Home প্রতিবেদন গল্প বাংলা খেয়াল উৎসব করতে পারা অনেক বড় ঘটনা

বাংলা খেয়াল উৎসব করতে পারা অনেক বড় ঘটনা

SHARE
Azad-Rahman

আজাদ রহমান

আমি মা-বাবার প্রথম সন্তান। শৈশবকাল থেকেই তাদের মুখে শুনেছি আমি তাদের অতি আকাক্সিক্ষত সন্তান। এটা আমাকে সবসময় সজীব করে রেখেছে।
হ আমাদের গ্রামের বাড়ির বৈঠক খানায় নাটকের মহড়া চলছিল। আমার বাবা যাত্রা পালা পরিচালনা, সংগীত পরিচালনা করতেন। তিনি সঙ্গীতকে পেশা হিসেবে নেননি কিন্তু উচ্চমানের পেশাজীবীদের মতো সংস্কৃতি বিষয়ে গুণী ব্যক্তি ছিলেন। আমি অভিনয়, নৃত্যে অংশ নিতাম। যেদিন আমি পায়ে ঘুংঘুর বেঁধে নাচছিলাম হঠাৎ করে সবাই ভয় পেয়ে বাড়ির ভিতর দিকে দৌড়ে পালালো। আমি ভয়ে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করলাম। আমার মা এসে আমাকে কোলে নিয়ে বাড়ির ভিতর লুকিয়ে গেলেন। শুনেছিলাম হঠাৎ করে ডাকাত এসেছিল তাই জীবনে বেঁচে গেছি।
হ আমার লেখাপড়া শুরু করার দিন হাতে খড়ির কথা মনে পড়ে। শিক্ষক শ্রী মুরারী মোহন বাবু এসে যথারীতি মন্ত্র পাঠ করেছিলেন। মাওলানা সাহেব মিলাদ পড়েছিলেন। সকলকে আপ্যায়ন করা হয়েছিল। তখনকার নিয়ম অনুযায়ী সনের কলম এবং কাঠ কয়লার কালি দিয়ে হাতের লেখা অভ্যাস করানোর মাধ্যমে আমার হাতেখড়ি হয়েছিল।
হ বাবা আমার জন্য একটি ঘোড়া কিনে দিয়েছিলেন। আমাদের গ্রামের বাড়ি থেকে ট্রেন কিংবা বাস স্টেশনে আসতে আমি সেই ঘোড়া চড়তাম। ঘোড়ায় চড়ে নানা স্থানে যাওয়া আমার জন্য আকর্ষণীয় ছিল।
হ তখন কার কলকাতায় রাশিয়ান সার্কাস আসতো। আমার বাবা সার্কাস দেখাতে নিয়ে যেতেন। সার্কাসে ঘোড়ার খেলা দেখে আমিও আমার ঘোড়া নিয়ে একটি ক্যানেল যা আনুমানিক ২০, ২৫ বা ৩০ ফুট চওড়া হতে পারে ঘোড়ায় চড়ে পার হবার চেষ্টা করতে গিয়ে বিভ্রাট ঘটিয়েছিলাম। ঘোড়া লাফিয়ে ক্যানেল পেরিয়েছিল কিন্তু ঘোড়ার পিঠ থেকে আমি ক্যানেলের মাঝে পড়ে গিয়েছিলাম। ক্যানেলে জলের নিচে থাকা ভাঙা পাইপে আমার হাত পা কেটে রক্তাক্ত হয়ে গিয়েছিল।
হ আমার মা বলতেন আমি নাকি যখন থেকে মুখে শব্দ করতে শুরু করেছি তখন থেকেই সংগীতের সঙ্গে জড়িয়ে গেছি। সুর আমাকে আকর্ষণ করতো। আমিও শব্দ করে সুর মেলাতে চেষ্টা করতাম। পরে যখন কথা বলতে শুরু করেছি তখন গান গাইতেও শুরু করেছি। এছাড়া শিশুকালেই আমি বাংলা- ঢোল, ঢাক এবং অন্যান্য ঢোলক বাজিয়েছি, তবলা, পাখোয়াজ এবং প্রচলিত সংগীত যন্ত্র নিয়ে বাজানোর অভ্যাস করেছি। সেই অভিজ্ঞতার স্মৃতি আমার অনেক ভালোলাগার বিষয়।
হ আমার প্রথম সংগীত শিক্ষা গুরু আমার বাবা। পরে আমার আনুষ্ঠানিক সংগীত শিক্ষক-গুরু নেপাল আর্য, শিব প্রসাদ ভট্টাচার্য, ওস্তাদ সাত্তার আলী খান, কেষ্ঠ বাবু, বিন্দু বাবু এবং আরো পরে সংগীত আচার্য শ্রী তারাপদ চক্রবর্তী, তানসেন পান্ডে, রমেশ চন্দ্র ব্যানার্জী, চিত্ত রায়, মায়াদি, পঞ্চানন বাবু, পরেশ বাবু, অমিও রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবোধনন্দী, বিরেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী, মিঃ গোমেজ। তাদের কাছে শেখার আনন্দ আমার সারা জীবনের উজ্জ্বল স্মৃতি।
হ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জোড়া সাঁকোর বাড়ির তিন তলায় থাকা এবং রবীন্দ্র ভারতীতে শিক্ষা গ্রহণ, আমার মা-বাবা, ভাই-বোন, বন্ধু, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সময় কাটানোর স্মৃতি আমার উজ্জ্বল হয়ে আছে।
হ শিল্পী সেলিনা আজাদের সঙ্গে আমার বিয়ে, আমার তিন সন্তান রুমানা আজাদ, রোজানা আজাদ, নাফিসা আজাদ এদের জন্ম, তাদের বেড়ে ওঠা, তাদের বিয়ে তাদের বর আমার জামাই সাব্বির হোসেইন, রুম্মন হাসান, মোতাহার সামনান এবং তাদের ছেলে-মেয়ে রনো, রেনিতা, রুশো, নিশমা, কুহু, অনা এদের জন্ম, তাদের বেড়ে ওঠা তাদের সঙ্গে এবং আমাদের সব আত্মীয়দের সঙ্গে সময় কাটানো আমার একান্ত ভালোলাগার মুহূর্ত।
হ আমার অসংখ্য গান সৃষ্টির মুহূর্ত চলচ্চিত্রের গান ছাড়ও বিশেষ ভাব ১। পূর্বের ঐ আকাশে সূর্য ওঠেছে এবং ২। জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো। ৩। রক্তেই যদি ফোটে জীবনের ফুল। ৪। সংগ্রাম সংগ্রাম চলবে দিন-রাত অবিরাম। এই সব গান সুর করা কিংবা অন্য কোনো গান রচনা করা সবই ভালো লাগা। তবে ৩। পূর্বের ঐ আকাশে সূর্য ওঠেছে এবং ২। জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো। এই গান দুটি আমাকে খুব ভুগিয়েছে। সেই বেদনা স্মৃতি আমাকে ব্যথা দেয়।
হ আমার বাংলা খেয়াল রচনা, গাওয়া, রেকর্ড করা, শেখানো, প্রচার করা, বাংলা খেয়াল প্রচারের প্রতিষ্ঠান “সংস্কৃতি কেন্দ্র” এর মাধ্যমে দেশের প্রবীণ-নবীন শিল্পীদের নিয়ে অনুষ্ঠান করা তাদের একাত্মতা এ সবই আমার উজ্জ্বল স্মৃতি।
হ প্রতিবছর ৩১ জানুয়ারি সন্ধ্যা থেকে ১ ফেব্রæয়ারি সকাল ৯টা পর্যন্ত “বাংলা খেয়াল উৎসব” অনুষ্ঠান করা এবং চ্যানেল আই টেলিভিশনে ১৫-১৭ ঘণ্টা বিরতিহীন ভাবে এই অনুষ্ঠান সরাসরি দেশ-বিদেশে প্রচার করা এটা আমার সব ে থকে উজ্জ্বল গৌরব জনক স্মৃতি। বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ জাতীয়-দায়িত্ব পালন করার জন্য ফরিদুর রেজা সাগর এবং শাইখ সিরাজ এই দুজন সম্মানিত মিডিয়া ব্যক্তিত্ব এবং চ্যানেল আই-এর সংশ্লিষ্ট সকল কর্মীকে আমি শ্রদ্ধা এবং ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আনন্দ আলো-এর ১২ বছর পূর্তি উপলক্ষে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা রইল।