Home শীর্ষ কাহিনি মঞ্চে সুদিনের প্রত্যাশা

মঞ্চে সুদিনের প্রত্যাশা

SHARE
Galalio

রেজানুর রহমান
মঞ্চ নাটকের ক্ষেত্রে অনেকদিন এমন দৃশ্য চোখে পড়ে নাই। বিশেষ করে মহিলা সমিতির আধুনিক ভবনটির সামনে তো নয়ই। একটা সময় মঞ্চ নাটক মানেই ছিল মহিলা সমিতি। অগ্রিম টিকেট কিনে নাটক দেখতে হতো। ছুটির দিনে নাটকের টিকেট পাওয়া ছিল ভাগ্যের ব্যাপার। মিলনায়তনের সামনে ঝুলিয়ে দেওয়া হতো ‘হাউসফুল’ লেখা বোর্ড। টিকেট না পেয়ে ফিরে যেতো অনেক দর্শক।
বহু দিন পর মহিলা সমিতির মঞ্চে তেমনই এক আনন্দময় দৃশ্য চোখে পড়ল। একটি টিকেটের জন্য সে কি হাহাকার। কারও কারও আকুতি ছিল এরকমÑ একটি টিকেট দিন। বসার জায়গা যদি নাও পাই দাঁড়িয়ে নাটক দেখবো। প্লিজ একটি টিকেট দিন।
দেশের একটি শ্রেষ্ঠ দৈনিকে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে এভাবে “সত্তর ও আশির দশককে মনে করিয়ে দিল মহিলা সমিতি। নাটক দেখার জন্য এতো মানুষ এসেছে তা ছিল বিস্ময়কর। নতুন তৈরি করা নীলিমা ইব্রাহিম মিলনায়তনে ছুটির দিন শুক্রবার সমবেত হয়েছিলেন দুই ধরনের মানুষÑ একদল মানুষের কাছে টিকেট পাওয়া ছিল হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো অভিজ্ঞতা। অন্য দলে ছিলেন কত যে মানুষ। একটি টিকেটের জন্য মরিয়া হয়ে এর কাছে- ওর কাছে ধর্না দিয়েছেন তারা। শোনা গেল এমন আর্তিও ‘ঢুকবার সুযোগ দিন শুধু, দাঁড়িয়ে দেখব’। কিন্তু তা সম্ভব নয় বলে সময় নষ্ট না করেই আসনপুর্ণ মিলনায়তনে নির্ধারিত সময়েই শুরু হলো নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের গ্যালিলিও নাটকটি। নাটক শেষে মিলনায়তন থেকে বেড়িয়ে আসা সকল দর্শকের মুখে প্রশান্তির ছায়া। ‘হ্যা অনেক দিন পর আবার একটা ভালো নাটক দেখলাম। অনেকের মন্তব্য ছিল এরকমÑ ‘আবার আসব মঞ্চে নাটক দেখতে’।
মঞ্চে দর্শক আসে না। এই অভিযোগ চলছিল বছরের পর বছর ধরে। হঠাৎ কি এমন ঘটলো যে মঞ্চের প্রতি দর্শকের নতুন করে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে? ‘গ্যালিলিও’ আবার মঞ্চে এসেছে বলেই কি দর্শকের এতো আগ্রহ? না ঠিক তা নয়। ‘গ্যালিলিও’ মঞ্চে এসেছে বলেই দর্শক ফিরেননি মঞ্চের আঙিনায়। গ্যালিলিওর পুরনো দিনের অভিনেতা-অভিনেত্রীরা ফিরেছেন বলেই দর্শকরাও ফিরেছেন। বিশিষ্ট অভিনেতা আলী যাকের, আসাদুজ্জামান নূরকে যদি আবার মঞ্চে দেখা যায় তাহলে তো দর্শকের ঘরে বসে থাকার কথা নয়। বাস্তবেও তাই ঘটেছে। বিশিষ্ট অভিনেতা আলী যাকের, আসাদুজ্জামান নূরের অভিনয় দেখার জন্যই দর্শকের এতো আগ্রহ।
নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়কে ধন্যবাদ জানাতেই হয় এই জন্য যে মঞ্চ নাটকের দুর্দিনে আবার নতুন করে তারা সক্রিয় হয়েছেন। এর আগে মঞ্চে এসেছে তাদের নতুন নাটক ওপেন কাপল। দুটি চরিত্রের এক সাহসী নাটক। অভিনয় করেন বিশিষ্ট অভিনেত্রী সারা যাকের ও অভিনেতা জিয়াউল হাসান কিসলু। নাগরিকের এই নাটকটিও মঞ্চ পাড়ায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। আশার কথা পুরনোরা আবার ফিরতে শুরু করেছেন মঞ্চে। বিশিষ্ট অভিনেত্রী অপি করিম ও আতাউর রহমান আবার মঞ্চে সক্রিয় হচ্ছেন। আলী যাকের ও ফেরদৌসী মজুমদারের সমন্বয়ে আরও একটি নতুন নাটক আসছে মঞ্চে। ফলে নাটক পাড়া আবার সরগরম হয়ে উঠেছে।
৮০ ও ৯০’র দশক ছিল মঞ্চের জন্য একটা আলোকিত সময়। ঢাকায় একমাত্র বেইলী রোডের মহিলা সমিতি ও গাইড হাউস মঞ্চেই নাটক মঞ্চস্থ হতো। ছোটো বড় প্রায় প্রতিটি নাট্যদলের নাটক হাউসফুল হতো। হঠাৎ করে মঞ্চের প্রতি দর্শকের আগ্রহ কমতে শুরু করে। যানজট, পথের দুরত্ব সহ নানা কারণে মঞ্চের প্রতি দর্শক আগ্রহ হারায় বলে অনেকের ধারনা। কিন্তু মহিলা সমিতিতে পুরনো গ্যালিলিওর নতুন করে মঞ্চয়ানের দিনে উপচেপড়া দর্শক দেখে সকল ধারনাই বদলে গেছে। যদি যানজট ও পথের দুরত্বকেই মঞ্চ নাটকের প্রধান অন্তরায় ধরা হয় তাহলে গ্যালিলিওর শোয়ের দিন রাজধানীর প্রত্যন্ত অঞ্চল যেমন মীরপুর, টঙ্গী, যাত্রাবাড়ি, পুরনো ঢাকা এমন কি সাভার, টঙ্গী থেকেও দর্শক এলো কি করে? কিসের টানে? নাটক নাকি অভিনেতা, অভিনেত্রীর টানে? কিছু দর্শকের কাছে আমরা এই প্রশ্নটিই রেখেছিলাম। মীরপুর ১০ এর বাসিন্দা আবুল কাসেম ও তার স্ত্রী এসেছিলেন গ্যালিলিও দেখতে। প্রসঙ্গ তুলতেই বললেন, আলী যাকের ও আসাদুজ্জামান নূর আমাদের অনেক প্রিয় অভিনেতা। তারা আবার মঞ্চে ফিরেছেন… তাদেরকে দেখার জন্যই আবার মহিলা সমিতিতে এসেছি। কতদিন পর আবার মঞ্চ নাটক দেখতে এলেন? প্রশ্ন করতেই সময়টা মনে করার চেষ্টা করে আবুল কাসেম বললেন, তা ধরেন ৫/৭ বছর পর… এতদিন কেন আসেননি? প্রশ্ন করতেই আবুল কাসেমের তাৎক্ষণিক জবাব ছিল এমনÑ ভালো নাটকের কোনো খোঁজ পাইনি। তাই আসিনি।
সিদ্দিকুর রহমান এসেছিলেন পুরনো ঢাকা থেকে। প্রসঙ্গ তুলতেই বললেন, আলী যাকের ও আসাদুজ্জামান নূর আমার অনেক প্রিয় অভিনেতা। এক সময় তারা গ্যালিলিও নাটকে অভিনয় করতেন। নাটকটি আবার মঞ্চে এসেছে। তাই দেখতে এসেছি। কতদিন পর মঞ্চ নাটক দেখতে এলেন? প্রশ্ন করতেই তিনি বললেন, আমি এখনও নিয়মিত নাটক দেখি। কে কি ভাবে নিবেন আমি জানিনা। যুগ বদলেছে। কিন্তু আমাদের মঞ্চ নাটকের তেমন কোনো পরিবর্তন চোখে পড়ে না। একটা সময় শুধুমাত্র নাটকের সেট দেখার জন্য অনেক দর্শক একই নাটক বার-বার দেখেছে। পদাতিকের ‘মা’ নাটকের সেট দেখার জন্য আমি দশবার নাটকটি দেখেছি। বর্তমান সময়ে অধিকাংশ নাট্যদলের নাটকে সেট, আলো ও মিউজিকের প্রতি তেমন কোনো যতœ থাকে না। কাহিনীর ক্ষেত্রেও তেমন কোনো চমক পাই না। তাই নাটক দেখে তেমন আনন্দও পাইনা। আমার একটা পরামর্শ আছে। একটা সময় দেখতাম টেলিভিশনের জনপ্রিয় তারকারা মঞ্চ নাটকে অভিনয় করতেন। টেলিভিশনে যারা অভিনয় করে যারা জনপ্রিয় ছিলেন তারাই মঞ্চ কাঁপাতেন। তাদেরকে দেখার জন্য দর্শকও আসতেন। বর্তমান সময়ে তেমনটা আর দেখা যায় না। সুবর্না মস্তাফা, শমি কায়সার, বিপাশা হায়াত, জাহিদ হাসান, তৌকির আহমেদ, চঞ্চল চৌধুরী, মোশাররফ করিম, বন্যা মির্জা, তারিক আনাম খান, নীমা রহমান সহ জনপ্রিয় টিভি তারকারা কোনো না কোনো নাট্য দলের সাথে জড়িত। তারা যদি আবার মঞ্চে সক্রিয় হন তাহলে তো মঞ্চ নাটক আবার জেগে উঠতে পারে।
সম্মানিত এই দর্শকের পরামর্শটি খুবই যুক্তিযুক্ত। একথাতো সত্য, টিভি নাটকের জনপ্রিয় তারকারাই এক সময় মঞ্চ নাটকের প্রাণ ছিলেন। টিভি নাটকে ব্যস্ততার ফলে অনেকেই মঞ্চকে ভুলে গেলেন। অথচ মঞ্চ নাটকের মাধ্যমেই তাদের অভিনয় জীবনের সুত্রপাত হয়েছিল। বর্তমান সময়ে টিভি নাটকের ব্যাপক জনপ্রিয় তারকা মোশাররফ করিমের অভিনয়ের সুত্রপাত তো ঢাকার মঞ্চ থেকেই। জাহিদ হাসান, আজিজুল হাকিম, চঞ্চল চোধুরী, শমী কায়সার, বিপাশা হায়াত, অপি করিম এরা তো মঞ্চ নাটক থেকেই উঠে আসা তারকা। অথচ টিভি নাটকের ব্যস্ততায় তারা অনেকেই মঞ্চকে ভুলে যেতে বসেছেন। উপরে যে সব তারকার কথা উল্লেখ করলাম তারা যদি নিজ নিজ নাট্য দলের মঞ্চ নাটকে আবার সক্রিয় হন তাহলে আমাদের মঞ্চ নাটকের জনপ্রিয়তা আবার ফিরে আসতে বাধ্য। জনপ্রিয় নাট্য ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান বর্তমান সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী। প্রতিদিন ব্যস্ত সময় কাটাতে হয় তাকে। মঞ্চকে ভালোবেসেই তিনি শত ব্যস্ততা সত্বেও আবার মঞ্চে সক্রিয় হয়েছেন। শারিরীক নানান অসুস্থতা সত্বেও আলী যাকের আবার মঞ্চে দাঁড়িয়েছেন। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য হলেও সকল নাট্য সংগঠনের ব্যস্ত টিভি তারকাদেরও উচিৎ আবার মঞ্চে সক্রিয় হওয়া। তাহলেই আমাদের মঞ্চ নাটক আবার ঘুরে দাঁড়াবে একথা জোর দিয়ে বলা যায়। মঞ্চ নাটকের জয় হোক।