Home শাহ্ সিমেন্ট নির্মাণে আমি পঞ্চাশের শেষ নক্ষত্রটিও নিভে গেল : আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

পঞ্চাশের শেষ নক্ষত্রটিও নিভে গেল : আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

SHARE

৩ জানুয়ারি আমার মেয়ে বিনীতা চৌধুরীর জন্মদিন। লন্ডনে আমার বাসা থেকে বহুদূরে গ্রিনিচে থাকে। এই করোনার দিনে জন্মদিনেও একত্র হওয়ার সুযোগ নেই। তাকে টেলিফোনে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে লেখার টেবিলে বসেছি, ঠিক এই সময় খবরটি এলো- পঞ্চাশের দশকের শেষ নক্ষত্রটিও নিভে গেছে। লন্ডনে তখন দুপুর হয়নি। কুয়াশার মতো বৃষ্টিঝরা দিন। এমন দিনে মন এমনিতেই ভারাক্রান্ত থাকে। আর ঠিক সেই সময় ঢাকা থেকে টেলিফোনে খবরটি পেলাম, রাবেয়া খাতুন আর নেই।
প্রথমে ভেবেছিলাম, মৃত্যুটা বুঝি করোনায় হয়েছে। তারপর জানলাম, আমাদের অন্য কয়েকজন খ্যাতিমান বুদ্ধিজীবীর করোনায় মৃত্যুর মতো রাবেয়া খাতুনের মৃত্যু করোনায় নয়। এতে অবশ্য সান্ত্বনা পাওয়ার কিছু নেই। সব মৃত্যুই মৃত্যু। বাস্তব সত্যটি হচ্ছে, রাবেয়া খাতুনকে আমরা হারিয়েছি। বাংলা সাহিত্য রাবেয়া খাতুনকে হারিয়েছে। এটি যে আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের কত বড় ক্ষতি সে কথা পরে সুযোগ পেলে লিখব। এখন ব্যক্তিগত শোক আর ক্ষতির কথাই বলছি।

রাবেয়া খাতুনের সঙ্গে আমার শেষ দেখা বেশ কয়েক বছর আগে। ঢাকায় ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে (তখন বোধ হয় নাম ছিল রূপসী বাংলা) তাঁর জন্মদিন পালিত হচ্ছিল। ঢাকার শিল্পী-সাহিত্যিকরা উপচে পড়েছিলেন সেখানে। আমি হঠাৎ গিয়ে হাজির হয়েছিলাম। মঞ্চে বসা রাবেয়া খাতুনকে সম্রাজ্ঞীর মতো দেখাচ্ছিল। তিনি অবশ্যই ছিলেন সাহিত্যের সম্রাজ্ঞী। বয়স হয়েছে। চেহারায় তার চিহ্ন নেই। পঞ্চাশের দশকে সওগাতের সাহিত্য বৈঠকে তাঁকে যেমন দেখেছি, তেমনি আছেন। তবে চুল পেকেছে। চেহারায় তারুণ্যের শ্রীটা একটু নিষ্প্রভ।
তাঁকে সম্মাননা জানানোর জন্য আমাকে যখন ডাকা হলো, আমি তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেছিলাম, রাবেয়া খাতুন আমাদের সাহিত্যজগতের প্রভাবতী দেবী সরস্বতী। আর সেলিনা হোসেন হচ্ছেন আশাপূর্ণা দেবী। সেলিনা হোসেন আমাদের চেয়ে বয়সে ছোট। কিন্তু তাঁর কলমের ঐশ্বর্য অনেক। আমি তাঁর জন্মদিনের সভায় যাওয়ায় রাবেয়া খাতুন অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন। সভামঞ্চে তাঁর পাশেই আমাকে বসতে দেওয়া হলো। তিনি আমার কুশল সংবাদ নিয়ে জানতে চাইলেন কী লিখছি? বললাম, রাজনীতির ছাইপাঁশ নিয়ে লিখছি। আপনার মতো কলমে সোনা ফলাতে পারিনি। রাবেয়া হেসে বললেন, যা ফলিয়েছেন তা-ই যথেষ্ট। সভামঞ্চে বসে নিম্নকণ্ঠে আরো কিছু আলাপ, যেমন আমার বাড়িতে খিচুড়ি খেতে আসবেন কবে? বলেছি, রাবেয়া, এবার আসতে পারব না, তবে লন্ডন থেকে আবার যখন আসব, তখন নিশ্চয় আপনার সঙ্গে দেখা করব।

সেই আমাদের শেষ দেখা এবং শেষ আলাপ। তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম আলাপের কথাও মনে আছে। তখন ফজলুল হকের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়নি। সম্ভবত ১৯৫১ সালের প্রথম দিকের কথা। পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলীতে ছিল মাসিক সওগাত ও সাপ্তাহিক বেগমের অফিস। এই অফিসে প্রতি মাসে একবার পূর্ব পাকিস্তান সংস্কৃতি সংসদের উদ্যোগে সাহিত্যসভা হতো। আর প্রায় প্রতিদিনই হতো ওই অফিসে পঞ্চাশের তরুণ শিল্পী-সাহিত্যিকদের আড্ডা। মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন চা-নিমকপাড়া জোগাতেন।
প্রচণ্ড আড্ডা বসত প্রতিদিনই। রবীন্দ্রনাথ থেকে বড় সব কবিকেই তখন আমরা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতাম। এই আড্ডায় নিয়মিত আসতেন শামসুর রাহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ, হাসান হাফিজুর রহমান, ফজলে লোহানী, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, মুর্তজা বশীর, সাইয়িদ আতিকুল্লাহ, আল মাহমুদ, মুস্তাফা নূরউল ইসলাম এবং আরো অনেকে। মাঝেমধ্যে আসতেন মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী এবং কোনো কোনো দিন ড. কাজী মোতাহার হোসেন।
এই আড্ডায় একদিন এক তরুণী এলেন। কার সঙ্গে এসেছিলেন মনে নেই। তিনি সঙ্গে তাঁর লেখা একটি ছোটগল্প নিয়ে এসেছিলেন। সেটি আড্ডায় পড়লেন। সবার তাক লেগে গেলেন। সেই পঞ্চাশের দশকে ঢাকার মেয়েরা যখন ঘোমটা থেকে বেরিয়ে আসেনি, তখন এক তরুণীর কলম থেকে এমন গল্প বের হওয়া। গল্পটি গ্রামীণ পরিমণ্ডলে লেখা হয়েছিল। সেই গল্পে ছিল গ্রামের এক চাষি বউয়ের জীবন সংগ্রামের কাহিনি। গল্পটি শুনে আলাউদ্দিন আল আজাদ লাফিয়ে উঠলেন। রাবেয়াকে বললেন, আপনার লেখায় সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা চমৎকার ফুটেছে। আপনার চরিত্রগুলো বলিষ্ঠ। আলাউদ্দিন আল আজাদ তখন চরম বামপন্থী ছিলেন। গল্পে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা কতটা ফুটিয়ে তোলা যায়, তার চেষ্টা করছেন। রাবেয়া তাঁকে বললেন, সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা কী আমি জানি না। আমি জীবনের বাস্তবতা এই গল্পে ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছি। তাঁর জবাব শুনে আমি চমৎকৃত হয়েছি। নিজেই যেচে তাঁর সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। সেই পরিচয় ক্রমে গভীর বন্ধুত্বে পরিণত হয়েছিল।
আরেক দিন সওগাত অফিসের ওই আড্ডায়ই সবাই রাবেয়া খাতুনকে একটি গান শোনানোর জন্য ধরলেন, বললেন, আপনি এত ভালো গল্প যখন লেখেন, তখন নিশ্চয়ই ভালো গান গাইতেও জানেন। রাবেয়া বারবার মাথা নেড়ে জানালেন, তিনি গান জানেন না। কিন্তু সবাই নাছোড়বান্দা। তখন রাবেয়া গাইলেন একটি রবীন্দ্রসংগীত ‘ওরে নতুন যুগের ভোরে’। এরপর রাবেয়া প্রায়ই সওগাতের আড্ডায় আসতেন। কথাশিল্পী হিসেবে তখনই তাঁর প্রতিষ্ঠা অর্জন শুরু।
মাঝখানে হঠাৎ রাবেয়া খাতুন সওগাতের সাহিত্যসভায় আসা বন্ধ করেন। সবারই আশা, তিনি শিগগিরই আবার নতুন গল্প নিয়ে আসবেন আড্ডায়। তাঁকে কোথায় পাব, আমরা জানি না। তিনি শিক্ষকতা করতেন, সাংবাদিকতা করতেন, তা আমরা সঠিকভাবে জানতাম না। এই সময় একদিন ইত্তেফাকের পুরনো অফিসে তাঁর সঙ্গে আমার দেখা। তিনি চলে যাচ্ছিলেন, আমাকে দেখে থামলেন। দুজন ইত্তেফাক অফিসের ভেতরে গিয়ে বসলাম।
সময়টা ভাষা আন্দোলনের বছর ১৯৫২ সালের জুন মাস। জিজ্ঞেস করলাম, সওগাতের আড্ডায় আপনাকে দেখি না কেন? তিনি বললেন, কিছু কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। তার পরই স্মিত হেসে বললেন, ‘আমি বিয়ে করতে যাচ্ছি।’ আমি চমকে উঠে বললাম, কাকে বিয়ে করছেন? রাবেয়া খাতুন বললেন, ফজলুল হককে।
ফজলুল হককে আমি তখন চিনতাম সিনেমা ও সিনেমা সাংবাদিকতা নিয়ে আগ্রহী এক যুবক হিসেবে। ১৯৫২ সালের জুলাই মাসে তাঁদের বিয়ে হয়। তারপর ফজলুল হকের সঙ্গেও ভালোভাবে পরিচিত হয়ে উঠি। অসম্ভব আমুদে আর অমায়িক মানুষ ছিলেন ফজলুল হক। তাঁর ভেতরেও যে সাহিত্য প্রতিভা ছিল, তা কিছুদিনের মধ্যে আমরা জানতে পারি। তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়, তিনি বাংলাদেশে চলচ্চিত্রশিল্পের অগ্রদূত। তাঁর সিনেমা পত্রিকাটি বাংলাদেশে প্রথম সিনে সাহিত্য মাসিক। অন্যদিকে পঞ্চাশের দশকে অজস্র গল্প-উপন্যাস রচনার সঙ্গে রাবেয়ার সম্পাদনায় বেরোত একটি মহিলা মাসিক অঙ্গনা।
আমি বিয়ে করে পুরান ঢাকার নারিন্দায় বাস করতে শুরু করি। রাবেয়া-ফজলুল হক দম্পতিও নারিন্দায় এসে বাস করতে শুরু করেন। তখন তাঁদের বাসায় তখনকার তরুণ সাহিত্যিকরা এসে আড্ডা দিতেন। জহির রায়হান তখন আমাদের মতো উঠতি সাহিত্যিক। কিন্তু ফিল্মের দিকে ঝোঁক বেশি। ফলে খুব দ্রুত রাবেয়া-ফজলুল হক দম্পতির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। রাবেয়া খুব চমৎকার খিচুড়ি রান্না করতেন। জহির রায়হানের খিচুড়ি খাওয়ার ইচ্ছা হলেই বলতেন চলুন গাফ্ফার, রাবেয়াদের বাসায় যাই। খিচুড়ি খাব। আর রাবেয়াও আমাদের দেখলেই খিচুড়ি রাঁধতে বসে যেতেন।
ঢাকায় রাবেয়ারা বহু বাসা বদল করে বাস করেছেন। সদরঘাটের কাছে ওল্ড স্ট্রিট, বনগ্রাম সব বাসার কথা আমার স্মরণে নেই। রাবেয়া ছোটগল্প ও উপন্যাস দুইয়েরই কুশলী শিল্পী। আমিও গল্প লিখি। সে জন্যই সম্ভবত আমাদের সখ্য একটু বেশি করে গড়ে উঠেছিল। আমার কাছে বিস্ময়ের ব্যাপার ছিল রাবেয়া খাতুনের সাহিত্য প্রতিভা। গ্রামীণ পরিমণ্ডলে সহজ-সরল জীবন আঁকতে আঁকতে তিনি কী করে বাংলাদেশের নির্মীয়মাণ মধ্যবিত্ত সমাজের সরল, অসরল, জটিল, কুটিল চরিত্র আঁকার নগরসভায় উঠে এলেন, তা বুঝতে আমার সময় লেগেছে। চরিত্রে যেমন ছিলেন প্রগতিশীল, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ছিলেন দৃঢ়নিষ্ঠ। তাঁর প্রতিভাও ছিল বহুমুখী। গল্প, উপন্যাস তো তিনি লিখেছেনই। তা ছাড়া লিখেছেন গবেষণাধর্মী লেখা। নাটক, কিশোরদের জন্য উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনি ইত্যাদি।

মুক্তিযুদ্ধের ওপরও তিনি অনুপম উপন্যাস লিখেছেন। লিখেছেন স্মৃতিকথা। এই স্মৃতিকথায় তিনি আমাকে উল্লেখ করেছেন একজন হিম্যান হিসেবে। কেন, তা আমি জানি না। তাঁর স্বামী ফজলুল হক শিশুতোষ চলচ্চিত্র ‘প্রেসিডেন্ট’ নির্মাণ করেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল মুক্তিযুদ্ধের ওপর একটি বড় চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন। এ জন্য তিনি ১৯৭১ সালে কলকাতায় অবস্থান করে মুজিবনগর সরকারের তথ্য বিভাগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কলকাতার পার্ক সার্কাসে বালু হাককাক লেনে ৯ মাস একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ আমার হয়েছিল। তিনি মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে অনেক অমূল্য তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন।
কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি আর ফিরে আসেননি। একবার কলকাতায় গিয়ে আমি জানতে পারি, তিনি আর বেঁচে নেই। আমার বড় বোনের কবর কলকাতার গোবরার কবরস্থানে। আমার বোনের কবরের কাছে ফজলুল হকও সমাহিত হয়েছেন। এখন ঢাকার মাটিতে সমাহিত হলেন তাঁর স্ত্রী রাবেয়া খাতুন। রেখে গেলেন যোগ্য পুত্র ফরিদুর রেজা সাগরসহ আরো তিন সন্তান।
জীবনকালেই রাবেয়া তাঁর অসাধারণ বহুমুখী প্রতিভার জন্য স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদকসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। আমার আজকের লেখা তাঁর সাহিত্যকৃতির আলোচনা নয়। সে আলোচনা স্বতন্ত্রভাবে করতে হবে। আজ শুধু তাঁকে শেষ সম্মান জানানোর জন্য এই ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণা। রাবেয়া খাতুনের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে পঞ্চাশের শেষ নক্ষত্রটিও নিভে গেল বলে আমার ধারণা। আর শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজনকে আন্তরিক সমবেদনা জানাই।