Home আরোও বিভাগ মিউজিক ভিডিও কে আসল কে নকল!

মিউজিক ভিডিও কে আসল কে নকল!

SHARE

সৈয়দ ইকবাল: গত কয়েক বছর ধরেই আমাদের সঙ্গীতাঙ্গণে গানের পাশাপাশি গান ভিডিওর জোয়ার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বর্তমানে শ্রোতারা গান শোনার পাশাপাশি তা দেখতেও চান। তার মানে গান এখন শোনার পাশাপাশি দেখারও বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই তো নামিদামি সঙ্গীততারকা থেকে শুরু করে আজকের একজন নতুন শিল্পীও গানের সঙ্গে গান ভিডিও রিলিজ করছেন। আর শ্রোতারাও ভিন্ন গল্প ও নিত্য নতুন নির্মাণশৈলীর গান ভিডিওগুলো লুফে নিচ্ছেন। তবে হাল সময়ে এই মিউজিক ভিডিও নির্মাণ নিয়ে শোনা যাচ্ছে নানান ধরনের সমালোচনা। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশের জনপ্রিয় কিছু মিউজিক ভিডিওর আদলে দেশে নির্মিত হয়েছে বেশকিছু মিউজিক ভিডিও। তাই নিয়েই সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

কলকাতার অখ্যাত শিল্পীরা যেসময়ে নিজেদের ক্যারিয়ারের আর্থিক সঙ্গতির জন্য বাংলাদেশের প্রযোজকদের সাথে লবিং করছেন ঠিক সে সময় আমাদের দেশের শিল্পীরাও সেইসব অখ্যাত শিল্পী ও সঙ্গীত পরিচালকদের হাত ধরে নিজেকে হিট করার স্বপ্ন বুনছেন। মূলত ক্যারিয়ারে হতাশাগ্রসত্ম শিল্পীরাই এই ফাঁদে পা দিচ্ছেন। ক্যারিয়ারে একের পর এক সুর নকল কিংবা নিজের মিউজিক ভিডিও অন্যেরটা দেখে নকল করছেন অনেক শিল্পী। এদের মধ্যে তরুণ শিল্পীদের সংখ্যাই বেশী। মূলতঃ এই শিল্পীরা ডোবাচ্ছেন গোটা মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির ইমেজ। এ ব্যাপারে অধিকাংশ সিনিয়র শিল্পী সঙ্গীতাঙ্গনের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।

সম্প্রতি সঙ্গীতশিল্পী কণা ও ইমরান এই অভিযোগে সমালোচিত হয়েছেন। কণ্ঠশিল্পী ইমরান মাহমুদুল নতুন করে সমালোচনায় এসেছেন তার নতুন প্রকাশিত একটি গানের মিউজিক ভিডিও প্রকাশ করে। গানটি প্রশংসিত হলেও ইমরানের এই গানটির ভিডিও নকলের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে। ইমরান ও কণা ছাড়াও পড়শী, বেলাল খান, আরেফিন রুমীসহ অনেকের বিরুদ্ধেই নকলের অভিযোগ রয়েছে। শুধু তাই নয় আমেরিকা সফরে বিভিন্ন অনৈতিক কাজে জড়িয়ে বাংলাদেশি কমিউনিটিকে লজ্জায় ফেলে দেন একজন শিল্পী। তখনও তাকে নিয়ে বিতর্ক কম হয়নি। বিটিভির এক অনুষ্ঠানে এই শিল্পী দেশ বরেণ্য সঙ্গীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিনের সাথেও বেয়াদবি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এব্যাপারে শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিনও পত্রিকায় বক্তব্য দিয়েছিলেন।

২৮ এপ্রিল ইউটিউবে মুক্তি পায় ইমরানের নতুন মিউজিক ভিডিও। ‘ফিরে আসো না’ শিরোনামের এই মিউজিক ভিডিওতে ইমরানের সঙ্গে প্রথমবারের মতো মডেল হয়েছেন মডেল ও অভিনেত্রী পিয়া বিপাশা। গানটি লিখেছেন স্নেহাশিষ ঘোষ এবং সুর ও সঙ্গীতায়োজন করেছেন ইমরান। ভিডিওটি নির্মাণ করেছেন চন্দন রয় চৌধুরী। মুক্তির একদিনেই প্রায় তিন লক্ষ বার দেখা হয়েছে ভিডিওটি। কিন্তু মুক্তির দু’দিনের মাথায় মিউজিক ভিডিওটি নিয়ে নকলের অভিযোগ ওঠে। শুরু হয় সঙ্গীতাঙ্গণে সমালোচনার ঝড়। রাশিয়ান শিল্পী এলভিরা টি’র জনপ্রিয় গান ‘ভিসিও রেশেনো’র (ইংরেজিতে অষষ অমৎববফ) ভিডিও নকল করা হয়েছে ইমরানের ব্যয়বহুল মিউজিক ভিডিওতে। ২০১১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ইউটিউবে প্রকাশ পেয়েছিল এলভিরাটির এই গানটি। ভিডিওটি দেখা হয়েছে আড়াই কোটিবারেরও বেশি। অবাক করার বিষয় হচ্ছে রাশিয়ান মিউজিক ভিডিওটি যে থিম নিয়ে নির্মিত হয়েছে, ইমরানের মিউজিক ভিডিওটিও সেই একই থিম নিয়ে নির্মিত। শুধু আলাদা কিছু দৃশ্য সংযোজন এবং বিয়োজন হয়েছে। মূল গানে মৃতদেহই গাইছেন গান, অর্থাৎ অপার্থিব জগৎ থেকে পার্থিব বিষয়াদি নিয়ে কথা বলছে। ফলে বদলে গেছে দুনিয়াকে দেখার বাসত্মবতা। আর বাংলায় গাইছেন ওই নারীর প্রেমিক। মূল ভিডিওর বিষয়াদি মৃত ব্যক্তির চোখে দেখা, নকলটি জীবিত ব্যক্তির চোখে দেখা। মূল গানে পায়ে মোজা পরানো হয়, বাংলায় হাতে মোজা পরানো হয়েছে এটাই বড় ধরনের পার্থক্য বলতেই হবে! মূল ভিডিওতে জামার দু’পাশের ফিতা খোলা হয়, বাংলায় একপাশে তা খোলা হয়!

এব্যাপারে অবশ্য মুখ খুলেছেন সঙ্গীতশিল্পী ইমরান ও মিউজিক ভিডিওর পরিচালক চন্দন রয় চৌধুরী। ইমরান বলেন, ‘আমার গানের মিউজিক ভিডিওর তিনটা অংশ আছে। একটি অংশ রাশিয়ান ঐ ভিডিওটি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে করা। ভিডিও নির্মাতা চন্দন চৌধুরী হয়তো মনে করেছেন যে ভিডিওর ঐ অংশগুলোতে এরকম কিছু রাখা দরকার। এজন্যই হয়তো তিনি ঐ ভিডিও থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এই ভিডিওর একটি অংশ বানিয়েছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘গানের কথা ও সুরে যেহেতু কোন সমস্যা নেই তাই আমি এইসব নিয়ে একদমই মাথা ঘামাচ্ছি না। আমার ভক্তরা ভিডিওটি গ্রহণ করেছে এটাই হচ্ছে শেষ কথা।’

অন্যদিকে ভিডিও নির্মাতা চন্দন চৌধুরী বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে যদি সমালোচনা হয়েই থাকে তবে আমি বলবো আমি পেরেছি ভালো কিছু নির্মাণ করতে। যা নিয়ে আলোচনা হওয়ার মতো কিছু আছে অনেকে তা নিয়েই সমালোচনা করতে ভালোবাসে। হ্যাঁ, আমি ভিডিওর একটি অংশ রাশিয়ান ঐ ভিডিও থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বানিয়েছি। দিনশেষে আমি সবাইকে এটা দেখাতেও পেরেছি যে অন্যদেশ যেটা বানাতে পারে তা আমরাও পারি। বাংলাদেশের শুধু মিউজিক ভিডিও নয়, নাটক, টিভিসি, সিনেমাতো হুবহু নকল হয়ে থাকে। আর এখানে মাত্র একটি গানের অংশ ফলো করা হয়েছে। আমি বিষয়টি নিয়ে মোটেই ভাবছি না।’

এদিকে তাদের দু’জনের এমন বক্তব্যে সিনিয়র অনেক শিল্পীই বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তাদের মতে, অন্যের বড় চুরির উদাহরণ দিয়ে নিজে বাঁচার চেষ্টা করছেন। সাম্প্রতিক মিউজিক ভিডিও নকলের বিতর্কে খোদ শিল্পীই সেটিকে গুরুত্ব দিতে চাননি। আর এ ধরণের চর্চায় মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির প্রতি সাধারণ দর্শকদের যে সম্মান তা নিয়েও আজ প্রশ্ন উঠছে বলে অনেকের অভিমত।

আরেফিন রুমীর ব্যক্তিগত জীবনের বিশৃঙ্খলা নিয়ে ঔদ্ধত্ত্ব পূর্ণ আচরণ সঙ্গীতাঙ্গনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। দুরবীন ব্যান্ডের শহীদের হাত ধরে যে রুমী ইন্ডাস্ট্রিতে আসেন পরে তার সাথেই নানামূখী প্রতারণা, একের পর এক নকল সুরের কাজ এসবের কারণে তার ব্যাপারে অনেক সমালোচনা শোনা যায়।

দেশের বাইরে গায়িকা পড়শী নিজের অডিয়েন্স মাতাতে না পেরে ‘লুঙ্গি ড্যান্স গাওয়া শুরু করেন কাণ্ডজ্ঞানবিবর্জিত হয়েই। তার ভিডিও সাধারণ দর্শকেরা আপলোড করে নিন্দা জানান। এ ভাবে ঐ শিল্পী দেশের জন্য কতটা সম্মান বয়ে আনছেন সে ব্যাপারেও প্রশ্ন উঠেছে।

অন্যদিকে মিউজিক ভিডিও কালচারে সম্প্রতি গায়িকা কনা ভারতীয় একটি গানের হুবহু নকলের পরও দুঃখ প্রকাশ না করে সেটিকে জাস্টিফাই করার জন্য ঔদ্ধর্ত্বপূর্ণ আচরণ করেন। সাংবাদিকদেরকে তার প্রতিপক্ষ বলে জ্ঞান দেন।

তার নতুন ‘রেশমী চুড়ি’ শিরোনামের নতুন গানটি নিয়ে সঙ্গীতাঙ্গণে বেশ সমালোচনার ঝড় বইছে। অনেকেরই অভিযোগ, গানটি বলিউডের ‘রয়’ ছবির ‘চিতিয়া কা লাইয়া রে’ গানের আদলে করা হয়েছে। শুধু সুর-সংগীতই নয়, মিউজিক ভিডিওটিও একই গানের আদলে নির্মিত হয়েছে। অনেকে মনে করছেন, কণা তার পড়নত্ম ক্যারিয়ারকে আবার চাঙ্গা করতে নকলের আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু এতে লাভের লাভ কিছুই হবে না, উল্টো আরও ডুববে তার ক্যারিয়ার এটা অনেকের ধারনা। রেশমি চুড়ি’ গানটি লিখেছেন কলকাতার প্রিয় চট্টোপাধ্যায়, সুর ও সংগীত পরিচালনা করেছেন আকাশ সেন। গানটির ভিডিও নির্মাণ করেছেন শিবরাম শর্মা। আর গানটি কণা গেয়েছেন সফটওয়্যার এর অটোটিউন ব্যবহার করে। অটোটিউন ব্যবহার করে  যে কোন গলাকে সুরেলা গলা করা যায়। যারা একটু গান বোঝেন, তারা এ ধরণের গানকে কখনই সমর্থন করেন না।

সর্বাধিক নকল ভিডিও নির্মাতা হিসেবে চন্দন চৌধুরী রেকর্ডের খাতায় নাম লেখাতে চলেছেন। অথচ কেন শিল্পীরা তাকে দিয়ে সেটি করাচ্ছেন সেটিও প্রশ্ন সাপেক্ষ।

বাংলাদেশের অন্যতম সেরা গায়ক, আইয়ুব বাচ্চু বেশ বিরক্তি প্রকাশ করেই বলেন, ‘সফটওয়্যার এর অটোটিউন আমাদের দেশের গান শিল্পকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে গেছে। আজকের অনেক শিল্পীই এই অটোটিউন ব্যবহার করে তথাকথিত জনপ্রিয় শিল্পী হয়ে যাচ্ছেন। যে কেউ চাইলেই শিল্পী হয়ে যাচ্ছেন।  আর এই শিল্পীরাই যখন কোনো লাইভ অনুষ্ঠানে গান গায় তখন তার আগের গানের সঙ্গে কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না।’