SHARE

রেজানুর রহমান: এক সময় চিঠিই ছিল প্রেমিক-প্রেমিকার কাছে সাত রাজার ধন। একটা চিঠির জন্য সে কী অপেক্ষা। চিঠি যখন আসে না তখন প্রেমিক-প্রেমিকার চেহারায় আষাঢ়ের মেঘ জমে যায়। খেতে ভালো লাগে না। বেড়াতে ভালো লাগে না। রাতের ঘুম উধাও হয়ে যায়। কখনো কখনো মেজাজ হয়ে যায় খিটখিটে। এই অবস্থায় হঠাৎ এলো চিঠি। আষাঢ়ের মেঘ উধাও। কাল যা ভালো লাগেনি আজ তা ভালো লাগছে। খেতে ভালো লাগছে। বেড়াতে ভালো লাগছে। যার কাছে প্রেমের চিঠি আসে তখন তার কাছে মনে হয় পৃথিবীটা আসলেই সুন্দর। কেউ কেউ মনের অজানেত্ম বলে ওঠে মরিতে চাই না আর… মানবের মাঝে বাঁচিতে চাই…

আশির দশক। একটা ঘটনার কথা বলি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মোহসীন হলে এক বড় ভাইকে দেখতাম দিনের একটা নির্দিষ্ট সময়ে হলের গেস্ট রুমের সামনে অস্থির পায়চারি করছেন। কৌতুহলবশত খোঁজ নিয়ে জানা গেল বড় ভাই প্রতিদিন ডাক পিয়নের জন্য অপেক্ষা করেন। বেলা ১২টা থেকে সাড়ে ১২টার মধ্যে ডাকপিয়ন হলে ঢুকবেন। গেটের মুখে তার পথ আগলে দাঁড়াতেন বড় ভাই। ডাকপিয়ন প্রায়শই তাকে হতাশ করতেন- চিঠি আসে নাই। পিয়নের কথা শুনে বড় ভাই খুব কষ্ট পেতেন। কোনো কোনো দিন রুমের দরজা বন্ধ করে ঘুমাতেন। ঘুম কী আর আসে? ঘুমানোর চেষ্টা করতেন।

হঠাৎ একদিন খেয়াল করলাম বড় ভাই হলে নাই। পিয়ন আসে পিয়ন যায় কিন্তু বড় ভাইকে দেখা যায় না। রুমে গিয়ে দেখি, রুমের দরোজায় তালা মারা। পরের দিনও একই অবস্থা। তারপরের দিনও…

হঠাৎ একদিন শুনলাম বড় ভাইকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনা কী? দৌড়ে গেলাম হাসপাতালে। বড় ভাইয়ের কয়েকজন বন্ধু তাকে ঘিরে বসে আছে। তাদেরই একজন বেশ বিরক্তকণ্ঠে বললেন, এই সবের কোনো মানে হয় না। একটা মানুষ কী প্রতিদিন চিঠি লিখতে পারে? কোনো কারণে হয়তো চিঠি আসতেছে না। সেজন্য ‘নাওয়া-খাওয়া’ বন্ধ করতে হবে…

এক পর্যায়ে রহস্য উদঘাটন করা গেল। ১০ দিন হয় প্রেমিকার চিঠি পাননি বড় ভাই। সে কারণে তার কাহিল দশা। ‘নাওয়া-খাওয়া’ ছেড়ে দিয়েছেন। ফলে অসুস্থ হয়ে পড়েন। বন্ধুরা তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছে। ডাক্তার বলেছেন, চিনত্মার কারণ নাই… রোগীকে একটু হাসিখুশি রাখেন সব ঠিক হয়ে যাবে।

কিন্তু হাসিখুশি রাখার নানাবিধ চেষ্টা করার পরও রোগীর উন্নতি হচ্ছিলো না। খায় না। ঠিকমত কথা বলে না। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।

দিন দুয়েক পরে ডাক্তার বড় ভাইয়ের বন্ধুদের ডেকে নিয়ে বললেন, উনার আসলে কোন রোগ নাই। তবে উনি মানসিকভাবে অসুস্থ। হলে নিয়ে যান। বন্ধুরা মিলে চেষ্টা করে দেখেন উনাকে হাসিখুশি রাখা যায় কিনা।

ডাক্তারের কথামতো বন্ধুরা তাকে হলে নিয়ে এলো। তাঁকে প্রায় চ্যাংদোলা করে রুমে ঢোকানো হলো। রুমের তালা খোলার পর হঠাৎ করেই বড় ভাই সুস্থ হয়ে উঠলেন। ঘটনা কী? ঘটনা আর কিছুই না, একটা চিঠি… বড় ভাইয়ের প্রেমিকার চিঠি এসেছে। সবার সামনে চিঠি খুললেন বড় ভাই। চিঠি পড়ে রীতিমতো হৈচৈ শুরু করে দিলেন। বন্ধুদের বললেন, আজ তোদের জন্য চাইনিজ হবে চাইনিজ…

প্রেমের চিঠির এতটাই শক্তি।

কোনটা প্রেমের চিঠি ডাকপিয়ন হয়তো বুঝতেন না। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রেমিক-প্রেমিকার ছোট ছোট ভাই-বোন তা বুঝতো। একসময় প্রেমের চিঠির বাহক ছিল হয় প্রেমিক-প্রেমিকার ছোট ভাই-বোন না হয় কাছের কোনো বন্ধু অথবা বান্ধবী।

তখন স্কুলে পড়ি। পাশের বাসার এক বড় ভাই যাকে আমরা সিনেমার নায়কের মতো শ্রদ্ধা করতাম তিনি একদিন আমার হাতে ছোট্ট একটা খাম ধরিয়ে দিয়ে বললেন, কাজল আপাকে এটা দিয়ে আসতে পারবি? কাজল আপা আমাদের পাড়ার সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে। আমাকে বেশ আদর করতেন। বড় ভাইকে বললাম, এটা কী এমন কঠিন কাজ? আমি পারব। ব্যাস শুরু হয়ে গেল আমার ‘ডাকপিয়নের’ জীবন। কাজল আপার হাতে বড় ভাইয়ের চিঠি দেই। বড় আপা চিঠি পড়ে তাঁর উত্তর দেয়। সেটা আবার তুলে দেই বড় ভাইয়ের কাছে। একদিন কাজল আপার বড় ভাইয়ের কাছে ধরা পড়ে গেলাম। বাসায় নালিশ করা হলো আমার নামে। বাবা বকলেন। মা বকলেন। আমি আর চিঠির ব্যাপারে আগ্রহ দেখাই না। একদিন দেখলাম আমারই এক সহপাঠি ‘ডাকপিয়ন’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কাজল আপা তাকে মাঝে মাঝে চকলেট দেয়।

সময়ের বাসত্মবতায় তখনকার দিনে ‘ডাকপিয়ন’ ছিলেন সবার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। বিশেষ করে প্রেমিক-প্রেমিকার কাছে ডাকপিয়ন ছিলেন দারুন জনপ্রিয়। প্রেমের চিঠি লেখার বইও বের হতো সে সময়। অনেকে সেই বই অবলম্বনে প্রেমিক-প্রেমিকাকে চিঠি লিখতেন। তখনকার দিনে সিনেমার জনপ্রিয় গানের ওপর চটি বই প্রকাশ হতো। এইসব বই থেকে গান সংগ্রহ করে গানের ভাষায়ও প্রেমের চিঠি লিখতেন অনেকে।

Premer-Chite-1-2যুগ পাল্টেছে। এখন আর প্রেমের চিঠি লেখা হয় না। এসএমএস, ফেসবুক আর ভাইবারের আধুনিক দুনিয়ায় প্রেমের চিঠি লেখার কথা অনেকেই ভুলে গেছেন। শুধু কী প্রেমের চিঠি, ব্যক্তিগত চিঠি লেখার কথাও ভুলে গেছেন অনেকে। প্রসঙ্গ তুললে অনেকেই হয়তো অবাক হবেন। ভাববেন ঠিকই তো কবে কতদিন আগে চিঠি লিখেছি? মনে পড়ছে না।

চিঠিতো আর লেখা হয় না। তাই বলে কী প্রেম থেমে আছে? না তা নয়। প্রেম চলছে প্রেমের গতিতেই। শুধু মাধ্যম পাল্টেছে। এখন প্রেম চলে মোবাইলে, এসএমএস, ফেসবুক আর ভাইবারের মাধ্যমে। ফলে অতীতকালের মতো এখন আর অপেক্ষার প্রহর কাটাতে হয় না। যখন যা মনে আসে তাই বলা যায়। তাই করাও যায়। প্রেমের চিঠি আসে নাই বলে অসুস্থ হওয়ার কোন ঘটনা ক্ষণে ক্ষণে আদান প্রদান হয়। মন খারাপ। মোবাইলে পাঠানো হলো মেসেজ। বন্ধু পাঠালো ফিরতি মেসেজ। বললো ভাইবারে আয়। ব্যাস দুই বন্ধু, প্রেমিক-প্রেমিকা ঢুকে গেল ভাইবারে। চলতি পথেও চলছে প্রেমের কথপোকথন। আর রাত? প্রেমিক-প্রেমিকার জন্য দারুণ একটা সময়। কেউ কেউ সারারাত ধরে মোবাইলে চালায় প্রেমের সাম্পান। ফলে প্রেমের রঙ ইদানিং ক্ষণে ক্ষণে পাল্টায়। হয়তো সারারাত কথা হলো। সকাল থেকে কথা বন্ধ। গতকাল সিদ্ধানত্ম হলো চলো বিয়ে করে ফেলি। কিন্তু পরের দিনই সিন্ধানত্ম বদল।

অনেকে মনে করেন, চিঠি যুগের প্রেমই ছিল আসল প্রেম। কারণ ভালোমন্দ বোঝার ক্ষেত্রে চিঠির ভূমিকা ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এক একটা চিঠি যেন এক একটা ইতিহাস। আর চিঠি পাওয়ার জন্য প্রেমিক-প্রেমিকার অপেক্ষার ব্যাপারটাও ছিল বেশ আনন্দের। এই অপেক্ষাই সম্পর্কের শক্ত ভিত্তি গড়ে দিত।

আর এখন সম্পর্ক গড়ার কত সহজ মাধ্যম। পথে যেতে যেতেও কত কথা বলা যায়। কিন্তু কথা যতই বলি না কেন অনেক ক্ষেত্রে বোঝাপড়াটা হয় না চিঠি যুগের মতো। সে কারণে ইদানিং সম্পর্ক যত তাড়াতাড়ি গড়ে ওঠে আবার তত তাড়াতাড়ি ভেঙেও যায়।

মডেল: চঞ্চল চৌধুরী ও বাধন