SHARE

অধ্যাপক ড. এম. শামিম জেড বসুনিয়া। বাংলাদেশের খ্যাতিমান একজন শিক্ষাবিদ এবং কাঠামোগত প্রকৌশল বিশেষজ্ঞ। একজন অভিজ্ঞ প্রকৌশলী হিসেবে দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে স্থাপনা শিল্পের কাঠামোগত ডিজাইন করে চলেছেন। ১৯৬৫ সালে বুয়েট থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। ১৯৭২ সালে তিনি মাস্টার্স সম্পন্ন করেন বুয়েট থেকে। ১৯৭৯ সালে বসুনিয়া ইংল্যান্ডের স্ট্রাথক্লাইড ইউনিভার্সিটি থেকে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮১ সালে তিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে অধ্যাপক নিযুক্ত হন। এরপর ২০০৯ সালে জানুয়ারীতে বুয়েট থেকে অবসর গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি এমিরিটাস অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটির সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। পদ্মা বহুমুখী সেতু এবং কর্ণফুলী টানেলের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও তিনি রাজশাহী ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং প্রাইম ব্যাংক লিমিটেডের স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ কনসালটিং ইঞ্জিনিয়ার্স (বিএসিই) এর সভাপতি। এবার শাহ সিমেন্ট সুইট হোমে তাকে নিয়ে প্রতিবেদন। লিখেছেন মোহাম্মদ তারেক
অধ্যাপক ড. এম শামিম জেড বসুনিয়ার গ্রামের বাড়ি রংপুর জেলায়। কিন্তু তার বেড়ে ওঠা বরিশালে। বাবার নাম নাসির উদ্দিন বসুনিয়া। তিনি বরিশাল জেলায় ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। মা মোমেনা বসুনিয়া। বরিশাল জেলা স্কুল থেকে তিনি মেট্রিকুলেশন (এসএসসি) পাস করেন ১৯৫৯ সালে। ১৯৬১ সালে ঢাকা কলেজ থেকে সায়েন্সে ইন্টারমিডিয়েট (এইচএসসি) পাস করে ভর্তি হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। ১৯৬৫ সালে তিনি স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।
স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর দীর্ঘ প্রায় চার বছর এক বিদেশী কনসালটিং ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠানে কাঠামোগত প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেন। তারপর তিনি বাবার অনুপ্রেরণায় ও উৎসাহে লেকচারার হিসেবে যোগ দেন বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি বিভিন্ন ভাবে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সহায়তা করেছেন। ১৯৭২ সালে তিনি মাস্টার্স সম্পন্ন করেন বুয়েট থেকে। এরপর ১৯৭৬ সালে উচ্চ শিক্ষার জন্য পাড়ি জমান ইংল্যান্ডে। ১৯৭৯ সালে স্ট্রাথক্লাইড ইউনিভার্সিটি থেকে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তারপর দেশে ফিরে এসে তিনি আবার শিক্ষকতা শুরু করেন বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। ২০০৯ সালের জানুয়ারীতে তিনি বুয়েট থেকে অবসর গ্রহণ করেন। এরপর তারই এক ছাত্র কিশোর কুমার সিকদারকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তোলেন অ্যাবড অব কনসালট্যান্টস (প্রাইভেট) লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান। বসুনিয়া এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আর পার্টনার হিসেবে আছেন কিশোর কুমার সিকদার। বিভিন্ন স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে দেশের মানুষকে সহযোগিতা করছেন তিনি। অধ্যাপক ড. এম শামিম জেড বসুনিয়া স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং কংক্রিট ডিজাইনের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ। তার দক্ষতার ক্ষেত্র গুলির মধ্যে রয়েছে কাঠামোগত মেরামত ও পুনর্বাসন, কাঠামোগত কংক্রিটের স্থায়িত্ব, স্বল্প ব্যয় আবাসন এবং গ্রামীণ অঞ্চল ইত্যাদি। একজন শীর্ষস্থানীয় বিশেজ্ঞ কংক্রিট প্রযুক্তিবিদ হিসেবে তিনি ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত প্রথম বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড (বিএনসিসি) তে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। তার অবদানের মধ্যে রয়েছে বিল্ডিং উপকরণ, কংক্রিট এবং ফেরো সিমেন্ট কাঠামোর নকশা, বিদ্যমান বিল্ডিং গুলির মূল্যায়ন ইত্যাদি।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে শেখ হাসিনা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি হসপিটাল বিল্ডিং

অধ্যাপক বসুনিয়া দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং কংক্রিট নির্মাণ ক্ষেত্রে কাজ করে যাচ্ছেন সততা ও নিষ্ঠার সাথে। তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছেÑ যমুনার উপর পূর্ব পশ্চিম আন্ত সংযোগ ট্রান্সমিশন লাইন, বগুড়ায় ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে শতাধিক ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র সংস্কার ও পুনর্বাসন এবং ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র গুলির জন্য মাস্টার প্লান প্রস্তত করা। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের মেরামত ও জোরদার করা, মিরপুর ক্রিকেট স্টেডিয়াম, মিরপুর ইনডোর স্টেডিয়ামের নকশা, ৩৯ তলা বিশিষ্ট সিটি সেন্টার, এনসিসি ব্যাংকের হেড অফিস বিল্ডিং, মিউচাল ট্রাস্ট ব্যাংক বিল্ডিং, মবিল বিন্ডিং, যমুনা ব্যাংক বিল্ডিং, ইসলামী ব্যাংক হেড অফিস বিল্ডিং ইত্যাদি।
নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের হয়ে তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছেÑ ভোলার সুউচ্চ জ্যাকব টাওয়ার, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে শেখ হাসিনা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি হসপিটাল বিল্ডিং, আগারগাঁয়ে ইলেকশন কমিশন বিল্ডিং, তেজগাঁও ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের হেড অফিস বিল্ডিং, গুলশান এভিনিউতে এমজেএল বাংলাদেশ লিমিটেড কমার্শিয়াল বিল্ডিং, গুলশানে যমুনা ব্যাংক লিমিটেডের হেড অফিস বিল্ডিং, তেজগাঁও ইমপালস মেডিক্যাল কলেজ এন্ড হসপিটাল বিল্ডিং, চট্টগ্রাম আগ্রাবাদে চট্টগ্রাম মা, শিশু ও জেনারেল হসপিটাল, পল্টনে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের হেড অফিস, মিরপুর-১৫ তে রাকিন সিটি মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতির আবাসিক ভবন সহ অসংখ্য প্রজেক্ট রয়েছে।
অধ্যাপক ড. এম শামিম জেড বসুনিয়া বলেন, অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দ্রুত অগ্রগতি করছে। আমরা যেমন একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার পথে। আমি আশাবাদী যে আমরা পরের কয়েক বছরে প্রচুর উন্নয়নমূলক কাজ দেখতে পাব। আমরা রাস্তা এবং মহাসড়কের অবকাঠামোগত উন্নয়নে দুর্দান্ত অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি। পদ্মা সেতুর বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য হিসেবে আমি বিশ্বাস করি এর সমাপ্তি দেশের জন্য মঙ্গলময় হবে। সরকার কর্ণফুলী টানেলও তৈরি করছে। দেশের অবকাঠামোগত মেরুদন্ডকে শক্তিশালী করার জন্য এ জাতীয় উদ্যোগ গুলি উল্লেখযোগ্য। ঢাকা থেকে অন্যান্য জেলায় যাতায়াত সময় হ্রাসের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষি ক্ষেত্রে অগ্রগতি হবে। চলমান অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলি থেকে আরও ইতিবাচক ফলাফল পাব বলে আমি আশাবাদী।
অধ্যাপক বসুনিয়া তার পাঠদান ও গবেষণা কার্যক্রম ছাড়াও বহু প্রশাসনকি পদে সাফল্যের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান এর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯০ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত সিভিল অনুষদের ডিন ছিলেন। কংক্রিট প্রযুক্তিবিদ হিসেবে তিনি ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত প্রথম বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) তে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। ১৯৯৭ সাল থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত তিনি বুয়েটের ছাত্র কল্যানের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। একজন বিশেষজ্ঞ সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে তিনি বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এর সকল সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং বিভিন্ন নির্মাণ সামগ্রীর বাংলাদেশী মান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এইচবিআরআই) গর্ভনর বোর্ডের সদস্য। এছাড়াও ডুয়েট, বুয়েট, কুয়েট এবং রুয়েটের অনুষদের সদস্য বাছাই বোর্ডের সদস্য হিসেবেও কাজ করেন।
অধ্যাপক বসুনিয়া সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এ বিশিষ্ট একজন শিক্ষাবিদ হলেও তিনি খেলাধুলা পছন্দ করেন। ফুটবল, টেনিস ভালো খেলতেন। ক্রীড়া ক্ষেত্রে একজন ভালো সংগঠক ছিলেন। ১৯৮১ সাল থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সাথে যুক্ত ছিলেন। সেই সময় তিনি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সদস্য, কোষাধ্যক্ষ ও সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশ ফুটবল দলের টিম লিডার হিসেবে তিনি জাতীয় দলকে ইউকে (২০০০), কাতারে (১৯৯৯) এবং মালদ্বীপে (১৯৯৬) নেতৃত্ব দিয়েছেন। নেপালে প্রথম সাফ গেমসে বাংলাদেশ দলের ম্যানেজার ছিলেন। আশির দশকের শেষ দিকে তিনি বাংলাদেশ অলিম্পিক এসোসিয়েশনের সদস্য ছিলেন। তিনি ১৯৯১ সালে জাপানের শীতকালীন গেমস অফ ইউনিভার্সিড এবং ১৯৯০ সালে বেইজিং এশিয়ান গেমসে প্রতিনিধিত্বকারী বিশেষ পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
বুয়েটের ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে প্রিয় শিক্ষক ছিলেন বসুনিয়া স্যার। তার ক্লাসগুলো খুবই আমোদ-প্রমোদ ও আনন্দময় মুহূর্তের মধ্য দিয়ে উপভোগ করতো শিক্ষার্থীরা। অধ্যাপক বসুনিয়া পড়াতে খুব ভালো বাসেন। আর তাই পড়ানো তার থেমে থাকেনি। এই বয়সে এসেও তিনি শিক্ষকতা করে যাচ্ছেন দাপটের সাথে।