Home শীর্ষ কাহিনি নাটক সিনেমায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ

নাটক সিনেমায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ

SHARE
Gerila

রেজানুর রহমান: ভদ্রলোক মহাবিরক্ত। আনমনে খিচতি আওড়াচ্ছেন- আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ কী এতটাই সহজ ছিল? ঠাস… ঠাস… ঠাস… বন্ধুকের কয়েকটা গুলি আর সঙ্গে সঙ্গে দেশ স্বাধীন হয়ে গেল? এতটাই সহজ ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধ? আরে ভাই মুক্তিযুদ্ধ এত সহজ ছিল না। সেই  দুঃসময়ে পাক হানাদার বাহিনী গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে। যাকে যেখানে পেয়েছে পশুর মতো গুলি করে মেরেছে। মা- বোনদের ইজ্জত হরণ করেছে। ইতিহাসের নির্দয়, নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠেছিল ওরা। চোখের সামনে যখন সেই দিনগুলোর ছবি ভেসে ওঠে তখন স্থির থাকতে পারি না। অস্থির লাগে…

ভদ্রলোক একটি ব্যাংকে চাকরি করেন। পারিবারিক এক অনুষ্ঠানে এসে অবসরের ফাঁকে টেলিভিশন খুলে বসেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের কাহিনি অবলম্বনে একটি টেলিফিল্ম শুরু হবে দেখে নড়েচড়ে বসলেন। কিন্তু টেলিফিল্ম-এর শুরুটা দেখেই তিনি মহাবিরক্ত। এসব কি দেখাচ্ছে? মুক্তিযোদ্ধার চেহারা এত ফিটফাট? চুলে শ্যাম্পু করা। ক্লিন সেভ। নাদুশ নদুস চেহারা। মাথায় একটা  লাল রংয়ের গামছা বাঁধলেই কী মুক্তিযোদ্ধা হওয়া যায়? এরা কি মূর্খ্য? ইতিহাস জানে না? ইতিহাস না জেনেই মুক্তিযুদ্ধের টেলিফিল্ম বানায়। এদের শাসিৱ হওয়া উচিত।

যেহেতু আমিও নাটক, টেলিফিল্ম বানানোর চেষ্টা করি তাই ভদ্রলোকের কথায় আমার মাঝে অপমানবোধ সম্প্রসারিত হতে থাকলো। কী বলতে চান তিনি? তিনি কি বাংলাদেশের নির্মাতাদের নাটক, সিনেমা দেখেন। অনেকেই ভালো কাজ করছে। অনেকের কাজ দেখে চোখ ফেরানো যায় না। দশটা কাজের মধ্যে একটা দুইটা দুর্বল কাজ থাকতেও পারে। কাজেই এভাবে ঢালাও মন্তব্য করা যায় না।

ভদ্রলোকের কথায় প্রতিবাদের সুরে জিজ্ঞেস করলাম- আপনি কি নিয়মিত বাংলাদেশের নাটক, সিনেমা দেখেন?

তিনি তীর্যক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন- বাংলাদেশের নাটক, সিনেমা কি দেখার মতো? আমি আবার প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিলাম। আমাকে থামিয়ে দিয়ে টিভির দিকে চোখ ফেলে বললেন- ঐ যে দ্যাখেন বাংলাদেশের নাটকের নমুনা। মুক্তিযোদ্ধার মাথায় শ্যাম্পু করা চুল। ক্লিন সেভ। আরে ভাই মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘সেভ’ করার মতো সময় কি ছিল? জীবন নিয়া টানাটানি… সেভ করার সময় কোথায়?

ভদ্রলোক শেষের দিকে অস্পষ্ট শব্দ করলেন। বোঝা গেল অশোভন কোনো শব্দ উচ্চারণ করেছেন। নাহ! এই ভদ্রলোককে ছেড়ে দেয়া যাবে না। তর্ক করতে হবে। তিনি একটা নাটক বা টেলিফিল্ম দেখে এভাবে মন্তব্য করতে পারেন না।

তাকে আবার প্রশ্ন করলাম- আপনি কি বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলে নিয়মিত নাটক, টেলিফিল্ম দেখেন?

তিনি আবারও বিরক্তি প্রকাশ করে বললেন- না, নিয়মিত দেখি না।

মেজাজ বিগড়ে গেছে আমার। দৃঢ় কণ্ঠে প্রতিবাদ করলাম- যেহেতু আপনি নিয়মিত বাংলাদেশের নাটক, সিনেমা দেখেন না  কাজেই এভাবে ঢালাও মন্তব্য করা আপনার সাজে না। আচ্ছা, আপনি কি মনে করেন বাংলাদেশের সব নাটক, সব সিনেমা খারাপ? ঠিক আছে আপনি দশটা খারাপ নাটকের নাম বলেন তো।

ভদ্রলোক আগের মতোই বিরক্ত হয়ে বললেন- আমি তো নিয়মিত নাটক দেখি না। কাজেই আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারব না।

মৃদু হেসে আবার তাকে জিজ্ঞেস করলাম- ঠিক আছে এবার দশটা ভালো নাটকের নাম বলেন! আচ্ছা, নাটকের নাম মনে না এলে সিনেমার নামও বলতে পারেন। দশটা ভালো সিনেমা…

ভদ্রলোক এবার যারপর নাই বিরক্ত হয়ে বললেন- বললাম তো আমি বাংলাদেশের নাটক, সিনেমা খুউব একটা দেখি না।

এবার ভদ্রলোকের প্রতি কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিলাম- যা দেখেন না তা নিয়ে মন্তব্য করা কি ঠিক? আপনার হাতের পাঁচটা আঙ্গুল কি সমান? কোনোটা বড় কোনোটা ছোট? হঠাৎ আপনি হাতের ছোট আঙ্গুল ছুঁয়ে বলছেন- সবকিছুই ছোট… বড় আঙ্গুল কিন্তু আছে। আপনি তা ছুঁয়ে দেখছেন না। অথবা ছুঁয়ে দেখার প্রয়োজনও মনে করছেন না। আগে বাংলাদেশের নাটক সিনেমা নিয়মিত দেখেন। তারপর না হয় মন্তব্য করবেন…

ভদ্রলোক আমার কথায় খুশি হলেন নাকি বেজাড় হলেন বোঝা গেল না। তিনি পাশের ঘরে চলে গেছেন। টেলিভিশনে টেলিফিল্ম চলছে। সে দিকে চোখ ফেলে যারপর নাই বিস্মত হলাম। একি দেখছি?

দুই.

MoktiJodder-Natokমেকআপম্যান তার মুখে দাড়ি লাগিয়েছেন। রাজাকার বলেই তার মুখে দাড়ি লাগানো হয়েছে। কিন্তু দাড়ি ঠিকমতো লাগানো হয়নি। খুলে পড়ে যাবে এমন অবস্থা। রাজাকার রূপি অভিনেতা একটি মেয়ের সঙ্গে কুরুচিপূর্ণ ভঙ্গিতে কথা বলছেন। চরিত্র দেখে বোঝা যাচ্ছে মেয়েটি গরিব ঘরের। অথচ তার মাথায় চুল শ্যাম্পু করা। ভ্রূ প্লাক করা। কোনোভাবেই চরিত্রের সঙ্গে যাচ্ছে না। দু’জনের অভিনয়ও অবিন্যস্ত। চোখ রাখতে পারলাম না টিভির দিকে। অপরাধ বোধ কাজ করছে। মনে হলো একটু আগে ভদ্রলোকের সঙ্গে এভাবে বাহাস করা ঠিক হয়নি। মাফ চেয়ে নিতে   হবে। খোঁজ নিয়ে জানলাম তিনি চলে গেছেন।

কয়েকমাস পর ভদ্রলোকের সঙ্গে আবার দেখা। শাহবাগে কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরিতে একটা অনুষ্ঠানে এসেছেন। দূর থেকে আমাকে দেখেই এগিয়ে এলেন। মৃদু হেসে বললেন- ভাই আমি এখন নিয়মিত বাংলাদেশের টিভি চ্যানেল দেখি। নাটক, টেলিফিল্ম দেখার চেষ্টা করি। কিন্তু বিজ্ঞাপনের জ্বালায় মন বসাতে পারি না। ভাই আপনার কাছে আমার কয়েকটা প্রশ্ন আছে!

উৎসুখ হয়ে জানতে চাইলাম- জি বলেন? ভদ্রলোক কিছু একটা ভাবলেন। তারপর বললেন- সেদিন স্বাধীনতা দিবসের টেলিফিল্ম নিয়ে আপনার কাছে অস্থিরতা প্রকাশ করেছিলাম। হ্যাঁ আপনার কথাই ঠিক। একটা কাজ দিয়ে আর দশটা কাজের মূল্যায়ন করা যায় না। তবে ভাই স্বাধীনতা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্যের আপন ঠিকানা। আমাদের শেকড়। এই বিষয় নিয়া খাম খেয়ালি করা ঠিক না। স্বাধীনতার নাটক, টেলিফিল্ম কেন শুধু ডিসেম্বর অথবা মার্চ মাসে টিভি চ্যানেলে প্রদর্শন করা হবে? বছরের অন্য সময়ে নিয়মিত প্রচার করতে সমস্যা কোথায়? দেশে এখন ২৮টি টিভি চ্যানেল। এর মধ্যে ২০টির মতো টিভি চ্যানেল বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান মালা প্রচার করে। প্রতিটি চ্যানেলে প্রতিদিন একটি করে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অনুষ্ঠান প্রচার করতে সমস্যা কোথায়। সেটা হতে পারে নাটক, আলোচনা, ডকু ফিল্ম, অথবা যুদ্ধে অংশ নেয়া বরেণ্য ব্যক্তির সাক্ষাৎকার। এটা কি করা যায় না?

ভদ্রলোককে এবার মনে হলো বেশ পজিটিভ। মৃদু হেসে বললাম- আমাদের কাগজ আনন্দ আলোয় আপনার কথাগুলো লিখবো। টিভি চ্যানেল কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই আপনার পরামর্শ ভেবে দেখবেন।

ভদ্রলোক এবার একটি গল্প বললেন। এটা তার দেখা বাস্তব গল্প।

১৯৭১। শীতকাল। একটি গ্রামের ঘটনা। প্রায় প্রতিদিন পাক হানাদার বাহিনী স্থানীয় রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে গ্রামে হামলা চালায়। কিশোরীসহ মধ্য বয়সের মেয়েদের ধরে নিয়ে যায়। ঐ আইলো রে… এই একটি চিৎকার সবার পরিচিত। এই চিৎকার শোনা মাত্রই গ্রামের নারী-পুরুষ সবাই প্রাণ ভয়ে পালাতে শুরু করে। গ্রামেরই একটি বাড়িতে ছোট ভাই দারুণ অসুস্থ। তাই মেলেটারী এসেছে শোনা মাত্রই বড় ভাই অসুস্থ ছোট ভাইকে পাজা কোলা করে নিয়ে উদভ্রানেৱর মতো ছুটতে থাকেন। কী এক মায়াময় সে দৃশ্য! দেখে চোখের পানি সরানো যায় না।

বর্তমান কাল। গ্রামের সেই ছোট ভাই এখন সুস্থ। কিন্তু বড় ভাইয়ের সঙ্গে তার বনিবনা নাই। ভিটেমাটি ভাগ হয়ে গেছে। বাড়ির মাঝে দেয়াল উঠেছে। এক ভাই অন্য ভাইয়ের শত্রু…

গল্পটি বলে থামলেন ভদ্রলোক। ভেবে নিয়ে বললেন- গল্পটি বাস্তব। এটা নিয়ে ফিল্ম হতে পারে ভেবে দেখবেন।

ভদ্রলোক চলে গেলেন। অনেক দিন ভেবেছি ভদ্রলোকের এই গল্প নিয়ে নাটক বানাব। কিন্তু কেন যেন মন সায় দেয় না। ভাইয়ে-ভাইয়ে বিরোধ আর কতকাল? এখন তো ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সময়। কিন্তু বাস্তবতাকে কি অস্বীকার করা যায়?

মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ঠিকানা। শুধু ডিসেম্বর আর মার্চ মাসে নয় বছরের প্রতিটি দিন মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রচার মাধ্যমে নানা ভাবে তুলে ধরা জরুরি। মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরব গাঁথা তরুণ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার লক্ষ্যে টিভি নাটক, সিনেমার আরও কার্যকর ভূমিকা জরুরি। আশাকরি সময়ের বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট সকলে বিষয়টি ভেবে দেখবেন।

 

বৃহৎ অর্থে একটি বাড়ি একটি দেশের প্রতীক

-ফরিদুর রেজা সাগর, কাহিনীকার

SAGOR-SIRএকটা প্রশ্ন উঠতেই পারে- বাড়ি কী শুধুমাত্র একটি বাড়িই? শুধুমাত্র বসবাসের জায়গা? না তা নয়। বাড়ি হলো একটি ঠিকানা। এক কথায় নিরাপদ আশ্রয়স্থল। বৃহৎ অর্থে একটি বাড়ি একটি দেশ ও রাষ্ট্রের প্রতীক। যার জন্য ১৯৭১ সালে আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছি। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম শেষে একটি দেশ অর্জন করেছি। এক অর্থে বাড়ির স্বাধীনতা পেয়েছি। কেমন আছে সেই স্বপ্নের বাড়িটি? আমরা মানুষগুলোই বা কেমন আছি? বৃহৎ অর্থে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ কেমন আছে? এই উপলব্ধি থেকে আজ থেকে এগার বছর আগে ‘বাড়ি’ শীর্ষক সিক্যুয়াল টিভি নাটক শুরু হয়। এবার ‘বাড়ি’ সিক্যুয়ালের ১১ বছর চলছে। আশা করি ‘বড় বাড়ি ছোট বাড়ি’ শীর্ষক এবারের নাটকে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে ভালোবাসার ক্ষেত্রে আরও আন্তরিক উপলব্ধি হয়েছে সবার।