ছাড়াই আন্দোলনে নামার যৌক্তিকতা কতটুকু! এই যে জন ভোগান্তি হলো তার দায়-দায়িত্ব কে নিবে?

 

গ.

একথা বোধকরি সকলেই স্বীকার করবেন আমাদের দেশ অতীতের তুলনায় এখন বেশ উজ্জ্বল। উন্নয়নের চাকা বেশ সচল। কারও কারও খেয়াল খুশির কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। আমাদের চলচ্চিত্রের উন্নয়নের কথাই যদি ধরি… সবাই জানেন, মানেনও আমাদের চলচ্চিত্র এখন একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। অভিনেতা-অভিনেত্রী আছেন, পরিচালক, প্রযোজক আছেন। এফডিসি আছে। সবই আছে। তবুও যেন কিছুই নাই। যৌথ প্রয়োজনার নামে ছবি বানানো হচ্ছে। কিন্তু সেখানে অনিয়ম, অবহেলার চিত্র উদ্বেগজনক। আমাদের চলচ্চিত্রের একজন নামকরা অভিনেত্রী চলচ্চিত্রের মানুষজনের সঙ্গে লুকোচুরি খেলায় মেতেছেন। এক বছর আগে বেশ কয়েকটি ছবির কাজ শেষ না করে তিনি হঠাৎ করেই হাওয়া হয়ে গেলেন। একবারও তিনি কি ভাবেননি যে ছবিগুলোর কাজ শেষ করেননি সেই ছবিগুলোর আর্থিক ক্ষতিটা কে পোষাবে? ইদানিং তিনি দেশের একটি জাতীয় দৈনিকে মাঝে মাঝেই ফিরে আসার ট্রেলর প্রকাশ করছেন। তিনি নাকি মোটা হয়ে গেছেন। তাই চিকন হয়ে আবার চলচ্চিত্রে ফিরবেন। অবাক লাগে এ ধরনের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ওপরও আমাদের নির্ভর করতে হয়। কিন্তু এর শেষ কোথায়?

ঘ.

আশার কথা, শোনা যাচ্ছে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি এবার নিজেরাই ‘নতুন মুখের সন্ধানে’ কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে। পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার এই তথ্যটি জানিয়েছেন আনন্দ আলোকে। আমরা আগাম অভিনন্দন জানাই চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতিকে এমন সুন্দর একটি উদ্যোগ গ্রহণের জন্য। প্রসঙ্গক্রমে একটি তথ্য তুলে ধরতে চাই। আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসনে পাশের দেশের চলচ্চিত্রের নায়ক নায়িকা আমাদের দেশে বেশ জনপ্রিয়। নতুন মুখের সন্ধান করতে গিয়ে আমরা যেন ভিন দেশের কাউকে না খুঁজি। আমাদের দরকার এযুগের রাজ্জাক, কবরী, ফারুক, শাবানা, ববিতা, রোজিনা, আলমগীর, রোজী সামাদ, আনোয়ার হোসেন, খান জয়নুল, গোলাম মুস্তাফাকে। অতীতের আয়ানায় আমরা যেন বর্তমান আর ভবিষ্যৎকে বিকশিত করতে পারি।

চ.

এবারও একুশে বইমেলা উপলক্ষে প্রকাশ হয়েছে বইমেলার একমাত্র দৈনিক পত্রিকা আনন্দ আলো বইমেলা প্রতিদিন। পত্রিকাটি এবার ১০ বছর পার করলো। এবারও ছিল সিটি ব্যাংক এন-এর সৌজন্যে সিটি আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার। ইতোমধ্যে পুরস্কার প্রাপ্ত কবি সাহিত্যিকদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। তাঁদেরকে আনন্দ আলো ও সিটি ব্যাংক এন-এর পক্ষ থেকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। এবারও এসি আই-এর সৌজন্যে এসি আই ফান কেক আনন্দ আলো শিশুসাহিত্য পুরস্কার নামে আরও একটি পুরস্কার সচল ছিল বইমেলায়। পুরস্কার প্রাপ্ত লেখকদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। তাঁদের প্রতিও আমাদের অভিনন্দন রইলো।

ছ.

ও হ্যাঁ প্রিয় পাঠক, জানেন নিশ্চয়ই আপনার প্রিয় পত্রিকা আনন্দ আলো আসছে ১লা বৈশাখে ১২ বছর অর্থাৎ এক যুগ পার করবে। ভাবতে বেশ আনন্দ হচ্ছে। দেখতে দেখতে ১২ বছর পার করছে আনন্দ আলো। ১২ বছর পার করার মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখতে আনন্দ আলোয় চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। যথারীতি একব্যাগ আনন্দ এক ব্যাগ আলো তো থাকছেই… আরো থাকছে বর্ণাঢ্য আয়োজন। অপেক্ষায় থাকুন…

জ.

সোবহান সাহেব দীর্ঘক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছেন। এই নিয়ে তিনবার বইমেলায় এসেছেন। এবারের বইমেলাটা অনেক সুন্দর। স্টল গুলোর সাজ সজ্জাও বেশ। হ্যাঁ মেলা এমনই হওয়া উচিত।

বইমেলায় এবার একটি পানির ফোয়ারা বসানো হয়েছে। শাহিদুল এই ফোয়ারার সামনেই অপেক্ষা করতে বলেছে। প্রায় ত্রিশ মিনিট ফোয়ারার পাশে একা দাঁড়িয়ে আছেন সোবহান সাহেব। বইমেলায় আজ অনেক মানুষ এসেছে। কিন্তু অনেকের হাতেই বই নেই। সোবহান সাহেব মনে মনে সান্ত¡না খুঁজলেনÑ বই না কিনুক কিন্তু বইয়ের মেলা দেখতে আসছে মানুষ এটাই বা কম কিসে? আজ না কিনুক কাল নিশ্চয়ই বই কিনবে।

হাত ঘড়ির দিকে তাকালেন সোবহান সাহেব। ৪০ মিনিট পেরিয়ে গেছে। না, আর অপেক্ষা করার কোনো মানে হয় না। যাবার জন্য পা বাড়াতেই একটি ছেলে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল। সোবহান সাহেবকে সালাম দিয়ে বললÑ মহাশয়, আমার নাম শাহিদুল। আমি দুঃখিত… আমার ৪০ মিনিট দেরী হয়েছে। এজন্য অবশ্য আমি দায়ী নই। পথের দুরত্বই এর জন্য দায়ী। আমি শ্যামলী এলাকায় একটি ছাত্রকে প্রাইভেট পড়াই। সেখান থেকে আসতেই দেরী হয়ে গেল।

শাহিদুল দেরী করার জন্য যারপর নাই বিরক্ত হয়েছিলেন সোবহান সাহেব। কিন্তু তার কথা শুনে একেবারে তুলার মতো নরম হয়ে গেলেন। মৃদু হেসে বললেনÑ ঠিক আছে, ঠিক আছে… তুমি দেরী করাতে আমি বিরক্ত হয়েছিলাম এটা সত্য। কিন্তু তোমার কথা শুনে তখন মন ভালো হয়ে গেছে। এবার বলোতোÑ ঘটনা কি? তুমি আমার বাসায় গিয়েছিলে… চিঠি লিখে এসেছো… কি নিয়ে তোমার এত উৎকণ্ঠা…

শাহিদুল মৃদু হেসে বললÑ মহাশয়, আপনার সঙ্গে আমার কিছু বন্ধুও এব্যাপারে কথা বলবেন। চলেন… ওরা সামনে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অপেক্ষা করছে…

সোবহান সাহেব কিছু একটা ভাবলেন। তারপর শাহিদুলের পিছু পিছু হাঁটতে থাকলেন।

(চলবে)