Home আরোও বিভাগ সিনেমা যে সিনেমা গুলোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত!

যে সিনেমা গুলোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত!

SHARE

ছবিগুলোর আওয়াজ ছিল বেশ। জমকালো মহরত কিংবা পত্রপত্রিকায় ঘটা করে সংবাদও প্রকাশ হয়েছিল ছবিগুলোর। কিন্তু বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও এসব ছবি মুক্তি পাওয়া তো দূরের কথা- শুটিংও সম্পন্ন হয়নি। নামীদামি সব তারকা, নির্মাতা, গল্পকার, প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান যুক্ত থাকার পরও এসব ছবি আলোর মুখ দেখছে না। তাহলে কী এই ছবিগুলো কখনোই মুক্তি পাবে না? বেশ কয়েকটি ছবির শুটিং আটকে আছে মাঝপথে আবার কিছু ছবির শুটিংও শুরু হয়নি। শুধুমাত্র ঘোষণা আর মহরতেই থমকে আছে ছবিগুলোর কাজ।
যাত্রাটা ভালোভাবেই শুরু করেছিল অপারেশন অগ্নিপথ। প্রথম লটে একটানা শুটিং করে ৪০ ভাগ কাজ শেষ হয়। এরপর তিন বছর পেরিয়ে গেলেও ছবিটির বাকি শুটিং আর এগোয়নি। নির্মাতা আশিকুর রহমান বর্তমানে অষ্ট্রেলিয়ায় আছেন। তিনি জানান, ‘দ্বিতীয় লটে শুটিংয়ের সময়ে শাকিব খানকে পরিচালক সমিতি থেকে ডাবিং ও শুটিংয়ের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। আমরা অনেক চেষ্টা করেও পরিচালক সমিতি থেকে শুটিংয়ের অনুমতি পাইনি। সেখান থেকেই আমাদের শিডিউল জটিলতা শুরু হয়।’
‘পারলে ঠেকা’ ছবির জন্য জয়া আহসান অভিনয়ের পাশাপাশি ‘জঙ্গলের ডাক’ শিরোনামে একটি রক ধাঁচের গানও গেয়েছিলেন। ২০১২ সালে সিনেমাটির ৪০ ভাগ শুটিং হয়ে অজানা কারণে বন্ধ হয়ে যায়।
এ বি এম সুমন বেশ আত্মবিশ্বাসী ছিলেন আদি চলচ্চিত্র নিয়ে। টিজার দেখেই ছবিটির ব্যাপারে দর্শকের আগ্রহ বাড়ে। আলোচনায় আসেন ছবির নবাগত অভিনেতা, অভিনেত্রী ও নির্মাতা। তানিম রহমান পরিচালিত প্রথম ছবি আদির শুটিং শেষ। ছবির গান আর টিজারও মুক্তি দেয়া হয়েছে। ২০১৬ সালে ছবিটি মুক্তির কথা থাকলেও আদির ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। নির্মাতা জানান, বেশ কিছু ইস্যুর কারণে আদি মুক্তি পাচ্ছে না।
নিজস্ব অর্থায়নে সিনেমাটির নির্মাণ কাজ শেষ করেন নির্মাতা রাসেল আহমেদ। স্বল্প বাজেটের এই ছবির টিজার মুক্তি দিয়ে বেশ বাহবা পান তিনি। শুটিং শেষ করে সম্পাদনার কিছু কাজ বাকি থাকতেই নৃ নির্মাতা রাসেল হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ২০১৭ সালের ১৫ মে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। নির্মাতার স্ত্রী ইথেল আহমদে জানান, ‘নৃ’ নামের এই চলচ্চিত্রটি নিয়ে রাসেলের অনেক আশা ছিল। অনেক সংকটের মধ্য দিয়ে সে শুটিং শেষ করেছে। আমাদের চাওয়া ‘নৃ’ মুক্তি পাক। সিনেমাপ্রেমী এই মানুষটা তাঁর প্রথম ছবির মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকুক।’ চলচ্চিত্রের কাজ শেষ করতে এখনো বেশ কিছু টাকা দরকার বলে জানালেন ইথেল।
ঘটা করে ২০১২ সালের ২৬ অক্টোবর সিলেটে শুরু হয় ‘রান’ ছবির শুটিং। মুহম্মদ জাফর ইকবালের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ‘ক্যাম্প’ অবলম্বনে এ ছবির নির্মাণকাজ শুরু করেন অভিনেত্রী আফসানা মিমি। বিশাল বাজেটও পেয়ে যান। গল্পকার, নির্মাতা, মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট আর দেশ-বিদেশের নামীদামি সব তারকা থাকায় ছবিটি বেশ আলোচনার জন্ম দেয় সে সময়। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ আছে রান- এর শুটিং। নির্মাতা আফসানা মিমি বলেন, ‘কিছু জটিলতা তখন তৈরি হয়েছিল। তবে সিনেমা বন্ধ হওয়ার মতো কিছু ঘটবে, এটা আমি আশা করিনি। এই মুহূর্তে ‘রান’ নিয়ে কোনো আপডেট নেই।’
পরিকল্পনামাফিক নির্দিষ্ট সময়েই ‘ছায়াছবি’ নামের সিনেমাটি শেষ করেন নির্মাতা মোস্তফা কামাল রাজ। সেই ছবির নায়িকা পূর্ণিমা আর নায়ক আরিফিন শুভ। ছবিটি মুক্তির জন্য প্রস্তুত থাকলেও গত সাত বছরে এটি আলোর মুখ দেখতে পারল না। ছবিটি সম্পর্কে জানতে চাইলে মোস্তফা কামাল রাজ বলেন, ‘ছায়াছবি’ নিয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। এটা আমার সঙ্গে প্রযোজকের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। সময় হলে আমি নিজেই এ ছবির ব্যাপারে সবাইকে জানাব।’
ছোট পর্দায় নিজের শক্ত অবস্থান প্রমাণ করেই নির্মাতা অনিমেষ আইচ চলচ্চিত্রে পা বাড়ান। বাণিজ্যিক ঘরানার গল্প নিয়ে ২০১১ সালের ১৭ ডিসেম্বর শুরু করেন ‘না মানুষ’ চলচ্চিত্রের কাজ। ৬৫ ভাগ শুটিং হয়ে বন্ধ হয়ে যায় ‘না মানুষ’। ছবিটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে নির্মাতা বলেন, ‘এটা ৩৫ মিলিমিটারে শুটিং করা। নতুন করে আবার ছবির কাজ শুরু করা সম্ভব কি না জানি না। তা ছাড়া প্রযোজক দেশে নেই। আর কেন শুটিং বন্ধ হয়েছিল, সে ইতিহাস বলতে ইচ্ছা করছে না।’
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে সুপরিচিত নাম এনামুল করিম নির্ঝর। তাঁর নির্মিত ছবি ‘আহা’! যা ২০০৭ সালেই বাংলাদেশের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জয় করে। নির্ঝরের সর্বশেষ ছবি ‘নমুনা’ কেনো এক অজ্ঞাত কারনে মুক্তি পাচ্ছে না। আজ পর্যন্ত সেন্সর বোর্ড ছবিটি মুক্তি দেয়ার বিষয়ে অনুমোদন দেয়নি।
ছবি ঝুলে যাওয়া বা শুটিং বন্ধ থাকা ছবিগুলোর এই তালিকায় অনেক জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী পরিচালকের নামও রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত দুই থেকে তিন বছর বা তারও আগে শুটিং শুরু হয়েছিল এরকম সিনেমার সংখ্যা প্রায় অর্ধশতেরও বেশি। এ ছবির মধ্যে কোনোটা প্রযোজকের সমস্যার কারণে আটকে রয়েছে। কোনোটা শিল্পীর শিডিউল সমস্যা, কোনোটি আবার কোনো অজুহাত ছাড়াই বন্ধ হয়ে রয়েছে।

এর মধ্যে জি সরকারের বেশ কয়েকটা ছবির খোঁজ মিলেছে। যে ছবির শুটিং শুরু হলেও এখনও শেষ হয়নি। আর হবে কিনা সেটিও জানা নেই কারও। এর মধ্যে রয়েছে মৌসুমী ও ফেরদৌসের ‘মায়ের মতো বোন’, আমিন খান-শাবনূরের ‘লাইলী মজনু’, জায়েদ খান ও বিন্দিয়ার ‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি’। নায়ক মান্নাকে নিয়ে পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান শুরু করেছিলেন ‘বৃষ্টির চোখে জল’ নামের ছবিটি। কিন্তু ঢাকাই ছবির দাপুটে এ নায়কের মৃত্যুর পর আটকে যায় ছবিটির শুটিং। এটি নিয়ে সামনে এগোনোর আর ইচ্ছা নেই বলেও জানিয়েছেন পরিচালক।
শাকিব খান অভিনীত ২০০৬ সালে এ পরিচালক শুরু করেছিলেন ‘স্বপ্নের বিদেশ’ সিনেমার শুটিং। এ ছবিরও কোনো খবর নেই। শাবনূর ও ফেরদৌস অভিনীত মোস্তাফিজুর রহমান মানিকের ‘এমনও তো প্রেম হয়’ নামের একটি ছবিও আটকে রয়েছে। এ ছবির ভবিষ্যৎও বলতে পারছে না কেউ।
কলকাতার জনপ্রিয় গায়ক ও নির্মাতা অঞ্জন দত্তের ‘মন বাকসো’, সেলিম রেজার ‘না বলা ভালোবাসা’ ও আহমেদ ম-লের ‘প্রবাসীর প্রেম’ ছবিগুলো শুটিং শুরু হয়ে দীর্ঘদিন ধরে থমকে আছে। কবে নাগাদ এসব ছবির কাজ শেষ হবে সেটা ছবির নায়ক কিংবা পরিচালক কেউই স্পষ্ট করে বলতে পারছেন না। এছাড়াও এফডিসিতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির সহযোগিতায় নির্মিত হওয়া একাধিক চলচ্চিত্রের মুক্তির কোনো খবর নেই।
১৯৯৬ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত সেন্সরের জন্য এফডিসিতে জমা পড়া ছবির প্রিন্টের হিসাব অনুযায়ী এই ছবির সংখ্যা ৪১। আটকে থাকা এ ছবিগুলোর সবই ৩৫ মিলিমিটার ফিল্ম ফরম্যাটে নির্মিত। এফডিসি কর্তৃপক্ষের হিসাবমতে, এসব ছবি নির্মাণে কারিগরি সহযোগিতা, ফ্লোর ভাড়া, পজেটিভ ক্রয় বাবদ ওইসব ছবির প্রযোজকদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে ৫ কোটি ৫৫ লাখ ৬৪ হাজার ২৮৬ টাকা পাওনা রয়েছে এফডিসির। একেকজন প্রযোজকের কাছে এই বকেয়ার পরিমাণ সর্বনিন্ম দুই লাখ থেকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা। এদিকে আটকে থাকা বেশ কিছু ছবি সেন্সর ছাড়পত্র পেলেও বাকি ছবিগুলো নানা ইস্যুতে এখনও ছাড়পত্র পায়নি।
বর্তমানে এসব ছবি মুক্তি দিতে গেলে আগে এফডিসির বকেয়া পরিশোধ করতে হবে। এরপর থার্টি ফাইভ থেকে ডিজিটালে পরিবর্তন করতে হবে। সেখানেও নতুন করে খরচের ব্যাপার আছে। এছাড়া যে প্রেক্ষাপট ধরে ছবি নির্মাণ করা হয়েছে, অনেক ছবির ক্ষেত্রে প্রেক্ষাপটের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতি মিলবে না। এমনকি ছবিগুলোর অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে অনেকেরই এখন আর দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা নেই।
এবার সরকারি অনুদান পাওয়া ছবির কথাও জানা যাক। ২০০৮-০৯ অর্থবছরের অনুদান পাওয়া জুনায়েদ হালিমের ‘স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নের গল্প’ ছবিটি নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ায় এটির মুক্তি নিয়ে সমস্যা রয়েছে। এছাড়া ২০১০-১১ অর্থবছরে ফারুক হোসেনের ‘কাকতাড়–য়া’ ও মির্জা সাখাওয়াৎ হোসেনের ‘ধোঁকা’ ছবিগুলোও একই অবস্থায় রয়েছে। এদিকে ২০১১-১২ অর্থবছরে মারুফ হাসান আরমানের ‘নেকড়ে অরণ্যে’, প্রশান্ত অধিকারীর ‘হাডসনের বন্দুক’, সৈয়দ সালাউদ্দীন জাকীর ‘একা একা’, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ক্যাথরিন মাসুদের ‘কাগজের ফুল’, নারগিস আক্তারের ‘যৈবতী কন্যার মন’, খান সরফুদ্দিন মোহাম্মদ আকরামের ‘খাঁচা’, ২০১৩ ড্যানি সিডাকের ‘কাঁসার থালায় রুপালি চাঁদ’, ড. সাজেদুল আওয়ালের ‘সিটকিনি’ ও জানেসার ওসমানের ‘পঞ্চসঙ্গী’ ছবিগুলোও অন্ধকারে রয়েছে। অনুদানের অর্থে নির্মিত এসব ছবি কবে আলোর মুখ দেখবে, কিংবা আদৌ দেখবে কি-না তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। এদিকে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে অনুদান পায় ড. সাজেদুল আওয়ালের ‘সিটকিনি’ ছবিটি, যে ছবিটির কাজ এখনও শেষ হয়নি বলেই জানা গেছে। মন্ত্রণালয়ের আইন অনুযায়ী অনুদানপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রের কাজ অনুদানের প্রথম চেকপ্রাপ্তির ৯ মাসের মধ্যে শেষ করতে হবে। কিন্তু কার্যত অনেক ক্ষেত্রেই এই নিয়ম গুরুত্ব পাচ্ছে না।