Home আরোও বিভাগ বন্ধু বিদায় বলো না!

বন্ধু বিদায় বলো না!

SHARE
Mashrafee

মামুনুর রহমান
বাংলাদেশে ক্রিকেট শুধুমাত্র একটি খেলা নয়, ঐতিহ্য, অহংকারেরও প্রতীক হয়ে উঠেছে। ক্রিকেট হাসলেই গোটা বাংলাদেশ হাসে। আবার ক্রিকেট ব্যর্থ হলে গোটা বাংলাদেশ যেন মুষড়ে পড়ে। আর তাই ক্রিকেটের ভালো-মন্দ সব ধরনের খবরের প্রতি দেশের মানুষের অনেক কৌতুহল। মাশরাফি, সাকিব, মুশফিক, তামিম, মাহমুদুল্লাহদের যে কোনো খবরের প্রতিই সাধারন মানুষেরও অনেক আগ্রহ থাকে। বাসাবাড়ি, অফিস আদালত, পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকান, ক্লাব, রেস্তোরা, সর্বত্র খেলা বিষয়ক কোনো প্রসঙ্গ উঠলেই ক্রিকেট অজান্তেই গুরুত্বপুর্ণ হয়ে ওঠে। কয়েকদিন আগে নগরীর একটি ব্যস্ত রাস্তার মোড়ে ভ্রাম্যমান চায়ের দোকানের সামনে ভীড় দেখে কৌতুহল বশত দাঁড়িয়ে গেলাম। দোকানের সামনে বসে, দাঁড়িয়ে পাশেই দেয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে কেউ কেউ চা খাচ্ছে আর একজন লোকের কথা মনযোগ দিয়ে শুনছে। যিনি বক্তার ভ‚মিকায় অবতীর্ণ তার বয়স বোধকরি সত্তুর ছুঁই ছুঁই। প্যান্টের সাথে পাঞ্জাবি পরেছে। মাথায় বিশেষ স্টাইলের টুপি।
চা খাচ্ছে বেশ শব্দ করে। চা খেতে খেতেই কথা বলল, আরে মিয়া এই জিন্দেগিতে কী আরেকটা মাশরাফিরে পাইবেন? বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য সে কী না করেছে? ভাঙ্গা পা নিয়া বছরের পর ক্রিকেট খেলছে। জাতীয় দলের নেতৃত্ব দিচ্ছে। তার সাথে কী না এমন ব্যবহার? অবস্থাটা যেন এমন, কাজের বেলায় কাজী, কাজ ফুরালেই পাজি! আচ্ছা আপনারাই বলেন, মাশরাফি বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য কী কিছুই করে নাই?
দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে বসে থাকা সব মানুষই সমস্বরে বলে উঠলÑ হ্যাঁ হ্যাঁ সে আমাদের ক্রিকেটের জন্য অনেক কিছু করেছে। সাথে সাথে একজন তরুণ পৃথকভাবে বলে উঠল, যোগ্য নেতা মাশরাফির সম্মানজনক বিদায় চাই…
ক্রিকেটের ক্যাচ ধরার ভঙ্গিতে তরুণের কথা ছোঁ মেরে নিল ওই বৃদ্ধ লোকটি। বলল, এই খানেই আমার একটা কথা আছে। মাশরাফি কি বলেছে যে সে বিদায় চায়? আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে মাশরাফি অবসরে যাবে বলে কী চ‚ড়ান্ত ঘোষনা দিয়েছে? যদি না দিয়ে থাকে তাহলে আমরা কেন তাকে জোর খাটাচ্ছি।
এবার দোকানের সামনে বসা অন্য একজন তরুণ বলল, আংকেল আমি কি একটা কথা বলতে পারি? বৃদ্ধ লোকটি সম্মতি দিলো, হ্যা বলেন!
জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শুরু এবং শেষ দুটোই তো আছে নাকি?
হ্যা আছে।
ধরেন আপনি একটা ক্লাব চালান। আপনি ক্লাবের প্রেসিডেন্ট। আপনি ক্লাবের অনেক উন্নতি করেছেন। তাই বলে কী আপনিই সারাজীবন ক্লাবের প্রেসিডেন্ট থাকবেন? নাকি আপনি থাকতে থাকতেই নতুন যোগ্য কাউকে ক্লাবের প্রেসিডেন্ট বানাবেন? মাশরাফি বিন মর্ত্তুজা বাংলাদেশের ক্রিকেটের জীবন্ত কিংবদন্তী। বাংলাদেশের ক্রিকেটের উন্নতির ক্ষেত্রে তার অবদানের কথা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বলেও শেষ করা যাবে না। তবুও কথা থেকে যায়। বিদায় বলে একটা কথা আছে। আমরা পৃথিবীতে এসেছি বিদায় নেওয়ার জন্য। কী ব্যক্তি জীবন, কী খেলোয়াড়ি জীবন সব ক্ষেত্রেই কথাটা প্রযোজ্য। মাশরাফি এখন আর শুধু খেলোয়াড় নন তিনি এখন জননেতা, একজন সংসদ সদস্য। কাজেই তার উচিৎ সময় থাকতেই সম্মানের সাথে ক্রিকেট থেকে বিদায় নেওয়া।
এই তরুণের কথা শেষ হতে না হতেই তার পাশেই দাঁড়ানো অন্য একজন তরুণ বলল, ভাই আপনার কথায় যুক্তি আছে। মাশরাফির উচিৎ সময় থাকতেই ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়া। তাই বলে আপনি তো তাকে জোর করতে পারেন না। তাকে আকারে ইঙ্গিতে একথা বলতে পারেন না যে আমরা তোমাকে এখনই বিদায় দিতে চাই। তুমি বিদায় নিয়ে চলে যাও… এইটা তো ভাই সম্মান দেখানো না। আর যাই করেন মাশরাফিকে অসম্মান কইরেন না।
এবার আলোচনাটা খিচুড়ি পাকানোর মতো হয়ে উঠলো। চাল, ডাল, পেঁয়াজ, মরিচ, লবণ দিচ্ছে সবাই। কিন্তু পরিমানের ব্যাপারে কারই কোনো ধারনা নাই। যে যেভাবে পারে আলোচনা করেই যাচ্ছে। বোঝা গেল এই লোকগুলো বিভিন্ন টেলিভিশনে রাতের টকশো দেখে। বিতর্কটা টকশো স্টাইলেই হচ্ছে। হঠাৎ বৃদ্ধ লোকটি সবাইকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য হাত তুলে বলল, থামেন, থামেন আপনারা। আপনারা কি জানেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রধান কোচের বেতন কত?
বৃদ্ধের কথা শুনে হৈ চৈ থেমে গেল। কেউ কোনো কথা বলছে না। বৃদ্ধ বলল, বাংলাদেশের নতুন ক্রিকেট কোচের নাম জানেন? নতুন হেড কোচের নাম রাসেল ডমিঙ্গো। ট্যাক্স বা আয়কর বাদে ডমিঙ্গো মাসে বেতন পাবেন ১৫ হাজার ডলারের কাছাকাছি। বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১৩ লাখ। আয়কর সহ হেড কোচের বেতন দাঁড়াবে ১৮ হাজার ডলারের মতো। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বেতন নিয়েছেন চন্ডিকা হাথুরুসিংহে। শ্রীলংকান কোচ মাসে বেতন নিতেন ২৫ হাজার ৮০০ ডলার। টাকায় যার পরিমান প্রায় ২২ লাখ। ক্রিকেটে হেড কোচের বেতনের পরিমাণ জেনে উপস্থিত সবাই যেন অবাক। কেউ একজন বলল, এতো টাকা!
সাথে সাথেই বৃদ্ধ লোকটি বলল, অন্যদেশে ক্রিকেটের হেড কোচের বেতন আরও বেশি। ভারতের ক্রিকেটের হেড কোচ বছরে বেতন পায় ৭ কোটিরও বেশী রুপী…
ক্রিকেট কোচদের বেতনের ব্যাপারটি সাধারন এই মানুষ গুলোকে খুব একটা টানলো বলে মনে হলো না। কারণ তারা কোটি কোটি টাকার হিসাবই তো জানে না। কাজেই এতো টাকার হিসাব শুনেই বা কি হবে? মনে হচ্ছিলো ভীড়টা এবার একটু ফাঁকা হবে। দুই একজন চায়ের বিল দিয়ে চলে গেল। হঠাৎ একজন তরুণ বৃদ্ধ লোকটিকে প্রশ্ন করলো, চাচা আপনার পরিচয়টাতো জানা হলো না।
বৃদ্ধ হাসি মুখে বলল, আমি একজন সাধারন মানুষ। সরকারী চাকরি করতাম। রিটায়ার করেছি। চাকরি জীবনে নিজ প্রতিষ্ঠানের হয়ে ক্রিকেট খেলেছি। তাই ক্রিকেটের ভালো-মন্দ দিয়েই আছি…
বৃদ্ধের কথা শুনে তরুণটি প্রশ্ন করলো, তাহলে তো আপনি আমাদের ক্রিকেটের অনেক কিছুই জানেন। আমার একটা প্রশ্নের জবাব দিতে পারবেন?
বৃদ্ধ আগ্রহ দেখিয়ে বলল, হ্যা বাবা বলেন আপনার প্রশ্নটা কি?
তরুণ বলল, মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মুশফিক ও মাহমুদুল্লাহ এই পাঁচ জনকে বলা হয় আমাদের ক্রিকেটের পঞ্চপান্ডব। মাশরাফি তো শেষ পর্যন্ত থাকবেন না। তামিম দল থেকে ছুটি নিয়েছেন। মাহমুদুল্লাহ’র বর্তমানে ব্যক্তিগত পারফরমেন্স খুব একটা ভালো না। দলের অন্য যারা আছেন তারাও যে খুব একটা ভালো অবস্থায় আছেন তা তো নয়। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ কী বলে আপনার মনে হয়?
বৃদ্ধ এবার যেন কিছু একটা ভাবল। তারপর তরুণের উদ্দেশে বলল, ধরেন আমার হাতে একটা গøাস আছে। গøাসে কিছু পানি আছে। এই গøাস দেখে নানা জনে নানান মন্তব্য করবে। কেউ হয়তো বলবে গøাসটি অর্ধেক খালি। কেউ বলবে অর্ধেক ভরা। আমি কিন্তু অর্ধেক ভরা যিনি বলবেন তার পক্ষেই কথা বলব। কেন বলব জানেন? অর্ধেক ভরা কথাটার মধ্যে একটা পজিটিভ স্বপ্ন আছে। যেহেতু অর্ধেক ভরা কাজেই চিন্তার কিছু নাই। আর কিছু পানি দিলেই গøাসটি ভরে যাবে। ক্রিকেটের বেলায়ও আমি তেমনটাই দেখি। কে নাই সে কথা না ভেবে কে আছে তার কথা ভাবা জরুরি। তাই বলে অতীতকে অবহেলা করে নয়। অতীতককে স্মরণে রেখে বর্তমানে যারা আছে তাদের নিয়েই পথচলার কায়দা কানুন যারা বের করতে জানে তারাই জয়ী হয়। আশাকরি বাংলাদেশের ক্রিকেটও এভাবে জয়ের বন্দরেই পা ফেলবে। জয় হোক বাংলাদেশের ক্রিকেটের।