Home আরোও বিভাগ সততা ও ভালোবাসাই জয়ী করেছে তাকে

সততা ও ভালোবাসাই জয়ী করেছে তাকে

SHARE

জাহিদ হাসান


ক্লান্তি আমাকে কখনো ছুঁতে পারে না। যদি ক্লান্তই হতাম তাহলে কবেই মানুষ এই জাহিদ হাসানকে ভুলে যেত। একটা সময় মনে হয় অভিনয়টা কমিয়ে দেই। কিন্তু আবার মনে হয় আমার কাছে দর্শক আরো চায়। তাই আবারো উদ্যম খুঁজি। আমি কখনো মনে করি না বেঁচে থাকতে মানুষের কাজ শেষ হয়ে যায়। আমি মনে করি কাজ করতে করতেই মানুষ একদিন পৃথিবী থেকে চলে যায়। আমি তাই করতে চাই। কথা গুলো আমাদের প্রিয় অভিনেতা ও নাট্য নির্মাতা জাহিদ হাসানের।
সিরাজগঞ্জের ছেলে। তার ডাক নাম পুলক। মা রেখেছিলেন পুলক নামটি। ছেলে বেলার বন্ধুরা এখনো তাকে পুলক নামেই ডাকেন। জাহিদ নামটি রেখেছিলেন তার দাদা। পুলক থেকে সবার ভালোবাসায় আজকের জাহিদ হাসান। তার বাবার নাম ইলিয়াস উদ্দিন তালুকদার। তিনি একজন কাস্টম কর্মকর্তা ছিলেন। মা হামিদা বেগম গৃহিনী। পাঁচ ভাই, তিন বোনের মধ্যে জাহিদ সবার ছোট। তিনি সিরাজগঞ্জের হৈমবালা উচ্চ বালক সিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেনীতে পড়তেন। তারপর তিন বছর বেনাপোলের ইস্টার স্কুলে পড়াশুনা করার পর পুনরায় সিরাজগঞ্জে ফিরে আসেন। ছেলে বেলা থেকেই নাটক পাগল ছিলেন জাহিদ হাসান। সিরাজগঞ্জে থাকাকালীন প্রচুর মঞ্চ নাটক দেখতেন। মাঝে মাঝে আবার যাত্রাপালাও দেখতেন। একবার জাহিদ জানতে পারলেন তাদের শহরে ‘নবাব সিরাজউদৌলা’ যাত্রা পালা হবে। ঢাকা থেকে দল আসবে। বিখ্যাত চলচ্চিত্রাভিনেতা আনোয়ার হোসেন নবাবের চরিত্রে অভিনয় করবেন। বড় বড় শিল্পীরাও আসবেন। ওই যাত্রাপালা দেখার জন্য ভীষণ আগ্রহী হয়ে ওঠেন জাহিদ। বাবাকে বললেন যাত্রা পালা দেখবো। বাবা তাকে ২০ টাকা দিয়ে বললেন, যাও আনোয়ার হোসেনকে দেখে এসো। আনন্দে চলে গেলেন যাত্রা পালা দেখতে। স্টেজের কাছে মাটিতে বসে সেই রাতে ‘নবাব সিরাজদৌলা’ যাত্রা পালা দেখেছিলেন জাহিদ হাসান। ওই প্রথম স্বপ্নের নায়ক আনোয়ার হোসনকে কাছ থেকে দেখা তার।
স্কুল পাস করে জাহিদ সিরাজগঞ্জ শহরেই কলেজে ভর্তি হন। কলেজে পড়ার সময় নাটকের দিকে ঝুঁকে যান তিনি। কারণ অভিনয়ের প্রতি দূর্বলতাটা ছিল সেই স্কুল থেকেই। কোথাও নাটক বা যাত্রা পালা হলে তাকে দেখা যেত। সিরাজগঞ্জের টাউন হলে একদিন জাহিদ বন্ধুদের নিয়ে তরুণ সম্প্রদায়ের মঞ্চ নাটক দেখতে চলে আসেন।। তার কয়েকজন বন্ধু নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাদের সঙ্গে একদিন নাটকের মহড়া দেখতে চলে আসেন। এভাবে আসা যাওয়ার মধ্যে কেট যায় কয়েকদিন। একদিন তার মনে হলো একটু চেষ্টা করলে সেও অভিনয় করতে পারবে।
‘সাত পুরুষের ঋণ’ নাটকে প্রথম অভিনয় করেন ছোট্ট একটি চরিত্রে। পরবর্তীতে একদিন ওই নাটকেরই মহড়া দিতে প্রধান চরিত্র অনুপস্থিত ছিলেন। তখন জাহিদ হাসান তার প্রক্সি দেন। সেদিনই নির্দেশক তার সিদ্ধান্ত জানান এখন থেকে এই চরিত্রটা জাহিদ নিয়মিত করবে। অভিনয়ের পোকাটা তখনই তার মাথায় স্থায়ী ভাবে বাসা বাঁধতে শুরু করে। এরপর তরুণ সম্প্রদায়ের হয়ে প্রায় এক ডজন নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি। তরুণ সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর এলাকায় তার পরিচিতি বাড়তে থাকে। একদিন জাতীয় পর্যায়ের একটি নাট্যোৎসবে তরুণ সম্প্রদায় তাদের নাটক নিয়ে ঢাকায় আসে। উৎসবে মামুনুর রশীদ সহ অনেক গুণী অভিনেতা উপস্থিত ছিলেন। নাটকটি মঞ্চায়নের পর মামুনুর রশীদ জাহিদকে ডেকে বললেন, তুমি তো দারুন অভিনয় করো। তোমার অভিনয় আমার বেশ ভালো লেগেছে। তুমি অভিনয়টা চালিয়ে যাও, ভালো করবে। এরপর কয়েকবার ঢাকায় তাদের নাটক মঞ্চস্থ হয়। আব্দুল্লাহ আল মামুন, আলী যাকের, সারা যাকের, জামিল আহমেদ সহ আরো অনেক নাট্যব্যক্তিত্ব জাহিদের অভিনয়ের প্রশংসা করেন। থাকেন সিরাজগঞ্জে। কিন্তু তার মনটা পড়ে থাকল ঢাকা শহরে। তাকে প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা হতেই হবে। এরপর নব্বই দশকের শুরু দিকে ঢাকার জগন্নাথ কলেজে মাস্টার্সে ভর্তি হন। তবে নাটকের বিষয়টা যেহেতু তার মাথার মধ্যে ছিল তাই ঢাকা এসে অনেক গুলো নাটকের সংগঠনের সঙ্গে যোগ দেন। থিয়েটার, আরণ্যক, ঢাকা পদাতিক, সুবচন সহ অনেক নাট্যদলের মহড়া দেখতে যেতেন জাহিদ।
১৯৮৯ সালে বড় একটি সুযোগ আসে তার জীবনে। বিটিভিতে তালিকা ভূক্ত হওয়ার জন্য অডিশন দেন। পাশও করেন তিনি। এবিষয়ে তার ভগ্নিপতি চিত্র গ্রাহক-প্রযোজক ও পরিচালক আব্দুল লতিফ বাচ্চু ও চিত্রগ্রাহক আনোয়ার হোসেন বুলু তাকে সহায়তা করেন। ওই সময়ে টিভি নাটকে অভিনয় করাটা অতো সহজ ছিল না কারোর জন্য। কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিলো। অডিশনে পাশ করার পরপরই নাটকে অভিনয় করতে পারেননি জাহিদ। তাতে কোনো কষ্ট হয়নি তার। তালিকাভূক্ত হতে পেরেছেন এটাই ছিলো তার জন্য বড় ব্যাপার। ১৯৯০ সাল জাহিদের জীবনে বড় একটি টানিংয়ের বছর ছিল। ঢাকায় তখন মঞ্চকর্মীদের বেশ ভালো অবস্থান ছিল। একদিন হঠাৎ করে এক বন্ধুর মাধ্যমে জাহিদ জানতে পারলেন ভারতের এনএসডি ডিগ্রি সম্পূর্ন করে দেশে ফিরেছেন তারিক আনাম খান। সময়ের মেধাবী নাট্যকর্মীদের এক সাথে করে তিনি একটি নতুন নাট্য দল গড়ে তুলবেন। খোঁজ-খবর নিয়ে জাহিদ সেখানে অডিশন দিলেন। নির্বাচিত হলেন। তারপর তারিক আনাম খান নির্বাচিতদের নিয়ে বসলেন। সেখানে জাহিদ, তৌকীর আহমেদ, ঝুনা চৌধুরী ও মেঘনা সহ আরো অনেকে ছিলেন। তখন নাট্যকেন্দ্র নামটি ঠিক করা হয়। এরপর শুরু হলো নাট্য কেন্দ্রের প্রথম প্রযোজনা ‘বিচ্ছু’র মহড়া। বিশ্বসেরা কমেডি নাট্যকার মলিয়ের রচিত মজার একটি নাটকের বাংলা রূপান্তর ‘বিচ্ছু’। তারিক আনাম খানের রূপান্তর ও নির্দেশানায় নাটকের নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন জাহিদ হাসান। সেখানে তার অভিনয়ের প্রশংসা করেন সবাই। এরপর থেকে দিন রাত শুধু থিয়েটার আর থিয়েটার। ধ্যান-জ্ঞানে ছিল শুধু অভিনয়।
১৯৯০ সালে জাহিদ হাসান বিটিভিতে অভিনয় শুরু করেন। তার অভিনীত প্রথম নাটক ছিল ‘জীবন যেমন’। আলিমুজ্জামান দুলু প্রযোজিত নাটকটি বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হয়। এই নাটকটি তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তারপর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প সমাপ্তি অবলম্বনে নির্মিত ‘সমাপ্তি’ টেলিফিল্মে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন। নাটকটির চিত্রনাট্য রচনা করেছিলেন অভিনেতা সুবর্ণা মুস্তফা।
জাহিদ হাসান মনে করেন থিয়েটার হচ্ছে একজন অভিনয় শিল্পীর জন্য অভিনয়ে হাতে খড়ি। এটা না হলে অভিনয়ের মূল শেকড় বসে না। ‘বিচ্ছু’ নাটকের পর নাট্যকেন্দ্রের পরের নাটক ‘তুঘলক’ এ সিরিয়াস চরিত্রে অভিনয় করেন জাহিদ হাসান। এ নাটকেও তার অভিনয়ের প্রশংসা করেন সবাই। এর মধ্যে বিটিভিতে শুরু হয়ে যায় প্যাকেজ নাটকের প্রচলন। হুমায়ূন আহমেদের ‘আজ রবিবার’ এ বোকা তরুণের চরিত্রে অভিনয় করেন জাহিদ। সেই নাটক দিয়েই মূলতঃ তার টিভি মিডিয়ায় পথ চলা শুরু। বলা চলে সেই চরিত্র দিয়েই জাহিদ হাসান তারকা বনে যান। তারপর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। হুমায়ূন আহমেদের ‘নক্ষত্রের রাত’, ‘সবুজ ছায়া’, ‘মন্ত্রী মহোদয়ের আগমন’, ‘সমুদ্র বিলাস’ ‘প্রাইভেট লিমিটেড’ নাটক গুলো তাকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে আসে। এভাবেই বদলে যায় জাহিদ হাসানের অভিনয় জীবনের গল্প।
একজন অভিনেতার জন্য বড় মাধ্যম হচ্ছে চলচ্চিত্রে অভিনয় করা। সব অভিনয় শিল্পীরই একটা স্বপ্ন। জাহিদেরও তেমনটি ছিল। তিনি প্রথম চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন ‘বলবান’ ছবিতে। এই ছবিতে তার চরিত্রটি প্রধান ছিল না। বানিজ্যিক ছবির নায়ক হিসেবে জাহিদ হাসানের অভিষেক হয় ‘জীবন সঙ্গী’ ছবির মাধ্যমে। এরপর ১৯৯৪ সালে রেজানুর রহমানের রচনা ও পরিচালনায় স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঠিকানা’তে অভিনয় করেন তিনি। মাঝে কেটে যায় কয়েকটি বছর। এরপর ১৯৯৯ সালে কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার হুমায়ূন আহমেদের পরিচালনায় ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ ছবিতে অভিনয় করেন। এই ছবিতে মতি চরিত্রে অসাধারণ অভিনয়ের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। এরপর ঝন্টু মন্টু দুই ভাই, মেইড ইন বাংলাদেশ, আমার আছে জল, প্রজাপতি সহ বেশ কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেছেন।
জাহিদ হাসান মনে করেন আসলে লেগে থাকার বা সাধনার কোনো বিকল্প নেই। সততা ও ভালোবাসা নিয়ে লেগে ছিলাম বলেই অভিনেতা হতে পেরেছি। সারা জীবন অভিনেতা পরিচয় নিয়েই বাঁচতে চাই।