SHARE

ক্যানসারের সঙ্গে দীর্ঘদিন লড়াই করে গত ৬ জুলাই পরাজিত হলেন ঢালিউডের প্লেব্যাক সম্রাট এন্ড্রু কিশোর। তার অসময়ে চলে যাওয়া এখনো মানতে পারেননি ভক্ত-দর্শকরা। তাহলে কীভাবে মেনে নেবেন তার ছেলেমেয়েরা। বাবাকে তারা শেষবারের মতো জীবিত, হাসি-খুশি অবস্থাতেই দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নিয়তির নির্মমতা সবাইকে মেনে নিতে হয়। তাই তো শেষ দেখায় বাবাকে নিথর অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখলেন তারা। এন্ড্রু কিশোরের ছেলেমেয়ে দুজনেই অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন। তার মৃত্যুর পর ছেলে জয় এন্ড্রু সপ্তক ফিরেছেন গত বৃহস্পতিবার। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে বড় মেয়ে মিনিম এন্ড্রু সংজ্ঞা টিকিট না পাওয়ায় ফিরতে দেরি হয়েছে। শুধু তার জন্যই বাবার মরদেহ এতদিন সমাহিত করা হয়নি। অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান হলো। বাবাকে শেষবারের মতো দেখতে অস্ট্রেলিয়া থেকে রাজশাহীতে পৌঁছেছেন মেয়ে এন্ড্রু সংজ্ঞা। এই শিল্পীর পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, মৃত্যুর কয়েক দিন আগে এন্ড্রু কিশোর তার দুই সন্তানের খোঁজ নেন। বলে যান, তিনি মারা গেলেও ছেলেমেয়েদের শেষ দেখার জন্য যেন অপেক্ষা করা হয়। তাই শিল্পীর ইচ্ছা পূরণ করার জন্য পরিবারের সদস্যরা ছেলেমেয়ের দেশে ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা করছেন।
অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন থেকে গত সোমবার সকালে ঢাকা হয়ে রাজশাহী ফিরেছেন তিনি। যদিও তার এক দিন পর অর্থাৎ গতকাল মঙ্গলবার রাজশাহী ফেরার কথা ছিল। কিন্তু এক দিন আগেই পৌঁছেছেন তিনি। তবে আগে এলেও পূর্বের পরিকল্পনা মতো আজই এই কিংবদন্তির শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে বলে জানা যায়। এন্ড্রু কিশোরের বড় বোনের স্বামী ডা. প্যাট্রিক বিপুল বিশ্বাস বলেন, ‘মেয়ে আগে ফিরলেও এন্ড্রু কিশোরকে সমাহিত করার দিন ১৫ জুলাই ঠিক রাখা হয়েছে। আজই তাকে তার পছন্দের জায়গায় সমাহিত করা হবে। তবে পরিবর্তন আনা হয়েছে শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে। সবার শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য আগে তার মরদেহ নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী কলেজে। কিন্তু এখন তা আর হচ্ছে না।’ তিনি জানান, ১৫ জুলাই সকাল ৯টায় এন্ড্রু কিশোরের মরদেহ রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘর থেকে সরাসরি সিটি চার্চে নেওয়া হবে। সেখানে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান শেষে পাশে থাকা বাংলাদেশ চার্চের কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হবে। তবে কেন তাকে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধার জন্য রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ে নেওয়া হবে না তা জানা যায়নি ।
এদিকে বাবা এন্ড্রু কিশোরের যে ছবি বাঁধাই করেছিলেন, সেই ছবি বুকে নিয়েই রাজশাহী ফিরেছেন সংজ্ঞা। রাজশাহী ফেরার পর বাবার ছবিটি জড়িয়ে কাঁদছেন বাড়িতে। বাবার শেষ বিদায়ের জন্য নিজেই তৈরি করে এনেছেন শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের ব্যানার। রাজশাহীর সার্কিট হাউজ ও কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে খ্রিস্টিয়ান কবরস্থানে শায়িত হবেন এন্ড্রু কিশোর। কবরস্থানে ঢুকেই বাম পাশের একটি স্থান ছিল তার পছন্দের। জায়গাটি তিনি আগেই দেখিয়ে দিয়ে গেছেন। সে অনুযায়ী সমাধির স্থান প্রস্তুত হচ্ছে। এই কবরস্থানেই সমাহিত হয়েছেন শিল্পীর বাবা ক্ষীতিশ চন্দ্র বাড়ৈ এবং মা মিনু বাড়ৈ।
১৯৫৫ সালের ৪ নভেম্বর রাজশাহীতে জন্মগ্রহণ করেন এন্ড্রু কিশোর। সেখানেই তিনি বেড়ে উঠেছেন। পড়াশোনা করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজার গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। বাংলাদেশের আধুনিক ও চলচ্চিত্র জগতের কালজয়ী অনেক গান তার কণ্ঠে সমৃদ্ধ হয়েছে। সুখ-দুঃখ, হাসি-আনন্দ, প্রেম-বিরহÑ সব অনুভূতির গানই তিনি গেয়েছেন। এন্ড্রু কিশোর প্রাথমিকভাবে আবদুল আজিজ বাচ্চুর অধীনে সংগীতের পাঠ শুরু করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের পর নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, আধুনিক, লোকসংগীত, দেশাত্মবোধকসহ প্রায় সব ধারার গানে কণ্ঠ দেন রাজশাহী বেতারে তালিকাভুক্ত সংগীতশিল্পী হিসেবে। চলচ্চিত্রে এন্ড্রু কিশোর গান গাওয়া শুরু করেন ১৯৭৭ সালে। আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া এই শিল্পী ক্যানসারে ভুগছিলেন। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে তার চিকিৎসা চলেছে দেশে ও সিঙ্গাপুরে। অনেক চেষ্টার পরও তাকে ধরে রাখা গেল না। জীবনযুদ্ধে পরাজিত হয়ে চলে গেলেন কোটি ভক্তকে কাঁদিয়ে।