Home এক্সক্লুসিভ মিডিয়া আদব বেয়াদব

মিডিয়া আদব বেয়াদব

SHARE
media

রেজানুর রহমান: ঘটনাটা মিডিয়ার অনেকেই জানেন। তবুও আরেকবার উল্লেখ করছি। প্রয়াত নাট্যাভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি শ্যুটিং স্পটে বসে আছেন। শ্যুটিং চলছে। কিন্তু একজন অভিনেতার অমনোযোগিতার কারণে পরিচালক নির্ধারিত সিকোয়েন্স শেষ করতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছেন। পরিচালক ফাইভ, ফোর, থ্রি, টু, ওয়ান, জিরো… অ্যাকশন বলেন। দৃশ্যধারণ শুরু হয়। তখনই ঐ অভিনেতার মোবাইলে ফোন আসে। অভিনেতা ছুটে গিয়ে ফোন ধরেন। তারপর ফোনে কথা বলতেই থাকে। এরকম ঘটনা বারবারই ঘটছিল। পরিচালক অ্যাকশন বলেন। ক্যামেরা চালু হয়। অভিনয়ও শুরু হয়। আবার ফোন আসে। অভিনেতা দৌড়ে গিয়ে আবার ফোন ধরে।

শ্যুটিং-এর লোকজন ত্যক্ত, বিরক্ত। কিন্তু কেউ কাউকে কিছুই বলছে না। বলবে কী করে? নামকরা অভিনেতা। তার মেজাজ মর্জির ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করে। কিছু বলতে গেলে যদি রেগে যায়? যদি বলে ফেলে মন ভালো নেই। আজ আর শ্যুটিং করবো না। তখন কী হবে? কাজেই কী দরকার বাবা! ফোনে কথা বলছে বলুক।

হুমায়ুন ফরীদি দূর থেকে ঘটনাটি দেখছিলেন। অভিনেতা এই মাত্র ফোনে কথা বলা শেষ করেছেন। শ্যুটিং ইউনিট হঠাৎ যেন জেগে উঠলো। হ্যাঁ এবার কিছু একটা হবেই হবে… এমন ভাব, উত্তেজনা সবার মধ্যে।

পরিচালক ফাইভ ফোর… অ্যাকশন বলতেই শ্যুটিং শুরু হলো। কিন্তু অভিনেতার মোবাইলে আবার এলো ফোন।

শ্যুটিং বন্ধ। অভিনেতা ফোনে কথা বলার জন্য একটু দূরে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ হুমায়ুন ফরীদি তার সামনে এসে দাঁড়ালেন। কোনো প্রকার ভূমিকা না রেখেই বললেন- অ্যাই তোমার ফোনটা একটু দাও তো…

অভিনেতা যেন একটু চমকে উঠলো। আমতা আমতা স্বরে বললো- ফরীদি ভাই ফোনটা জরুরি…

ফরীদি সেই অভিনেতাকে আর কথা বলার সুযোগ দিলেন না। তার হাত থেকে ফোন কেড়ে নিয়ে দূরে একটা ছোট্ট পুকুরের মধ্যে তা ছুড়ে ফেললেন। শ্যুটিং স্পটের সবাই নিশ্চুপ। অভিনেতা ততক্ষণে তার ভুল বুঝতে পেরেছে। মাথা নিচু করে বলল- স্যরি ফরীদি ভাই, আমার ভুল হয়ে গেছে।

হুমায়ুন ফরীদি সেদিন সেই অভিনেতাসহ শ্যুটিং স্পটে উপস্থিত সবার উদ্দেশে বলেছিলেন- অভিনয় হলো আসলে উপাসনার মতো। অভিনেতা-অভিনেত্রীকে মনোযোগী হতে হয়। তাকে বিনয়ী হতে হয়।

সেদিন সেই অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদির পা ছুয়ে ক্ষমা চেয়েছিল। ফরীদি তাকে বুকের মাঝে জড়িয়ে নিয়ে বলেছিলেন- অ্যাই তোমরা বোঝো না কেন, এই যে আমরা যারা নাটক সিনেমায় অভিনয় করি তারা কি শুধুই অভিনেতা-অভিনেত্রী? না, তার চেয়েও বড় কিছু। দেশের মানুষ আমাদেরকে অনুকরণ করে অনুসরণ করে। কাজেই আমাদের উচিত তাদের জন্য মহান আদর্শ ছড়িয়ে দেয়া।

হুমায়ুন ফরীদি বেঁচে নেই। ধরা যাক তিনি যদি বেঁচে থাকতেন এবং এই সময়ের একজন অভিনেতা অথবা অভিনেত্রীর সঙ্গে তার একই ধরনের ঘটনা ঘটতো। পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াত? আমার ধারণা এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া বেশ কঠিন। কেউ হয়তো বলবেন হুমায়ুন ফরীদি বলে কথা। কাজেই এখনকার দিনে তার সঙ্গে ঘটনাটি ঘটলে আগের মতোই পরিস্থিতি দাঁড়াতো। যিনি এই ধরনের অন্যায় করবেন তিনি নিশ্চয়ই স্যরি বলবেন।

আবার কেউ হয়তো বলবেন- স্যরি বলার প্রশ্নই আসে না। ইদানিংকার ছেলে-মেয়েরা সিনিয়র-জুনিয়র মানে নাকি? যদি মানতোই তাহলে রোকেয়া প্রাচীর সঙ্গে প্রসূন আজাদ অভদ্র ব্যবহার করতো না। অনেকে হয়তো জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছেন রোকেয়া প্রাচীর সঙ্গে প্রসূন আজাদের কী এমন হয়েছে? ঝগড়া হয়েছে? যদিও শোবিজ এ নিয়ে বেশ সরগরম।

লড়াই জমে উঠেছে। রোকেয়া প্রাচী বনাম প্রসূন আজাদের মিডিয়া বাহাস চলছে জোরেশোরে… মহা সমারোহে… অভিনেত্রী প্রসূন আজাদের বিরুদ্ধে পরিচালক রোকেয়া প্রাচীর গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেছেন প্রসূন আজাদ তার সঙ্গে চরম বেয়াদবি করেছেন। উত্তরে প্রসূন আজাদ একটি টিভি চ্যানেলে মিটিমিটি চোখে মুখে হাসি ছড়িয়ে বলেছেন- আমি দুষ্টু! কিন্তু বেয়াদব নই।

প্রসূন আজাদের বিরুদ্ধে টিভি মিডিয়ায় সক্রিয় এবং নিষ্ক্রিয় তিন সংগঠন যথাক্রমে অভিনয় সংঘ, প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন ও ডিরেক্টরস গিল্ডের কাছে অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন। তিনি প্রসূনের ‘বেয়াদবি কর্মকাণ্ডের’ বিচার চেয়েছেন।

ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে রোকেয়া প্রাচী বলেছেন, গত ১৮ অক্টোবর ফরিদপুরে শুটিংয়ে যাওয়ার কথা ছিল। এ দিন বিকাল ৪ টার সময় মালিবাগে গাড়ি পাঠাই প্রসূনকে আনার জন্য।

এদিকে, ক্যামেরাম্যানসহ অন্য কলাকুশলীরা ভিন্ন ভিন্ন জায়গাতে অবস্থান করছিল। কিন্তু প্রসূন আসে রাত ৮ টায়। দেরির কারণ প্রসঙ্গে সে জানায়- শুটিং সেটে তার ভাইকে সঙ্গে নিয়ে আসায় দেরি হয়েছে। কিন্তু ছেলেটি তার আপন ভাই নন। তার অ্যাসিস্ট্যান্টও নন। এমনকি ছেলেটি ছোটও না। সে পরিণত একজন পুরুষ। তারপর প্রসূনকে বলি, ‘আমাদের অলরেডি অনেক দেরি হয়ে গেছে। আজকে পৌঁছাতে অনেক রাত হয়ে যাবে। ওকে রাতে কোথায় থাকতে দেব? এর চেয়ে বরং ও আগামীকাল আসুক আমি রুমের ব্যবস্থা করব।’ কিন্তু প্রসূন ওকে ছাড়া যেতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলে, ‘আপনারা যান আমি ওকে নিয়ে আসছি।’ তখন বলি, তুমি যখন ওকে নিয়ে আসবে তখন আগে বললেই পারতে। আমরা চলে যেতাম।’’

তিনি আরো বলেন, ‘‘গেস্ট থাকবে তুমি আগে আমাকে জানাওনি। জানালে ব্যবস্থা করে রাখতাম। ছেলেটা তোমার অ্যাসিস্ট্যান্ট হলে ড্রাইভারের সঙ্গে রাখতে পারতাম। ছোট হলে আমাদের সঙ্গে রাখতাম। প্রসূন বলে, ‘আপনি এখনি এতটা পেইন দিচ্ছেন সেটে তো আরো বেশি দেবেন।’ তখন আমি বলি, ‘আমি প্রযোজক, পরিচালক। আমি তোমার ভালো-মন্দ দেখব না? তোমাকে পেইন দেব কেন!”

প্রসূন আজাদের জন্য আমার নাটকের শ্যুটিং বাতিল করতে হলো। এ বিষয়ে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেই। কারণ, শ্যুটিং বাতিল মানেই এতগুলো মানুষের রুটি-রুজিতে আঘাত করা। আর এ বিষয়ে প্রসূন ফেসবুকে লিখেছে: ‘আমাদের মিডিয়ার পরিচালক শিল্পীকে রাতেরবেলা আউট ডোরে একা নিয়ে যেতে চেয়েছে। যেখানে যাওয়াটা অনেক সময় সমস্যা হয়। সে (পরিচালক) তার কু ইচ্ছে চরিতার্থ করতে পারেনি বলে আমার ভাইকে সঙ্গে নিতে দেয়নি।’ আমি ২৭-২৮ বছর ধরে মিডিয়াতে কাজ করছি। অন্য অনেক মেয়েরাও কাজ করছে। আর মেয়ে পরিচালক ইন্ডাস্ট্রিতে হাতে গোনা চার পাঁচজন। বাকি সবাই পুরুষ। তার মানে সমস্ত পরিচালক কী চরিত্রহীন? প্রসূনের এ ধরনের কথা বলা যথেষ্ট আপত্তিকর। সে পরিচালক ও সম্পূর্ণ ইন্ডাস্ট্রিকে অসম্মান করেছে। আমার হয়তো ৫০ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে। ওকে ফাইন! তাতে সমস্যা নেই, কিন্তু পরিচালকদের এভাবে অসম্মান করে কথা বলতে সে পারে না। বলেন রোকেয়া প্রাচী।

ঘটনার ব্যাপারে নিজের ফেসবুকে অ্যাকাউন্টে এক স্ট্যাটাস দিয়েছেন প্রসূন আজাদ। ‘সন্ধ্যায় আম্মু ইলিশ মাছ রান্না করছিল। আমি কিচেনের ফ্লোরে বসে কফি খাচ্ছিলাম। আম্মু বলছিল, প্রসূন এত দূর যাবি, আমার মন চাচ্ছে না। আমি আম্মুকে বললাম সুন্দর ক্যারেক্টার, আর অনেক দিন পর, করি একটা নাটকে অভিনয়, কি আসে যায় -বলে আমি লাগেজ গুছাতে বসলাম। আবার জানলাম, এসিস্টেন্টের বাড়িতে ঝামেলা তাই সঙ্গে যাবে না। আমারও ভালো লাগছিল না। একা একা শ্যুটিংয়ে যাইনা যে তা না, তবে ব্রোথেলের মতো জায়গায় এত কালারফুল ফ্রেম পাওয়া যাবে ভেবে প্রত্যয়কে বললাম। প্রত্যয় জানালো, ওর কাজ আছে। আমি একাই বের হলাম। মাঝ রাস্তায় প্রত্যয় ফোন করে জানালো সঙ্গে যাবে। গেলাম ডিরেক্টরের বাড়ির সামনে। দৌলতদিয়া বেশ দূরে। ৮টায় পৌঁছালাম বলে ডিরেক্টর সালাম না নিয়েই এতগুলো কথা শুনিয়ে দিল। আমার ধারণা ওনার পারিবারিক ঝামেলা চলছে। নইলে সুস্থ মাথায় একটা মানুষ এত বাজে আচরণ কেনো করবে! মগবাজার, মৌচাকে প্রচুর যানজট। এটা এই শহরে নতুন নয়। আমার জন্মের পর থেকেই দেখে আসছি। ৭:৩০ থেকে ৮:০০ টা বেজে গেল কেন সেজন্য উনি এত রাগ করলেন! আমি অবাক। কোনোভাবেই উনি প্রত্যয়কে সহ্য করতে পারছিল না। আমি আমার এসিস্টেন্ট ছাড়া অথবা এই ছোট ভাই ছাড়া দৌলতদিয়ার মতো জায়গায় যাওয়ার সাহস পাই নাই।

আমার বহু রাত গেছে চোখের পানি মুছে। আপনাদের আগেও অনেক বড় বড় স্টার আমাকে “নাই” করে দিতে চেয়েছিলেন। এই কথা আমি নতুন শুনি নাই। কিন্তু তারা কোথায়? প্রত্যয় ভাবছিল, আমি চড় থাপ্পড় মেরে বসি কি না। কিন্তু পুরোটা সময় হাসি মুখেই ওনার কথা শুনে যাচ্ছিলাম আর উত্তর দিচ্ছিলাম। কারণ আমি আমার ভাইকে ছাড়া শুটিংয়ে ওনার সঙ্গে যেতে চাই নাই।

সুতরাং অসুস্থ ডিরেক্টর, আমার আব্বু আম্মু আপনার মতো না, আপনি আমার মায়ের পরিচিত তাই সালাম দিয়ে কথা বলেই কথা শেষ করেছি। আমাকে “নাই” করবেন করেন। কিন্তু একটা প্রশ্ন আপনি কি আমাকে দিয়ে অভিনয় করাতে চাচ্ছিলেন? নাকি অন্য কিছু? তাহলে ছোট ভাইকে দেখে এমন করলেন! এতগুলো মানুষের সামনে নেরি কুত্তা হয়ে গেলেন! ভাদ্র মাস নাকি? আপনি কে?’

পরে অবশ্য প্রসূন আজাদ স্ট্যাটাসটি নিজের ফেসবুক থেকে সরিয়ে নেন। তবে তিনি একটি ‘মাধ্যমে’ এ ব্যাপারে আরও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন-

“কোনো পরিচালক কিংবা পৃথিবীর কোনো মানুষ ইউনিটের হাজার মানুষের সামনে আমাকে অপমান করতে পারেন না। আমি অপরিচিত কাউকে নিয়ে গেলেও এটা করতে পারেন না। সেখানে আমি পরিচয় দিয়েছি, প্রত্যয় আহমেদ আমার ছোট ভাই। সে ইন্ডাস্ট্রিতে প্রতিষ্ঠিত ফটোগ্রাফার। আসলে সে আমার ছোট ভাইকে পছন্দ করেনি। সে চিৎকার করে আমার সঙ্গে কথা বলেছে। যা সে করতে পারে না। আমি নাবালিকা নই। আমার একটা পরিচয় আছে। আমার পরিবার আছে। আমার ঘরের চালের চিনৱা করতে হয় না। যদি চালের চিনৱা করতে হতো, তবে হয়তো তার হাতে পায়ে ধরে বলতাম, ‘ম্যাডাম শ্যুটিং করেন।’ আমি ওই পারসোনালিটির মেয়ে না। যে আমাকে সম্মান দেবে না আমি তার কাজ করব না। পুরো বিষয়টি রোকেয়া প্রাচীর পরিকল্পিত। উনি ইচ্ছে করেই এটা করেছেন। আমি এত নোংরা পলিটিক্সের মধ্যে যেতে চাই না।”

তিনি আরো বলেন, ‘আমার পুরো জীবন এখনো পড়ে আছে। আর উনার বয়স তো প্রায় শেষ। আমি তার ফ্যান ছিলাম। সে সুবাদে কাজ করতে যাওয়া। কিন্তু যে আচরণ আমি পেয়েছি আমি খারাপ কিছু করিনি। আর কারো যদি খারাপ কিছু করে থাকি তবে আল্লাহ আছেন। তার বিচার তিনি করবেন। কিংবা মানুষ আমাকে সেভাবে দেখবে। আমি আসলে অভিনয়টা করি আর ওটাই ভালোবাসি। আসলে তিনি একটা নোংরা পলিটিক্সের মধ্যে আমাকে ফেলতে চাইছেন। এবং তারা ওটাই করেন। সুতরাং আমি এ বিষয় নিয়ে আর সময় নষ্ট করতে চাই না।’

আপনার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী? এমন প্রশ্নের জবাবে প্রসূন বলেন, ‘দেখা যাক।

প্রসূন আজাদ ও রোকেয়া প্রাচীর মধ্যে সৃষ্টি বাহাসে কে কতটা দায়ী তা হয়তো শেষ পর্যনৱ পরিষ্কার হবে না। তবে এটা পরিষ্কার এই ধরনের ঘটনা আমাদের শোবিজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

রোকেয়া প্রাচী দেশের একজন নামকরা অভিনেত্রী। শুধু দেশে নয় বিদেশেও তিনি দেশের জন্য সুনাম কুড়িয়েছেন। তার সঙ্গে বাহাসে জড়িয়ে পড়া একজন তরুণ অভিনেত্রীর পক্ষে কতটা শোভন তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। তবে আনন্দ আলোর পর্যবেক্ষণে মনে হয় এর জন্য পরিবেশ ও পরিস্থিতিই দায়ী। এক সময় নাটক ও চলচ্চিত্রে সিনিয়র ও জুনিয়রদের মধ্যে যে সদ্ভাব ছিল তা এখন নেই বললেই চলে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জুনিয়ররা সিনিয়রদের পাত্তাই দেন না। এর অবশ্য কারণও আছে। আমাদের নাটক সিনেমা হয়ে উঠেছে তথা কথিত নায়ক নায়িকা নির্ভর। বিশেষ করে টিভি নাটকে বাবা-মা, ভাই-বোনের দরকার পড়ে না। খালা-মামা, খালু-ফুফু বলে যে কেউ আছে তা আমাদের টিভি নাটকে দেখাই যায় না। যে কারণে প্রবীণ অভিজ্ঞ অভিনেতা-অভিনেত্রীর জায়গায় সদ্য মিডিয়ায় পা রাখা তরুণ অভিনেতা-অভিনেত্রীই অতি জরুরি। একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরি। উত্তরায় একটি শ্যুটিং হাউজে শ্যুটিং এর প্রস্তুতি চলছে। দেশের একজন নামকরা প্রবীণ অভিনেতা শিডিউল টাইমে এসেছেন। তাকে মেকআপ রুমে বসিয়ে রাখা হয়েছে। একজন প্রবীণ অভিনেত্রীও এলেন সঠিক সময়ে তাকেও মেকআপ রুমে বসিয়ে রাখা হলো। সকাল ১০ টায়ও কাজ শুরু হচ্ছে না। ঘটনা কী? ঘটনা হলো নাটকের নায়িকা এখনও আসে নাই। নায়কের ফোন বন্ধ।

বেলা ১ টায় নায়ক নায়িকা এলেন। ইউনিট ব্যস্ত হয়ে উঠলো তাদের দু’জনকে নিয়ে। এক সময় নায়ক-নায়িকাকে নিয়ে আউট ডোরে শ্যুটিং-এর জন্য বেড়িয়ে গেল সবাই।

মেকআপ রুমে তখনও বসে আছেন সেই প্রবীণ অভিনেতা-অভিনেত্রী। বিকালে তাদেরকে জানানো হলো আজ তাদের কাজ হবে না।

আনন্দ আলোর সম্পাদকীয় নীতিই হলো নেতিবাচক সংবাদকে গুরুত্ব না দেয়। কিন্তু সময়ের প্রয়োজনে কিছু কথা বলতেই হচ্ছে। আমাদের শোবিজে সংশ্লিষ্ট মানুষদের আচার-আচরণ, নীতি নৈতিকতা বোধকরি পাল্টে যাচ্ছে। এইতো সেদিন অভিনয় শিল্পী সংঘের সভায় বিশিষ্ট অভিনেতা ডিএ তায়েব একটি ভয়াবহ তথ্য তুলে ধরলেন। তার বক্তব্যের সারমর্ম অনেকটা এরকম- তিনি পুলিশ বাহিনীতে চাকরি করেন। আর তাই মাঝে মধ্যেই শিল্পীদের নিয়ে বিব্রত পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। ইয়াবা অথবা নিষিদ্ধ কোন নেশা জাতীয় দ্রব্যসহ পুলিশের হাতে ধরা পড়েছেন হয়তো কোনো অভিনেতা-অভিনেত্রী। তারা তখন নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়ার জন্য ডিএ তায়েবের শরণাপন্ন হন। তখন ডিএ তায়েব যারপর নাই বিব্রত হন বলে জানান।

ডিএ তায়েবের এই বক্তব্য সেদিন অভিনয় শিল্পী সংঘের সভায় ব্যাপক আলোড়ন তোলে। অনেকেই তায়েবকে সমর্থন করে বলেন, আচার-আচরণের ব্যাপার শিল্পীদের উচিত আরও সচেতন হওয়া। যদিও কেউ কেউ তায়েবের বক্তব্যের সমালোচনাও করেছেন। তাদের মনৱব্য ছিল- সব শিল্পীই ‘ড্রাগ’ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নয়। কাজেই এ ব্যাপারে প্রকাশ্য সভায় কোনো বক্তব্য দেয়া ঠিক নয়।

একথা সত্য ‘ড্রাগ’ জাতীয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে শিল্পীদের কেউ যদি জড়িত থাকেন তারা হয়তো হাতে গোনা। কাজেই তাদের কথা এত গুরুত্ব দিয়ে বলার কী আছে? কিন্তু ঐ যে একটা কথা আছে না- এক বালতি দুধকে নষ্ট করার জন্য এক ফোঁটা তেঁতুলের রসই যথেষ্ট। তেমনি একশজন নীতিবান শিল্পীর ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য একজন ‘নীতিহীন’ শিল্পীই যথেষ্ট।

আমাদের মিডিয়ায় সত্যিকার অর্থে এখন নীতি, নৈতিকতার প্রশ্নটিই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও ভালোবাসাই এই সংকটের সমাধান দিতে পারে।

মিডিয়া সংশ্লিষ্ট অনেকে মনে করেন রোকেয়া প্রাচী ও প্রসূন আজাদের মধ্যে সৃষ্ট ঘটনা আমাদের মিডিয়ার বাস্তব অবস্থাকে তুলে ধরেছে। মিডিয়া বড় হচ্ছে। সেই তুলনায় আমাদের সম্পর্কের বাঁধন পোক্ত হচ্ছে না। আলগা হয়ে যাচ্ছে। যে সময়ে সিনিয়র-জুনিয়রদের মধ্যে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আস্থার জায়গাটা আকাশের মতো বিশাল হওয়া দরকার সেই সময়ে তা হয়ে যাচ্ছে ক্ষীণ। আমরা বোধকরি একটা সংকটকে মোটেও গুরুত্ব দিচ্ছি না। পাশের দেশের বাংলা টেলিভিশন চ্যানেল আমাদের দেশে ক্রমান্বয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বাংলায় ডাবিং করা বিদেশি একাধিক টিভি সিরিয়াল দেশের বেশ কয়েকটি টিভি চ্যানেলে প্রচার শুরু হয়েছে। এই বাস্তবতায় আমরা আমাদের যোগ্যতা ও সম্ভাবনার জায়গাটা কতটা তৈরি করতে পেরেছি? আমরা কি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত? দেশের স্বার্থে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে ভাববেন সবাই।

প্রসূন আমার সঙ্গে চরম বেয়াদবি করেছে-রোকেয়া প্রাচী

রোকেয়া প্রাচী বলেছেন, প্রসূন আজাদ আমার সঙ্গে চরম বেয়াদবি করেছেন। নাট্য পরিচালকদের সম্পর্কে অনেক আপত্তিকর কথা বলেছেন। তার আচরণ ছিল অশোভন ঔদ্ধত্যপুর্ণ দুর্বিনীত। তিন সংগঠনের কাছে বিচার দিয়েছি। মিডিয়াকে সুষ্ঠুভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবার ক্ষেত্রে প্রসূনের বিচার হতে হবে।

আমি দুষ্টু তবে বেয়াদব নই -প্রসূন আজাদ

রোকেয়া প্রাচীর সঙ্গে প্রসূন আজাদ বেয়াদবি করেছেন- এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রসূন বলেছেন, আমি দুষ্টু তবে বেয়াদব নই। আমি কোনো অভিযোগেরই জবাব দিব না। কারণ আমি মুখ খুললে অনেকেই বিব্রত হবেন…

একটি বিজ্ঞাপন এবং কিছু অপ্রীতিকর মুহূর্ত

বিষয়টা এড়িয়ে যাওয়ার মতো না। অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন এটাতো ফেসবুকের ঘটনা। পত্র-পত্রিকায় এনিয়ে লেখারই বা কী আছে? তাদের উদ্দেশ্যে, বলি ফেসবুক এখন আমাদের সমাজ জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কাজেই সেখানে আমরা কি দেখছি, কি পড়ছি তাও আলোচনা হওয়া দরকার।

হ্যাঁ, যে বিষয়ের কথা বলছিলাম। ব্রেস্ট ক্যান্সারের ওপর একটি টিভি বিজ্ঞাপন বানানো হবে। মডেল হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে নায়লা নাঈমকে। এই মহিলা পেশায় একজন চিকিৎসক। ফেসবুক অথবা ওয়েব সাইটে ঢুকলে তার যেসব ছবি দেখা যায় তার সঙ্গে বাংলাদেশের সংস্কৃতির কোনো মিল নেই। তাকে নিয়ে বানানো হচ্ছিল একটি টিভি বিজ্ঞাপন। ক্যামেরা রেডি। পর্দায় দেখা গেল নায়লা নাঈমকে। সালোয়ার কামিজ পরেছেন। ক্যামেরার পেছন থেকে বলা হলো- আপা আপনার কামিজটা যদি একটু… সাথে সাথেই রেগে উঠলেন নায়লা নাঈম। উত্তেজিত কণ্ঠে বলতে থাকলেন- আর কত খুলব? আর কি দেখতে চান আপনারা? আপনারা এখানে ক্যামেরা ধরে আছেন। ঐ যে দেখেন পাশের বাড়ির বারান্দা থেকে বাইনোকুলার দিয়ে আমার শরীর দেখার চেষ্টা হচ্ছে… আপনারা আর কি দেখতে চান? আসেন আমি আপনাদের সব কিছু খুলে দেখাব…

নায়লা নাঈম উত্তেজিত হয়েই কথাগুলো বলছিলেন। তখন নেপথ্যে একটি কণ্ঠ ছিল এরকম- আপা এটাতো বিজ্ঞাপন, একটু না খুললে…

নায়লা নাঈমকে নিয়ে এই ধরনের একটি বিজ্ঞাপন বানানো এবং তা ফেসবুকে ছেড়ে দেয়ার ঘটনা সত্যি আমাদের বিস্মিত করেছে। আমাদের শোবিজকে সঠিক পথে পরিচালিত করার ক্ষেত্রে এই ধরনের কর্মকাণ্ডের ব্যাপারেও সচেতন পদক্ষেপ জরুরি।