SHARE

সংলাপটা ছিল এরকমÑ তুই একটা ভোদাই! বুঝছ না… জনপ্রিয় অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী এই সংলাপ বলতে রাজি হলেন না। তার আপত্তি ‘ভোদাই’ শব্দটি নিয়ে। পরিচালককে বিনয় সহকারে বললেন, ভাই এই শব্দটা বাদ দেন। ‘ভোদাই’ মানে বোঝেন তো! আপত্তিকর শব্দ। নাটকে এই শব্দ ব্যবহার করা ঠিক না। তার কথা শুনে পরিচালক প্রথমে একটু অবাক হলেন। ভাবলেন, কোনভাবেই শব্দটা বাদ দিবেন না। আমরা তো কথায় কথায় শব্দটা ব্যবহার করি। কাউকে তুচ্ছ ও তাচ্ছিল্য করতে হবে ফট করে বলে ফেলি, তুই তো একটা ভোদাই… হঠাৎ যেন পরিচালক শান্ত হলেন। ভাবলেন অভিনেতা ঠিকই বলেছে। ‘ভোদাই’-এর মতো আপত্তিকর একটা শব্দ নাটকের সংলাপে যুক্ত হতে পারে না। এই শব্দ বাদ!
এই ঘটনাটা আমার দেখা। একটি শব্দ নিয়ে একজন অভিনেতার এই যে অনুভূতি তা মনে রাখার মতো। আসলে তো ‘ভোদাই’ শব্দটা নাটকে মানায় না। আমরা কথায় কথায় অনেক কথাই বলি। তাই বলে সব কথাই কি ছাপার যোগ্য? নাকি টিভি পর্দায়, সিনেমায় অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মুখে জুড়ে দেয়া উচিৎ? ‘…মারানি’র পুত মারাত্মক রকমের অশ্লীল একটা শব্দ। অথচ একদিন একটি টিভি চ্যানেলে নাটকের অভিনেতার মুখে এই শব্দটি শুনলাম। পাশে বসেছিল আমার এক আত্মীয়ের সাত বছরের মেয়ে। সে আমাকে জিজ্ঞেস করলোণ্ড আংকেল এই শব্দটার মানে কি? তার কাছে সেদিন স্বাভাবিক হতে পারিনি। সাত-পাঁচ বুঝিয়ে দিয়েছি। সেদিন মেয়েটির মা আমাকে অনেক কথা শোনালেনণ্ড ভাই আপনিতো সাত-পাঁচ বুঝিয়ে চলে যাচ্ছেন। আপনি যাবার পর মেয়ে আমাকে ঠিকই জিজ্ঞেস করবে। জানতে চাইবে ‘…মারানি’ মানে কী?
এই ঘটনার পর উল্লেখিত নাটকের নাট্যকারের সাথে আমার কথা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ভাই নাটকটায় ঐ শব্দটা ব্যবহার না করলে কি হোত না? তিনি আমার কথায় বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, আপনি কি বলছেন এসব? আমার নাটকের সিচুয়েশন অনুযায়ী এই শব্দটাই যথার্থ। ‘…মারানি’ বলে গাল দেয়ার সময় একটা জোশ কাজ করে। আমার নাটকে এই জোশটা দরকার। আপনি শব্দটা নিয়ে আপত্তি করলেন। কিন্তু অনেকে এই শব্দটার জন্য বাহাবা দিয়েছে। বলেছে শব্দটা নাকি যুৎসই ছিল। দর্শক শব্দটা বেশ খেয়েছে।
নাট্যকার বন্ধুর কথা শুনে আমি অবাক। শব্দ কি খাওয়ার জিনিস? দর্শক শুধু শব্দ খায় না। নাটকও নাকি খায়। কথায় কথায় অনেকে বলেন, নাটকে এটা থাকতে হবে ওটা থাকতে হবে। এসব না থাকলে নাকি দর্শক নাটক খায় না। নাটক তাহলে এখন দেখার বিষয় না খাবার বিষয়। যাক, দেশে চাউলের দাম বাড়লে দর্শককে নাটক খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখা যাবে। একথা আমার এক বন্ধুর সাথে আলোচনা করছিলাম। বন্ধু বললেন, আমাদের নাটকের যা অবস্থা তাতে দর্শককে ভবিষ্যতে নাটক খাওয়ানো মুশকিল হবে। বন্ধু কথায় কথায় পাশের দেশের বিভিন্ন বাংলা টিভি চ্যানেলের নাটকের কথা তুললেন। তার মন্তব্যণ্ড ওদের নাটকের মাল-মশলাটা একটু অন্যরকম। তাই ওদেরটার প্রতি অনেকের আগ্রহ এখন অনেক বেশি। ওদের নাটক দর্শক খাচ্ছে।
লেখাটা শুরু করেছিলাম একটা শব্দ নিয়ে। ভোদাই শুধুতো একটা শব্দ। সেটা না থাকলে একটি নাটকের খুব যে ক্ষতি হবে তা আমি মনে করি না। চঞ্চল চৌধুরী সময়মতো পরিচালককে এ ব্যাপারে সচেতন করার জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এমনও তো হতে পারত, নাটকের সংলাপ। অভিনেতাকে তা বলতেই হবে। পরিচালকের নির্দেশ মানলেন। দায়ভারতো তার নয়। পরিচালকের। এটাই কি সত্যি গল্প? নাটকের ভালোমন্দের দায়ভার কি শুধূ একজন পরিচালকের? আর কারো নাই। জনপ্রিয় অভিনেতা মোশাররফ করিম কোন এক নাটকে একটি সংলাপ আউড়িয়ে প্রবাসী বাঙালিদের বিক্ষোভের মুখে পড়েছিলেন। নাটকের সংলাপটি ছিল বোধকরি এরকমণ্ড দুবাই যায় তো ফহিরন্নির পুলারা… আমি কি ফহিরন্নির পুলা…।
এটিতো নাটকের একটি সংলাপ মাত্র। আমরা কথায় কথায় এমন অনেক কথাই বলি। কিন্তু প্রচার মাধ্যমে সব কথা কি বলা যায়? নাকি বলা উচিৎ? দুবাই যায় ফকিরন্নির পুলারা… অর্থাৎ যে দুবাই চাকরি করতে চায় সে অতি
নিকৃষ্ট। মানেটাতো এরকমই দাঁড়ায়। আমাদের টেলিভিশন নাটকের দর্শক সংখ্যা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অনেক। বিদেশে বসে যারা নাটকের এই সংলাপ শুনেছে তাদের মাঝে নেতিবাচক প্রতিক্রিযা হওয়াই স্বাভাবিক। আমার কেন যেন মনে মনে হয় সেদিন মোশাররফ করিমও পরিচালককে পরামর্শ দিতে পারতেন। বলতে পারতেন, ভাই এই সংলাপটা বাদ দেন। সংলাপটা প্রবাসীদের মনকষ্টের কারণ হতে পারে।
আমার ধারনা মোশাররফ করিম একথা ভাবার সময় পাননি। সময় পেলে নিশ্চয়ই বলতেন। আসলে আমরা সময় নামক একটা যন্ত্রের নিয়ন্ত্রনে বসবাস করছি। সময়ের ঘড়িতে খাচ্ছি দাচ্ছি, ঝাঁকের কই ঝাঁকে মিশে যাচ্ছি। আমার প্রথম নাটক নির্মাণ করেছিলাম প্রয়াত নাট্যজন আতিকুল হক চৌধুরী। বিটিভিতে ‘আর কতদূর’ নামে আমার প্রথম টিভি টিভি নাটকের স্যুটিং শুরুর আগে একটানা তিনদিন রিহার্সেল করেছিলেন অভিনেতা-অভিনেত্রীরা। প্রয়াত আব্দুল্লাহ আল মামুন, কাজী আবু জাফর সিদ্দিকীসহ অনেকে অভিনয় করেছিলেন ঐ নাটকে। রিহার্সেল করতে করতে নাটকটির অনেক খুটিনাটি আলোচনা করেছেন সবাই। সেদিন আমিও সিদ্ধান্ত নেই নিজে যখন নাটক বানাব শিল্পীদের নিয়ে এভাবেই রিহার্সেল করব। সে সিদ্ধান্ত রাখতে পারিনি। এখন টিভি নাটকের রিহার্সেল করার কথা ভাবাই যায় না। অনেকে পান্ডুলিপি ঠিকমতো পড়েনও না। যার ফলে নাটক যে একটি সম্মিলিত কর্মকান্ড সে ধারণা থেকে আমরা যেন সরে যাচ্ছি।
একটি ছোট্ট ঘটনার কথা বলে লেখাটি শেষ করব। এক ঘন্টার একটি নাটক বানাব। জনপ্রিয় এক অভিনেত্রীর সাথে আমার ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি যোগাযোগ করল। অভিনেত্রী খুশী মনে নাটকের ডেট দিলেন। স্যুটিং এর কয়েকদিন আগে তার কাছে পান্ডুলিপি পাঠানো হলো। পান্ডুলিপিতে স্যুটিং সম্পর্কিত তথ্য উল্লেখ করা ছিল। পান্ডুলিপি পেয়ে অভিনেত্রী আমাকে ফোন করলেন, ভাই এটা কি হল?
কেন কি হয়েছে?
আমিতো এক ঘন্টার নাটকে দুইদিন সময় দিতে পারব না।
বলেন কি! আমার দরকার তিন দিন। অনেক কষ্টে দুদিনে ম্যানেজ করব ভাবছি…
অভিনেত্রী আমার কথা কেড়ে নিয়ে বললেন, বলেন কি আপনি? আমি একদিনের বেশি দিতে পারব না।
জিজ্ঞেস করলাম, স্ক্রীপ্ট পড়েছেন?
না। তবে পড়বো।
স্ক্রীপ্টে আপনার সিকুয়েন্স আছে ২২টি। একদিনে সম্ভব?
আমার কথা শুনে অভিনেত্রী সবজান্তার মতো বললেন, কেন সম্ভব না। অনেকেই তো ৩০/৩৫টা সিকুয়েন্সও একদিনে শেষ করে…
অভিনেত্রীর কথা শুনে আমি তো থ। একদিনে ৩০ সিকোয়েন্সের স্যুটিং। ওহ! মাই গড!
লেখাটি শেষ করি। ধন্যবাদ জানাই চঞ্চল চৌধুরীকে তার সচেতন সিদ্ধান্তের জন্য। কয়েকদিন আগে চ্যানেল আইতে ‘মনের মানুষ’ ছবিতে তাকে আবার দেখলাম। তার অভিনয় দেখে মনে হলো আমরাও পারি। শুধু দরকার সম্মিলিত উদ্যোগ। সম্মিলিত পরামর্শ। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত। যে সিদ্ধান্তে একটি আপত্তিকর শব্দ বাদ দেয়া গেছে একটি নাটক থেকে…।
রেজানুর রহমান