Home ফিচার দুই মেয়রের ঢাকা দর্শন

দুই মেয়রের ঢাকা দর্শন

SHARE

যানজট আর জলজট আমাদের ঢাকা নগরির নিত্য পরিচিত দৃশ্য।  বাসা থেকে বের হলে কখন গন্তব্যে পৌছা যাবে  তা বলা মুশকিল।  যানজটে নাকাল নগরবাসি।  সাথে আছে জলজটের দূর্ভোগ।  একটু বৃষ্টি হলেই ঢাকা ডুবে যায়।  রাস্তায় নৌকা চলে।  বস্তিবাসি ছেলে মেয়েরা রাস্তার পানিতে মাছ ধরে।  ম্যানহোলে মানুষ ডুবে যায়।  কী নিদার“ন বিড়ম্বনা।  এমনি এক যানজট ও বৃষ্টি মুখর দিনে ঢাকার দুই মেয়র শহর দেখতে বেড়িয়েছিলেন।  তাদের শহর দর্শন নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন।  এর সাথে বাস্তবতার কোন মিল নেই।  তবে বিষয়টি সবাইকে ভাবতে বলি। 

ঢাকা দক্ষিনের মেয়র সাঈদ খোকন ফোনে বললেন, আনিস ভাই কোথায় আপনি? ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হক তখন কাকলীতে ওভার ব্রীজে গাড়ির ভেতর চুপচাপ বসে আছেন।  তার গাড়ির সামনে পিছনে যতদূর চোখ যায় শুধুই গাড়ি আর গাড়ি।  প্রায় ৪০ মিনিট ধরে একই জায়গায় তার গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।  আশেপাশের গাড়ি থেকে লোকজন তাকে দেখছে।  তাদের অভিব্যক্তি দেখে আনিসুল হক বুঝে ফেললেন তারা কে কি বলছে! একটু আগে একটা পত্রিকা থেকে একজন রিপোর্টার ফোন করেছিল।  ফোন ধরতেই অবাক করা প্রশ্নণ্ড ভাই, ঢাকাকে কি বাঁচানো যাবে?

আনিসুল হক ভাবছিলেন রেগে যাবেন।  রিপোর্টারকে দু’চার কথা শুনিয়ে দিবেন।  ভাই এটা কি ধরনের প্রশ্ন করলেন আপনি? ঢাকাকে বাঁচানো যাবে না মানে? ঢাকার কি হয়েছে? ঢাকা কি মানুষ? পর¶ণেই নিজেকে সামলে নিলেন।  যত কঠিন, বিব্রতকর প্রশ্নই হোক না কেন রাগারাগি করা যাবে না।  কুল ব্রেনে কথা বলতে হবে।

আনিসুল হক মৃদু হেসে বললেন, ভাই আপনি চমৎকার একটা প্রশ্ন করেছেন।  সত্যি ঢাকার এখন ‘মরণ বাঁচন’ সমস্যা।  আমি মেয়রের দায়িত্ব নিয়েছি সবে ১০০ দিন পার হয়েছে।  সীমাহীন সমস্যার মধ্যে আছি।  কোনটা রেখে কোনটার সমাধান করব বুঝতে পারতেছি না।  ভাই আপনি কি আমাকে আর কোনো প্রশ্ন করবেন? রিপোর্টার একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, অনেক প্রশ্নই তো করতে চাই।  সাত রাস্তার মোড়ে কড়া রোদের মধ্যে প্রায় এক ঘন্টা গাড়িতে বসে আছি।  গাড়ি নড়ে না চড়েও না।  ভাই এই শহর থেকে কি যানজট দূর হবে না?

আনিসুল হক তখন নিজের কথা ভাবছিলেন।  একই প্রশ্নতো তারও।  ওভার ব্রীজ থেকে দূরে চেয়ারম্যান বাড়ির সোজা রাস্তাটা দেখা যাচ্ছে।  শুধুই গাড়ি আর গাড়ি।  আহা! কী চমৎকার দৃশ্য! কে বলে বাংলাদেশ গরীব দেশ।  মোবাইল ক্যামেরায় ছবিটা তুলে রাখলে কেমন হয়?

রিপোর্টার আবার একই প্রশ্ন করলেন, ভাই আমার প্রশ্নের জবাব পেলাম না।

কোন প্রশ্ন ভাই? আনিসুল হক বিনীত কণ্ঠে জানতে চাইলেন।

রিপোর্টার বলল, ঢাকার যানজট প্রসঙ্গ…

01আনিসুল হক মৃদু হেসে বললেন, ভাই এই প্রশ্নটাতো আমারও।  তবে আমরা চেষ্টা করতেছি।  আমাদেরকে একটু সময় দেন।  আশা রাখি যানজট সমস্যার একটা সমাধান হয়েই যাবে।  ভাই বিশ্বাস হারাবেন না।  কথায় বলে না… বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর।  আমি ভাই, আশাবাদী মানুষ।  আমার বিশ্বাস আমাদের এই শহরের অবস্হা এতো কর“ন থাকবে না।  এই শহর একদিন পৃথিবীর মধ্যে উন্নত শহরের মর্যাদা পাবে… হ্যা… আমি এটা বিশ্বাস করি…

রিপোর্টার ফোন কেটে দিয়েছে।  আনিসুল হক হাফ ছেড়ে বাঁচলেন।  আগে পত্র পত্রিকা, টিভি চ্যানেল থেকে কেউ ফোন দিলে খুশী হতেন।  বিশেষ করে মেয়র নির্বাচনের সময় মিডিয়ার কারও ফোন পেলেই মনটা আনন্দে ভরে যেত।  আর এখন মিডিয়া থেকে কারও ফোন এলেই নিজেকে অসহায় লাগে।  সেই একই প্রশ্নণ্ড ভাই ঢাকার কি হবে? যানজট কি দূর করতে পারবেন? আর জলজট… ভাই ঢাকায় থাকাতো দুর্বিসহ হয়ে উঠছে…

সাঈদ খোকন আবার ফোন দিয়েছেন।  আনিসুল হক তড়িঘড়ি ফোন রিসিভ করে বললেন, হ্যা খোকন বলেন…

আপনি এখন কোথায়?

ঐ যে যেখানে ছিলাম সেখানেই আছি।

কোথায় ছিলেন? কোথায় আছেন?

কাকলী ফ্লাইওভারের ওপর।  সামনে পিছনে শুধুই গাড়ি আর গাড়ি।  নড়ে না চড়ে না।  আপনি কোথায়?

আমিতো ভাই শাহবাগ মোড়ে গাড়ির ভিতর বসে আছি।  আমারও একই দশা।  সামনে পিছনে শত শত গাড়ি।  নড়ে না চড়েও না।  ভাই আপনার ফোন কি এত¶ণ বন্ধ ছিল? ফোন করে পাচ্ছিলাম না…

সাঈদ খোকনের প্রশ্ন শুনে আনিসুল হক মৃদু হেসে বললেন, না না ফোন বন্ধ ছিল না।  একজন সাংবাদিকের সাথে কথা বলছিলাম…।  ইদানিং সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে আমিতো ভাই কাহিল হয়ে পড়েছি।  আপনার অবস্হা কি! সাংবাদিকরা ফোন করে না?

করে না আবার… প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙ্গে কারও না কারও ফোনে।  আজ সকালে একজন ফোন করেই বললেন, ভাই ঢাকার ভবিষ্যৎ কি বলেন তো… এই শহরে থাকবো না চলে যাবো… মৃদু হেসে বললাম, আপনি বোধহয় রেগে আছেন? আমার কথা শেষ হতে না হতেই তিনি বিরক্ত হয়ে বললেন, ভাই সব কিছুরই তো একটা সীমারেখা থাকা দরকার।  বর্ষার সময় বৃষ্টি হবে এটাই তো স্বাভাবিক।  কিন্তু আধ ঘন্টার বৃষ্টিতেই যদি শহর ডুবে যায় তাহলে সেই শহরে থাকার কোন যুক্তি থাকে না।  গতকাল দুপুরে শান্তিনগরের রাস্তা দিয়ে গাড়িতে আসছিলাম।  হঠাৎ নামলো ঝুম বৃষ্টি।  সাথে সাথে লেগে গেল যানজট।  রিকশাওয়ালারাতো নিয়মের তোয়াক্কা করে না।  ফাঁক পেলেই উল্টো পথে রিকশা ঢুকিয়ে দেয়।  নামি দামি গাড়িওয়ালারাও কম যায় না।  বৃষ্টি পরছে।  রাস্তা ভিজে পানি ফুলে উঠছে।  রাস্তায় নিয়ম ভেঙ্গে গাড়ি রিকশা যে যেদিকে পারে যাবার চেষ্টা করছে।  আশেপাশে ট্রাফিক পুলিশ যারা ছিল তারা ফুটপাতে অসহায় ভাবে দাঁড়িয়ে আছে।  আধঘন্টার বৃষ্টিতে এলাকার রাস্তায় হাটু সমান পানি জমে গেল।  গাড়ি মানুষ, রিকশা কে আগে যাবে শুর“ হয়ে গেল তার প্রতিযোগিতা।  রাস্তার ম্যানহোল বোধকরি খোলা ছিল রিকশা থেকে পরে গেল মা ও মেয়ে।  ছোট্ট মেয়ের মাথায় আঘাত লেগেছে।  রক্ত ঝরছে।  কী নিদার“ন চিত্র।  ভাই বলেন, এটা কি একটা দেশের রাজধানী শহরের দৃশ্য হতে পারে…

বলেই ফোন কেটে দিয়েছিলেন সেই সাংবাদিক।

ভাই কি ফোনে আছেন? সাঈদ খোকনের প্রশ্ন শুনে আনিসুল হক বললেন, হ্যা আছি।  আপনার কথাগুলো মনযোগ দিয়ে শুনছিলাম।  আমাদের তো ভাই কিছু একটা করতে হবে।  পাবলিক আমাদের উপর এখনো ভরসা করছে।  গতকাল এক ভদ্রলোক আমাকে ফোন করেছিলেন।  একটা কথাই বললেন, আনিস সাহেব আপনাদের উপর আমাদের অনেক ভরসা।  এই শহরটাকে বাঁচান পি­জ…

আনিসুল হকের কথা শুনে সাঈদ খোকন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, আমরা না পারলে মানুষ খুউব আশাহত হবে।  গতকাল আমার কাছে একজন স্কুল ছাত্র একটা কাটর্ুন পাঠিয়েছে।

তাই? কি আছে কাটর্ুনে!

আনিসুল হকের প্রশ্ন শুনে সাঈদ খোকন বললেন, যানজট নিরসনের একটা উপায় বাতলে দিয়েছে।

1তার কাটর্ুনে আকাশে গাড়ি উড়ছে… বলেই সাঈদ খোকন হেসে ফেললেন।  আনিসুল হক বললেন, আমাদের নিয়েও তো পত্র পত্রিকায় কাটর্ুন ছাপা হচ্ছে… দেখেছেন…

সাঈদ খোকন বিব্রত হয়ে বললেন, হ্যা দেখেছি… ভবিষ্যতে আরো যে কত কাটর্ুন হবে তা আল­াই জানে…

কথা বলতে বলতে সাঈদ খোকন হঠাৎ খুশী হয়ে বললেন, ভাই খুশীর খবর, যানজট ছেড়েছে।  আমার গাড়ি রাস্তায় চলতে শুর“ করেছে।  আশাকরি অল্প সময়ের মধ্যে প­ান মতোই আমাদের দুজনের দেখা হবে।

আসলে ঢাকার দুই মেয়র সিদ্ধান্ত নিয়েছেন গোপনে ঢাকার আসল চিত্র দেখবেন দুজনে।  সেজন্য পাইক পেয়াদা, হোন্ডা, গুন্ডা কাউকে সাথে নেননি।  মেকআপ করে নিজেদের চেহারা বদলে ফেলেছেন।  গাড়ি ছেড়ে দিয়ে প্রায় তিনঘণ্টা ঢাকায় বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখলেন।  হাঁটতে গিয়ে শরীর পারমিট করছিলো না।  অথচ নির্বাচনের সময় কখনো ২৪ ঘন্টার মধ্যে ১৮ ঘন্টাই হেঁটেছেন।  শরীর এতটুকু ঝামেলা করেনি।  আজ ৩ ঘণ্টা হাঁটার পর মনে হল আর সম্ভব না।

শান্তিনগরের পাশে ফুটপাতে একটা চায়ের দোকানের সামনে বসেছেন দুই মেয়র।  দোকানদার মাঝে মাঝেই সন্দেহভরা চোখে তাকাচ্ছে।  সাঈদ খোকন বললেন, চাচা আমাদেরকে দুই কাপ চা দেন।

দোকানদার চায়ের কাপে চিনি ঢেলে নাড়তে নাড়তে বলল, আপনাদেরকে চেনাচেনা লাগতেছে।  মনে হইতেছে কোথায় যেন দেখছি…

সাঈদ খোকন মৃদু হেসে বললেন, কোথায় দেখেছেন মানে? আমরাতো আজই আপনার দোকানে নতুন এলাম।  চা দেন।

দোকানদার চায়ের কাপ বাড়িয়ে দিয়ে খুশী হয়ে বলল, আপনাদেরকে আমাদের দুই মেয়রের মতো মনে হইতেছে…

দোকানদারের কথা শেষ হতে না হতেই পাশেই বেঞ্চিতে বসা একজন বয়স্কলোক ¶ুব্ধ হয়ে বলল, কার কথা বলতেছ মিয়া… ঢাকার দুই মেয়রের কথা? পারব না… কিছুই করতে পারব না… ঢাকার এক মেয়র কি বলছে শুনবা? শোন… বলেই একটা পত্রিকা পড়া শুর“ করলো… ‘বৃষ্টির পানি নর্দমা দিয়ে খালে পড়বে।  সেখান থেকে নদীতে যাবে।  এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।  কিন্তু সিটি করপোরেশন সব নর্দমার মালিক নয়।  ওয়াসার নিয়ন্ত্রণে ৬০০ কিলোমিটার নর্দমা।  লেকগুলোর মালিক জেলা প্রশাসন।  সেখানে সিটি করপোরেশনের কিছু করার নাই।

বৃদ্ধের কথা শুনে পাশেই বসা আরেকজন বয়স্কলোক প্রতিবাদের ভঙ্গিতে বলল, সিটি করপোরেশনের কিছু করার নাই বললেতো হবে না।  আমরা ভোট দিছি এই শহরের উন্নতির জন্য।  তাদেরকে সেটা করতে হবে।  কেমনে করবে সেটা আমরা জানি না।

দ্বিতীয় লোকের কথা শুনে প্রথম লোকটি বলল, শোনেন ঘটনা কিন্তু পরিস্কার।  কেমনে পরিস্কার? শোনেন তাইলে বলি।  এই যে আমরা এইখানে বইস্যা আছি।  হঠাৎ যদি বৃষ্টি আসে তাইলে নিমিষে এলাকা ডুইব্যা যাবে।  তারপর আস্তে আস্তে পানি সরবে।  তার মানে কি দাড়াইল? পানি যাবার রাস্তায় বাধা আছে।  এই শহরে আগে অনেক খাল ছিল।  ধোলাই খালের নাম নিশ্চয়ই শুনছেন? মতিঝিলের পাশে গুদারাঘাট ছিল।  নৌকায় মানুষ পারাপার করতো।  এখন কোথাও খাল নাই।  পানি যাবার রাস্তা বন্ধ।  খালের মুখে বড় বড় বিল্ডিং উঠছে।  কারা তুলছে।  এইসব বিল্ডিং? বড় বড় লোকেরা।  তাদেরকে আগে ধরতে হবে।  তাদেরকে ধরতে না পারলে কাজের কাজ কিছুই হবে না।

চায়ের দোকানে ঢাকার জলাবদ্ধতা আর যানজট পরিস্হিতি নিয়ে দুইপ¶ জোর তর্ক শুর“ হয়ে গেল।

হঠাৎ আকাশ কাঁপিয়ে শুর“ হলো ঝুম বৃষ্টি।  যে যেদিকে পারে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দৌঁড়াতে থাকলো।  দুই মেয়রও নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুট দিলেন।  কিন্তু বিধিবাম।  দুজনই পরে গেলেন ভাঙ্গা ম্যানহোলের ভিতর।  জোরে বৃষ্টি হচ্ছে।  পানি বাড়তে শুর“ করেছে।  পানির ঝাপটায় দুই মেয়রের মুখের মেকআপ ধুয়েমুছে যাচ্ছে।  তাদের চেহারা যতই স্পষ্ট হচ্ছে বৃষ্টির ঝাপটা ততই বাড়ছে।  বৃষ্টির মধ্যেই কেউ একজন চিৎকার দিয়ে বলল, অ্যাই কে কোথায় আছোস তাড়াতাড়ি আয়।  আমগো মেয়র সাবরা ডুইব্যা যাইতেছেন…

মুহূর্তে এলাকা জনসমুদ্রে রূপ নিল।  দুই মেয়র ম্যানহোলের মধ্যে পরে হাবুডুবু খাচ্ছে।  পত্র পত্রিকা টিভি চ্যানেলের সাংবাদিকরা ছুটে এসেছে।  বেশ কয়েকটি টিভি চ্যানেল ঘটনা সরাসরি সম্প্রচার শুর“ করেছে।  এ সময় দূরে মাথাভর্তি ঝাকরা চুলের একজন পাগল কিসিমের মানুষ চিৎকার করে বলতে শুর“ করলোণ্ড কী চমৎকার দেখা গেল।  তারা সবে চলে এলো….

কার্টুন সহয়তা: প্রথম আলো ও ডেইলী স্টার