SHARE

দেশে চলচ্চিত্র বিষয়ক অনেক অনুষ্ঠান হয়। পদক, পুরস্কার প্রদানের পাশাপাশি চলচ্চিত্র বিষয়ক আলোচনাও হয়। কিন্তু ফজলুল হক স্মৃতি পুরস্কার প্রদানের মতো এতো আন্তরিক ও সম্মানজনক আয়োজন খুব একটা দেখা যায় না। ২০০৪ সাল থেকে প্রতিবছর চলচ্চিত্র অঙ্গনের দু’জন গুণী মানুষকে এই পুরস্কার প্রদান করা হচ্ছে। এবার ছিল পুরস্কার প্রদানের ষোলতম আসর। আর তাই ঢাকার ওয়েস্টিন হোটেলে বসেছিল তারার মেলা। শীতার্ত আবহাওয়াকে উপেক্ষা করেও চলচ্চিত্র অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ সহ দেশের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন। এবারের অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ আনিসুজ্জামান ছিলেন প্রধান অতিথি। চলচ্চিত্রের রূপবান কন্যা খ্যাত সুজাতা ও বিশিষ্ট রন্ধনবিদ কেকা ফেরদৌসী অনুষ্ঠান মঞ্চে বসেছিলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব সৈয়দ সালাউদ্দীন জাকী। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিবেশক সমিতির সভাপতি খোরশেদ আলম খসরু, বিশিষ্ট অভিনেতা আল মনসুর, চিত্র নায়িকা মৌসুমী প্রমুখ অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় ছিলেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র সাংবাদিক আব্দুর রহমান। চ্যানেল আই-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, বিশিষ্ট রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, চ্যানেল আই-এর পরিচালক জহির উদ্দিন মাহমুদ মামুন, বিশিষ্ট অভিনেতা শহীদুল আলম সাচ্চু, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার, চিত্রনায়ক ওমর সানী, বিশিষ্ট উপস্থাপক ফরহাদুর রেজা প্রবাল, শিশুসাহিত্যিক আমীরুল ইসলাম, চলচ্চিত্র নির্মাতা অরুণ চৌধুরী, সঙ্গীতশিল্পী অনিমা রায়, গীতালী হাসান সহ ফজলুল হক পরিবারের সদস্যবৃন্দ, নগরীর গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে ফজলুল হক স্মৃতি পুরস্কার ২০১৯ প্রাপ্ত কোহিনুর আক্তার সুচন্দা (চলচ্চিত্র পরিচালক) এবং রাফি হোসেনের (চলচ্চিত্র সাংবাদিকতা) হাতে পুরস্কারের অর্থমূল্য, ক্রেস্ট ও উত্তরীয় তুলে দেয়া হয়। প্রতিবছরের মতো এবারও অনুষ্ঠানটি ছিল অনেক স্বপ্ন ও প্রেরনায় মোড়া। চলচ্চিত্র সাংবাদিকতার প্রাণ পুরুষ ও চলচ্চিত্র নির্মাণের মহান কারিগর ফজলুল হকের সংগ্রামী জীবনের নানা দিক তুলে ধরে অনুষ্ঠানে এবারও বলা হয়, কিংবদন্তী চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব ফজলুল হক শুধু চলচ্চিত্রের জন্য নয় দেশের সার্বিক উন্নয়নেও ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন। আমরা যেন তাকে ভুলে না যাই।
ফজলুল হক ছিলেন এদেশের প্রথম সিনেমা পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক। পঞ্চাশের দশকে এদেশে সিনেমা শিল্পের যাত্রা শুরুর আগেই সিনে সাংবাদিকতা বা চলচ্চিত্র বিষয়ক পত্রিকা প্রকাশ করা রীতিমতো দুঃসাহসীক কাজ ছিল। এখনকার চলচ্চিত্র শিল্প বা অসংখ্য পত্র-পত্রিকার যুগে সেই সময়ের এই উদ্যোগ সম্পর্কে কল্পনা করাও কষ্টকর। ফজলুল হক সেই কাজটি করেছিলেন। সে কারনেই ফজলুল হককে এদেশের চলচ্চিত্র সাংবাদিকতার জনক বলা যায়।
১৯৫০ সালে বগুড়া থেকে সিনেমা পত্রিকাটি প্রথম প্রকাশিত হয়। পরবর্তি সময়ে এর প্রকাশনা ঢাকায় স্থানাস্তর হয়। পত্রিকাটি প্রকাশ হতো ২, এসি রায় রোড ঢাকা থেকে। পত্রিকাটির সর্বশেষ সংখ্যা প্রকাশ হয়েছে ১৯৫৯ সালে। তৎকালীন সময়ের অত্যন্ত মান সম্পন্ন ও জনপ্রিয় পত্রিকা ছিল ‘সিনেমা’। ষাটের দশকের শুরুতে ফজলুল হক ‘প্রেসিডেন্ট’ নামে একটি শিশুতোষ সিনেমা নির্মাণ করেছিলেন যা পাকিস্তান আমলে পুরস্কৃত হয়েছিল। আনন্দের সংবাদ হলো ওই সিনেমায় ফজলুল হকের দুই যোগ্য সন্তান ফরিদুর রেজা সাগর ও কেকা ফেরদৌসী ভাই-বোনের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। আরও আনন্দের সংবাদ হলো প্রেসিডেন্ট ছবিতে শিশু নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করে পুরস্কৃত হয়েছিলেন আজকের স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব ফরিদুর রেজা সাগর।
প্রেসিডেন্ট যখন নির্মিত হয় তখন ঢাকায় প্রযোজিত সিনেমার সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। পরে ‘উত্তরণ’ নামে আরও একটি সিনেমা পরিচালনা করেছিলেন ফজলুল হক। পত্রিকা সম্পাদনা বা চলচ্চিত্র পরিচালনা কোনোটাতেই তিনি থেমে থাকেননি। পরে অন্যান্য ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। এক সময় তিনি বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যান।
অনুষ্ঠানের শুরুতে শহীদুল আলম সাচ্চু নির্মিত ফজলুল হকের জীবনভিত্তিক একটা কাহিনীচিত্র প্রদর্শন করা হয়। ‘অগ্রগামী স্বাপ্নিক’ শিরোনামের এই কাহিনী চিত্রটিতে ফজলুল হকের সংগ্রামী জীবনের নানা তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবারের মতো এবারও কাহিনীচিত্রটি দেখে উপস্থিত অনেকে আবেগ আপ্লুত হয়ে ওঠেন। চলচ্চিত্র সহ দেশের সামগ্রিক ক্ষেত্রে উন্নয়ন ভাবনায় ফজলুল হকের ত্যাগের কথা স্মরণ করে এবারও অনুষ্ঠানে সেই দাবী উঠলো, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ফজলুল হকের কর্ম ভাবনার দৃষ্টান্ত তুলে ধলা জরুরি। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে চলচ্চিত্র বিষয়ক পাঠ্যসূচিতে ফজলুল হকের জীবন কাহিনী অন্তর্ভূক্ত করার দাবী উঠলো আবারও।
১৬ বছরে ৩২ জন
দেশ বরেণ্য কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের উদ্যোগে ২০০৪ সাল থেকে ফজলুল হক স্মৃতি পুরস্কার প্রদান কার্যক্রম শুরু হয়। চলতি বছর সহ মোট ১৬ বছরে দেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনের মোট ৩২ জন গুণী ব্যক্তিকে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে।
তারা হলেনÑ সাইদুল আনাম টুটুল, ফজল শাহাবুদ্দিন (২০০৪), চাষী নজরুল ইসলাম, আহমদ জামান চৌধুরী (২০০৫), হুমায়ূন আহমেদ, রফিকুজ্জামান (২০০৬), সুভাষ দত্ত, হীরেন দে (২০০৭), গোলাম রাব্বানী বিপ্লব, আব্দুর রহমান (২০০৮), আমজাদ হোসেন, সৈয়দ শামসুল হক (২০০৯), মোরশেদুল ইসলাম চিন্ময়, মুৎসুদ্দী (২০১০), ই আর খান, অনুপম হায়াৎ (২০১১), নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, গোলাম সারওয়ার (২০১২), নায়করাজ রাজ্জাক, রেজানুর রহমান (২০১৩), সৈয়দ সালাহউদ্দীন জাকী, আরেফিন বাদল (২০১৪), মাসুদ পারভেজ, শহীদুল হক খান (২০১৫), আজিজুর রহমান, মোস্তফা জব্বার (২০১৬), আব্দুল লতিফ বাচ্চু, নরেশ ভুইয়া (২০১৭), মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, শফিউজ্জামান খান লোদী (২০১৮), কোহিনুর আখতার সুচন্দা, রাফি হোসেন (২০১৯)।