Home আরোও বিভাগ বিনোদন বিষয়টা জীবন থেকে মাইনাস হয়ে গেছে -ড. কামাল হোসেন

বিনোদন বিষয়টা জীবন থেকে মাইনাস হয়ে গেছে -ড. কামাল হোসেন

SHARE

ড. কামাল হোসেন দেশবরেণ্য আইনজীবী, রাজনীতিবিদ। আনন্দ  আলোর চতুর্থ বর্ষের এগারোতম সংখ্যায় তাঁর একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। তাঁর এই সাক্ষাৎকারে ছিল না কোনো রাজনৈতিক প্রসঙ্গ এমনকি আইনের কথাবার্তাও..

ড. কামাল হোসেন। আইনজীবী নাকি রাজনীতিবিদ, কোন পরিচয়ে তিনি বড়? আমাদের কাছে দুটি পরিচয়েই তিনি সমান শ্রদ্ধাশীল এবং জনপ্রিয়তা বটেই। আনন্দ আলোর এক ঈদ সংখ্যার জন্য তিনি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। তবে এ সাক্ষাৎকারে নেই কোনো রাজনৈতিক প্রসঙ্গ এমনকি আইনের কথাবার্তাও। তাহলে কি আছে? আসুন ড. কামাল হোসেনর মুখিামুখি হই।

আনন্দ আলো: প্রথমেই জানতে চাই পরিবার আপনার কাছে কী?

ড. কামাল হোসেন: পরিবার হচ্ছে একজন মানুষের জীবন চলার গুরুত্বপূর্ণ দিক। এ পৃথিবীতে সেই ভাগ্যবান যে একটি সুখী পরিবারে জন্ম নিয়েছে। মানুষ হওয়ার ব্যাপারে পরিবেশ পেয়েছে, স্নেহ ভালোবাসা পেয়েছে, ও দিকনির্দেশনা পেয়েছে। পারস্পরিক সহমর্মিতা, সহনশীলতা একে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা, যেমন বড়দের প্রতি ভালোবাসা ছোটদের প্রতি স্নেহ এটাকেই আমরা বলি সুন্দর পারিবারিক জীবন। বিরাট পাওয়া। সত্যিকার অর্থে একজন মানুষ যদি মা বাবাকে শুভাকাঙক্ষী হিসেবে পেতে পারে এবং বাসত্মবে যদি তা হয়ে থাকে তাহলে এর চেয়ে ভাগ্যবান কেউ হতে পারে না। এ কথায় পরিবার আমার কাছে বেঁচে থাকার প্রেরণা।

আনন্দ আলো: আমাদের পরিবারগুলো ভেঙে গেছে ইতিমধ্যে। আমরা একসময় যৌথ পরিবার বেশি দেখতাম সেই আধিক্য এখন নেই। এই সময়ে এসে আপনি কোনটার পক্ষে, একক পরিবার না যৌথ পরিবার।

ড. কামাল হোসেন: পশ্চিম থেকে এসেছে আমাদের কালচারে একক পরিবারের ধারণা। যদিও আমাদের দেশের মানুষ পারিবারিক জীবন চায়, যৌথভাবে থাকতে চায় কিন্তু একপর্যায়ে এসে যারা শিক্ষার সুযোগ পেয়েছে তাদের মধ্যে একটা আগ্রহ থাকে- হ্যাঁ আমি আত্মনির্ভরশীল হব, আমার নিজস্ব একক জীবন গড়ব এটা সম্পূর্ণ একটা পশ্চিমা কালচার। সেদিন আমি একজন বিদেশীকে প্রশ্ন করেছিলাম, তুমি কি মা বাবার সাথে থাকো? সে বলল, না আমি মা বাবার সাথে থাকি না। তাদের সঙ্গে দেখা হয় মাঝে মধ্যে। এটা কিন্তু আমাদের জন্য খুবই বিব্রতকর, এটা কী করে হয়? একই শহরে থাকো, কাছাকাছি থাকো তবুও মাসে দু’একবারের বেশি দেখা না হওয়া এটা ঠিক না। আমরা যেভাবে মানুষ হয়েছি আমাদের যে মূল্যবোধ এসব আমরা কল্পনাই করতে পারি না। তবে আমাদের এখানে যে একক পরিবার সেখানে কিন্তু ভিন্নতা দেখা যায়। মাঝেমধ্যে বাবা মার সঙ্গে দেখা হচ্ছে যাওয়া-আসা হচ্ছে। বাবা মা নাতি-নাতনির খোঁজখবর নিচ্ছে, ভালো রান্না হলে বাবা-মার জন্য পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে, এটা শুধু উৎসবের দিনগুলোতে নয় সময় পেলেই বাবা মা অথবা ছেলে মেয়ে একে অন্যের খোঁজখবর নিচ্ছে। এটা দায়িত্ববোধ থেকে আনত্মরিকভাবে সনত্মানরা বাবা-মার জন্য করছে, মা বাবাও তেমনি করছে।

আনন্দ আলো: আপনি তো সবকিছু মিলিয়ে প্রচণ্ড ব্যসত্ম থাকেন। তারপরও বিনোদনের একটা ব্যাপার থাকে। আপনার বিনোদন কী?

ড. কামাল হোসেন: বইপড়া, কিছুটা মিউজিক শোনা হয়। একটা সময় ছিল সিনেমা দেখতাম।

আনন্দ আলো: কার গান ভালো লাগে।

ড. কামাল হোসেন: সিদ্ধার্ত শংকরের গান শুনি। এছাড়া রবীন্দ্রসঙ্গীত, কিছু ক্ল্যাসিকাল গান পছন্দ।

আনন্দ আলো: আপনার বাড়ির পাশেই নাটক সরণি ও শিল্পকলা একাডেমী। মনে পড়ে কি শেষ কবে নাটক দেখেছেন?

ড. কামাল হোসেন: বহুদিন পরে সেলিম আল দীনের একটি নাটক দেখা হয়েছে আমার। আয়োজকরা আমাকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে গিয়েছিল আমিও মনে করলাম এটা আমার ভাগ্য এবং একটা সুযোগ পেলাম। আমি এবং আমার পরিবারের এমন সুযোগ সহজেই হয় না। এখানে বলে রাখি স্বাধীনতা সংগ্রামে আমরা যারা জড়িত ছিলাম, স্বাধীনতার পরেও কিছু কিছু কাজের দায়িত্ব পেয়েছি, কাজ করতে গিয়ে এতটা চাপের মধ্যে গেছে-যাচ্ছে যে বিনোদনের বিষয়টা জীবন থেকে একেবারে মাইনাস হয়ে গেছে। এমন কি ছেলেমেয়েরা যে বড় হচ্ছিল মানে ১৯৭১ সালে আমার মেয়ের বয়স চার ওই সময় আমার সনত্মান কীভাবে মানুষ হয়েছে এটা মনেও পড়ে না। তবুও এতটুকু প্রশানিত্ম আছে যে দেশের জন্য কিছু একটা করতে পেরেছি।

আনন্দ আলো: আপনার ছোটবেলার গল্পটা ছোট করে জানতে চাই?

ড. কামাল হোসেন: ছোটবেলা কেটেছে কলকাতায়, দাদার বাড়ি বরিশালে। বাবা মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করে প্র্যাকটিস শুরু করেন। কলকাতাতেই আমার জন্ম। ১৯৪৭ সালে বাবা ঢাকা চলে আসেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজে চাকরিজীবন শুরু করেন। আমি পুরনো ঢাকার সেন্টগ্রেগরী স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেছি। তখন সেন্টগ্রেগরী স্কুল কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিয়েছিল স্কুলের পাশাপাশি কলেজ করার। আমি এই কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করি। ওই কলেজে আমার এক বছরের সিনিয়র ছিলেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ইয়াজউদ্দিন আহমেদ। ওই কলেজ থেকে সুযোগ এলো আমার আমেরিকায় লেখাপড়া করার। শুধুমাত্র ভালো রেজাল্ট করার সুবাদে আমেরিকার ওই বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে থার্ড ইয়ারে ভর্তি হওয়ার সুযোগ দেয়।

আনন্দ আলো: আপনাদের সময় ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে একটা বন্ধু ও অভিভাবক সম্পর্ক ছিল। জনশ্রুতি আছে এখন আর ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে সেই সম্পর্ক নেই।

ড. কামাল হোসেন: এটা সত্যি কথা। তখন শিক্ষকরা আমাদের কাছে অভিভাবকের মতো ছিলেন সেটা আমি স্কুল থেকে পেয়েছি। তখন স্কুলে ছাত্ররা কে কী করছে এর সবকিছুর প্রতি খেয়াল রাখতেন শিক্ষকরা। ক্লাসের পড়ার বাইরে আর কী কী বই পড়ছে খেলাধুলা করছে কিনা, বাসায় পড়ছে কিনা, কয় ঘণ্টা পড়ছে সবকিছুর হিসেব নেয়া হতো। এই যে টিউশনির ব্যাপার এর কোনো অসিত্মত্বই ছিল না। বাসায় গিয়ে শিক্ষকরা ছাত্রদের খোঁজখবর নিতেন, পড়াতেন, এর জন্য কোনো টাকা পয়সাই লাগত না। এখন অবশ্য অর্থনৈতিক চাপের কারণে কিছু মেনে নিতে হচ্ছে। তবে ওই সময় টিউশনি, টিউটর, নোট বই এসব অকল্পনীয় ছিল। এর জন্য সমাজের অবক্ষয়, মূল্যবোধ দায়ী অনেকটা। তবে পূর্বপুরুষরা আমাদের জন্য যে মূল্যবোধ রেখে গেছেন তা আক্ষরিক অর্থেই সবার জন্য একটা বড় সম্পদ। এই মূল্যবোধ থেকে যারা সরেছে, নড়েছে তারা ক্ষতিগ্রসত্ম হয়েছে।

আনন্দ আলো: বঙ্গবন্ধুর সাথে আপনার ঘনিষ্ঠতার কথা সবার জানা। তাঁর সঙ্গে আপনার পরিচয় কীভাবে হয়েছিল?

Dr-Kamal-1ড. কামাল হোসেন: আমি ১৯৫৯ সালে লন্ডন থেকে ব্যারিস্টারি পাস করে দেশে ফিরে এসেছি। তখন সামরিক আইন বলবত আছে। ওই সময় রাজনীতি নিষিদ্ধ। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তখন ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। মাঝেমধ্যে তিনি ঢাকা আসতেন। এয়ারপোর্টে আমি তাকে রিসিভ করতে যাই, ওখানেই পরিচয় হয় বঙ্গবন্ধুর সাথে। তখন আমরা বলতাম মুজিব ভাই। বঙ্গবন্ধু সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে খুব শ্রদ্ধা করতেন, বস বলে ডাকতেন। আমি বঙ্গবন্ধুকে অনেক আগে থেকেই চিনতাম ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের ইতিহাস থেকে। ওই সময় বঙ্গবন্ধুর বয়স ছিল ৩৮ বছর। ওই বয়সে দেশের এবং মানুষের জন্য কিছু করার একটা শক্তি কাজ করত তাঁর মধ্যে। ১৯৫৪ সালে মন্ত্রী হওয়ার লোভ ছেড়ে দিয়ে বললেন, আমি সংগঠন করব, মন্ত্রী হব না। ওই সময় বঙ্গবন্ধুর কাছে সবাই জানতে চাইত এরপর কী হবে, কী করা উচিত? গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা যাবে কীভাবে? তরুণ সমাজকে জাগিয়ে তোলার কি অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তার। তিনি ছিলেন দূরদর্শী এক নেতা। ’৫৯ সালে তিনি যে ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন ’৬৯ সালে সেটাই ফলে গিয়েছিল। আগরতলা মামলায় ওনার হয়ে আমি লড়েছি। আগরতলা মামলায় বঙ্গবন্ধু যেদিন ছাড়া পান সেদিন সারাদেশ ছাত্রদের মিছিলে প্রকম্পিত হয়ে উঠেছিল বঙ্গবন্ধু  োগানে। জেলে গিয়েছিলেন তিনি সবার প্রিয় মুজিব ভাই হিসেবে, জেল থেকে বেরিয়ে এলেন বঙ্গবন্ধু হয়ে।

আনন্দ আলো: আপনার রাজনৈতিক জীবনের কিছু সুখের স্মৃতির কথা জানতে চাই।

ড. কামাল হোসেন: ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট, ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন দেখেছি এবং উৎসাহিত হয়েছি। ভাষা আন্দোলনের অগ্রসৈনিক আব্দুল মতিন আমার ঘনিষ্ঠজন, ভাষা আন্দোলনের যে লিফলেট ছাড়া হয়েছিল তার খাম লিখতে দিয়েছিলেন আমাকে। আমি দেখেছি ভাষা আন্দোলনের প্রতিটি সেনানিকে। কী আত্মবিশ্বাস তাদের কী সাহস আর একাগ্রচিত্ত। এই মানুষদের সঙ্গে কাজ করা তাদেরকে সামনে থেকে প্রত্যক্ষ করা দারুণ সুখের এবং আনন্দের ছিল।

আনন্দ আলো: দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান এবং দুর্নীতি বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

ড. কামাল হোসেন: দুর্নীতির ব্যাপারে সচেতন হওয়া প্রয়োজন, বিশেষ করে সাধারণ মানুষের। আমরা যেটা লক্ষ্য করেছি পঞ্চাশ ও ষাট দশকে দুর্নীতির ব্যাপারে মানুষ বেশি সোচ্চার ছিল। আরো সক্রিয়ভাবে প্রতিবাদ করত। একসময় আমাদের দেশের মানুষ দৃঢ়কণ্ঠে উচ্চারণ করত পশ্চিমাদের মতো আমরা টাকার জন্য, দালান-কোঠা, গাড়ি বাড়ির জন্য পাগল না। আমাদের মধ্যে মূল্যবোধ আছে পরিবারের প্রতি, সমাজের প্রতি, ভাষা-সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা। দুর্নীতি হচ্ছে একটা নেশা, এটা অভাবের তাড়নায় হয় না। নেশা যদি না হতো তাহলে একটা মানুষ শত শত হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি করত না। তবে আমাকে সবচেয়ে বেশি অবাক করেছে একজন দুর্নীতিবাজকে যখন মানুষ নেতা হিসেবে মেনে নিচ্ছে। এটা সালাম, বরকতের বাংলাদেশ, নূর হোসেনের বাংলাদেশের চিত্র হতে পারে না। নূর হোসেন কি শক্তি নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন সেদিন। ‘দুর্নীতি স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’। সেই বোহেমিয়ান নূর হোসেনের নামে আমরা জাতীয়ভাবে দিবস পালন করি যার নামে রাজধানীতে চত্বর হয়েছে, সেই দেশের মানুষ দুর্নীতিবাজদেরও নেতা মেনে নেয়। এটা একটা রোগ। আসুন সবাই মিলে এই রোগ মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া চাই।

আনন্দ আলো: আপনি বাংলাদেশের ও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের আইডল। আপনার আইডল কে?

ড. কামাল হোসেন: আমি কারো আইডল যদি হয়ে থাকি তবে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করব। আমার আইডল নেলসন ম্যান্ডেলা ও অংসান সুচি। আদর্শের জন্য তারা আপোসহীন অবস্থানে আছেন। ২৭ বছর জেল খেটে ক্ষমতায় এসে নীতির সাথে কোনো আপোস না করে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন ম্যান্ডেলা। অংসান সুচি অসাধারণ এক মানুষ। তিনি জেল খেটেই চলেছেন, নীতির সাথে আপোস করেননি কখনো। মিয়ানমার সামরিক সরকার বলছে তুমি জেল থেকে বেরিয়ে বিদেশ চলে যাও আমরা কিছুই বলব না কিন্তু তিনি দেশ ছেড়ে কোথাও যাবেন না। লন্ডনে তার স্বামী ক্যান্সারে আক্রানত্ম হয়ে যখন মৃত্যুশয্যায় তখন সুচিকে বলা হলো তোমার স্বামীকে দেখার জন্য লন্ডনে যাও কিন্তু দেশে আসতে পারবেন না বলে স্বামীকে শেষবারের মতো তার দেখা হয়নি।

আনন্দ আলো: দেশবাসীর জন্য এই ঈদে কিছু বলবেন?

ড. কামাল হোসেন: হ্যাঁ, আমি সবাইকে বলতে চাই আসুন আমরা একতাবদ্ধ হই। আমাদের এত কিছু অর্জন, এত কিছু দিয়ে গেছেন আমাদের পূর্বপুরুষরা। আমরা গড়তে চাই দুর্নীতিমুক্ত, কালো অর্থনীতি মুক্ত একটি সুন্দর বাংলাদেশ। আল্লাহ যেন আমাদের সেই শক্তি সাহস দান করেন।