Home শাহ্ সিমেন্ট নির্মাণে আমি পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোক্তা শরীফুল

পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোক্তা শরীফুল

SHARE

অধ্যাপক ড. মুহম্মদ শরীফুল ইসলাম। বাংলাদেশের খ্যাতিমান একজন জিওটেকনিক্যাল ডিজাইন বিশেষজ্ঞ ও গবেষক। দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষাবিদ হিসেবে পাঠদান ও গবেষণার পাশাপাশি land reclamation (জমি পুনরূদ্ধার), ঢাল সংরক্ষণ, ভৌত স্থাপনা ও ভিত্তিপ্রস্তরের নকশা, নির্মাণ, মেরামত ও রক্ষনাবেক্ষণে পরামর্শক হিসেবে কাজ করে চলেছেন। তিনি বুয়েট থেকে ১৯৯৭ সালে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ স্নাতক ও ১৯৯৯ সালে জিওটেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। সেই বছরেই তিনি স্কলারশিপ লাভ করে পাড়ি জমান জাপান। সেখানে ২০০২ সালে জাপানের সাইতামা ইউনিভার্সিটি থেকে ভূমিকম্প বিষয়ক গবেষণা করে তিনি আর্থকোয়েক ইঞ্জিনিয়ারিং এ পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তারপর একই ইউনিভার্সিটি থেকে দুই বছর (২০০৫-২০০৭) পোস্ট ডক্টরাল গবেষণা করার সুযোগ লাভ করেন। এরপর দেশে ফিরে তিনি বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন এবং বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানেই কর্মরত আছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান বিশ্বায়ন ও নগরায়নে পরিবেশবান্ধব বায়ো-ইঞ্জিনিয়ারিং এবং পরিবেশবান্ধব ও দূর্যোগ সহনীয় গ্রামীন ঘরবাড়ি নির্মাণে এর অন্তর্ভূক্তি প্রদানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকার জন্য তিনি দেশে-বিদেশে পরিচিত ও সমাদৃত হয়েছেন। এবার শাহ্ সিমেন্ট নির্মাণে আমিতে তাকে নিয়ে প্রতিবেদন লিখেছেন মোহাম্মদ তারেক

অধ্যাপক ড. মুহম্মদ শরীফুল ইসলাম এর গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা জেলার কোটবাড়ির সন্নিকটে বাতাবাড়িয়া গ্রামে। সেখানেই বেড়ে উঠা তার। বাবা মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম পেশায় রসায়নের অধ্যাপক এবং মা নুরজাহান একজন গৃহিনী। চার ভাই এক বোনের মধ্যে শরীফুল ইসলাম মেঝ। তার বড়ভাই মফিজুল ইসলামও একজন প্রকৌশলী, বর্তমানে অষ্ট্রেলিয়ায় কর্মরত আছেন। সেঝো ভাই কম্পিউটার প্রকৌশলী কানাডায় কর্মরত আছেন। ছোটবোন ইশরাত জাহান ও ছোট ভাই আরিফুল ইসলাম আহসানুল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে তড়িৎ ও ইলেক্ট্রনিক প্রকৌশল বিভাগে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত আছেন। ছোটবেলা থেকেই শরীফুল ইঞ্জিনিয়ার হবার স্বপ্ন দেখতেন। হয়েছেনও সফল। বাবা-মার ইচ্ছা আর নিজের আগ্রহ থেকেই তার প্রকৌশলী হওয়া।
ডঃ শরীফুল কুমিল্লার গভঃমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুল থেকে সম্মিলিত মেধাতালিকায় ১২ তম হয়ে এসএসসি পাস করেন ১৯৮৮ সালে। ১৯৯০ সালে কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধাতালিকায় ২য় হয়ে ভর্তি হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। ১৯৯৭ সালে তিনি বুয়েট থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পাস করে বের হওয়ার পর লেকচারার হিসেবে যোগদান করেন বুয়েটের একই বিভাগে। ১৯৯৯ সালে বুয়েট থেকেই অত্যন্ত কৃতকার্যতার সাথে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। এরপর উচ্চ শিক্ষার জন্য জাপান সরকারের বৃত্তি নিয়ে পাড়ি জমান সে দেশে। ২০০২ সালে জাপানের সাইতামা ইউনিভার্সিটি থেকে আর্থকোয়াক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে দুই বছর (২০০৫-২০০৭) পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণা করার জন্য জে এস পি এস (জাপান সোসাইটি ফর দ্য প্রমোশন অফ সায়েন্স) ফেলোশীপ লাভ করেন। দেশে ফিরে এসে তিনি পুনরায় বুয়েটে শিক্ষকতা শুরু করেন। অভিজ্ঞ শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এর নানা বিষয়ে হাতে কলমে শিক্ষা দেয়ার পাশাপাশি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণার কাজে নিয়োজিত আছেন। এর পাশাপাশি তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সুপারভাইস করছেন। তার সুপারভাইসকৃত এযাবৎকালে প্রায় ৩০ টির বেশি গবেষণা সম্পন্ন হয়েছে। তাছাড়া, তিনি দেশে বিদেশে অনেক পিএইচডি গবেষণা সুপারভিশনের সাথেও যুক্ত আছেন, যেমন অস্ট্রেলিয়ার সিডনী বিশ্ববিদ্যালয় ও সিঙ্গাপুর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। এছাড়া দীর্ঘ দুই যুগের বেশি কর্মজীবনে অধ্যাপক শরীফুল ইসলাম বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নাল, কনফারেন্স ও সেমিনারে দেড় শতাধিকের মত গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন। এছাড়াও তার লিখিত একটি বই “Disaster Resilient Low Cost Houses” ২০২০ সালে ইংরেজী ও ফরাসি ভাষায় অনুদিত ও প্রকাশিত হয়।তাঁর গবেষণা বিশেষভাবে বায়ো-ইঞ্জিনিয়ারিং সহ বিভিন্ন অত্যাধুনিক বিষয় যেমন জলবায়ু সহিষ্ণু অবকাঠামো নির্মাণ, দুর্যোগ মোকাবেলা যোগ্য গ্রামীণ আবাসন, জমি পুনরুদ্ধার, ভূমিকম্প প্রতিরোধী ভিত্তি এবং লিকুইফেকশন সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশে-বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। এছাড়া ভেটিভার (বিন্নাঘাস) ভিত্তিক বায়ো-ইঞ্জিনিয়ারিং এবং গ্রীন ব্রিক তৈরিতে তার অনস্বীকার্য অবদানের কারণে দেশ ও বিদেশে পরিচিতি লাভ করেছেন। তার অক্লান্ত চেষ্টায় ২০১৮ সালে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন অন্তভুঁক্ত এলাকায় ভেটিভার এর প্রয়োগ ও ক্ষমতা নিধারণের জন্য “ভেটিভার ডেমোন্সট্রেশন সেন্টার” প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তিনি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-BAPA এর আজীবন ফেলো।

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শরীফুল ইসলাম প্রায় পঁচিশ বছর ধরে জিওটেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ কাজ করে যাচ্ছেন সততা ও একনিষ্ঠতার সাথে। বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এ গবেষণা, পরীক্ষা ও পরামর্শ ব্যুরো (বিআরটিসি) এর সদস্য হিসেবে তিনি মাটি, কংক্রিট, ইট, বালু, সিমেন্ট ইত্যাদি নিয়মিত পরীক্ষার সাথে জড়িত। এছাড়াও বুয়েটের একজন বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ও পরামর্শক হিসেবে ডঃ শরীফুল বর্তমানে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে বিশেষজ্ঞ, প্যানেল অব এক্সপার্ট বা পরামর্শক হিসাবে কাজ করে জাতীয় উন্নয়নে অবদান রাখছেন। এরমধ্যে বাংলাদেশ নেভি সাবমেরিন বেইস, চট্টগ্রাম- কক্সবাজার হাইওয়ে সংষ্কার প্রজেক্ট, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রজেক্ট, পূর্বাচল লিংক রোড এন্ড পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ে প্রজেক্ট, বাংলাদেশ মায়ানমার ফ্রেন্ডশিপ রোড প্রজেক্ট, পদ্মা ব্রিজ রেল লিংক প্রজেক্ট, কক্সবাজার বিমানবন্দর প্রজেক্ট, পতেঙ্গা কন্টাইনার টার্মিনাল প্রজেক্ট, পদুয়ার বাজার কুমিল্লা এর ট-লুপ, LGED-এর রোড ডিজাইন ও পেভমেন্ট স্ট্যান্ডার্ড প্রজেক্ট, ঢাকা আশুলিয়া এলেভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রজেক্ট, রিভার ক্রসিং টাওয়ার প্রজেক্ট অন্যতম। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বেশ কিছু প্রজেক্টের জিওটেকনিক্যাল ডিজাইনের অ্যাডভাইজার হিসেবে কাজ করেছেন। এছাড়াও তিনি দীর্ঘদিনযাবত হাওড় এলাকায় ঢাল, ভিটা ও কিল্লা সুরক্ষা, উপকূলবর্তী এলাকায় গ্রামীণ সড়ক, বন্যা তীর ও চিংড়ী মাছের বাঁধ সংরক্ষণ, উখিয়া শরণার্থী শিবিরে পাহাড়ী ঢাল সুরক্ষায় নিরবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। বর্তমানে তিনি বেশ কিছু নতুন গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টের কাজ হাতে নিয়েছেন।
ড. শরীফুল আজ অবধি একাডেমিক কৃতিত্ব, শিক্ষাদান এবং গবেষণায় তার শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি হিসাবে ২০টিরও বেশি পুরস্কার পেয়েছেন। যার মধ্যে ডঃ রশিদ স্বর্ণপদক, শরফুদ্দিন স্বর্ণপদক, ডিন’স অ্যাওয়ার্ড, মনবুশো বৃত্তি (জাপান), একাডেমিক শ্রেষ্ঠত্বের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মেরিট বৃত্তি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে তিনি গবেষণার জন্য ১৩ টি পুরষ্কার পেয়েছেন যার মধ্যে রয়েছে কিং অফ থাইল্যান্ড ভেটিভার অ্যাওয়ার্ডস ২০১৫ (King of Thailand Vetiver Awards 2015), দ্য ভেটিভার নেটওয়ার্ক ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড ২০১৫(The Vetiver Network International Awards 2015), Forum-86 Research Excellence Award 2020 অন্যতম। এছাড়াও তিনি springer, ICCEE-2018 , ICDRM-2019, ISSMGE এবং JSCE-এর সেরা গবেষণা নিবন্ধ পুরষ্কার পেয়েছেন। তিনি দেশ-বিদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ও সংস্থার সাথে সহযোগী গবেষক হিসেবে গবেষণা পরিচালনা করছেন।
ড. শরীফুর ইসলাম ২০০০ সালে বিয়ে করেন। স্ত্রীর নাম কাজী আসমা শরীফ। তিনি একজন গৃহিনী। এই দম্পতির একমাত্র কন্যা সন্তান সাঈবা বিনতে শরীফ ইলমী মাস্টারমাইন্ড স্কুলে অধ্যয়নরত, ও লেভেলের একজন পরীক্ষার্থী।
এই শিক্ষাবিদ ও প্রকৌশলী তার মাটি ও মানুষের প্রতি অগাধ ভালোবাসা থেকে দেশের মানুষের কষ্ট লাঘবের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। দেশপ্রম থেকেই দেশের অবকাঠামো যেমন, বাড়িঘর, রাস্তাঘাট ও পাহাড়ি ঢাল সুংরক্ষা, ভূমি পুনরূদ্ধার প্রভৃতি ক্ষেত্রে বায়ো-ইঞ্জিনিয়ারিং এর অন্তর্ভূক্তির মাধ্যমে আরো দূযোর্গ সহনীয় করে তোলাই তার লক্ষ্য। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হিসেবে তিনি চান বায়ো-ইঞ্জিনিয়ারিং ও দূর্যোগ সহনীয় বাড়িঘর নির্মাণে এর ক্ষেত্র সম্প্রসারণ ও সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতকরন।
যেসব ভবন তৈরি করা আছে তা কিভাবে ভূমিকম্প সহনীয় করে তৈরি করা যায়? -এ প্রশ্নের উত্তরে ড. শরীফুল বলেন, বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড (BNBC) অনুসারে retrofitting করার মাধ্যমে ভবনকে ভূমিকম্প সহনীয় করে তৈরি করা যায়। এক্ষেত্রে অবশ্যই মানসম্মত কাঁচামালের ব্যবহার, যথাযথ নকশা প্রনয়ন, এর প্রয়োগ, তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।

নতুন ভবন নির্মাণের পূর্বে কি ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে?- উত্তরে ড. শরিফ জানান, বাংলাদেশে ভবন নির্মাণের জন্য সবার প্রথমে অবশ্যই বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড (BNBC) অনুসরণ করে ভবনের নকশা ও স্থাপনার কাজ শুরু করতে হবে; এক্ষেত্রে BNBC অনুযায়ী ধাপগুলো হবে মাটি পরীক্ষা, বিল্ডিং এ মানসম্মত নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার, মালামাল পরীক্ষা, মালামাল মিশ্রণের অনুপাত ঠিক রাখা, রডের হিসাবাদি ও পরীক্ষা ঠিকমত করা এবং সর্বপরি ভবন নির্মাণের সময় সুচারুভাবে নিরীক্ষণ বা তদারকি করে রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে ।