Home এক্সক্লুসিভ শাহাবুদ্দিনের শিল্পকর্ম এবং কিছু কথা

শাহাবুদ্দিনের শিল্পকর্ম এবং কিছু কথা

SHARE
Shahab-uddin

মমতাজউদদীন আহমদ: আমি শাহাবুদ্দিনের কথা বলছি, শিল্পী শাহাবুদ্দিনের কথা। প্রবাসে আছেন শিল্পকলার মহৎ রাজ্য প্যারিসে। সে অনেক দিনের কথা চল্লিশ বছর হয়ে গেল। বাংলার তরুণ শাহাবুদ্দিন ঢাকা চারুকলার সম্ভাবনাময় ছাত্র। বৃত্তি পেলেন বিদেশ যাবার। বঙ্গবন্ধু বললেন, আর কোথাও না, তুই প্যারিসে চলে যা। মেলা কিছু শেখার সুযোগ পাবি। তুই যা, তোর ভালো হবে। শাহাবুদ্দিন চলে এলেন প্যারিস। এক এক করে চার দশক হয়ে গেল। ইতোমধ্যে মেলা কিছু ঘটেছে। শাহাবুদ্দিনের স্বদেশ ভাবনার শ্রেষ্ঠ সম্পদ জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলো ঘাতকরা। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। বাংলার স্বাধীনতাকে ছিন্ন ভিন্ন করার আয়োজন। মুক্তিযোদ্ধা শাহাবুদ্দিনের অন্তর জুড়ে হাহাকার প্যারিসে। একি হলো যে দেশের মাটির জন্য সৈনিক পিতার ছয় সন্তান একসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ করেছে, মৃত্যুকে পায়ে দলেছে, সে দেশের রক্তে ভেজা স্বাধীনতা নিয়ে এ কোন ষড়যন্ত্র? রিচার্ড নিকসনের আমেরিকা কি পরাজয়ের পর পরাজয় পেয়েও ক্ষান্ত হবে না। শাহাবুদ্দিনের হাতে এখন আর অস্ত্র নাই। যে বজ্রমুষ্টি দিয়ে প্ল্যাটুন কমান্ডার সম্মুখ যুদ্ধে দুশমনের সঙ্গে নির্ভয়ে যুদ্ধ করেছেন সে অস্ত্র যদিও নাই, তবু শাহাবুদ্দিন নিরস্ত্র নয়।

যোদ্ধা শাহাবুদ্দিন সর্বসময়ে সৈনিক। মানুষ মারা অস্ত্র বিদায় করেছে, কিন্তু মানুষ আঁকার অস্ত্র তাঁর সবল মুষ্ঠিতে। শাহাবুদ্দিনের মোটা তুলিতে গাঢ় রহস্য জেগে উঠল মানুষের বিক্রম, বিজয় আর বিপ্লব। সৈনিক যখন শিল্পী হয়, তখন তার শিল্পের ভাষা পবিত্র আর মহিমা ভিন্ন প্রকৃতিকে খুঁজে নেয়। শাহাবুদ্দিন আর বজ্রকঠিন মুঠোয় মোটাতুলি ধরে একের পর ক্যানভাসে বিজয় বিপ্লব আর যুদ্ধ জয়ের গান এঁকে গেলেন। যোদ্ধা শিল্পীর অমৃত ক্যানভাস দেখে বিদেশি দর্শক যুদ্ধজয়ী বাংলাদেশের মহিমায় উচ্ছ¡সিত। তারাও গেয়ে উঠল সমস্বরে জয় বাংলা বাংলার জয়। নব শিল্পের মহিমায় বাংলা বিশ্বের শিল্প শ্রেণির উচ্চতায় উড্ডীন হলো।

সেই সৈনিক শিল্পী শাহাবুদ্দিন এসেছিলেন স্বদেশে। আহা কি তার অবয়ব। যেন প্রবল ঝড়ের দাপটে উঁচু তালগাছ তার সব কটা ডালপালা দিয়ে ঝড়কে রুখে চলেছে। শাহাবুদ্দিন অবশ্য খালি হাতে আসেননি। ডালি ভরে এনেছেন তাঁর সাম্প্রতিক মেলাকয়টা শিল্পকর্ম। রণক্ষেত্রের আগুনে ¯œাত বাঙালি দর্শক তাই পেয়ে উম্মাতাল। চিত্তে তাদের ব্যাকুল তৃষ্ণা। এ এক অন্য জগত। শাহাবুদ্দিন বাংলার হৃদয়ে অনন্য সুন্দর এক বলবান সম্পদ। আনন্দে চিত্ত জেগে ওঠে। যতই অবলোকন করি ততবার হৃদয়ের কথা অবারিত হয়। বাংলার নদী, নদীর চর, বনভ‚মি আর ব্যাকুল সমুদ্রের হেড শাহাবুদ্দিনের চিত্রকর্মের প্রধান ব্যঞ্জনা। এ ব্যঞ্জনা একেবারে নতুন নয়। জয়নুল আবেদিনের মন্তরে মানুষ হাহাকার দেখেছে বাংলা। যতই দেখেছে ততই জীবনের স্বরূপে সচেতন হয়েছে বাংলা। কিন্তু জয়নুল আবেদিন তো কেবল মম্বন্তরের হাহাকার আঁকেননি। এঁকেছেন বেঁচে ওঠার প্রতীজ্ঞায় লিপ্ত বাঙালির বলবান বাহু। জয়নুল তাঁর স্বদেশের বুকে শক্তিও সাহসের অদম্য বাসনা জাগিয়ে দিয়েছেন। বাংলাকে সীমাহীন শক্তির আধার করেছেন শিল্পাচার্য। তাঁর পদক্ষেপ ধরে তাঁরই নব প্রজন্ম শাহাবুদ্দিন বাঙালিকে যুদ্ধ জয়ের অদম্য শক্তির প্রতিভ‚ করেছেন। যে মাটিতে ঘুমিয়ে আছে লক্ষ মুক্তিসেনা, সে মাটি মুঠি মুঠি তুলে শাহাবুদ্দিন তাঁর বিজয় তুর্য তীব্র সুরে বাজিয়েছেন চিত্রকর্মের ভাষায়। রেঁনেসাঁ কালের শিল্পকর্মের উদাহরণ নয়, এ চিত্রশালা বিজয়ের বাসনায় উন্নত উদ্যত শির। নত হবার নয় শাহাবুদ্দিনের ছবি। ‘তোমাদের যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রæর মোকাবেলা করতে হবে।’ এই মহা আহŸানের যথার্থ সাড়া দিয়েছে শাহাবুদ্দিনের চিত্রশালা।

সেদিন মনপ্রাণ উজাড় করে শাহাবুদ্দিনের শিল্পকর্মের প্রদর্শনী দেখলাম। এক একটা ক্যানভাসের সামনে দাঁড়াই আর চিত্তের আহŸানে স্থির হয়ে যাই। সেটি ছেড়ে অন্যটিতে চলে আসার পরে আরো বিস্ময়ে বিহŸল হবার দশা হয়। যেন আমারই বাসনা আর প্রত্যাশাকে শাহাবুদ্দিন গড়ে তুলেছেন শিল্পকর্ম। এমন দীপ্র দীপ্ত কাজ শাহাবুদ্দিনের। তাঁর কর্মের সবল গতিময় তার সঙ্গে নিজের গতিকেও ক্ষিপ্র করে তুলেছেন। কোথা থেকে একরাশ উজ্জ্বল সাহস এসে আমাকে রাঙিয়ে দিয়ে যায়। আমি পরাজয়ের কষ্ট ভুলে বিজয়ের আনন্দে মাতাল হই। চিত্তের প্রাণে সম্পদ সৃজনে শাহাবুদ্দিন এক বলবান বাহাদুর সৈনিক। যে কোনো জনপদ বা দেশ এমন শিল্পীর সন্ধান পেলে অবিসংবাদী আনন্দে বলতে পারেÑ হাঁ এই তো, এই তো আমার দেশ। সাধে কি আর বঙ্গবন্ধু আবেগে অধীর হয়ে বলেছেন, কবির কবিতা মিথ্যা হয়ে গেছে, আমার বাঙালি মানুষ হয়েছে, বাঙালি যুদ্ধ করে স্বদেশকে স্বাধীন করেছে।

কাইয়ুম চৌধুরীর চিত্রে গামছা দিয়ে কোমর কষে মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধে চলেছে। সে মুক্তিযোদ্ধাকে কাদাপানি আর মলমূত্রের মধ্যে নিয়ে যুদ্ধের গান শুনিয়ে জাগিয়ে তুলেছেন শাহাবুদ্দিন। নেংটি পরা বাঙালি যোদ্ধা শত্রæর সমর সজ্জাকে তুড়ি মেরে মাটিতে পা ফেলে এগিয়ে চলেছে জয়বাংলা বাংলার জয় গাইতে গাইতে।

শাহাবুদ্দিনের চিত্রশালায় বিজয় আর বিপ্লব বারবার জ্বলে উঠেছে। একই সঙ্গে পাশাপাশি ‘জেনোসাইড’ এঁকেছেন শাহাবুদ্দিন। অসংখ্য মাংসের দলা একীভ‚ত হয়ে বাংলার ভ‚মিকে বিষাদ সমুদ্রে ডুবিয়ে রেখেছে। কিন্তু তার মধ্যেও বেঁচে থাকা এক দুর্জয় যোদ্ধা বেঁচে আছে। শাহাবুদ্দিনের ছবিতে আসন্ন পরাজয়ের অশ্রæ নাই। আছে উল্লাস, আনন্দ ও জাগরণ। শাহাবুদ্দিন যখন কথা বলেন, অথবা যুদ্ধক্ষেত্রের বর্ণনা দেন, তখন তিনি কণ্ঠে তোলেন আনন্দের বারতা। তারও বেশি তাঁর দেহের ভাষায় জেগে ওঠে সহ¯্রধারায় বিজয়ের আহŸান।

এমন সরল চিত্ত মানুষের খুব কম দেখা মেলে। শিশুর সরল সহজ আনন্দ শাহাবুদ্দিনের দেহের কোষে কোষে। কোথাও কোনো দ্বিধা, দ্ব›দ্ব কোনো পিছুটান শাহাবুদ্দিনকে ব্যাহত করে না। অনর্গল এক অবারিত শিশু যেন শিল্পীর দেহে ও মনে দিনরাত খেলা করছে। আর এই নির্ভুল সারল্য শিল্পীকে তাদের কণ্ঠে সৈনিকের গান, সে গানের ছবি এঁকেছেন ক্যানভাসের সামনে। শাহাবুদ্দিন নরম হাতের পরশ বুলিয়ে একটু একটু করে মমতা মাখিয়ে ছবির মুখ আর অবয়ব আঁকেন না। যেন রণক্ষেত্রের এক দীপ্র দীপ্ত সৈনিক ক্ষিপ্র গতিকে ছবির দেহ আর দেহের গভীরে মনের যে সবল চিত্র তা আঁকেন। সে দৃশ্য শিল্পীর গতিকে দেখে কত আনন্দ কত সুখ। শাহাবুদ্দিনের ছবির যে দুরন্ত গতি ও ছুটে চলার যে ক্ষিপ্রতা তা দেখে মনপ্রাণ ভরে যায়।

¯œানরতা রমণী, স্বাস্থ্যবতী লাবণ্যময়ী রমণীর মধ্যে শাহাবুদ্দিন অন্য রকম সুধা ঢেলে দিয়ে তাকে সজীব করে তুলেছেন। এ তার যুদ্ধ নয়। এর নাম প্রেম ভালোবাসা।

রবীন্দ্রনাথ, গান্ধী আঁকেন ন¤্রতুলির ছোঁয়ায়। যুদ্ধাহত পৃথিবী জুড়ে অশান্তি আর মৃত্যু সেখানে শাহাবুদ্দিনের মন জুড়ে শান্তি আর শান্তির জন্য প্রার্থনা। সৈনিক শাহাবুদ্দিনের এ এক অন্যরূপ।

শাহাবুদ্দিনের এত যে শক্তির জন্য আগ্রহ, সবকিছুর পিছনে তার অতল মনে শান্তির বাসনা ছড়িয়ে আছে। শাহাবুদ্দিন যুদ্ধ নয় শান্তিকে আলিঙ্গন করেন। তার বড় মর্মান্তিক কয়েকটি চিত্র বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। ঘাতকের আঘাতে নিষ্প্রাণ বঙ্গবন্ধু সিঁড়িতে পড়ে আছেন। অদূরে তাঁর মোটা ফ্রেমের চশমা। যতই দেখি মর্মভেদী ব্যাকুলতার হৃদয়মন আর্দ্র হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধু তর্জনী উচিয়ে বলছেন, আর যদি একটা গুলি চলে। আর যদি আমার মানুষকে হত্যা করা হয়Ñ সে তর্জনীর শক্তি দেখে আমাদের চিত্ত অগ্রিতেজের সাহসে জেগে ওঠে। কোথাও অন্ধকার দেখি না।

Shahab-uddin-1শাহাবুদ্দিন বাঙালির কবি, বাংলাকে সবখানি মমতা দিয়ে ভালোবেসেছেন। মেঘনা পাড়ের সন্তান শাহাবুদ্দিন আহমদ। যুদ্ধ করেছেন দেশের জন্য। স্বদেশকে বিশ্বের কাছে প্রতিভাত করেছেন শিল্পের শক্তি দিয়ে। সেখানেই তাঁর শিল্প সাধনার মহৎ অন্বেষা।

গাঢ় লাল শাহাবুদ্দিনের প্রিয় রঙ। যেন রক্তের ¯্রােতে দাঁড়িয়ে শাহাবুদ্দিনের শক্ত তুলি সৈনিকের দর্পে ক্যানভাসে আঁচড় দিয়ে চলেছেন।

আমি এক সমুদ্র পাড়ি দিয়ে এলাম ডাঙায়। আবার আমাকে সমুদ্রের বুকে যেতে হবে। আমার বিশ্রাম নাই বলছিলেন শাহাবুদ্দিনÑ সমুদ্র সৈকতে হাঁটতে হাঁটতে আপন মনে মনের কথা আউড়ে চলেনÑ সে এক অনন্ত তৃষায় ব্যাকুল বাংলার যোদ্ধা। বারবার এমন নীরব যাত্রাপথে শিল্পীকে দেখে থাকতে মন চায়।

আমার দুপায়ের শক্তি দিয়ে আমি জগতের পথে হেঁটে চলেছি। আমার একটি পা পেয়েছি, জয়নুল আবেদিনের কাছে। আর অন্যটি পেয়েছি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে। আমার ক্লান্তি নাই। যেতে হবে অনেক দূর। দূর-দূরান্ত। বিশ্রাম নেবনা আমি। সবার কাছে আমার আবেদন। আমার গতি যেন শিথিল না হয়, আমার চলার বেগ যেন রুদ্ধ না হয়। তেমন শুভেচ্ছা করবেন সবাই।

জয় বাংলা বলে মেঘনা পাড়ের শাহাবুদ্দিন তাকিয়ে থাকলেনÑ আহা তার দৃষ্টি জুড়ে কত তৃষা আর স্বপ্ন। এই তো বাংলার হৃদয়ের শিল্পী। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত শাহাবুদ্দিন চিত্রকর্মের প্রদর্শনীতে গিয়ে আমি লাভ ক্ষতির হিসাব করিনি।

বারবার মনে হয়েছেÑ আমার সোনার বাংলার কত যে মহিমা আর রহস্য এখনো গুপ্ত ভান্ডারের মতো জমা হয়ে আছে। এমন ভান্ডারের দরোজা খোলার কাজ একজনের পক্ষে সম্ভব নয়। অতীতে খুলেছেন শিল্পাচার্য এখন খুলছেন শাহাবুদ্দিন। তাঁদের অনুসৃত পথেই যেতে হবে আমাদের। বাংলার চিত্ত আরো উদ্ভাসিত হবে। শাহাবুদ্দিন যে প্রবাসে বসে মহিমা ও ঐশ্বর্যগুণের বাংলাকে উম্মোচন করেছেন, সেজন্য আমরা সহ¯্রবার  তাকে সাধুবাদ দিই। তাঁর জয় বাংলা মন্ত্রটি আরো উজ্জ্বল হোক। শাহবুদ্দিন দীর্ঘজীবনে কর্মময় থাকুন।