Home ফিচার শামসুজ্জামান খানের কাছে শেষ চিঠি

শামসুজ্জামান খানের কাছে শেষ চিঠি

SHARE


আমীরুল ইসলাম

অনেক কথা ছিলো জামান ভাই। অনেক কাজ অসমাপ্ত রেখে আপনি অলৌকিক বিদায় নিলেন। এই সত্য আজও বিশ্বাস হচ্ছে না। মেনে নিতে পারছি না। এবং আমরাও জীবন সম্পর্কে হতাশ ও উদাসীন হয়ে পড়ছি। কিছুই ভালো লাগছে না জামান ভাই।বাংলা একাডেমির পরেই চ্যানেল আই ছিলো আপনার প্রিয়তম স্থান। কতো অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন আপনি। ‘পাঠক সমাবেশ’ প্রতিদিন একটা বই নিয়ে আলোচনা। প্রায় দুই বছর একটানা অনুষ্ঠানটি আপনি উপস্থাপনা করেছেন। মুজিব বর্ষে বঙ্গবন্ধু বিষয়ক বই নিয়ে প্রতিদিন কথা বলতেন। করোনাকে উপেক্ষা করে দায়িত্ব নিয়ে পাঠক সমাবেশে একে একে দশ-বারোটা বই নিয়ে আলোচনা করে যেতেন। ৮০ এর কাছাকাছি বয়স হলেও কখনো ক্লান্তির ছাপ দেখিনি।
সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে আপনার অবদান মহীরুহের মত। আপনার বিপুল কাজের তালিকা দেখলে অবিশ্বাস্য লাগে। আপনি ছিলেন গভীর প্রত্যয়ী রেনেসাঁ মানব। আপনার মননশীল কর্মের দিকে তাকিয়ে কেবল বিস্মিত হই।
আপনি ছিলেন গবেষক, প্রাবন্ধিক। বাংলা কাল গণনা, নববর্ষ উৎসব, হালখাতা, লোক সংস্কৃতি, গ্রাম্য কৌতুক, হাটুরে কবিতা-গান, ফুটবল, শিশু সংগঠন ছিলো আপনার উৎসাহের কেন্দ্রবিন্দু। আর পুরো জীবন আপনি উৎসর্গ করেছেন বাংলাদেশের ইতিহাস ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে।
জামান ভাই, আপনি ছিলেন একদা শিক্ষক। পরে বাংলা একাডেমির উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। পরে মহাপরিচালক। শেষে বাংলা একাডেমির সভাপতি। আপনার মত এতো দীর্ঘকাল কেউ বাংলা একাডেমির সঙ্গে সংযুক্ত থাকেননি। বাংলা একাডেমির সঙ্গে ছিলো আপনার আত্মীক বন্ধন।
আপনি কচি কাঁচার মেলা শিশু সংগঠনের সঙ্গে আমৃত্যু জড়িত ছিলেন। আমরা কচি কাঁচার আসরে নিয়মিত লিখতাম। তাই আপনি আমাদের কাছে হয়ে গেলেন ‘জামান ভাই’।
বঙ্গবন্ধুর রচিত বই তিনটা সুষ্ঠুভাবে প্রকাশনার পেছনে আপনার গবেষণালব্ধ পরিশ্রম এখন ইতিহাস হয়ে আছে। বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা, চীন ঘুরে এলাম। পান্ডুলিপির বিশুদ্ধ পাঠ উদ্ধার করেছেন দিনের পর দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বড় আস্থাভাজন ছিলেন আপনি। ব্যক্তিগত পর্যায়ে আপনাদের সম্পর্ক ছিলো। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার এ নিয়ে আপনি কখনো উচ্চকণ্ঠ ছিলেন না। প্রধানমন্ত্রীর গল্প শোনাতেন না কখনো। আমরা বহুবার শুনতে চেয়েছি। আপনি দু একটা গল্প বলেই পাশ কাটিয়ে গেছেন।
বঙ্গবন্ধুর ব্যাপারে আপনি ছিলেন নিরপেক্ষ। তাই বলে ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের ব্যক্তিদের আপনি উপেক্ষা করতেন না। আমাদের সুবিধা বাদী সমাজে আপনার মত ব্যক্তিত্ব বিরল।
লোকসাহিত্য গবেষণায় আপনি আন্তর্জাতিক মানের কাজ করেছেন। চৌষট্টি জেলার সাংস্কৃতিক উপাদান সম্পাদনা করেছেন। প্রমিত অভিধান, শব্দের উৎপত্তি, আঞ্চলিক ভাষার অভিধান আপনার স্মরনীয় কাজ।
ঢাকাইয়া কৌতুক নিয়েও আপনি বই লিখেছেন। কালো মানিক পেলেকে নিয়ে আপনি অসাধারণ ভাষায় কিশোরদের জন্য একটি বই লিখেছেন। গ্রাম বাংলার গান সংগ্রহ করেছেন।
বাংলা একাডেমিতে দীর্ঘকাল কাজের সুবাদে বহু প্রজেকক্ট আপনি গ্রহণ করেছেন। লেখক জাদুঘর, লেখকদের উপর ডকুমেন্টারি, বড় লেখকদের রচনাবলী প্রকাশ, লোকসাহিত্য সংগ্রহ, গুরুত্বপূর্ণ রচনা, ভিন্ন ভাষায় প্রকাশ, গবেষণা কতোকিছু যে করেছেন। এই নিয়ে রীতিমতো গবেষনা হতে পারে।
জামান ভাই, বাংলা একাডেমির নতুন ভবন নির্মাণ, কর্মকর্তা কর্মচারীদের বাসস্থান, বইমেলা বড় পরিসরে সোহরওয়ার্দী উদ্যানে নেয়ার ব্যাপারে আপনার ভূমিকা অনেক দিন মনে থাকবে।
আপনি তরুণদের লেখা ও মননশীলতার খোঁজ খবর রাখতেন। অনেক প্রতিভাবান তরুণ আপনার কালে বাংলা একাডেমিতে চাকুরি গ্রহণ করেছে। তাদের আপনি পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। এমন কী বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রেও অল্প বয়সী গুণী লেখকদের প্রাধান্য দিয়েছেন।
জামান ভাই আপনি কাজে বিশ্বাসী এক ব্যক্তি। ছিদ্রান্বেষীদের সমালোচনা আপনি গ্রহণ করতেন না।
বাংলা একাডেমির বইমেলায় সব সময় আপনার সাথে কথা বলেছি। চ্যানেল আইয়ের জন্য অনুষ্ঠান তৈরি করেছি। আপনার সহযোগিতার উদার হাত সবসময় দীর্ঘ ছিলো।
কলকাতায় বাংলাদেশের বইমেলায় একসাথে গিয়েছি। পার্ক হোটেলে আড্ডা হয়েছে। সকালে নাশতার টেবিলে কত কথাই না হতো আমাদের। অন্যপ্রকাশের মাজহারুল ইসলাম, অনন্যার মনিরুল হক, কাকলীর সেলিম ভাই, শাহাদাৎ হোসেন নিপু, রিফাত কামাল সাইফ আমরা সবাই মিলে আড্ডা দিতাম।
মনে পড়ে জামান ভাই, নিউইয়র্কে মুক্তধারার বইমেলায় ক্যামওয়ে লজ নামে চাইনিজদের এক হোটেলে আমরা উঠলাম। জ্যাকসন হাউটসে সেই হোটেল। জামান ভাই, আমরা এক সাথে। জামান ভাই যে কতো সাধারনের ভেতর অসাধারন দিলেন তার বর্ণনা দিতে পারব না।
বাংলা একাডেমির অনেক কাজের মধ্যে জামান ভাই আমাদের জড়িত করে নিতেন। এতে আমরা অনেক সম্মানবোধ করতাম।
এই তো ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে জামান ভাই আপনি এক দুপুরে চ্যানলে আইতে এলেন। আমি আদিত্য শাহীন, পিয়াস মজিদ সারাক্ষণ আপনাকে ঘিরে আড্ডা দিলাম। কৌতুক করলাম। আপনি ভালো মানের কালো কফি খেতে চাইলেন। ব্যবস্থা করলাম। চ্যানেল আইতে এলেই জামান ভাই আপনি সাগর ভাই বা আমার রুমে আসতেন। অবসরে খানিক গল্প হতো। রেকডিং শেষে আমাদের ছাদের ক্যান্টিনে মধ্যাহ্নভোজ সেরেছি এক সাথে। আমাদের যে কোন প্রেস কনফারেন্সে, কোন পুরস্কার প্রদান কার্যক্রমে আপনি ছিলেন অবধারিত প্রধান ব্যক্তি।
আপনার প্রস্থানে আমরা সত্যি অভিভাবকশূন্য হয়ে পড়লাম। এই শূন্যস্থান কি করে পূরণ হবে? আমরাও আসছি জামান ভাই।
দেখা হবে আপনার সাথে।