Home শীর্ষ কাহিনি প্রথম স্বাধীনতা বার্ষিকীর ভাষণ

প্রথম স্বাধীনতা বার্ষিকীর ভাষণ

SHARE

শেখ মুজিবুর রহমান
আমার প্রাণপ্রিয় বীর বাঙ্গালী ভাই ও বোনেরা,
আজ আমরা স্বাধীনতার প্রথম বার্ষিকী উদ্যাপন করছি। আজকের এই মহান দিনে বেদনাভরা হৃদয়ে আমি আমার দুঃখভারাক্রান্ত দেশবাসীর সাথে একযোগে পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে যে লক্ষ লক্ষ মানুষ স্বাধীনতার জন্য আত্মদান করেছেন, তাঁদের আত্মার মাঘফেরাত কামনা করছি। একই সাথে আমি মুক্তিবাহিনীর সকল অঙ্গদল, বাংলাদেশ রাইফেলস, পুলিশ, ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, সশস্ত্র বাহিনীর দেশপ্রেমিক জওয়ান, নির্ভক যুব সমাজ, ছাত্র, কৃষক, মজদুর, বুদ্ধিজীবী তথা আমার সমগ্র সংগ্রামী জনগণকে স্বাধীনতার সংগ্রামে তাঁদের গৌরবময় ও ঐতিহাসিক ভূমিকার জন্য অভিনন্দন জানাচ্ছি। তাদের এই ঐতিহাসিক ভূমিকা এবং সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের শুধু নয়, সারা বিশ্বের উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও বর্ণবাদ বিরোধী জঙ্গী মানুষের জন্যে স্থায়ী প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
আমাদের প্রিয় দেশবাসী-গত পঁচিশ বছর ধরে আপনারা নির্দয় শোষণ, ক্ষুধা, বঞ্চনা, নিরক্ষরতা, সাম্প্রদায়িকতা, স্বৈরাচার, দারিদ্র্য ও মৃত্যুর বিরুদ্ধে নিরলস সংগ্রাম করেছেন। সাম্রাজ্যবাদী শোষকরা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে একটা নিকৃষ্টতম উপনিবেশে পরিণত করেছিল। আমরা সন্ত্রাসের মধ্যে বাস করতাম। শোষণের চাকায় পিষ্ট হয়ে মৃত্যুবরণ করতাম। আমরা যখন দারিদ্র্য ও ক্ষুধায় নিমজ্জিত, তখন তদানীন্তন পাকিস্তানী শাসকচক্র আমাদের কষ্টার্জিত তিন হাজার কোটি টাকা এখান থেকে লুট করে নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানকে গড়ে তুলেছে। আমরা যখন ন্যায় বিচারের জন্য আবেদন জানিয়েছি, তখন আমাদের ভাগ্যে জুটেছে নিষ্পেষণ আর মৃত্যু।
সমসাময়িক কালে নিষ্ঠুরতম স্বাধীনতাযুদ্ধে আমাদের ত্রিশ লক্ষ লোক প্রাণ দিয়েছে, আর তিন কোটি মানুষ সর্বস্বান্ত হইয়য়াছে। এই সবকিছুই ঘটিয়াছে আমাদের স্বাধীনতার জন্য। আজ আমি যখন আমার সোনর বাংলার দিকে তাকাই, তখন দেখিতে পাই যুদ্ধবিধ্বস্ত ধূসর পান্ডুর জমি, ধ্বংসপ্রাপ্ত গ্রাম, ক্ষুধার্ত শিশু, বিবস্ত্র নারী আর হতাশাগস্ত পুরুষ। আমি শুনিতে পাই সন্তানহারা মায়ের আর্তনাদ, নির্যাতিত নারীর ক্রন্দন ও পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধার ফরিয়াদ। আমাদের স্বাধীনতা যদি ইহাদের আশা-নিরাশার দ্বন্দ হইতে উদ্ধার করিয়া মুখে হাসি ফুটাইতে না পারে, লক্ষ লক্ষ ক্ষুধার্ত শিশুর মুখে তুলিয়া না দিতে পারে এক মুষ্টি অন্ন, মুছিয়া দিতে না পারে মায়ের অশ্রু ও বোনের বেদনা, তাহা হইলে সে স্বাধীনতা মিথ্যা, সে আত্মত্যাগ বৃথা। আমাদের কষ্টার্জিত স্বাধীনতার বর্ষপূর্তি উৎসবের লগ্নে দাঁড়াইয়া আসুন, আজ আমরা এই শপথ গ্রহণ করি, বিধস্ত মুক্ত বাংলাদেশকে আমরা গড়িয়া তুলিব। গুটি কয়েক সুবিধাবাদী নয়, সাড়ে সাত কোটি মানুষ তার সুফল ভোগ করিবে। আমি ভবিষৎ বংশধরদের সুখী ও উন্নততর জীবনের প্রতিশ্রুতি দিতেছি।
আজ আমাদের সামনে পর্বতসমান সমস্যা উপস্থিত। আজ মহাসঙ্কটের ক্রান্তিলগ্নে আমরা উপস্থিত হইয়াছি। বিদেশ ফেরত এক কোটি উদ্বাস্তু, স্বদেশের বুকে দুই কোটি গৃহহারা মানুষ, বিক্ষত কর্মহীন চালনা-চট্টগ্রাম পোতাশ্রয়, নিশ্চল কারখানা, নির্বাপিত বিদ্যুৎ সরবরাহ, অসংখ্য বেকার, অপরিমিত অরাজকতা, বিশৃঙ্খল বাণিজ্যিক সরবরাহ ব্যবস্থা, ভগ্ন সড়ক, সেতু ও বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা, দারিদ্র, খাদ্যাভাব, দ্রবমূল্যের উর্ধ্বগতি এবং অকষিত ভূমি- এ সবকিছুই আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে পাইয়াছি। জনগণের গভীর ভালোবাসা, আস্থা, অদম্য সাহস ও অতুলনীয় ঐক্য- এগুলিকে সম্বল করিয়া আমার সরকার এই সঙ্কট কাটাইয়া উঠার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করিয়াছে। আমি আশা করি, অতীতে আপনারা যেইভাবে দুর্জয় সাহসে বুক বাধিয়া ইয়াহিয়ার সামরিক অস্ত্রকে পরাভূত কারিয়াছিলেন, গভীর প্রত্যয় ও সাহস নিয়া, তেমনই বর্তমান সঙ্কটের মোকাবিলা করিবেন। আমরা পুরাতন আমলের জীর্ণ ধ্বংসস্তুপের মধ্য হইতে নূতন সমাজ গড়িয়া তুলিব।
ভাই ও বোনেরা আপনার জানেন হানাদার পাকিস্তানী বাহিনী আমাদের বাংলাদেশ রাইফেল ও পুলিশের বিপুলসংখক সদস্যকে হত্যা করিয়াছে। আইনের শাসন কায়েক ও শান্তি রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সংগঠনের অভাব বিপ্লবী বাংলাদেশ সরকারের জন্য একটা বিরাট সমস্যা হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। তখন নিযুক্তির মাধ্যমে আমরা পুলিশ বিভাগকে সংগঠিত কারিয়াছি এবং ইতোমধ্যে যে সকল সমাজবিরোধী দুস্কৃতিকারী স্বাধীনতা-উত্তর সুযোগ সুবিধাদির অপব্যবহারে লিপ্ত হইয়াছিল, তাহাদের দমন করিয়া জনসাধারণের মনে নিরাপত্তাবোধ ফিরাইয়া আনার কাজে হাত দেওয়া হইয়াছে। উত্তরাধিকার সূত্রে আমরা পাইয়াছিলাম স্বাধীন জাতির জন্য সম্পূর্ণ অনুপযোগী একটি প্রাদেশিক প্রশাসনিক কাঠামো। ইহার কিছু কিছু আবার ঔপনিবেশিক মানসিকতা কাটাইয়া উঠিতে পারিতেছিল না। তাহারা এখনও বনেদী আমলাতান্ত্রিক মনোভাবকে প্রশ্রয় দিয়া চলিয়াছে। আমরা তাহাদেরকে স্বাধীন জাতীয় সরকারের অর্থ অনুধাবনের জন্য উপদেশ দিতেছি। এবং আশা করিতেছি, তাঁহাদের পশ্চাদমুখী দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন ঘটিবে। আমার সরকার নব রাষ্ট্র এবং নূতন সমাজের উপযোগী কারিয় সমগ্র প্রশাসনিক যন্ত্রকে পুনর্গঠিত করিবে। প্রস্তাবিত প্রশাসনিক কাঠামোতে জনগণ ও সরকারি কর্মাচারীদের মধ্যে নৈকট্য সৃষ্টির পূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করা হইতেছে। আমরা বাংলাদেশের সমস্ত মহকুমাগুলিকে জেলা পর্যায়ে উন্নীত করার পরিকল্পনা তৈরি করিতেছি।
বিশষজ্ঞরা খসড়া শাসনন্ত্র প্রণয়নের কাজে নিয়োজিত রহিয়াছেন। তাহাদের কাজ অনেকটা অগ্রসর হইয়াছে এবং খসড়া শাসনতন্ত্র গণপরিষদের পূর্বেরই প্রস্তুত হইয়া যাইবে। এই শাসনতন্ত্রের মূল স্তম্ভ হইবে- জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজবাদ ও ধর্মনিরেপক্ষতা। ৫৪টি বন্ধুরাষ্ট্র এ পর্যন্ত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বীকৃতি দিয়েছেন। বিপুলসংখ্যক বন্ধুরাষ্ট্রের এই স্বীকৃতিদান রাষ্ট্রপুঞ্জের অন্যান্য সদস্যকে বাংলাদেশের বাস্তবতাকে মানিয়া নেয়ার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করিবে।
উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন ও অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের জন্য আমরা বন্ধুরাষ্ট্রগুলির নিকট হইতে উদার সাহায্য ও সহযোগিতা প্রত্যাশা করিতেছি। বিশেষ করিয়া ভারত আমাদের সুদিন ও দুর্দিনের প্রতিবেশী। সম্প্রতি মহান ভারতের মহান নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশ সফর করিয়া গিয়াছেন। এই শুভেচ্ছা সফরের প্রাক্কালে আমরা শান্তি, বন্ধুত্ব ও মৈত্রী চুক্তিতে সংহতির বন্ধনকে মজবুত করিবে। সোভিয়েত রাশিয়া আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের দুর্যোগময় মুহূর্তে পাশে আসিয়া দাঁড়াইয়াছিল। আমি সোভিয়েত রাশিয়া সফর করিয়া আসিয়াছি, সেখানে তাহাদের অকৃত্রিম আতিথেয়তা আমাকে মুদ্ধ করিয়াছে। সোভিয়েত নেতৃবর্গ বিদ্ধস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠনের কাজে সার্বিক সাহায্যের আশ্বাস দিয়াছেন। এই প্রসঙ্গে আমি পূর্ব ইউরোপীয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রপুঞ্জ যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, পশ্চিম জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, স্ক্যান্ডেনেভিয়ান দেশগুলি এবং অন্য বন্ধুরাষ্ট্রসমূহ যাহারা আমাদের দিকে সাহায্যের হাত নিয়া আগাইয়া আসিয়াছেন তাহাদের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করিতেছি। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি জোট বহির্ভূত ও সক্রিয় নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে রচিত। বৃহ-শক্তির আন্তর্জাতিক সংঘাতের বাহিরে আমরা শান্তিকামী। আমরা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নীতিতে বিশ্বাসী এবং প্রতিবেশীর সহিত সদ্ভাব সৃষ্টিতে আগ্রহী। দেশ গড়ার কাজে কেহ আমাদের সাহায্য করিতে চাহিলে তাহা আমরা গ্রহণ করিব। কিন্তু সে সাহায্য অবশ্যই হইতে হইবে নিষ্কণ্টক ও শর্তহীন। আমরা জাতীয় সার্বভৌম ও সমস্ত জাতির সম-মর্যাদার নীতিতে আস্থাশীল। আমাদের আভ্যন্তরীন ব্যাপারে কেহ হস্তক্ষেপ করিবেন না, ইহাই আমাদের কামনা।
দুর্ভাগ্যবশত পাকিস্তানের শাসকরা বাংলাদেশের বাস্তবতাকে স্বীকৃতি প্রদান করিতেছে না। তাহারা পাঁচ লক্ষ নিরীহ বাঙালিকে সন্ত্রাস ও দুর্দশার মধ্যে আটক রাখিয়াছে। আমি বিশ্বের বিবেকসম্পন্ন মানুষ ও বিশেষ করিয়া মি. ভুট্টোর নিকট আবেদন করিতেছি, তাহাদের ফিরাইয়া দেওয়া হোক। এই ইস্যুকে কোন ক্রমেই যুদ্ধবন্দিদের সহিত সমপর্যায়ে গণ্য করা চলিবে না। কারণ, যুদ্ধবন্দিদের মধ্যে এমন অনেক আছে- যাহারা শতাব্দীর নৃশংসতম হত্যার অপরাধে অপরাধী। তাহারা মানবিকতাকে লঙ্ঘন করিয়াছে এবং আন্তর্জাতিক আইন ও নীতিমালার ভিত্তিতে তাহাদের বিচার হইতে হইবে। পাকিস্তানের সংবেদনশীল সাধারণ মানুষের নিকট আমার আবেদন, নুরেমবার্গ মামলার আসামিদের হইতেও নিকৃষ্ট ধরণের এই অপরাধীদেরকে যেন তাহারা স্বজাতি বলিয়া ভাবিবেন না।
যাহারা উদ্বাস্তু হইয়া ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন, তাহারা দেশে প্রত্যাবর্তন করিয়াছেন। সাহায্য, পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনের জন্য আমরা কার্যকরী কর্মসূচি গ্রহন করিয়াছি। বিনামূল্যে ও ন্যায্যমূল্যে খাদ্য সরবরাহের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইতেছে। ছিন্নমূল মানুষের মাথা গুজিবার ঠাঁই করিয়া দেয়ার জন্য অস্থায়ী বাসগৃহ তৈরির কাজ হতে নেয়া হইয়াছে।
বিধবা, অনাথ এবং নির্যাতিত মহিলাদের পুনর্বাসন পরিকল্পনাকে সরকার অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বিবেচনা করিতেছেন। হানাদার পাকিস্তান বাহিনী যেভাবে বাংলাদেশকে ধ্বংস করিয়াছে, তাহাতে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থা পুনরুদ্ধার করিতে দশ বৎসব সময় দরকার। আমাদের বিপ্লবী সরকার তিন বৎসরের মধ্যেই এই কাজ সমাপ্ত করিতে চান।
আমার সরকার অভ্যন্তরীণ সমাজ বিপ্লবে বিশ্বাসী। পুরাতন সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন করিতে হইবে। অবাস্তব তালিকা নয়, আমার সরকার ও পার্টি বৈজ্ঞানিক সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রবর্তনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। দেশের বাস্তবিক প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে পুরাতন সমাজিক কাঠামোকে ভাঙ্গিয়া নূতন সমাজ গড়িতে হইবে। শোষণ ও অবিচারমুক্ত নূতন সমাজ আমরা গড়িয়া তুলিব এবং জাতির এই মাহক্রান্তিলগ্নে সম্পদের সমাজিকীকরণের পর্যায়ক্রমিক কর্মসূচির শুভ সূচনা হিসেবে আমার সরকার নিম্ন লিখিত বিষয়গুলি জাতীয়করণ করিতেছে:
১. ব্যাংকসমূহ (বিদেশি ব্যাংকের শাখাগুলি ভিন্ন)
২. সাধারণ ও জীবন বীমা কোম্পানিসমূহ ( বিদেশি বীমা কোম্পানির শাখাসমূহ ভিন্ন)।
৩. সকল পাটকল।
৪. সকল বস্ত্র ও সূতাকল।
৫. সকল চিনিকল।
৬. আভ্যন্তরীণ ও উপকূলীয় নৌ-যানের বৃহদাংশ।
৭ ১৫ লক্ষ টাকা মূল্যের ও তদূর্ধ্ব সকল পরিত্যক্ত ও অনুপস্থিত মালিকানাভুক্ত সম্পত্তি।
৮. বাংলাদেশ বিমান ও বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনকে সরকারি সংস্থা হিসেবে স্থাপন করা হইয়াছে।
৯. সমগ্র বহির্বাণিজ্যকে রাষ্ট্রীয়করণের লক্ষ্য নিয়া সাময়িকভাবে বহির্বাণিজ্যের বৃহদাংশকে এই মুহূর্তে ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে আনা হইয়াছে।
দেশে ও বিদেশে অবস্থানরত বাঙালি প্রতিভাবান ব্যক্তিদের আমি দেশগড়ার কাজে আগাইয়া আসার জন্য আমন্ত্রণ জানাইতেছি। সরকারি সেক্টরে কাজ করার জন্য তাহাদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হইবে। শিগগিরই যে শিল্পনীতি ঘোষণা করা হইবে, তাহাতে এইসব ব্যবস্থা সম্পর্কে বলা হইবে।
যেই সমস্ত রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠানের সহিত বাঙালিদের মালিকানার স্বার্থ সরাসরি জড়িত, সেই সমস্ত প্রতিষ্ঠানের সাবেক মালিক অথবা প্রধান কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানাইতেছি যে, তাহারা যেন অবশ্যই স্মরণ রাখবে, আমরা যে- সমস্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করিতেছি, সেইগুলি সবদিক হইতে বিপ্লবাত্মক এবং জনসাধারণকে অবশ্যই এইসব ক্ষেত্রে তাহাদের দায়িত্ব সম্পর্কে শিক্ষিত করিয়া গড়িয়া তুলিতে হইবে।
বেসরকারি ক্ষেত্রে মাঝারি ছোট শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলিকে আমাদের নীতির সুনির্দিষ্ট ভূমিকা রহিয়াছে। এইসব প্রতিষ্ঠানের মালিকদের সরকারি নীতির কাঠামোর মধ্যে হইতে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের কাজ ন্যায্যভাবে চালানোর জন্য উৎসাহ দেওয়া হইবে।
আমি এমন একটা নীতি নির্ধারণ করতে চাই, যাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় অংশ নিতে পারবেন। এই ব্যাপারে মেহনতী শ্রেণীর কর্তব্যবোধের উপর আমরা অনেকখানি নির্ভর করছি। শ্রম ও পুঁজির মধ্যে অবহমান কাল ধরে যে পরস্পর বিরোধিতা রয়েছে, তা আমাদের নতুন নীতি গ্রহণের ফলে বাংলাদেশ থেকে অনেকখানি বিলুপ্ত হবে। শ্রমিক-কর্মচারীকে আর সর্বদা মালিকের সাথে বিরোধে লিপ্ত থাকতে হবে না। কেননা, বর্তমানে তাদের মালিক হলো বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ যাঁরা মালিক ও ম্যানেজারদের হাতে বিশ্বাস করে নিজেদের সম্পত্তি জমা রেখেছে।
আমি খুব শীঘ্রই শ্রমিক প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সভা করছি। সেই সভায় শ্রমিক সংক্রান্ত সহরকারী নীতি এবং আমাদের বিপ্লবী নীতিসমূহ বাস্তবায়িত করতে তাদের যে পূর্ণ সহযোগিতা লাগবে সে বিষয়ে আলোচনা করা হবে। এ ব্যাপারে পূর্ণ মতৈক্যে পৌঁছানোর পরে আমি আশা করবো যে, শ্রমিক নেতারা আমার সরকার ও আমার সাথে একযোগে কাজ করবেন এবং এই বিপ্লবী নীতিসমূহ সরাসরি শিল্প এলাকায় কার্যকরী করবেন। তদুপরি শ্রমিকদের গুরুদায়িত্ব সম্পর্কে শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে।
আমার ছাত্র ভাইয়েরা যারা মুক্তিসংগ্রামে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিয়াছিল, তাহাদের প্রতি আমি আহ্বান জানাইতেছি যে তাহারা যেন আমাদের বিপ্লবের লক্ষ্যকে বাস্তবায়িত করার জন্য তাহাদের কাজ করিয়া যাইতে থাকে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিপ্লব সাধনের উদ্দেশ্যে একটি পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশসহ আমি একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করিতে চলেছি।
আমাদের সমাজে চাষীরা হলো সবচেয়ে দুঃখী ও নির্যাতিত শ্রেণী এবং তাদের অবস্থার উন্নতির জন্যে আমাদের উদ্যোগের বিরাট অংশ অবশ্যই তাদের পিছনে নিয়োজিত করতে হবে।
সম্পদে স্বল্পতা থাকা সত্ত্বেও আমরা চাষীদের স্বল্প মেয়াদী সাহায্য দানের জন্য ইতিমধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। ২৫ বিঘার কম জমি যাদের আছে, তাদের খাজনা চিরদিনের জন্য মওকুফ করা হয়েছে। ইতিপূর্বে সমস্ত বকেয়া খাজনা মাফ করা হয়েছে। তাকাভি ঋণ বাবদ ১০ কোটি টাকা বিতরণ করা হচ্ছে এবং ১৬ কোটি টাকা টেষ্ট রিলিফ হিসাবে বিতরণ করা হয়েছে। লবণের উপর থেকে কর তুলে দেওয়া হয়েছে।
সারা বছর ধরে সেচের কাজ চালানো, উন্নতমানের বীজ বপন, সার, কীটনাশক ঔষধ এবং প্রতিটি চাষীকে পর্যাপ্ত ঋণ দানের ব্যভস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। ভূ-মালিকানার ক্ষেত্রে পশ্চাতের বেষম্য দূরীকরণের জন্য পারিবারিক ও ব্যক্তিগত মালিকানার পরিধি কমিয়ে এনে পরিবার পিছু একশ বিঘায় আনা হয়েছে। ভবিষ্যতে এই উচ্চ সীমা আরও কমিয়ে আনা যায় কিনা সেটা বিবেচনা করে দেখা যাবে। ছোট ছোট চাষীদের অবশ্যই উৎপাদনক্ষম করে তুলতে হবে। এ কথা মনে রেখে আমরা পল্লী এলাকায় সমবায় ব্যবস্থার ভিত্তিতে ব্যাপক কর্মসূচী গ্রহণ করতে চেষ্টা করছি। এর ফলে চাষীরা কেবলমাত্র আধুনিক ব্যবস্থার সুফলই পাবে না, বরং সমবায়ের মাধ্যমে সহজ শর্তে ও দ্রুত ঋণ পাওয়া সম্ভব হবে।
এই সাথে আমাদের উদ্দেশ্য হরো ভূমিহীন ও স্বল্প জমির অধিকারী চাষীদের জন্যে ব্যাপক পল্লী পুনর্গঠনের কর্মসূচী গ্রহণ করা। “কাজ করলে খাদ্য” এই কর্মসূচীর অংশ হিসাবে ১ লক্ষ ৫০০ হাজার টন খাদ্যশস্য বরাদ্দ করা হয়েছে। এছাড়া টেষ্ট রিলিফের অধীনে পল্লীর কর্মসংস্থানের জন্যে নগদ ১৬ কোটি টাকা দেওয়া হয়ে গেছে।
আমরা আমাদের ক্ষুদ্র কুটির শিল্পকে বেকার সমস্যা সমাধানে উপযোগী করে গড়ে তুলতে চেষ্টা করছি। জনসাধারণের নিত্রনৈমিত্তিক প্রয়োজনের চাহিদার সাথে সমন্বয় রেখে এটা গড়ে তোলা হবে। আমাদের কৃষি ও শিল্পোন্নয়নের এটা হবে সহায়ক। এই সরকার নগরভিত্তিক ও গ্রামীণ জীবনের মধ্যেকার বৈষম্য সম্পর্কে সচেতন।
সেই সব ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়ার যাঁরা পাট চাষীদের উপার্জিত অর্থ দিয়ে মানুষ হয়েছেন- তাঁদেরকে গ্রামে ফিরে যেতে হবে। আমি ইতিমধ্যে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসাবে গ্রামে কাজ করার জন্য ৫ শত ডাক্তারকে গ্রামে নিযুক্ত করেছি।
বাংলাদেশে মানুষে-মানুষে, ব্যক্তিতে-ব্যক্তিতে বৈষম্য থাকবে না। সম্পদের বণ্টন ব্যবস্থায় সমতা আনতে হবে এবং উচ্চতম আয় ও নিম্নতম উপার্জনের ক্ষেত্রে যে আকাশচুম্বী বৈষম্য এতদিন ধরে বিরাজমান ছিল সেটা দূর করার ব্যবস্থাদি উদ্ভাবনের জন্যে আমি একটি বিশেষ কমিটি গঠন করার কথা বিবেচনা করছি।
আজ আমার বিশ্ব সভ্যতার এক ক্রান্তিলগ্নে উপস্থিত। একটি নতুন বিশ্ব গড়ে তোলার স্বপ্নে আমরা বিভোর, একটি সামাজিক বিপ্লব সফল করার প্রতিশ্রুতিতে আমরা অটল, আমাদের সমস্ত নীতি-আমাদের সমস্ত কর্মপ্রচেষ্টা এ কাজে নিয়োজিত হবে। আমাদের পথ দুস্তর। এ পথ আমাদের অতিক্রম করতেই হবে। আমার প্রিয় দেশবাসী, লক্ষ লক্ষ শহীদের রক্তের লাল আস্তরণে দাঁড়িয়ে আমি আপনাদের কাছে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেবো না। আমি জীবনে কোনদিন কাউকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেইনি। শত্রুরা বাংলাদেশে সব কিছু ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। কিছুই রেখে যায়নি। কি করে যে এই দেশ চলছে, সত্যই চিন্তা করলে আমি শিউরে উঠি।
শ্মশান বাংলাকে আমরা সোনার বাংলা করে গড়ে তুলতে চাই। সে বাংলায় আগামী দিনের মায়েরা হাসবে-শিশুরা খেলবে। আমরা শোষণমুক্ত সমাজ গড়ে তুলবো। আপনারা নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে সহযোগিতা করবেন। ক্ষেত, খামার, কারখানায় দেশ গড়ার আন্দোলন গড়ে তুলুন। কাজের মাধ্যমে দেশকে নতুন করে গড়া যায়। আসুন, সকলে মিলে সমবেতভাবে আমরা চেষ্টা করি, যাতে সোনার বাংলা আবার হাসে, সোনার বাংলাকে আমরা নতুন করে গড়ে তুলতে পারি।
জয় বাংলা!
[প্রথম স্বাধীনতা বার্ষিকী উপলক্ষ্যে দেশবাসীর উদ্দেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ। ২৬শে মার্চ ১৯৭২]