Home প্রতিবেদন প্রকৃতি কথা শীতের সকালে উদ্ভিদ উদ্যানে : মুকিত মজুমদার বাবু

শীতের সকালে উদ্ভিদ উদ্যানে : মুকিত মজুমদার বাবু

SHARE

শীতের সকাল। কুয়াশার ধোঁয়াশা তখনো কাটেনি। সূর্যের সাথে চলছে তার লুকোচুরি খেলা। নির্জন উদ্ভিদ উদ্যান তখনো ঘুমিয়ে আছে। পাখির কিচির-মিচির শব্দও গাছগুলোর শীতঘুম ভাঙাতে পারছে না। চারপাশের গাছ থেকে বৃষ্টির ফোঁটার মতো টুপটাপ ঝরে পড়ছে স্বচ্ছ কুয়াশার মুক্তদানা। ঘড়ির কাঁটায় সময় বেড়ে চললেও প্রকৃতির যেন আসলেমিভাব কিছুতেই কাটছে না। এরই মধ্যে শীতকে উপেক্ষা করে গলাপর্যনত্ম কালো জ্যাকেট, টুপি পরে সস্ত্রীক হাজির হয়েছেন নিসর্গী দ্বিজেন শর্মা, পাখি অনত্মঃপ্রাণ ইনাম আল হক। কথাসাহিত্যিক বিপ্রদাশ বড়ুয়াও এসে গেছেন। এসেছেন জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের পরিচালক ছায়েদুর রহমান। উদ্ভিদবিদ শামসুল হক। আগে থেকে তরুপল্লবের সাধারণ সম্পাদক মোকারম হোসেন চলে এসেছেন তার সংগঠনের সদস্যদের নিয়ে। আমার সাথেও রয়েছে প্রকৃতি ও জীবন দল।

জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের গাছে নামফলক লাগানোর এক আয়োজন করা হয়েছে। গাছ চেনার এ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের সাথে তরুপল্লব। এ আয়োজনে উদ্ভিদ উদ্যানে ২০০ প্রজাতির ৬০০টি গাছে নামফলক লাগানো হবে।

শহরে বসবাসরত এই আমরা দিন দিন গাছ-গাছালি আর তার শীতল ছায়া থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। যান্ত্রিক জীবনে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সবুজের কোমলতা থেকে বঞ্চিত করছি। প্রকৃতিবান্ধব শহর গড়ে তোলার ব্যাপারে এখনো আমরা উদাসীন। এখনো শহরের কলেবর বৃদ্ধির জন্য নির্বিচারে বন উজাড় করছি, চারপাশের নদ-নদী ভরাট করছি, দখল করছি ডোবা-নালা, আবাদি জমি। জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি, ভাঙন, জলবায়ু উদ্বাসত্মুসহ নানাবিধ কারণে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে শহরের দিকে ছুটে আসছে মানুষ। অধিক জনসংখ্যার চাপ সামাল দিতে না পেরে ক্রমশ শহরের পরিবেশ হয়ে পড়েছে দূষিত।

প্রকৃতি থেকে দূরে থাকলে মানুষের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রসত্ম হয় এবং নানাভাবে জীবনের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। শহরে বসবাসরত শিশুরা আজ গাছ চেনে না, ফুল চেনে না, মাছ চেনে না, পাখি চেনে না, প্রাণী চেনে না। তারা জানে না ডাবের পর নারিকেল হয়। মলা-ঢেলা নামে কোনো মাছ আছে। তারা ডাহুক দেখেনি। টিয়া কিংবা ময়না দেখে মুগ্ধ চোখে অপলক তাকিয়ে থাকেনি কোনোদিন। প্রকৃতি থেকে আমরাই দিন দিন তাদেরকে বিচ্ছিন্ন করে বড় মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছি। অথচ মানুষের সাথে প্রকৃতির রয়েছে নাড়ীর সম্পর্ক। আর সেই সম্পর্ক অটুট রাখতে উদ্ভিদ উদ্যানে গাছের পরিচয় তুলে ধরার আয়োজন। দর্শনার্থীদের অনেকেই জানে না কোনটা কোন প্রজাতির গাছ। গাছের গায়ে নাম-পরিচয় লেখা থাকলে সহজে তারা জানতে পারে কোন গাছটার কি নাম। এই সূত্র ধরেই ‘হলুদ পাদাউক’-এর সাথে পরিচয় করিয়ে দেন নিসর্গী দ্বিজেন শর্মা। তিনি বলেন, গ্রীষ্মের ফুল হিসেবে পরিচিত হলেও ফুলটি কখন ফোটে তা পর্যবেক্ষণে না থাকলে জানা যাবে না। একদিন স্থায়ী এ ফুল সারাদিন সৌন্দর্য বিলিয়ে সন্ধ্যায় ঝরে পড়ে। পরদিন গাছে ফুলের কোনো চিহ্ন থাকে না। বিপন্ন প্রজাতির ‘হলুদ পাদাউক’ গাছ বাংলাদেশে খুব কম সংখ্যক রয়েছে। রমনা পার্কে রয়েছে হাতেগোনা কয়েকটি, আর মিরপুর উদ্ভিদ উদ্যানে আছে একটি।

কথাসাহিত্যিক বিপ্রদাশ বড়ুয়া পরিচয় করিয়ে দেন অশোক ফুলের সাথে। তিনি বলেন, ‘অশোক শোক রহিত করে। অশোক কারো অসুবিধা করে না। না পরিবেশের, না মানুষের। বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে অশোক কিছুটা আলাদা। কমসংখ্যক উদ্ভিদ রয়েছে যার কাণ্ড থেকে ডালপালাজুড়ে ফুল ফোটে। শুধু তাই নয়, এদের প্রস্ফুটনকালও দীর্ঘ। রোগ নিরাময়ে ভেষজ গুণ, শীতল ছায়া, মধুরিমা সুবাস এবং পুষ্প-প্রাচুর্য ইত্যাদির জন্যই ফুলটির নাম হয়েছে অশোক। কাব্যে বহুল ব্যবহার ছাড়াও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সঙ্গে অশোক যুক্ত। এই তরুতলেই মহামতি গৌতম বুদ্ধের জন্ম। আর এমন ঘটনা অশোককে বাড়তি খ্যাতি দিয়েছে। অশোক ছাড়াও রাজ অশোক ও স্বর্ণ অশোক নামে আরো দু’ প্রজাতির অশোক দেখা যায়।

পাখিপ্রেমিক ইনাম আল হকের কথায় উঠে আসে গাছ-গাছালির গুরুত্ব। তিনি বলেন, গাছ-গাছালির সঙ্গে পশু-পাখির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। গাছ না থাকলে বেশির ভাগ পাখিই থাকবে না। আবার পশু-পাখি না থাকলে মানুষও থাকবে না। গাছ-গাছালি, পশু-পাখির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নিবিড়, একের অন্যের পরিপূরক।

আমরা পরিবেশবান্ধব দেশ গড়ে তুলতে চাই। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পাখি চেনাতে চাই, গাছ উপকারিতা সম্পর্কে অবগত করতে চাই, ফুলের গল্প বলতে চাই, নদীর ছুটে চলার সুর ও তাল শোনাতে চাই। আমরা চাই প্রকৃতির সাথে গড়ে উঠুক মানুষের সখ্য। গাছ চেনার এ আয়োজন তারই ক্ষুদ্র প্রয়াস।

লেখক: চেয়ারম্যান, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন