Home শীর্ষ কাহিনি প্রচ্ছদ মুখ নতুন পরিচয়ে সুবর্না মুস্তাফা

নতুন পরিচয়ে সুবর্না মুস্তাফা

SHARE
Subarna-Mostafa

রেজানুর রহমান
শ্রদ্ধাভাজন ফরিদুর রেজা সাগরের নিকট থেকে
তথ্যটা পেলাম। ২০ ফেব্রæয়ারি ২০১৯। মহান
জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ
সদস্যবৃন্দ মাননীয় স্পীকারের কাছ থেকে শপথ নিবেন।
একই দিনে একুশে পদক প্রাপ্ত গুণী জনদেরকেও পদক
প্রদান করা হবে। গুণী অভিনেত্রী সুবর্না মুস্তাফা দুটি ক্ষেত্রেই
সাফল্য অর্জন করেছেন। সকালে মহান জাতীয় সংসদের
সদস্য হিসেবে শপথ নিবেন। বিকেলে গ্রহণ করবেন একুশে
পদক। ক’জনের ভাগ্যে এমন সৌভাগ্য ধরা দেয়? আমাদের
দেশে এর আগে বোধকরি আর কারও বেলায় এমন অনিন্দ্য
সুন্দর সৌভাগ্যের ঘটনা ঘটেনি। সকালে শপথ নিবেন
জাতীয় সংসদের স্পীকারের কাছে। আবার বিকেলে একুশে
পদক গহ্র ণ করবেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে।
সত্যি এ এক বিরল সৌভাগ্য। যে সৌভাগ্যের অধিকারী
দেশের গুণী অভিনেত্রী সবার প্রিয় সুবর্না মুস্তাফা। ¯ভ^ াবতই
আমরা সবাই বেশ খুশি। যাকে পাই তাকেই ঘটনাটা বলি।
আনন্দ বিনিময় করি। হঠাৎই তথ্যটা দিলেন দেশের বিশিষ্ট
শিশুসাহিত্যিক, চ্যানেল আই-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক
ফরিদুর রেজা সাগর। সুবর্না মুস্তাফা তার অনেক কাছের
বন্ধু! কাজেই বন্ধুর সাফল্যে তার তো খুশি হওয়ার কথা।
অথচ তিনি বেশ বিষণড়ব। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি
সুবর্নার ঘটনাটা জানো?
খুশি হয়ে বললাম, হ্যা জানিতো… ২০ ফেব্রæয়ারি একই
দিনে তিনি জাতীয় সংসদের এমপি হিসেবে শপথ নিবেন।
পাশাপাশি একুশে পদক গ্রহণ করবেন… এই ভাগ্য
কয়জনের হয়?
ফরিদুর রেজা সাগর বিষনড়ব কণ্ঠেই বললেন, তুমি বোধকরি
আসল ঘটনাটা জানো না?
আসল ঘটনা? কি? কৌতুহলী চোখে জিজ্ঞেস করলাম।
ফরিদুর রেজা সাগর বললেন, ২০ ফেব্রæয়ারি সুবর্না সংসদ
সদস্য হিসেবে শপথ নিবে, একুশে পদক গ্রহণ করবে।
অথচ ওইদিন ওর বাবার মৃত্যু দিবস। বলেই একটু যেন
আবেগ প্রবণ হয়ে উঠলেন ফরিদুর রেজা সাগর।
সত্যি এটা আবেগ প্রবণ হওয়ার মতোই পরিস্থিতি। বাবার
মৃত্যু দিনে সাফল্যের ¯ী^ কৃতি পাওয়া যেমন আনন্দের
তেমনই বিষাদেরও। বাবার মৃত্যু দিন যে কোনো সন্তানের
কাছে অনেক কষ্টের। বাবা মানে তো মাথার ওপর নির্ভরতার
ছাদ। বাবা না থাকলে সেই ছাদটা আর থাকে না। তখন
নিজেকে খুব একা লাগে! আকাশের দিকে তাকালেই
মনে হয় সাহস দেওয়ার যেন কেউ নেই। অসীম শূন্যতা
চারপাশে…


সুবর্না মুস্তাফার কাছে তার বাবা দেশ বরেণ্য অভিনেতা গোলাম মুস্তাফা ছিলেন সকল প্রেরনার উৎস

কে না জানে সুবর্না মুস্তাফার কাছে তার বাবা দেশ বরেণ্য
অভিনেতা গোলাম মুস্তাফা ছিলেন সকল প্রেরনার উৎস।
ভালো ছাত্রী হয়ে ওঠা, সেই সাথে একজন দক্ষ অভিনেত্রী
হিসেবে নিজেকে যোগ্য করে তোলা, সর্বোপরি সততা ও
ভালোবাসায় নিজেকে গড়ে তোলার মূল প্রেরনা তো প্রিয়
বাবার কাছেই পেয়েছেন সুবর্না মুস্তাফা! বাবা বেঁচে থাকা
অবস্থায় সুবর্না যুদি একই সাথে জাতীয় সংসদের প্রতিনিধির
পাশাপাশি একুশে পদক পাবার এই সৌভাগ্যটা অর্জন
করতেন তাহলে বাবা কি যে খুশি হতেন। অথচ বাবার মৃত্যু
দিনেই কিনা এক সাথে দুটি ঘটনাই ঘটবে।
প্রসঙ্গμমে সুবর্না মুস্তাফাকে এব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিলামÑ
বাবার মৃত্যু দিনে আপনার এতো সাফল্যের ঘটনা…
কথা টেনে নিলেন আমাদের প্রিয় অভিনেত্রী সুবর্না মুস্তাফা,
সত্যি ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রæয়ারি আমার কাছে একটি
অনন্যদিন হয়ে থাকবে। বাবার মৃত্যুদিনে জীবনের দুটি
গুরুত্বপুর্ণ সাফল্য পেলাম। বাবাকে খুউব মনে পড়ছে। তবে
আমি কখনই মনে করি না বাবা আমার পাশে নেই। বাবা
আমার পাশেই আছেন। মাঝে মাঝেই বাবার স্পর্শ অনুভব
করি। তখনই সৃষ্টিশীল কাজের অনুপ্রেরণা পাই!
সুবর্না মুস্তাফা। একই নামে কত পরিচয়। গুণী অভিনেত্রী,নাট্য পরিচালক, দক্ষ সংগঠক। এবার হলেন সংসদ সদস্য।
জীবনের নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছেন। এজন্য কি
তিনি আদৌ প্রস্তুত ছিলেন? প্রশড়ব করতেই বিনয়ের সাথে
বললেন, সত্যি কথা বলতে কী… আমি এজন্য মোটেই
প্রস্তুত ছিলাম না। তবে হ্যা, মহান জাতীয় সংসদের এমপি
হতে পেরে বুঝলাম দেশের প্রয়োজনে আমার অনেক কিছুই
করার সুযোগ রয়েছে। এজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ
হাসিনার কাছে আমি অনেক কৃতজ্ঞ। তিনি আমার ওপর
আস্থা রেখেছেন। এখন আমার দায়িত্ব হলো তাঁর আস্থার
প্রতিদান দেওয়া। আশাকরি আমি তা পারব।
প্রসঙ্গμমে সুবর্না মুস্তাফা বললেন, এর আগে কোনদিনই
আমি জাতীয় সংসদ ভবনে আসিনি। শপথ নেবার দিনই
প্র ম ঢোকার সুযোগ পেয়েছি। এতবড় সংসদ ভবন। কি
পবিত্র একটা জায়গা। আনন্দে আমার চোখে পানি এসে
গিয়েছিল। আমাকে বিশেষ ভাবে আকর্ষণ করেছে জাতীয়
সংসদ ভবনের বিশাল লাইব্রেরিটি। ৪০ হাজারেরও বেশী
বই আছে এই লাইব্রেরীতে। ভাবা যায়? ইতিমধ্যেই আমি
একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। আমি একজন অভিনেত্রী।
যত ব্যস্ততাই থাকুক না কেন অভিনয় আমি ছাড়তে পারব
না। তবে পারত পক্ষে আমি জাতীয় সংসদের কোনো
অধিবেশনই মিস করতে চাই না। সকল সেশনেই আমি
উপস্থিত থাকব বলে সিদ্ধাš Í নিয়েছি। আমাদের মাননীয়
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রী য় কাজে এতো ব্যস্ত থাকেন।
তবুও তিনি জাতীয় সংসদের কোনো সেশনই মিস করেন
না। তিনিই আমার প্রেরনা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পারলে আমি
কেন পারব না। আমি মহান জাতীয় সংসদের রীতিনীতি
শিখতে চাই। দেশের প্রয়োজনে নিজেকে কাজে লাগাতে
চাই। ইতিমধ্যেই আমার কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমাদের
জন্য একটা ওরিয়েন্টেশন ক্লাশ হয়েছে। সেখানেই জানলাম
আমরা এই যে ‘সাংসদ’ শব্দটা ব্যবহার করি তা ঠিক শব্দ
নয়। ওটা হবে সংসদ সদস্য।
সুবর্না মুস্তাফা আরও বলেন, জীবনের এক নতুন অধ্যায়ে
ঢুকে আমার মনে হচ্ছে নতুন করে স্কুে ল ভতির্ হয়েছি।
জাতীয় সংসদের মাননীয় স্পীকার হলেন এই স্কুলের কা¬ শ
টিচার। মাননীয় হুইপ যারা তারা হলেন ক্লাস মনিটর। আর
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হলেন স্কুলের প্রিন্সিপাল। শিক্ষাজীবনে
বরাবরই আমি ভালো ছাত্রী ছিলাম। আশা করি এখানেও
ভালো ছাত্রী হিসেবে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারব।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার ওপর যে আস্থা রেখেছেন তার
আমাকে সফল হতেই হবে। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ
গঠনে একটা কার্যকর ভ‚মিকা রাখতে চাই।
দীঘর্ অভিনয় জীবনে মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনার
প্রশেড়ব কোনো আপোষ করেন নাই সুবর্না মুস্তাফা। অনেকদিন
আগে বিটিভির একটা নাটকে সংলাপ ছিল এরকমÑ
“আমাদের মহান নেতা জিয়াউর রহমান ছিলেন স্বাধীনতার
ঘোষক” এই সংলাপের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সুবর্না মুস্তাফা
বিটিভি ভবনে বলে এসেছিলেন, যেদিন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু
পারবেন সেদিনই আমি বিটিভির নাটক করতে আসব। কথা
রেখেছিলেন সুবর্না মুস্তাফা। ওই ঘটনার পর অনেক বছর
আর বিটিভির কোনো নাটক অথবা অনুষ্ঠানে যাননি।
মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শগত অবস্থানে সুবর্না মুস্তাফা
কতটা বিশ্বস্থ এবং অনঢ় তার প্রমাণ মেলে আরেকটি
ঘটনা থেকে। বিটিভির ২৫ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে একটা
নাটকে দেখানো হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ শেষে একটি কিশোর
জাতীয় পতাকা হাতে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ শ্লোগান
দিতে দিতে সামনের দিকে দৌড়ে আসছে। বিটিভির
২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে এক আড্ডা অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট
উপস্থাপক আনিসুল হক, সাংবাদিক শাহাদৎ চৌধুরী,
বিশিষ্ট নাট্য ব্যক্তিত্ব আতিকুল চৌধুরী এবং সুবর্না
মুস্তাফা উপস্থিত ছিলেন। ওই অনুষ্ঠানে নাটকটির প্রসঙ্গ
তুলে সুবর্না মুস্তাফা আতিকুল হক চৌধুরীকে জিজ্ঞেস
করেছিলেন, আতিক ভাই আমাদের টিভি নাটকে ইতিহাস
বিকৃতির ঘটনা ঘটছে। স্বাধীনতা যুদ্ধ শেষে জাতীয়
পতাকা হাতে বাংলাদেশ জিন্দাবাদ শ্লোগান দিতে দিতে
একজন কিশোর ছুটে আসছে। কিন্তু ইতিহাস তা বলে
না। ইতিহাস বলেÑ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের সময় একটাই
শ্লোগান ছিলÑ জয়বাংলা। কাজেই ওই কিশোরের মুখে
জয় বাংলা শ্লোগানটা থাকলে ইতিহাসের প্রতি যথাথর্
শ্রদ্ধা জানান হতো বলে আমি মনে করি।
তখনকার দিনে বিটিভিতে ‘জয় বাংলা’ শব্দটা উচ্চারণ
করাও ছিল এক ধরনের অপরাধের মতো। অথচ সেটি অন
এয়ার হয়ে যায়। এরপর অনেকেই টেলিফোনে, ব্যক্তিগত
ভাবে সুবর্না ম¯ু Íাফাকে ধন্যবাদ জানান। একটি ঘটনার কথা
উল্লেখ করে সুবর্না মুস্তাফা বলেন, বিটিভিতে অনুষ্ঠানটি
প্রচার হবার পর সেμেটারিয়েট থেকে এক ভদ্রলোক
আমাকে ফোন করে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন অনেক দিন
পর বিটিভির কোনো অনুষ্ঠানে ‘জয় বাংলা’ শব্দটা শুনলাম।
আনন্দে কেঁদে ফেলেছিলাম। সুবর্না আপনাকে অনেক
ধন্যবাদ। সাহস করে শব্দটা উচ্চারণ করার জন্য।
জীবনের নতুন অধ্যায়ে ইতিমধ্যেই দারুন ব্যস্ত হয়ে
উঠেছেন সুবর্না ম¯ু াÍ ফা। জাতীয় সংসদের কোনো সেশনই
বাদ দিবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আর তাই সংসদের
অধিবেশন থাকলে সেটাই তার কাছে বেশি প্রাধান্য পাবে।
তাহলে কি অভিনয় থেকে দূরে সরে যাবেন তিনি? পশ্র ড়ব
করতেই বললেন, না, কক্ষোনা না। অভিনয় আমি ছাড়তে
পারব না। তবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ফেলে আমি কখনই অীভনয়
করব না। আমি মনে করি ইচ্ছা থাকলেই উপায় হয়।
৮ মাচর্ আন্তর্জাকি নারী দিবস। নারীর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গ
তুলতেই সুবর্না মুস্তাফা বললেন, যে যাই বলুক না কেন
আমি মনে করি আমাদের দেশের নারীরা গত কয়েক বছরে
অনেক এগিয়ে গেছে। সমাজের প্ির তটি সেক্টরে পুরুষের
পাশাপাশি নারীরাও সমান তালে ভ‚মিকা রাখছে। দেশের
প্রয়োজনে পুরুষের পাশাপাশি নারীরা আরও এগিয়ে যাক!
জয় হোক বাংলাদেশের।