Home প্রতিবেদন অফ দ্য রেকর্ড শিল্পী সমিতির নির্বাচন কারও হাসি কারও কান্না

শিল্পী সমিতির নির্বাচন কারও হাসি কারও কান্না

SHARE

আনন্দ আলো প্রতিবেদন : নির্বাচন মানেই তো এক ধরনের উৎসব। হই চই শ্লোগান থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নির্বাচনটা কার তার ওপর নির্ভর করে হই চই আর আনন্দের মাত্রা। কর্মচারী ইউনিয়নের নির্বাচন আর অফিসার সমিতির নির্বাচনের মধ্যে আচরণগত কোনো পার্থক্যই যদি না থাকে তাহলে কে কর্মচারী, কে অফিসার তার মর্যাদা থাকে না।
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি নামটাই অনেক অনেক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার। রূপারী পর্দায় আমরা যাদের দেখি, যাদের জন্য আনন্দে হাত তালি দেই, যাদের অভিনয় দেখে আমরা হাসি, কাঁদি তাদেরই সংগঠন শিল্পী সমিতি। সঙ্গত কারনেই এই সংগঠনের প্রতি সাধারন মানুষের অনেক টান রয়েছে। রূপারী পর্দায় যেমন তারকাদের ছোঁয়া যায় না, শুধু দেখেই আনন্দ পাওয়া যায়। তেমনি তাদের আচার-আচরণ…. তারকারা অন্যের চেয়ে একটু আলাদা। কাজেই তাদের নির্বাচন প্রক্রিয়াও হবে অন্যের থেকে আলাদা, অন্যরকম। যা দেখে সাধারন মানুষ মোহিত হবে। ভাববে তারকা বলেই এতো নান্দিনিক আয়োজন সম্ভব। নির্বাচন তো সবাই করে। কিন্তু চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচনের বৈশিষ্ট্য অন্যের চেয়ে আলাদা…. চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির প্রতি সাধারন মানুষ অর্থাৎ দর্শকের এই যে এতো আস্থা, শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস তা কি অযৌক্তিক। যাকে ভালোবাসি তাকে তো অন্যের চেয়ে আলাদা দেখতে চাইব। আলাদা মানে… প্রভাব, প্রতিপত্তি, সম্মান ও ভালোবাসার ক্ষেত্রে অন্যের চেয়ে আলাদা। কিন্তু বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির চেহারা কি অন্যের চেয়ে আলাদা? পার্থক্য করা যায় অন্যের সাথে?
নেতা আছে রে…
শব্দেরও মর্যাদা আছে। বিশেষ বিশেষ শব্দের ওপর পরিবেশ পরিস্থিতি বোঝা যায়। তেমনই নির্বাচনের পোস্টার, নির্বাচনী ভাষা ও শ্লোগান দেখে ও শুনেও বোঝা যায় সংগঠনটি কেমন? একটি ছাত্র সংগঠনের নির্বাচন অথবা শ্রমিক, কর্মচারী ইউনিয়নের নির্বাচনী আচরনের ক্ষেত্রে অনেক পার্থক্য থাকার কথা। অফিসার পর্যায়ের কোনো সংগঠনের নির্বাচনী আচরণই বলে দেয় তারা অফিসার। তাদের অন্যরকম মর্যাদা আছে। তেমনই চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচনী আচরণ দেখেও বোঝার কথা এটা একটা মর্যাদাবান সমিতির নির্বাচন। কিন্তু কার্যত শিল্পী সমিতির নির্বাচন দেখে তা বোঝার উপায় ছিল না। এফডিসিতে ঢুকে মনে হয়েছে যেন কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গ সংগঠনের নির্বাচন হচ্ছে। পোস্টার, শ্লোগান ব্যানার, ফেস্টুনে কোনো মাধুর্যতা নেই, আয়োজনে কোনো নান্দনিকতা নেই। নেতা আছে রে… কোন সে নেতা…? এই ধরনের সস্তা শ্লোগান তো চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচনে হবার কথা নয়। শ্লোগানে অবশ্য দোষ নেই। দোষ হলো আচরণে। শ্লোগানের সাথে আচরনের বহিঃপ্রকাশ দেখে ভাবতে কষ্ট হচ্ছিলো এটা চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচন। কারণ চলচ্চিত্র শিল্পীরাতো অনেকের কাছে স্বপ্নের নায়ক-নায়িকা। তাদের নির্বাচনী কর্মকান্ডে এমন কিছু থাকবে যা অন্যেরা অনুকরণ করবে। বলবে, বেশ তো! এই না হলে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি!
তবুও আলোচনার
কেন্দ্র বিন্দু
যদিও বাংলাদেশে চলচ্চিত্রকে নিয়ে অহংকার করার মতো তেমন কোনো পরিবেশ নেই। বছরে হাতে গোনা ছবি নির্মিত হয়। তাও আবার বাজার পায় না। এক সময়ের আলো ঝলমল চলচ্চিত্র জগৎ এখন অনেকটাই শ্রীহীন। তবে নির্বাচন এলে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো বেশ সরব হয়। তখন মনে হয়, কাজ না থাক। নির্বাচন করতে সবাই বেশ পরিপক্ক। যে কোনো মূল্যে নেতা হতেই হবে। কথা উঠেছে, এই যে এতো জাকজমক পূর্ণ পরিবেশে শিল্পী সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল এতে চলচ্চিত্র কি সত্যিকার অর্থে লাভবান হবে? চলচ্চিত্রই যদি শেষ পর্যন্ত লাভবান না হয় তাহলে চলচ্চিত্রের এতো সংগঠন থেকে লাভ কী?
প্রথম দফা
কাঁদলেন মৌসুমী
চলচ্চিত্রের নায়ক-নায়িকারা কাঁদে। তাদের কান্না আমরা পর্দায় দেখি। তারা কাঁদেন চলচ্চিত্রের চরিত্রের প্রয়োজনে। কিন্তু শিল্পীদের বাস্তবের কান্না তেমন একটা দেখা যায় না। বিশেষ করে জনপ্রিয় তারকাদের বাস্তবের কান্না প্রকাশ্যে দেখার সুযোগও তো থাকার কথা নয়। অথচ চিত্র নায়িকা মৌসুমীর কান্না দেখল সবাই। বাস্তবের কান্না। ঘটনা কী? কেন মৌসুমীর মতো এমন একজন জনপ্রিয় তারকা প্রকাশ্যে কাঁদছেন? খোঁজ নিয়ে দেখা গেল মৌসুমীকে তারই একজন সহ-শিল্পী প্রকাশ্যে অপমান করেছেন। মৌসুমী বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের একজন নির্ভরযোগ্য তারকা। অথচ তাকেই কিনা একজন সহ শিল্পীর কাছ থেকে শুনতে হলÑ আপনি কে? মৌসুমীর মতো জনপ্রিয় তারকাকে যখন শুনতে হয়Ñ আপনি কে? তখন সত্যিকার অর্থেই বোঝা যায় আমাদের চলচ্চিত্রের কী করুণ বাস্তবতা ভর করছে।

তবুও আলো জ্বলেছিল
মৌসুমীকে প্রকাশ্যে অপমান করার পর চলচ্চিত্রের বিভিন্ন সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের আন্তরিক হস্তক্ষেপে বিষয়টির সন্তোষজনক সমাধান হয়ে যায়। প্রচার মাধ্যমে দুই সভাপতি প্রার্থী মিশা সওদাগর ও মৌসুমীর বন্ধুত্বপুর্ণ আচরনের সুন্দর সুন্দর মুর্হূর্তগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ গুরুত্বের সাথে প্রচার হতে থাকে। এতে একটা স্বস্থির জায়গা ফিরে আসে। মৌসুমী ও মিশা সওদাগর দু’জনে বেশ ভালো বন্ধুও বটে। মালা বদল কৌতুক আনন্দেও তারা দু’জন মেতে উঠেছিলেন। এবারের নির্বাচনে দুই সভাপতি প্রার্থীর এমন আনন্দময় আচরণ সবার দৃষ্টি কেড়েছে। বিষয়টি বেশ স্বস্থিরও ছিল।
নিজের বাড়িতে ঢোকার পারমিশন নাই
ছোট্ট একটি নির্বাচন। কিন্তু আয়োজন ছিল বিরাট। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। নিরাপত্তাজনিত কারণে এমনটা হতেই পারে। শিল্পীদের নির্বাচন। কাজেই নির্বাচনী এলাকায় কোনো বাধা ছাড়াই ঢোকার সুযোগ থাকলে সাধারন মানুষের অহেতুক ভীড় ঠেকানো যেতো না। কাজেই এফডিসির প্রবেশ মুখে একটু কড়াকড়ি তো থাকবেই। তাই বলে সোহেল রানাও কী এই কড়াকড়ির মধ্যে পড়বেন? সোহেল রানা আমাদের চলচ্চিত্রের একজন জীবন্ত কিংবদন্তী তারকা। অথচ তিনি নির্বাচনে ভোট দিতে এসে এফডিসির গেটে বাধার মুখে পড়েন। শুধু সোহেল রানাই নন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির মহাসচিব বদিউল আলম খোকন, বিশিষ্ট নির্মাতা কাজী হায়াৎ, দেলোয়ার জাহান ঝন্টু, গাজী জাহাঙ্গীর, বিশিষ্ট প্রযোজক মোহাম্মদ ইকবাল সহ বিশিষ্ট অনেক তারকা শিল্পী, প্রযোজক, পরিচালক নির্বাচনের দিন এফডিসিতে ঢোকার সময় প্রবেশ মুখে বাধা প্রাপ্ত হন। নির্বাচনী আচরণবিধিতে বরা ছিল নির্বাচনের দিন ভোটার কার্ড ও নির্দিষ্ট পাশ ছাড়া কেউই এফডিসিতে ঢুকতে পারবেন না।
ভালো কথা। এরকম কিছু নিয়ম মেনেই তো নির্বাচন করতে হয়। তাই বলে সোহেল রানা, কাজী হায়াৎ, দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর মতো গুণী পরিচালক ও শিল্পী এফডিসিতে ঢুকতে পারবেন না এটা কেমন কথা? শুধু কী শিল্পী পরিচালক? বিভিন্ন মিডিয়ার সদস্যরাও নির্বাচনী এলাকায় ঢোকার সুযোগ পাননি। কারণ তাদের কাছে নির্দিষ্ট পাস ছিল না। প্রশ্ন উঠেছে সোহেল রানা শিল্পী সমিতির একজন ভোটার। তাকে কেন এফডিসিতে ঢুকতে বাধা দেয়া হল? দেলোয়ার জাহান ঝন্টু, কাজী হায়াৎ শিল্পী সমিতির ভোটার নন। কিন্তু তারাতো নামকরা পরিচালক। তাদেরকে কেন এফডিসিতে ঢুকতে বাঁধা দেয়া হল? এটাকে বলে এক ধরনের অবহেলা!
দলে বলে এলেন
শাকিব খান
শুধু সোহেল রানাই নন আমাদের চলচ্চিত্রের একমাত্র নির্ভর যোগ্য নায়ক শাকিব খানও নির্বাচনের দিন এফডিসির মুখে বাধা প্রাপ্ত হন। অবশ্য তিনি বিরাট এক গাড়ির বহর নিয়ে এফডিসিতে এসেছিলেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শাকিব খানকে ভিতরে যাওয়ার অনুমতি দিলেও তার গাড়ির বহর থামিয়ে দেন। তাতেই বাধে বিপত্তি। পরে শাকিবের হস্তক্ষেপে গাড়ির বহর এফডিসির ভিতরে যাবার অনুমতি পায়।
বিজয় ঘোষনার
আগেই বিজয়ী
চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচন শেষ পর্যন্ত বেশ শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই অনুষ্ঠিত হয়। এফডিসির প্রবেশ মুখে বিশিষ্ট শিল্পীদের ঢুকতে না দেওয়ার বিড়ম্বনা সহ আর কোনো ঝুট ঝামেলা তেমন ছিল না। বিকেল ৫টায় ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার এক ঘণ্টা পরেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মৌসুমী বিজয়ী হয়েছেন বলে সংবাদ প্রচার হতে থাকে। এই ঘটনায় মৌসুমী যারপর নাই বিব্রত হয়ে যান!
আবারও কাঁদলেন মৌসুমী
এবারের শিল্পী সমিতির নির্বাচনে কান্নাই ছিল যেন চিত্র নায়িকা মৌসুমীর নিয়তি। প্রথমে শোনা গিয়েছিল তিনি পৃথক প্যানেল দাড় করিয়ে নির্বাচন করবেন। বিশিষ্ট অভিনেতা ডি এ তায়েব সাধারন সম্পাদক পদে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করবেন বলে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মৌসুমী পৃথক প্যানেল দাঁড় করাতে না পেরে স্বতন্ত্র সভাপতি প্রার্থী হিসেবেই নির্বাচনে থেকে যান। ফলে তাকে বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়। নির্বাচনের ক্যাম্পেইন চলাকালে এক সহ শিল্পীর কাছে লাঞ্ছিত হয়ে তিনি প্রকাশ্যে কেঁদেছেন। আবার নির্বাচনী ফলাফল ঘোষনার পর আবার চোখের পানি ঝরিয়েছেন। মৌসুমীর এই কান্না কি আমাদের চলচ্চিত্রের উম্মেষ ধারায় নতুন কোনো মেরুকরণ দাঁড় করাবে?
সর্বোচ্চ ভোট পেলেন অশ্লীল যুগের নায়ক!
আলেকজান্ডার বো আমাদের চলচ্চিত্রের অশ্লীল যুগের নায়ক। এবারের নির্বাচনে কার্য নির্বাহী সদস্য পদে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন। সর্বোচ্চ ভোট (৩৩৭) পেয়ে সদস্য পদে নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৯৫ সালে শহীদুল ইসলাম খোকনের ‘লম্পট’ ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে পা ফেলেন আলেকজান্ডার বো। ওই সময়ই মূলত আমাদের চলচ্চিত্রে অশ্লীলতা ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করে। আলেকজান্ডার বো সহ অনেকেই বিভিন্ন বিতর্কিত ছবিতে অভিনয় করেন। অশ্লীল যুগের শিল্পী হিসেবে মেহেদী, শাহীন আলম, ময়ূরী, পলি, শায়লা, সোহেল খানরা সিনেমা থেকে হারিয়ে গেলেও আলেক জান্ডার বো বোধকরি হারিয়ে যাননি। শিল্পী সমিতির নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভোট প্রাপ্তিই তা প্রমাণ করে।
নির্বাচন তো হলো তারপর?
যে দেশে সিনেমাই নির্মিত হয় না সে দেশে এতো ঘটা করে সিনেমা সংশ্লিষ্ট কোনো সংগঠনের নির্বাচন করার যৌক্তিকতা কি? এই প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। এত বড় একটা ইন্ডাস্ট্রি অথচ বলতে গেলে গুটি কয়েক ভাগ্যবান শিল্পী ছাড়া কারও কোনো কাজ নেই। শিল্পী সমিতিতে এবার যারা নির্বাচিত হয়েছেন তাদের মধ্যেও অনেকে বহুদিন ধরে সিনেমায় অভিনয় করেন না। যেখানে সিনেমারই কোনো খবর নেই সেখানে শিল্পী সমিতির নতুন নেতৃতত্ব আসলে ভবিষ্যতের কি করতে চায়? প্রশ্ন ছিল পুনরায় নির্বাচিত সভাপতি ও সাধারন সম্পাদকের প্রতি। দু’জনেই অভিন্ন সুরে বললেন, আমরা দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নে কার্যকর ভ‚মিকা রাখতে চাই। আমাদের জন্য দোয়া করবেন।