Home এক্সক্লুসিভ পৃথিবীতে বেঁচে থাকাই একটা জার্নি-বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত

পৃথিবীতে বেঁচে থাকাই একটা জার্নি-বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত

SHARE
buddodev-dasgupta

চলচ্চিত্র কখনো কাব্য হয়ে উঠে। কখনো সুর, ছন্দ, কখনো জাদুতে পরিণত হয়। এবং সেটা ক’জনইবা তার নির্মাণে দেখাতে পেরেছেন। চলচ্চিত্রের কবি, জাদুকর, সুর, ছন্দের স্রষ্টা, মাটির মানুষ বাংলা ভাষাভাষি মানুষের প্রিয় চলচ্চিত্রকার যিনি প্রায় ছয়দশকে মাত্র ১৭টি ছবি নির্মাণ করে ভারত এবং বাংলাদেশে ফিল্ম আইকনে পরিণত হয়েছেন, তিনি বুদ্ধদেব দাশ গুপ্ত। পড়েছেন অর্থনীতি নিয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। ছাত্র জীবন থেকে কবিতা লিখছেন। নিজের গল্প, কবিতা নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করেছেন। তাকে বলা হয় পয়েট্রিক সিনেমার স্রষ্টা। তাঁর ছবিতে কবিতার ছোঁয়া চিরকালীন, কারণ তিনিতো কবি। প্রথম দিকে সত্যজিৎ রায়-এর ছবি দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে বাস্তববাদী সিনেমা নির্মাণ করেছেন। পরবর্তীতে ভিন্ন ধারার সিনেমা নির্মাণ করে বিশ্ববিখ্যাত ফিল্ম ক্রিটিকদের পাশে নিজের নাম লেখাতে সক্ষম হয়েছেন। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে রাজশাহীতে এসেছিলেন বুদ্ধদেব দাশ গুপ্ত একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে। কলকাতায় ফিরে যাওয়ার পথে ঢাকায় দুদিন অবস্থান করেন। এক ফাঁকে এসেছিলেন চ্যানেল আই ভবনে। চ্যানেল আইয়ের ছবির কবি অনুষ্ঠানে, মুখোমুখি হয়েছিলেন উপস্থাপিকা, নির্মাতা, অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচীর সাথে। বুদ্ধদেব দাশ গুপ্তর সঙ্গে আরো দুজন অতিথি ছিলেন তাদের একজন প্রেমেন্দ্র মজুমদার। যিনি চলচ্চিত্র সমালোচক, চলচ্চিত্রকর্মী, লেখক, আরেকজন সোহেলী দাশ গুপ্ত। যিনি বুদ্ধদেব দাশ গুপ্তের বেশ কিছু ছবির প্রধান সহকারী পরিচালক। তিনিও কবিতা লেখেন, কোরিওগ্রাফ করেন এবং নৃত্যশিল্পী। বুদ্ধদেব দাশ গুপ্তের সঙ্গে কথপোকথনের চুম্বক অংশ পাঠকের জন্য। লিখেছেন- জাকীর হাসান

আনন্দ আলো: এই বাংলায় আপনার শেকড়। এখানে আপনার জন্ম। সেই সময়ের কথাগুলো কি মনে পড়ে?

বুদ্ধদেব গুপ্ত: এই বাংলার সঙ্গে আমার নাড়ির টান আছে। আমার মমতাময়ী মায়ের বাড়ি ছিল ঢাকার পুরানা পল্টনে। মায়ের সঙ্গে রমনার রেসকোর্স ময়দানে হাঁটতে যেতাম। আমার মা ভারী মিষ্টি করে অরগান বাজাতে পারতেন, গান গাইতেন। শুধু ঢাকা নয় বাবার রেলওয়ের চাকরির সুবাদে এই বাংলার বহু জায়গায় আমরা থেকেছি। অদ্ভুত সুন্দর ভাটি অঞ্চলের এই দেশের অনেক স্মৃতি এখনো আমার কাছে উজ্জ্বল।

আনন্দ আলো: জীবনের শুরুতে কবিতা লিখে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। পরে শিক্ষকতা করেছেন। সব ছেড়ে সিনেমা নির্মাণ শুরু করলেন। পরবর্তীতে সিনেমা নির্মাণে থিতু হলেন। কবি, শিক্ষকতা ও সিনেমা নির্মাণের মতো সৃজনশীল কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করা এই যে, এতবড় জার্নি সেই সাহস আপনি কীভাবে অর্জন করেছিলেন?

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত: সাহস যদি না থাকতো তাহলে মুশকিলে পড়তাম এবং কি যে হতো আমার জীবনে তা জানি না। আমার যখন বোঝার বয়স হলো- তখন চলচ্চিত্র নিয়ে আমার মধ্যে প্রচণ্ড আগ্রহ সৃষ্টি হয়। অনেক দিন পেরিয়ে যাবার পর সেই আগ্রহের কথা বাবাকে বললাম। বললাম, বাবা আমি পুনাতে ফিল্মের উপর পড়তে চাই। বাবা রাজি হলেন না। বাবার না শোনার পর প্রচণ্ড দুঃখ পেয়েছিলাম। আমার আরো একটি শখ ছিল পঠনের মানে বই পাঠের। বিশেষ করে ইকোনমিক্স, মাইক্রোইকোনমিক্স ও গণিতের উপর। পরবর্তীতে ইকোনমিক্সের পাঠ চুকিয়ে মাস্টার মশাই হলাম। শিক্ষকতা করতে গিয়ে দেখলাম ক্লাসের ছাত্ররা আমার চেয়ে বয়সে অনেক বড়। এছাড়া আরো কিছু বিষয় ছিল যা পাশ কাটিয়ে চলতে পারছিলাম না। এরপর শিক্ষকতার চাকরিটা ছেড়ে দেই। কবিতা লিখছি ছোটবেলা থেকে। সেই চৌদ্দ বছর বয়স থেকে। ওই বয়সে আমার কবিতার বই প্রকাশ হয়। বলাই বাহুল্য কবিতার কাছে আমি ভিশন ঋণী। সিনেমাতে আসা কবিতার কারণেই। হয়তো সিনেমায় আসা হতো না যদি কবিতা না লিখতাম। আর সুরের কাছেও আমি ঋণী ছোটবেলা থেকে। সুর শুনতে গিয়ে সবকিছু হারিয়ে ফেলি। সুর শোনার সময় আমার চোখ বন্ধ হয়ে যায়। এখনো আমি চোখ বন্ধ করে গান শুনি। ভিশন পছন্দ করতাম পেইন্টিং। পেইন্টিং-এর প্রদর্শনীতে যেতাম, পেইন্টিং- এর বিভিন্ন বই কিনে পড়তাম। ছবি দেখে প্রায়ই ভাবনায় পড়ে যেতাম। কোনো ছবির সামনে দাঁড়িয়ে মনে হতো একটি ছবি অনেক কিছু জানিয়ে দিয়ে যাচ্ছে এবং আরো অনেক ছবির কথা বলছে। এই সবকিছু মিলিয়েই আমার চলচ্চিত্রে পথ চলা।

আনন্দ আলো: আমরা যখন আপনার ছবি দেখি তখন ছবিটি আমাদেরকে একটা জাদুর পৃথিবীতে নিয়ে যায়। আবার বাস্তবতার ভেতরেও টেনে নিয়ে আসে। এই ম্যাজিক রিয়ালিজমের রহস্যটা কি?

buddodev-dasgupta-1বুদ্ধদেব দাশ গুপ্ত: জীবনের অনেক কিছুই ম্যাজিকাল। ম্যাজিকটা খুব দরকার। আমার মনে হয় ম্যাজিক ছাড়া কিছুই হয় না। কয়েকদিন আগে কলকাতার একটি অনুষ্ঠানে বলেছিলাম দুটো মানুষের সম্পর্কের মধ্যে একটা ম্যাজিক থাকা দরকার। ম্যাজিক যদি না থাকে তাহলে সম্পর্কটা থাকে না। খাবার না থাকলেও চলে, চাঁদের আলো না থাকলেও চলে কিন্তু ম্যাজিকটা থাকতেই হবে। ম্যাজিকটা কিন্তু একটি রহস্যের সামনে নিয়ে যায়। না বলার অনেক কিছু থাকে। জানার একটি বিষয় থাকে। অনেকেই বলেন, আমার ছবিতে এই রহস্যভেদ আমি কীভাবে করি? আমি এটাই বলি, এটা এমনিতে হয় না, এটা চর্চা করার কোনো বিষয় নয়, এটা শেখার কোনো ব্যাপার নয়, এটা ভেতর থেকে তৈরি হয়। এই ম্যাজিক্যাল বিষয়টি আরেকটু বিস্তারিতভাবে বলা দরকার। আমরা যে বাস্তবতাকে দেখতে পাই সেটা রিয়েল বাস্তব কিন্তু এই বাস্তবতার বাইরেও আরেকটি বাস্তবতা আছে। বাইরে থাকা যে এলিমেন্টগুলো, বাস্তবের যে রং সেগুলো কিন্তু অসামান্য। সেগুলো সত্যিই ম্যাজিকাল স্বপ্ন থেকে বেরিয়ে আসা, উঠে আসা জিনিস। সেগুলো বাস্তবকে আরো মহিমান্বিত করে, আরো সুন্দর করে। বাস্তবের মানেটা তখন আরো গভীর হয়। তানা হলে খুব একটা চার্মফিল থাকে না এটা খুব প্রেডিক্টেবল সুতরাং দৈনন্দিন যে বাস্তবতা তার মাঝখানে ম্যাজিকটা এবং নিজের স্বপ্নটা জুড়ে নিলেই হয়। তখন দেখা যাবে বাস্তব জীবনটায় আর বোরিং লাগছে না। কারণ ঐ জীবনেতো ম্যাজিক আছে।

আনন্দ আলো: আসলে একজন ফিল্ম মেকারের মেধা মনন, পঠন, বাস্তবতা অভিজ্ঞতা পুরো জার্নিটা একটা সৃষ্টিশীলতার দিকে নিয়ে যায়। ফিল্ম মেকারের সেই জার্নিটা খুব জরুরি। সেটা স্বপ্নে হোক জাগরণে হোক?

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত: আসলে পৃথিবীতে বেঁচে থাকাটাই একটা জার্নি। সেটা কেউ বোঝে কেউ বোঝে না। একজন সৃষ্টিশীল মানুষের বিশেষত্ব হলো- এই জার্নিটা তুলে ধরা। এই জার্নিটার মধ্যে ঢুকে পড়া। ঢুকে পড়েই জার্নিতে যে অসামান্য ঘটনা ঘটতে থাকে, অসামান্য যে মানুষ থাকে, অসামান্য যে বিষয় থাকে তা অবলোকন করে প্রকাশ করা।

আনন্দ আলো: আপনার প্রতিটি ছবিতে প্রকাশভঙ্গিটা ধারাবাহিকভাবে আমরা যেভাবে দেখেছি সেই স্কেলটা আপনি কীভাবে বজায় রেখেছেন এতো নির্মোহ থেকে?

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত: নির্মোহ এবং তার সঙ্গে খুশি না থাকা। খুশি না থাকা মানে বোঝাচ্ছি নিজের কাজ নিয়ে খুশি না হওয়া। পুরস্কার টুরস্কার নিতে যাই ঠিকই কিন্তু সেগুলো কখনোই আমাকে পরিচালনা করে না। আমি বুঝি পৃথিবীতে ভিশন বড় বড় কাজ রয়েছে, সেখানে দাগ কাটতে গেলে আমাকে লড়াই করতে হবে। লড়াইয়ে জিততে হবে। আমি তাই প্রতিটি ছবি যখন শেষ করি তখন মাথা খারাপ হয়ে যায়। মনে হয় ছবিটিতে যা বলতে চেয়েছিলাম তা বলতে পারবো না। ছবিটি মনে হয় শেষ হবে না, ফেল করবো। তখন পালিয়ে বেড়াই। খুঁত খুঁতে থাকা, কিছুতেই সুখী না হওয়া কিছুতেই তুষ্ট না হওয়া ফিল্ম করতে গিয়ে এসব পরবর্তীতে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখিয়ে দেয়। এই তুষ্ট না হওয়ার ব্যাপারটিকে আমি খুব মর্যাদা দেই। এখনও মনে হয় ব্যাপারটি আমার মধ্যে আছে, থাকবে এবং থাকুক। আমাকে অনেক পুরস্কার দেয়া হয়েছে। আমার ছবি নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়। কেউ কেউ আমাকে নিয়ে বই প্রকাশ করেছেন, এতে আত্মপ্রসাদ লাভ করার কোনো বিষয় নেই। এবং আমি যা করবো সেটাই যে ঠিক এটা কখনোই মনে হয় না বরং আমার ভয় অনেক বেড়ে যায়। আমার সর্বশেষ ছবি ‘টোপ’ শেষ করে পরবর্তী ছবির কথা ভাবছি। এ সময়টাতেও সেরকম মনে হচ্ছে।

আনন্দ আলো: ছবির গল্প কীভাবে চিন্তা করেন যখন একটা ছবি থেকে আরেকটি ছবিতে যান?

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত: কিছু বিষয় মাথায় চলে আসে। তারপর সেটাকে তৈরি করা। এই তৈরি করাটা সময় সাপেক্ষ। সময় সাপেক্ষ শুধু নয় মাঝেমধ্যে হতাশাবোধ করি এবং চিন্তায় থাকি মনে হয় কিছু হচ্ছে না। মনের ভেতরে উলটপালট হচ্ছে। আবার নতুন করে লিখতে বসে যাই। এভাবে ছবির গল্পটি তৈরি হতে থাকে। পরের ছবির গল্পটি কি সেটা আগে থেকে আমি জানি না, আমি কি করবো। এই যে ম্যাজিক ব্যাপারটি বলছিলাম, ম্যাজিক সব সময় ঘটছে আমার ছবিতে এভাবেই।

আনন্দ আলো: আপনি স্ক্রিপ্ট তৈরি করার পরও খুশি হন না। ভিশন রাগ ক্ষোভ বিরক্তে থাকেন। ছবির কিছুদিন শুটিং হওয়ার পর বলেন, এবারও হলো না। পরেরটা বেস্ট ছবি হবে দেখ। আপনার রেগে যাওয়ার অনেক ঘটনা আছে। সে সব মজার ঘটনা কি শেয়ার করা যায়?

buddodev-dasgupta-2বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত: আগেই বলেছি কাজের ক্ষেত্রে অল্পতে তুষ্ট হতে পারি না কেন জানি। আর রেগে যাওয়ার ঘটনাতো অনেক ঘটেছে ছবি করার সময়। যেমন ‘তাহাদের কথা’ সিনেমার শুটিং করছি। মিঠুন চক্রবর্তী তখন ভারতের অনেক বড় এবং জনপ্রিয় অভিনেতা। দেখা হওয়ার পর ও বলল আমার সঙ্গে কাজ করবে। আমি বললাম কাল ঠিক ১০টার মধ্যে স্টুডিওতে এসো। পরের দিন আমরা শুটিং- এর আয়োজন করছি খুব সকাল থেকে। কাজ করতে করতে সকাল ১০টা পার হলো কিন্তু মিঠুনের আসার খবর নেই। আমি সবাইকে ডেকে বললাম এই লোকেশনে শুটিং প্যাকআপ। বের হচ্ছি এই সময় দূর থেকে দেখি মিঠুন গাড়ি চালিয়ে স্টুডিওতে ঢুকছে। আমাদের বেরিয়ে যাওয়া দেখে পেছন পেছন ছুটে আসে আমার সামনে। তখন এতটাই উত্তেজিত ছিলাম যে- আমি একটি ইট হাতে ওকে মারতে গিয়েছিলাম। মিঠুন দৌঁড়াচ্ছে আমিও দৌঁড়ে যাচ্ছি। যা হোক একটা সময় ও আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। তখন ওকে একটা কথা বলেছিলাম ১০টা মানে ১০টা। আমার সেটে ১০টা বাজার ১০ মিনিট আগে আসতে হবে। আমি মিঠুনকে বলেছিলাম তোমাকে আমি চিনতে চাই না, তোমাকে চেনার কোনো প্রয়োজন নেই, ইচ্ছেও নেই। পরে একদিন সে বোম্বের ছবিতে যে ধরনের ড্রেস পরে অভিনয় করে তেমনি ড্রেস পরে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। নমস্কার করার পরও ওকে আমি চিনতে পারিনি। ও বাজি ধরেছিল দাদা আমাকে চিনতে পারবে না। আপন মনে কাজ করে যাচ্ছি। সবাই তখন হো হো করে হাসছে। সত্যিই সেদিন ওকে চিনতে পারিনি আমি। আমার কাছে মিঠুনের কোনো অসিৱত্বই নেই। তখন আমার কাছে অসিৱত্ব সেটাই যে চরিত্রে সে অভিনয় করছে বা করবে। পরবর্তীতে মিঠুন আমার কথা মেনে ‘তাহাদের কথা’য় কাজ করেছে এবং নিজেকে বদলে ফেলেছে ঐ সময় থেকে। আমার ছবিতে নওয়াজ উদ্দিন সিদ্দিকী কাজ করেছে। সে সত্যিই ব্যতিক্রমী এক অভিনেতা। ও বলতো দাদা আপনার মতো এত ইয়ং পরিচালকের সঙ্গে কখনো কাজ করিনি। কাজের প্রতি নওয়াজের ভিশন রকম ইনভলপমেন্ট দেখেছি। অনেকের সঙ্গে কাজ করে সেটা পাওয়া যায় না। অনেকের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে মাথা ঠুকতে হয়। ভিশন বিরক্ত হতে হয় তখন রাগটা হয় এবং ক্ষেপে যাই। শুধু ক্ষোভ, বিরক্ত, রাগই হয় না সিনেমা করার সময়। কিছু ঘটনার সঙ্গেও নিজেকে বেঁধে ফেলি। ‘মন্দ মেয়ের উপাখ্যান’ সিনেমার শুটিং করছিলাম একটা গাছের নীচে। একজনের সঙ্গে জরুরি কথা বলছিলাম হঠাৎ দেখি গাছ থেকে দলে দলে উইপোকা নেমে আসছে ভিশন ব্যস্ততায়। দেখে অদ্ভুত লাগলো। স্ক্রীপ্টের মধ্যে না থাকলেও উইপোকার দল আমার সেই সিনেমায় উঠে এলো। আরো একটি ছবির কথা বলি, শুটিং করছি একটি গ্রামে। ক্যামেরা চলার সময় হঠাৎ শুনতে পেলাম দূরে কোথাও ধানভানার ঢেঁকির আওয়াজ। অদ্ভুত মিষ্টি আওয়াজ। তখন মনে হলো- ঢেঁকিতে যারা ধান ভাঙছে তাদের সঙ্গে যদি থাকতে পারতাম। তাদের কারোর সঙ্গে যদি ঘর বাঁধতে পারতাম। ছবি করার সময় এসব ঘটনা ঘটার পর সব সময় শান্ত থাকা যায় না। যারা শান্ত থাকতে পারেন তারা অসামান্য এবং নমস্য মানুষ। আমি কখনো শান্ত থাকি না, অশান্ত থাকি কিছু করার নেই।

আনন্দ আলো: পরবর্তী পরিকল্পনা নিয়ে কী ভাবছেন?

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত: এই বাংলার সঙ্গে আমার নাড়ির একটা টান রয়েছে। বহু আগে দেশ ভাগ হয়েছে, সেই ভাগ সবাই যে মেনে নিয়েছেন, ঠিকভাবে নিয়েছেন তা নয়। কেউ কষ্টও পেয়েছেন। বাংলাদেশে আসার পরদিন ৭ নভেম্বর গিয়েছিলাম রাজশাহী। খ্যাতিমান সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক চেয়েছিলেন তার বাড়িতে যেন যাই। যাওয়ার পর তিনি কি যে খুশি হলেন ভাবা যায় না। মুর্শিদাবাদের মানুষ তিনি। আমার কাছে তার বাড়ির গল্প বলছিলেন। তিনতলা মাটির ঘরের গল্প বলছিলেন। মায়ের গল্প বলছিলেন। মাকে নিয়ে তিনি ‘আগুন পাখি’ নামে একটি বিখ্যাত উপন্যাস লিখেছেন। তাকে দেখে ভাবছিলাম মানুষ যে যে প্রানেৱই থাকুন না কেন তার শেকড়ের কথা মনে করে বেদনা ও দুঃখবোধ ঝরে পড়বেই। চলে আসার সময় তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে দেখেছিলাম আবেগ আপ্লুত হয়ে যাচ্ছেন তিনি। এটা বুদ্ধদেব দাশগুপ্তকে দেখে নয়। যে দেশে তিনি বড় হয়েছেন। সেই দেশের মানুষকে দেখে তাঁর সেই ফেলে আসা দিনের কথা, দেশের কথা চোখের কোনে ভেসে উঠেছিল। এই যে বেদনা এটা থাকবেই, আমারও আছে। আমার ভিশন ভালো লাগে যখন বাংলাদেশে আসি। এত ভালোবাসা পাই এখানকার মানুষের কাছ থেকে। আমার খুব ইচ্ছে এখানে কিছু কাজ করি। একটি পরিকল্পনার কথা চলছে, ভাবছি কাজ করবো, দেখা যাক সময়ই বলে দিবে সবকিছু।

বুদ্ধদেব-এর নতুন ছবি উড়োজাহাজ-এ রোকেয়া প্রাচী

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত তাঁর আগামী ছবির নাম ঘোষনা করেছেন। ছবির নাম উড়োজাহাজ। এই ছবির একটি গুরুত্বপূর্ন চরিত্রে অভিনয় করবেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচী। তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায় প্রাচী বলেছেন, এটি তার অভিনয় জীবনের একটি আনন্দ সংবাদ। উড়োজাহাজ-এ অভিনয়ের জন্য ইতিমধেই তিনি প্রস্তুতি শুরু করেছেন। উল্লেখ্য, ছবির বাংলাদেশ অংশের প্রযোজক ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লি.।