Home প্রতিবেদন শাহ সিমেন্ট সুইট হোম মা মেয়ের স্থাপত্য ভুবন

মা মেয়ের স্থাপত্য ভুবন

SHARE
Mom-doughter-architect

নভেরা গওহর। বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য স্থপতি। দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে বাংলাদেশের স্থাপত্য অঙ্গনে দৃপ্ত পদচারণা তার। আন্তরিক সদিচ্ছা, দৃঢ় মনোবল ও উৎসাহ এবং কঠোর পরিশ্রম তাকে আজকের অবস্থানে এনেছে। ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এর স্থাপত্য বিভাগ থেকে ব্যাচেলর অব আর্কিটেকচার ডিগ্রি লাভ করেন। একই বছর তিনি যোগ দেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের স্থাপত্য অধিদপ্তরে সহকারি স্থপতি হিসেবে। দীর্ঘ ৩৩ বছর স্থাপত্য অধিদপ্তরে কর্মে নিয়োজিত থেকে ২০১৪ সালে ডেপুটি চীফ আর্কিটেক্ট হিসেবে অবসর নেন। চাকরি জীবনে অনেক সরকারি ভবনের নকশার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। সরকারি চাকরিতে থাকাকালিন ২০১১ সালে তিনি গড়ে তোলেন ‘নওয়াজ এন্ড এসোসিয়েটস’ নামের একটি কনসালটেন্সি ফার্ম। বর্তমানে তিনি এই ফার্মের প্রিন্সিপ্যাল আর্কিটেক্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মেয়ে স্থপতি শেরিন লূৎফা নওয়াজ ম্যানেজিং পার্টনার। দুজনেই আধুনিক স্থাপত্য শৈলীর সমন্বয়ে স্থাপত্য শিল্পে সৃষ্টিশীল কাজ করে চলেছেন। এবার শাহ্ সিমেন্ট সুইট হোমে মা- মেয়ে দুজনকে নিয়ে প্রতিবেদন। লিখেছেনÑ মোহাম্মদ তারেক
স্থাপত্য শিল্পে এদেশের নারীদের অবদান কোনো অংশেই কম নয়। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ স্থপতি নভেরা গওহর। এক সময় মনে করা হতো নারীরা শুধু মাত্র অফিশিয়াল কাজ আর ঘর-সংসার সামলাবে। সে ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছেন তিনি। নারী বা পুরুষ নয় দক্ষতা, মেধা ও যোগ্যতা থাকলে যে কেউ ভালো কাজ করতে পারে এর জলন্ত উদাহরণ নভেরা গওহর। ছয় ভাইবোনের মধ্যে ছোট নভেরা। তার গ্রামের বাড়ি মনোহরপুরে। বেড়ে ওঠা যশোর শহরে। নভেরার বাবার নাম মরহুম গওহর আলী। তিনি একজন শিক্ষক ছিলেন। মা নজিরুন নেসা গৃহিনী। স্কুল জীবন থেকেই ছবি আঁকা স্কেচ করা ছিল তার প্রচন্ড নেশা। স্বপ্ন দেখতেন ক্রিয়েটিভ কিছু করার। ছোটবেলা থেকেই আর্কিটেকচারের প্রতি তার ভালোবাসা জন্মায়। সেই ভালোবাসা থেকেই আজ তিনি হয়েছেন সফল একজন স্থপতি। যশোর গর্ভনমেন্ট স্কুল এবং কলেজ থেকে তিনি এসএসসি ও এইচএসসি কৃতিত্বের সাথে পাস করে ভর্তি হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এর স্থাপত্য বিভাগে। এবং সেখানেই আর্কিটেকচার ডিগ্রি লাভ করেন।
পাস করে বের হওয়ার পর পরই তিনি যোগ দেন স্বনামধন্য স্থপতি বশিরুল হকের ফার্মে। সেখানে কিছুদিন কাজ করেন। নভেরার বাবা চাইতেন না তার মেয়ে অনেক সময় ধরে ঘরের বাইরে থাকুক। কোনো ফার্মে কাজ করুক। তাই বাবার ইচ্ছাটাকে প্রাধান্য দিয়ে নভেরা গওহর যোগ দেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের স্থাপত্য অধিদপ্তরে সহকারি স্থপতি হিসেবে। চাকরিতে থাকা কালিন ১৯৯৬ সালে তিনি আরবান এনভারোমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট-এ স্বল্পকালিন সময়ে পোস্ট ডিপ্লোমা করেন তদানিন্তন সচিব মরহুম কামরুল ইসলাম সিদ্দিকীর নির্দেশে। ২০০১ সালে রেইনওয়াটার হারভেসটিং উপর প্রশিক্ষনের জন্য জাপান ও ভারতে যান। এছাড়া দেশে মিন্টু রোডে মন্ত্রীদের বাসভবন ও সরকারী শিশু পরিবারের ভবনের কাজ এবং অন্যান্য কিছু ভবনের কাজ করেন। সততা ও নিষ্ঠার সাথে দীর্ঘ ৩৩ বছর কাজ করে গেছেন স্থাপত্য অধিদপ্তরে। ২০১৪ সালে নভেরা গওহর ডেপুটি চিফ আর্কিটেক্ট হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। স্থাপত্য অধিদপ্তরে থাকা কালিন নিজে গড়ে তোলেন ‘নওয়াজ এন্ড এসোসিয়েটস’ নামের একটি কনসালটেন্সি ফার্ম। বতর্মানে তিনি এই ফার্মের প্রিন্সিপ্যাল আর্কিটেক্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। চাকরিতে থাকাকালীন বিভিন্ন প্রজেক্টের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। যেমনÑ

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের বর্ধিত অংশের কাজ, শ্যামলীর কিডনী হাসপাতাল, শাহবাগের পিজি হাসপাতালের কিছু অংশের কাজ, হাইকোর্টের আনিস ভবন, পুরো রমনা পার্কের উন্নয়নের কাজ ইত্যাদি। এ ছাড়াও শ্রম মন্ত্রনালয়, সমাজকল্যান মন্ত্রণালয়, সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়, মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় সহ বিভিন্ন মন্ত্রনালয়ের বিভিন্ন প্রজেক্টের সাথে জড়িত ছিলেন নভেরা গওহর। নওয়াজ এন্ড এসোসিয়েটস হতে তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছেÑ শ্রীপুরের লেজার বাংলাদেশের ৫৫ বিঘার ওপর নির্মিত ‘কাল মেঘ ভিলা’ ও মেরিনা ও উড ল্যান্ড প্লটের ডিজাইন, কক্সবাজার ইনানী বীচের রিসোর্ট ও রেস্টুরেন্ট, সাভারের উত্তরা মটর এন্ড বাজাজ এর যৌথ মোটর বাইক ফ্যাক্টরি বিল্ডিং, সারা বাংলাদেশে উত্তরা মোটর বাইক শোরুম, ওয়ার্কশপ, মালিবাগে ঘচখ এর ভবন, গুলশান-২ এর লেজার বাংলাদেশ অফিসের ইন্টেরিয়র, এমজিএইচ গ্রæপ এবং তার্কিশ অ্যাম্বাসির ইন্টেরিয়র, গুলশান-২ পার্কের চিলড্রেন কর্নার ডিজাইন, এমজিএইচ এর অধীনে সিঙ্গাপুর এয়ার লাইন্স এর কার্গো অফিসের ইন্টেরিয়র, ক্যান্টনমেন্টের এয়ার ফোর্স অফিস বিল্ডিংয়ের কিছু ইন্টেরিয়র, এমজিএইচ এর শিপিং লাইনের কিছু কাজ, মিরপুরের হারবোরিয়াম, সরকারি বিভিন্ন ক্যাটাগরির আবাসন সহ অসংখ্য ভবনের ডিজাইন ও ইন্টেরিয়র করেছেন। এছাড়াও বেশ কিছু নতুন প্রজেক্টের কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। ১৯৮২ সালে বিয়ে করেন নভেরা গওহর। স্বামীর নাম কাদের নওয়াজ। তিনি নওয়াজ এন্ড এসোসিয়েটস ফার্মের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন। তাদের রয়েছে দুই সন্তান। মেয়ে শেরিন লুৎফা নওয়াজ নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির স্থাপত্য বিভাগ থেকে পাশ করা স্থপতি। তিনি নওয়াজ এন্ড এসোসিয়েটস-এ ম্যানেজিং পার্টনার হিসেবে আছেন। ছেলে সাবেল নওয়াজ একজন ব্যারিস্টার।
স্থপতি নভেরা গওহর বলেন, আমার বাবার ইচ্ছাটাকে প্রাধান্য দিয়ে আমি সরকারি চাকরিতে যোগ দান করি। কর্মক্ষেত্রে আমার সহকর্মীদের প্রায় সবাই আমাদের একই বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এর হওয়ার কারণে কাজের পরিবেশটা ভালো ছিল। বাংলাদেশের আবহাওয়া, জলবায়ু, প্রকৃতিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিটি কাজে নজর দেন নভেরা গওহর ও শেরিন লুৎফা নওয়াজ। পাশাপাশি পেশার কাছে দায়বদ্ধ থেকে সেটাকে সততার সঙ্গে শেষ করতে সচেষ্ট থাকেন সর্বদা।