Home এক্সক্লুসিভ পরিবারের সাপোর্ট ছাড়া মেয়েদের বাইরে কাজ করা খুবই কঠিন :ওয়ার্দা রিহাব

পরিবারের সাপোর্ট ছাড়া মেয়েদের বাইরে কাজ করা খুবই কঠিন :ওয়ার্দা রিহাব

SHARE

ওয়ার্দা রিহাব আন্তর্জাতিক মানের একজন ক্লাসিক্যাল ডান্সার ও কোরিওগ্রাফার। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী বেলায়েত হোসেন খান, শান্তিবালা সিনহা, শর্মিলা বন্দ্যোপাধ্যায়, তামান্না রহমানসহ গুণী ও মেধাবী অনেক নৃত্যশিল্পীর কাছে তার হাতেখড়ি। পরবর্তীতে ওয়ার্দা রিহাব গুরু কলাবতী দেবীর তত্ত¡াবধানে রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনিপুরী নৃত্যে উচ্চতর শিক্ষা নেন এবং থৈবা সিং ও ওঝা রণজীৎ-এর কাছে মনিপুরি মার্শাল আর্ট ‘থান টা’ শিখেন। তিনি বর্তমানে ইন্দিরা গান্ধী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের নৃত্যশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ধৃতি নৃত্যালয় নামে তার একটি নাচের প্রতিষ্ঠান আছে। তার কাজ, অর্জন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাসহ নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন আনন্দ আলোর সঙ্গে। তারই চুম্বক অংশ প্রকাশ করা হলো। লিখেছেন-প্রীতি ওয়ারেছা।

আনন্দ আলো: আপনার উল্লেখযোগ্য কিছু কাজ সম্মন্ধে জানতে চাই-

ওয়ার্দা রিহাব: বিভিন্ন ধরণের কাজ করেছি সারাবছর ধরেই। উল্লেখযোগ্য কাজের বিষয়ে বলতে গেলে অনেকগুলোর নাম চলে আসবে। বাংলা ভাষায় একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন ‘বাংলাদেশ টেলিভিশন’। প্রতিষ্ঠানটি এবছর সমপ্রচারের ৫০ বছর পূর্ণ করেছে। ৫০ বছর পূর্তির উপলক্ষকে স্মরণীয় করতে একটি মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে আমি বাংলাদেশের মোস্ট সিনিয়র কয়েকজন নৃত্যশিল্পী, বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় কয়েকজন নৃত্যশিল্পী ও উদীয়মান কয়েকজন নৃত্যশিল্পীকে নিয়ে সুন্দর একটি কোরিওগ্রাফি করেছিলাম। বলতে গেলে আমার ক্যারিয়ারের উজ্জ্বল একটি পরিবেশনা ছিল এটি। এ বছরের ২৬ মার্চ মাসে বাংলাদেশের ৪৪তম স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস পালিত হয়েছে। এই উপলক্ষে ব্যাংককের বাংলাদেশ দূতাবাস ‘রিদম এন্ড হারমোনি দ্যাট বাংলাদেশ’নামের একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেখানে আমি ও আমার দল ধৃতি নৃত্যালয় নৃত্য পরিবেশন করেছি। দেশের বাইরে নৃত্য পরিবেশন করতে গেলে আলাদা একটা দায়বদ্ধতা আমার মধ্যে কাজ করে। নিজেকে উজাড় করে আমি আমার দেশের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে তুলে ধরার চেষ্টা করি। মার্চে আরো একটি পরিবেশনা ছিল ত্রিপুরার আগরতলা ও আসামের গৌহাটিতে। সেখানকার ক্লাসিক্যাল ফেস্টিভ্যালে আমি একক নৃত্য পরিবেশন করেছি। ১০ মে কলকাতার রবীন্দ্র সদনে আমার দল ধৃতি নৃত্যালয়ের মনোজ্ঞ একটি পরিবেশনা ছিল। রবীন্দ্রজয়ন্তী উপলক্ষে রবীন্দ্রসদনে ‘কবিপক্ষ’ নামে পক্ষকালব্যাপী একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল ভারতের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকার। সেখানেই মঞ্চস্থ হয় রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্য শ্যামা। দর্শক দারুণ উপভোগ করেছেন আমাদের প্রযোজনাটি। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, শো শেষ করার পর হলভর্তি দর্শক দাঁড়িয়ে আমাদের সম্মান জানিয়েছেন। এটা ভারতে সচরাচর দেখা যায় না। শো শেষ করার পর অনেকেই জানিয়েছেন, এর আগে ভারতে এমন করে শ্যামা মঞ্চস্থ হয়নি। তাদের এই উচ্ছ¡াস আমাকে ভীষণ ভাবে মনুপ্রাণিত করেছে। এ বছরের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে আয়োজন করা হয়েছিল ‘বঙ্গমেলা’ নামের একটি অনুষ্ঠান। সেখানে আমরা ‘আলোর পথযাত্রী’ নামে একটি প্রযোজনা মঞ্চস্থ করেছিলাম। বিদেশের বুকে বাঙ্গালিদের উদ্যোগে করা যেকোন উৎসব আমাদের শিল্প ও সংস্কৃতিকে সবার সাথে পরিচয় করানোর ব্যাপারে বড় ভুমিকা রাখে। বঙ্গমেলার গ্র্যান্ড ওপেনিং উৎসবে আমার দল ধৃতি নৃত্যালয়ের ৪০ জন নৃত্যশিল্পীর প্রায় ৪৫ মিনিটের একটি পরিবেশনা ছিল। সেখানে আমার কোরিওগ্রাফি অনেক প্রশংসিত হয়েছিল। এই সফরে আমার দল ভার্জিনিয়া, ওয়াশিংটন, মেরিল্যান্ড, ওয়াহিও এবং নিউইয়র্কে শো করে প্রবাসী এবং যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারাতে সমাদৃত হয়েছে। মে মাসের শেষের দিকে ঢাকায় আসেন বলিউড তারকা দীপিকা পাড়ুকোন। তিনি লাক্সের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর। সেই উপলক্ষেই বাংলাদেশ ইউনিলিভার একটি মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এই আয়োজনে দীপিকার ছবির জনপ্রিয় একটি গানে পারফর্ম করেন লাক্সতারকা বিদ্যা সিনহা মিম, মেহজাবিন চৌধুরী এবং শানারেই দেবী শানু। আমি সেই নাচের কোরিওগ্রাফি করি। এ বছরের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’ প্রদান উপলক্ষে অনুষ্ঠিত বর্ণাঢ্য আয়োজনে আমি কোরিওগ্রাফি করেছি। খুবই প্রশংসিত হয়েছে কাজটি। মাত্র কয়েকদিন আগে বাঙ্গালি উদযাপণ করলো আর্থ প্যারেড। জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ’ পুরস্কার পাওয়ায় ৫ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নাগরিক সংবর্ধনা দিতে আর্থ প্যারেডের আয়োজন করে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। আর্থ প্যারেড শিরোনামের এই আয়োজনে এক হাজার শিল্পীর সমন্বয়ে একটি নৃত্যানুষ্ঠানে আমি কোরিওগ্রাফি করেছি। মাত্র ২০ মিনিটের একটি পরিবেশনার জন্য জড়ো করা হয়েছিল প্রায় এক হাজার শিল্পীকে। দেশাত্মবোধক, সাঁওতালি ও মণিপুরি গান নিয়ে তৈরি করা ২০ মিনিটের একটি মেডলিতে নৃত্যশিল্পীরা ছাড়াও অংশ নিয়েছিলেন সাইক্লিস্ট, ঢুলী, স্কাউটস, পাপেট ও অটিস্টিক শিল্পীরা। ২৫ অক্টোবর উড়িষ্যায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ‘ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল ডান্স ফেস্টিভ্যাল’। সেখানে আমাকে মণিপুরি নৃত্যে অনন্য অবদান রাখার জন্য ‘সংযুক্তা পানিগ্রাহী মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করা হবে। অত্যন্ত সম্মানজনক এই অ্যাওয়ার্ডটি। ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল ডান্স ফেস্টিভ্যালে আমার দলের পারফর্মেন্সের পাশাপাশি আমার সোলো পারফর্মেন্সও থাকবে।

আনন্দ আলো: প্রত্যেকটা মানুষের জীবনেই একটা লক্ষ্য থাকে। আপনি যদিও প্রতিষ্ঠিত একটি জীবনে আছেন তারপরেও ভবিষ্যতের চাওয়া কি?

Shyama-at-Kabipakshওয়ার্দা রিহাব: সারা দেশে নৃত্যশিল্পের বিরাজমান চর্চাকে আরও তরান্বিত করার জন্য আমরা কয়েকজন নৃত্যশিল্পী মিলে একটি উদ্যোগ নিয়েছি। ‘ওয়ার্ল্ড ডান্স অ্যালায়েন্স’ একটি আর্ন্তজাতিক সংগঠন। সেই সংগঠনটির বাংলাদেশ ফ্যাঞ্চাইজি হিসেবে আমরা একটি ইয়ুথ উইং চালু করেছি। ঢাকার বাইরে তুলনামূলক সুযোগ বঞ্চিত অর্থাৎ দক্ষ নৃত্যশিল্পীদের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকা নৃত্যশিল্পীদের দক্ষতা ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধির জন্য ঢাকার বাইরে সাতটি বিভাগে কর্মশালার আয়োজন করা হবে। এটি আপাতত এক বছর মেয়াদী একটি প্রজেক্ট। আসছে ডিসেম্বর থেকে আগামী বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত কর্মশালাটি পরিচালনা করবো। আমাদের কাজটি হবে ঢাকার বাইরের শিল্পীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেয়া। এই প্রজেক্টের মাধ্যমে প্রাপ্ত নৃত্যশিল্পীদের নিয়ে ঢাকায় একটি ফেস্টিভ্যালের আয়োজন করা হবে। বৃহত্তর উদ্দেশ্যকে মাথায় নিয়ে আমরা এই আয়োজনটির উদ্যোগ নিয়েছি। আমাদের নৃত্যশিল্পীরা সবাই ঢাকা বেজড্। অথচ ঢাকার বাইরে প্রচুর সম্ভাবনাময় নৃত্যশিল্পী আছে যারা শুধুমাত্র সঠিক প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষণের অভাবে পিছিয়ে আছে এবং সঠিক পদ্ধতিতে তাদের নৃত্যচর্চা চালিয়ে যেতে পারছে না। তাদেরকে আমরা প্রশিক্ষণ দিয়ে এক কাতারে নিয়ে আসতে চাই। ওয়ার্ল্ড ডান্স অ্যালায়েন্স সম্পূর্ণরুপে একটি নন-প্রোফিটেবল অর্গানাইজেশন। আমরাও কাজ করবো স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে। আমরা আশা করি প্রথম বছরের প্রাপ্তি আমাদের পরবর্তীতে আরো আশাবাদী করে তুলবে। দেশব্যাপি নৃত্যশিল্পী তৈরির এই প্রক্রিয়া অবশ্যই সফল হবে।

আনন্দ আলো: সমসাময়িক নৃত্যচর্চা নিয়ে কিছু বলুন-

ওয়ার্দা রিহাব: আমাদের নৃত্যশিল্পীরা খুবই দক্ষ, শুধু চাই পৃষ্ঠপোষকতা। আমি বলব কাজ খুব ভালো এগোচ্ছে, তবে আরেকটু সময় লাগবে। আশা করছি আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে আমাদের সমসাময়িক নৃত্যকে আর্ন্তজাতিক পর্যায়ে পৌঁছে দিতে পারবো।

আনন্দ আলো: আমাদের দেশের নৃত্যশিল্পীদের মধ্যে অস্থিরতা টের পাই। তাদের অধিকাংশই অন্যান্য পেশায় মনোনিবেশ করছে। কেন?

ওয়ার্দা রিহাব: নৃত্যখাতে বাজেট থাকে খুব কম। আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে প্রচুর নৃত্যানুষ্ঠান হচ্ছে, দেশের প্রচুর ইভেন্টে নৃত্যশিল্পীরা পারফর্মেন্স করছেন, প্রবাসীদের আমন্ত্রণে দেশের বাইরে নৃত্য পরিবেশন করছেন- সবই ঠিক আছে তবে যেটা নেই সেটা হচ্ছে বাজেট। আয়োজক প্রতিষ্ঠান নৃত্যখাতে বাজেট এতোই কম রাখে যে সেই বাজেট দিয়ে কোনভাবেই পোষায় না। নাচ একটি ব্যয়বহুল শিল্প। এখানে কস্টিউম একটা বড় ব্যাপার। অনেক সময় দেখা যায় আয়োজক প্রতিষ্ঠানের বরাদ্দকৃত টাকা শুধুমাত্র কস্টিউম কিনতেই শেষ হয়ে যায়। এইসব কারণে শিল্পীদের মধ্যে অস্থিরতা দেখা যায়। আমাদের দেশে খুব কম নৃত্যশিল্পীই আছেন যারা নিজেদের ট্র্যাক পরিবর্তন না করে কাজ করে যাচ্ছেন। নৃত্যকে পেশা হিসেবে নিয়ে সম্মানের সাথে জীবিকা নির্বাহ করছেন এমন শিল্পীর সংখ্যা হাতে গোনা। তাহলে বৃহত্তর সংখ্যাকে নিয়ে পরিকল্পনা কে করবে? সবকিছু নিয়েই ভাবার সময় এসেছে আসলে। জাতীয় পর্যায় থেকে নৃত্যখাতে পৃষ্ঠপোষকতা দরকার, দরকার নৃত্যশিল্পীদের সঠিক মূল্যায়ন ।

আনন্দ আলো: নাচের বাইরে প্রিয় শখ কি?

ওয়ার্দা রিহাব: নাচের বাইরে ভীষণ প্রিয় শখ সাঁতার। সুযোগ পেলেই পানিতে নেমে যাই।

আনন্দ আলো: এতো যে ব্যস্ত থাকেন পরিবার থেকে কেমন সহযোগিতা পান?

ওয়ার্দা রিহাব: আমার মা ডাঃ হোসনে আরা বেগম। মায়ের কারণেই আমার নাচের জগতে আসা। বাবা নেই, ১৯৯৩ সালে তাকে হারিয়েছি। আমার স্বামী অরুপ কুমার সাহা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। সে আমাকে ভীষণ সহযোগিতা করে। সত্যি বলতে পরিবারের সাপোর্ট ছাড়া বাইরে কাজ করা খুবই কঠিন। আর আমার মত হলে তো কথাই নেই-আজ এখানে তো কাল সেখানে! সেদিক দিয়ে বলব আমি খুবই লাকি।