Home ভ্রমণ মানিলু বন্ধু আমার

মানিলু বন্ধু আমার

SHARE
Farjana-Brownia

ফারজানা ব্রাউনিয়া: মানুষ নাকি তার স্বপ্নের সমান বড়। কিন্তু যে বাস্তব স্বপ্নকে ছাড়িয়ে যায় না তা পৃথিবী পরিবর্তন করতে পারে না। দিনে দিনে যখন মানুষ বড় হতে থাকে তার সঙ্গে বড় হতে থাকে তার স্বপ্ন। একটি সোনালী স্বপ্নের নাম স্বর্ণ-কিশোরী। বাংলাদেশের ২ কোটি মেয়ের সোনালী জীবনের স্বপ্ন নিয়েই যার যাত্রা শুরু। সে স্বপ্ন আজ শুধু বাংলাদেশ নয় পুরো পৃথিবীর কিশোর-কিশোরীদের সোনালী জীবনের স্বপ্ন দেখে। সেই ধারাবাহিকতায় স্বর্ণ-কিশোরী দেশের গÐি পেরিয়ে ছুটে চলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সুইজারল্যান্ড, ডেনমার্ক, কাতার, মালটা, উগাÐা, ফিলিপাইন, রাশিয়া সহ বিভিন্ন দেশে। দ্বিতীয়বারের মতো রাশিয়ান সরকারের আমন্ত্রণে চল্লিশ দিনের সাংস্কৃতিক ভাব বিনিময়ের আয়োজনে পৃথিবীর ১০টি দেশের ৭০জন কিশোর-কিশোরী রয়েছে যেখানে বাংলাদেশের স্বর্ণ-কিশোরী এবং সূর্য-কিশোররা অংশগ্রহণ করে। রাশিয়ান সরকারী প্রতিষ্ঠান রোসাটাম-এর আয়োজনে নিউকিডস্ ২০১৭-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে রাশিয়ান সরকার আমন্ত্রণ জানায় সস্ত্রীক ফরিদুর রেজা সাগর এবং ফারজানা ব্রাউনিয়াকে। আনন্দের সঙ্গে যাত্রা হলো শুরু। গন্তব্য রাশিয়ার বিখ্যাত শহর সেন্ট পিটার্সবার্গ। ফরিদুর রেজা সাগর এবং কনা রেজা ঘুরেছেন পৃথিবীর প্রায় সব দেশ। কিন্তু রাশিয়ায় এই প্রথম তাদের যাত্রা। এ কারণে একধরনের আত্মপ্রসাদে ভুগছিলেন ব্রাউনিয়া, হয়তো নতুন কিছু দেখাতে পারবেন তাদের। কিন্তুঘটলো উল্টোটা। বরং, আমার জন্যই অপেক্ষা করছিলো নতুন কিছু। উড়োজাহাজ এমিরেটস্ হওয়ায় যথারীতি যাত্রা বিরতি দুবাইতে। ফরিদুর রেজা সাগরকে যারা চেনেন তারা প্রায় সকলেই জানেন আমাদের এই মানুষটি যেকোনো সাধারন মুহূর্তকেই তার আন্তরিক যাদুর ছোঁয়ায় করে দিতে পারেন অবিস্মরণীয়। তেমনি একটি চমক অপেক্ষা করছিল ব্রাউনিয়ার। দুবাইতে নেমেই ব্রাউনিয়া জানতে পারলেনÑ ফরিদুর রেজা সাগরের স্ত্রী, বিশিষ্ট নারী উদ্যোক্তা কনা রেজা ব্রাউনিয়ার জন্যও। নিয়ে যাচ্ছেন আটলান্টিস সিটিতে। পরম মমতায় হারিয়ে যাওয়া আটলান্টিস সিটির সমুদ্র পাড়ে সঙ্গী হলেন তিনি ব্রাউনিয়ার। আর সেখানেই ব্রাউনিয়ার সঙ্গে দেখা হলো নতুন বন্ধু মানিলুর সঙ্গে।

ওর নাম মানিলু। এক ছেলের মা। আমার নতুন বন্ধু। সারাদিন কাজ করে; উপার্জন করে; বাড়ি ফিরে ছেলেকে আদর করে খাবার খাইয়ে দেয়। ওর চাকরিটা বেশ মজার। অতিথিদেরকে আনন্দ দেবার জন্য পানির মাঝে বিভিন্ন কসরত করতে হয়; নাচতে হয়; গাইতে হয়। বন্ধুটি আমায় এসে গালে চুমু দিয়ে ভালোবাসা জানালো। না, আমি কোনো মানুষের কথা বলছি না। তার বসবাস পানিতে। কিন্তু সে আবার মাছও নয়। আমি একটি ডলফিনের কথা বলছি। তার বসবাস পারস্য উপসাগরে। প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রের আদলে হারিয়ে যাওয়া বিখ্যাত আটলান্টিস সিটির মতো করেই তৈরী হয়েছে দুবাইয়ের হোটেল আটলান্টিস সিটি। মানিলু সেখানেই কাজ করে। আমি যাবার পরে তার সাথে আমার এক বিশেষ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। তার জন্য নতুন কিছু নয়। প্রতিদিন বেশ কিছু মানুষের সঙ্গেই তার দেখা হয়। এমনকি তার দলনেতা – বিভিন্ন আওয়াজে এবং ইঙ্গিতে যে তাকে নির্দেশ দিয়ে থাকে – সেও মানুষ। কিন্তু আমার জন্য এটি ছিল প্রথম কোনো ডলফিনের সঙ্গে বন্ধুত্ব।

শুরুতেই পানিতে নেমে পায়ের পাতার বারিতে পানির ওপরে কিছুক্ষণ ভেসে থেকেই মনে হচ্ছিলো আমিও ডলফিনদের একজন। দলনেতা ইশারা করতেই সে আমার কাছে চলে এলো। ঠিক আমার হাতের নিচে। আমি তাকে স্পর্শ করলাম। সে নিজ সুরে আওয়াজ করলো এবং আমাদের বন্ধুত্ব হলো। তারপর পিঠে চড়িয়ে সাগরের নোনাজলে ছুটে চললো মানিলু। তার দুহাত ধরে পিঠের ওপরে চড়ে আমিও যেনো ডলফিন হয়ে গেলাম।

বেশ কিছু দূর ঘুরিয়ে এনে সে যখন আমার সঙ্গে বিভিন্ন খেলায় মত্ত তখন আমি জানতে পারলাম সে এক সন্তানের মা। ছোট্ট শিশুটিকে বাইরে আনতে সে নারাজ। তার শরীরে সন্তানকে প্রসবের পর দুগ্ধপান করানোর জন্য রয়েছে ভিন্ন দুটি কাটা, ঠিক তার পেটের নিচে। পানিতে সেই কাটার মাঝে লম্বা ঠোঁট স্ট্র-এর মতো ঢুকিয়ে শিশুটি দুধ পান করে। অন্য মাছের মতো ওদের ডিম হয় না। সন্তান প্রসব করে ওরা মানুষের মতো। আর তাই অনুভূতিও যেনো আমাদের কাছাকাছি।

সারাদিনের প্রচুর কাজের পরে শিশুটির কাছে গেলেই তার মাতৃত্ব জেগে ওঠে। পরম মমতায় শিশুকে আদর করে; খেলে এবং দুধ পান করায়। আশ্চর্য্য সুন্দর এই নারী ডলফিন মানিলু পুরো শরীর পানির উপর উঠিয়ে মাইকেল জ্যাকসনের মতো ব্রেক-ডান্স দিতে জানে। ছন্দে ছন্দে আমার ডান হাতে ঠোঁট লাগিয়ে তীব্র গতিতে ঘুরিয়ে ঘূর্ণন-নৃত্যে নেচে ওঠে মানিলু। চোখ বন্ধ করে হাতটা গোল করে ধরতেই পানির নিচ দিয়ে মানুষের মতো দুহাতের মাঝ দিয়ে উঠে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। আমি তার প্রেমে পড়ে গেলাম। জানতে চাইলাম তার প্রেমিক ডলফিনের কথা। তবে জেনে আহত হয়েছি যে, ডলফিনদের মধ্যে পুরুষরা প্রেম এবং সন্তানের ব্যাপারে অনুভূতিশীল নয়। মানুষের মাঝেও এ ধরনের ডলফিন পুরুষ লক্ষ্য করা যায় যারা সন্তান এবং প্রেমের ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন থাকে। তবে ডলফিনের স্মৃতি শক্তির চাইতে মানুষের স্মৃতি শক্তি বেশ দীর্ঘ হওয়ায় এ ধরনের পুরুষেরা জীবনের শেষ প্রান্তে ভীষণ একাকিত্বে ভোগে।

সমুদ্রের ওপরে মানিলুর সঙ্গে অনেক আনন্দময় সময় কাটিয়ে আটলান্টিসের রুমে ফিরবার পথে এক আশ্চর্য্য সমুদ্র তলদেশের অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করছিলো আমার জন্য। প্রায় তিনশ প্রজাতির মাছ রয়েছে এই সমুদ্রসম অ্যাকুরিয়ামে। হারিয়ে যাওয়া আটলান্টিসের ধ্বংসাবশেষের আশে পাশেই যেনো ঘুরছে মাছগুলো। ঘোরা মাছ থেকে শুরু করে তারা মাছ, স্টিং রে, স্কুইট, অক্টোপাস, বø্যাক ড্রাগন ফিশ, বø্যাক সি ব্যাস, ব্যাট ফিশ, কাউ ফিশ, ঈল, ঈগল রে, মেসোপেলাজিক, ব্যারেল আই, অ্যান্টার্টটিক টুথ, হাঙ্গর সহ প্রায় সকল প্রজাতির মাছই রয়েছে এখানে। হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিলো আমিও ঠিক পানির নিচেই ডুবে গেছি। সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছি।

অবশেষে রুমে এলাম। রুমের দেয়ালটি কাঁচের। সেই কাঁচের ওপাশেই রয়েছে সমুেেদ্রর পানি এবং  শত প্রজাতির মাছ বন্ধুরা। রুমের দেয়ালে সেই জীবন্ত মাছগুলো যেনো ঘোরাঘুরি করছে। ক্লান্ত শরীরে পরিশ্রান্ত হয়ে সমুদ্র-তলদেশের শোবার কক্ষের বিছানায় গা লাগাতেই যেনো রাজ্যের ঘুম চোখে নেমে এলো। ঘুমের মাঝে মৎস্যমানবী হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি সমুদ্রের তলদেশ। খুঁজে পেয়েছি হারিয়ে যাওয়া সেই বিখ্যাত আটলান্টিস সিটি।

সমুদ্রের মাঝে অবস্থিত গোলাকার এই নগরীতে খাল খনন করে পানি এবং মাছের প্রাচুর্য নিশ্চিত করা হয় সাধারণ মানুষের জন্য। এমনকি স্থাপত্যকলায়ও দেখা গেছে প্রচুর আলো-বাতাসের সমাগম। কিছু কিছু ধ্বংসাবশেষে দেখা গেলো শোবার কক্ষ সংলগ্ন ¯œানঘর ছিলো। প্লেটোর কলমে যে আদর্শ রাষ্ট্রের ছবি আঁকা হয়েছিলো তা হয়তো এই আটলান্টিস সিটি দেখেই তিনি লিখেছিলেন অথবা তার লেখা থেকেই হয়তো কাল্পনিক এই নগরীর চিত্র অঙ্কিত হয়েছিলো।

আদর্শ একটি রাষ্ট্র। আদর্শ একটি পৃথিবী। যা হবে সমতার। মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য আলো-বাতাস খাবার হবে সমান। যোগ্যতার ভিত্তিতে কেউ এগিয়ে গেলে আমরা তাকে অভিবাদন জানাতে পিছপা হবো না। আবার কেউ পিছিয়ে পড়লে তাকে একটু হাত ধরে এগিয়ে নিতেও যেনো ভুলে যাবো না।

এরই মাঝে ঘুম ভেঙে গেলো। তাকিয়ে দেখি সমুদ্রের ওপর থেকে আলো পানি ভেদ করে আমার কাঁচের দেয়ালটি আলো করে রেখেছে। তার পেছনেই সকল মাছের চলাচল শুরু হয়ে গেছে। ইস্স… দেখা হলো না – অন্ধকারে সমুদ্রের নিচের জগতে মাছেরা ঘুমায় কী করে। কারণ তখন আমিও ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। জীবনের অন্ধকার এবং আলো দুটো দিক থাকে। অন্ধকারের দিকটি মাঝে মাঝে না জানলেও চলে। তবে আলোর পথযাত্রী হিসেবে কোনো আলোর কণা যেনো দৃষ্টি না এড়ায় সে লক্ষ্যেই স্বর্ণ-কিশোরী আর সূর্য-কিশোরদের সাথে দেখা করতে যাত্রা হলো শুরু। গন্তব্য রাশিয়া।