Home আরোও বিভাগ টিভি গাইড নাটক সিনেমার একাল সেকাল

নাটক সিনেমার একাল সেকাল

SHARE

সৈয়দ ইকবাল
একটা সময় ছিল যখন শুধু আমাদের দেশেই নয় গোটা পৃথিবীতে সিনেমাই ছিল সব চেয়ে বড় বিনোদন মাধ্যম। সিনেমার প্রতি ছিল মানুষের দুনির্বার আকর্ষণ। হলের ভিতর সাদা পর্দায় মানুষ হাঁটে, দৌঁড়ায়, হাসে, কাঁদে। জীবনের কথা উঠে আসে বড় পর্দায়। এ যেন এক অবাক করা জাদু। দেখলেই মনে প্রশান্তি আসে। আনন্দে মন ভরে যায়। তাই কর্মক্লান্ত মানুষ, বিনোদন পিয়াসী মানুষের একমাত্র আগ্রহের জায়গা হয়ে ওঠে সিনেমা হল। নতুন সিনেমা মুক্তি মানেই উৎসব আনন্দের ঢেউ জেগে ওঠা। প্রতিটি অগ্রসরমান পরিবারে তখনকার দিনে সিনেমা দেখাই ছিল প্রধান বিনোদন। তাও আবার রীতিমত পরিকল্পনা সাজিয়ে পরিবারের লোকজন সিনেমা হলে সিনেমা দেখতে যেতেন। সিনেমা দেখে ফিরে এসে পারিবারিক আড্ডায় সিনেমার ভালো-মন্দ নিয়ে আলোচনা চলত। আর যদি সিনেমাটি মনের মতো হয় তাহলে তো মুখে মুখে ছড়িয়ে যেত সিনেমাটির নাম। বাসা বাড়ি থেকে অফিস আদালতের আড্ডায়ও ভালো সিনেমাটি নিয়ে কথা হতো। ‘আহা! কী দারুন সিনেমা! রাজ্জাকের অভিনয় দেখেছেন। আর কবরীর তো জুড়ি নেই। আনোয়ার হোসেন আর রোজী সামাদ তো ফাটিয়ে দিয়েছে….’ এ ধরনের কত কথাই না আলোচিত হতো। পরিবারের মানুষেরা সিনেমার নায়ক-নায়িকার নাম ধরে এমন ভাবে আলোচনা-সমালোচনা করতেন মনে হতো সিনেমার রাজ্জাক, ববিতা, শাবানা, ফারুক, আলমগীর, কবরী, আনোয়ার হোসেন, রোজী সামাদ, আনোয়ারা তাদের পরিবারেই সদস্য অথবা কতদিনেরই না চেনা।
প্রিয় অভিনেতার টানে এক সিনেমা অনেকেই একাধিকবার দেখতে যেতেন। বিনোদন পত্রিকার পাতায় ছাপা হতো নায়ক-নায়িকাদের বড় বড় ছবি। আর এই ছবিগুলো সংগ্রহ করে অনেক ভক্ত তার শোবার ঘরে টাঙ্গিয়ে রাখতেন। এরকম কতো ভক্তের খবরই না পাওয়া যেত। নায়করাজ রাজ্জাকের ছোট বড় নানা ধরনের ছবি দিয়ে ভরিয়ে রেখেছে নিজের থাকার ঘরের দেয়াল। কবরী, ববিতার ছবি দিয়েও ছবির জাদুঘর সাজানোর কত ঘটনাই না ঘটেছে। সিনেমার নায়ক নায়িকারা ছিল অনেকের কাছে দেবতার মতো! তাকে ছুঁয়ে দেখতে পারলেই যেন জীবন ধন্য…
কালের বিবর্তণে বিনোদনের আরেকটি মাধ্যম টেলিভিশন বিস্তৃত আকার ধারণ করলো। আমাদের দেশে টেলিভিশন মানেই ছিল একটি মাত্র নাম বিটিভি। সিনেমার মতোই ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল বিটিভি। বিটিভিতে প্রতি সপ্তাহে এক ঘণ্টার একটি নাটক প্রচার হতো। নাটকের এই অনুষ্ঠানটি ছিল বিটিভির সবচেয়ে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান। রাতে অর্থাৎ সন্ধ্যার পরই প্রচার হতো এক ঘণ্টার নাটক। তখন তো আর মোবাইলের যুগ ছিল না। তবুও নাটক প্রচারের পর-পরই বাতাসের বেগে ছড়িয়ে যেতো নাটকটির ভালো-মন্দের অনুভ‚তি। পরের দিন বিভিন্ন অফিস আদালতেও আলোচনার ঝড় তুলতো ওই নাটকটি। ফলে নতুন কোনো অভিনেতা, অভিনেত্রী একটি নাটকে ভালো অভিনয় করলেই হয়ে যেতো স্টার। পত্র-পত্রিকায় তাকে ঘিরে তোলপাড় শুরু হতো। এক সময় সিনেমার জনপ্রিয়তা ভাগাভাগি হয়ে যায় টেলিভিশনের পর্দায়।
কালের বিবর্তণে টেলিভিশনের জনপ্রিয়তাও হ্রাস পেতে থাকলো। অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আবির্ভাবে সিনেমা হলের প্রতি মানুষের সীমাহীন আগ্রহে যেন কমে যেতে শুরু করলো। এর কারণ হলো তথ্য প্রযুক্তির আধুনিক আবিস্কার। আগে সিনেমা দেখতে হলে দল বেধে হলে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। টেলিভিশনের যুগান্তকারী প্রসারের ফলে টেলিভিশনে অন্যান্য অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সিনেমাও ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠলো। অর্থাৎ এক সময় সিনেমা দেখতে হলে যেতে হতো সিনেমা হলে। পরে সেই সিনেমাই দেখার সুযোগ মিলল ঘরের ড্রয়িংরুমে টেলিভিশনের পর্দায়। ফলে সিনেমা হলের প্রতি সাধারন দর্শকের আগ্রহ যেন কমে যেতে থাকল। যেখানে ঘরে বসেই টিভিতে সিনেমা দেখা যায় সেখানে কষ্ট করে সিনেমা হলে যাবারই বা দরকার কী?
আবার এক সময় হঠাৎ করেই সিনেমা দেখার সুযোগ মিলল মোবাইল ফোনের পর্দায়। শুধু কী সিনেমা? টিভি নাটক সহ আরও কত কিছুই না এখন মোবাইল ফোনের পর্দায় দেখা যায়। ফলে নাটক সিনেমা দেখার ক্ষেত্রে মাধ্যমের পরিবর্তন ঘটলো। এক সময় সিনেমা হল ছিল বিনোদনের অন্যতম আকর্ষণ। পরে সেটা চলে এলো পরিবারের ড্রয়িংরুমে। এখন মোবাইল ফোনের পর্দায় সিনেমা, নাটক দেখার অবারিত সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে হেঁটে হেঁটে, গাড়িতে যেতে যেতে এমনকি বিছানায় শুয়েও মানুষ নাটক, সিনেমা দেখে। ফলে বিনোদনের ক্ষেত্র অনেকটাই বদলে গেছে!
কিন্তু কাঙ্খিত পরিবর্তনটাই বা কী হলো? নাটক, সিনেমা সহ বিনোদনের অনেক কিছুই এখন মোবাইল ফোনে দেখার সুযোগ রয়েছে। তা সত্বেও আমাদের নাটক, সিনেমা নিয়ে অতীতকালের মতো কেন ‘ভালো’ আলোচনা হয় না? এখন তো আর যানজট অতিক্রম করে সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা না দেখলেও চলে। ইউটিউবে ঢুকলেই সিনেমার বিরাট রাজ্য স্বাগত জানাবে। হাতের কাছে কতই না সুযোগ। কিন্তু আমরা কি সেই সুযোগ পজিটিভ অর্থে গ্রহণ করছি?
ধরা যাক, পবিত্র ঈদের কথা। প্রতিবারের মতো এবারও ঈদে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে শত শত টিভি নাটক টেলিফিল্ম এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সিনেমার পাশাপাশি বাহারী অনেক অনুষ্ঠান প্রচার হবে। কতজন থাকব এই সব অনুষ্ঠানের সাথে? এত বড় একটা উৎসব। নিজেদের কতই না আয়োজন থাকবে। দেশে এতো আয়োজন থাকা সত্বেও এবারও কী আমরা অন্য দেশে ঘুরবো? এই প্রসঙ্গে আনন্দ আলোর চলতি সংখ্যাতেই একটি পৃথক প্রতিবেদন ছাপা হলো। কাজেই এব্যাপারে বাড়তি কিছু বলতে চাই না। শুধু একটা অনুরোধ করিÑ হাতের কাছে অনেক অপশন রয়েছে বলে দেশের সংস্কৃতিকে অগ্রাহ্য করবেন না। এই ঈদে দেশের টিভি চ্যানেল সমূহের অনুষ্ঠান দেখুন। সিনেমা হলে যাবেন নতুন মুক্তি প্রাপ্ত সিনেমা দেখতে। ভালোর পাশে আলো ফেলুন। ভালো সবকিছুর সাথে থাকুন। তবেই না ভালো কাজের প্রতি উৎসাহ বাড়বে।