Home এক্সক্লুসিভ দুই তরুণের স্বপ্নভুবন

দুই তরুণের স্বপ্নভুবন

SHARE

আনন্দ আলোর এবারের প্রচ্ছদে এসেছেন সিনেমার নতুন মুখ সিয়াম ও রোশান। শাকিব পরবর্তী কে হবেন কান্ডারী? এই বিষয়ে যাদের সঙ্গেই কথা হয়েছে তারা স্পষ্ট ভাবেই এগিয়ে রেখেছেন সম্ভাবনাময় এই দুই তরুণ নায়ককে। প্রায় সকলেই বলেছেন, নায়ক হওয়ার যথেষ্ট যোগ্যতা নিয়েই তারা এসেছেন এই ইন্ডাস্ট্রিতে। এখন যথাযথ সাপোর্ট আর পরিশ্রমই পারে তাদের এগিয়ে নিতে বলেছেন বিশ্লেষকরা। কিভাবে তারা এগোবেন, ধরতে পারেন ইন্ডাস্ট্রির হাল অথবা হতে পারেন শাকিব পরবর্তী কান্ডারী এই স্বপ্নই উঠে এসেছে এই দুই তরুণের আড্ডায়….
আনন্দ আলো: যে সময়টায় আপনারা কাজ করছেন, সেই সময়টা একজন নায়ক হিসেবে নিজেদের ক্যারিয়ার এগিয়ে নেয়ার বা নায়ক হিসেবে একটা অবস্থান তৈরি করার ক্ষেত্রে একটা অনুকুল পরিস্থিতি এখন আমাদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে নেই। অথচ নায়ক হিসেবে কাজ করার পূর্নাঙ্গ যোগ্যতা নিয়েই আপনারা কাজ করতে এসেছেন বা কাজ করছেন। কিন্তু এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কাজটাকে কতটা উপভোগ করছেন?
সিয়াম: আমার প্রথমেই যে জিনিসটি ভালো লাগে সেটা হলো কাজ করতে। আমি কাজটাকে এনজয় করি। কাজের মধ্যেই থাকতে চাই। কাজের মধ্যে না থাকলে আমি অসুস্থ বোধ করি। ঘুমের সময়টা বাদ দিলে আমি বাকিটা সময় নিজেকে কাজের মধ্যেই ডুবিয়ে রাখি। আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া যে যথেষ্ট কাজ এখন আমার হাতে আছে। একটি ছবি থেকে আরেকটি ছবি করার যে প্রস্তুতিটা নেয়া আমার প্রয়োজন, সেই সময়টুকুও আমি পাচ্ছি না। তাই আমি মনে করি আমি খুব ভাগ্যবান ইন্ডাস্ট্রির এমন একটা সময়েও কাজ নিয়েই ব্যাস্ত আছি। কাজেই দৃঢ় ভাবেই বলবো আমি সময়টাকে এনজয় করছি। এবং প্রত্যাশা রাখি সামনের সময়েও ব্যস্ত থাকবো এবং কাজটাকে এনজয় করবো।
রোশান: আমাদের প্রত্যাশাটা একটু হয়তো বেশীই। আমরা চাই আমাদের এখানে বলিউড লেভেলের কাজ হোক। বিগ বাজেটের কাজ হোক। পরিচালকরা তাদের প্রতাশা অনুযায়ী বাজেট বা সাপোর্ট নিয়ে কাজ করুক। কিন্তু সেটাতো আর এখানে হচ্ছেনা বা হওয়ার সুযোগ নেই। অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেই আমাদের কাজ হচ্ছে। এরই মাঝে যতটুকু কাজ করছি, আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহর কাছে হাজার শোকর। আমার ‘বেপরোয়া’ ছবিটি রিলিজের পর অনেক কাজের অফার পেয়েছি। ৩টি ছবির কাজ ইতিমধ্যেই শেষ করলাম, আরো ৩/৪টি ছবির কাজ শুরু হয়েছে। ২/৩টির ব্যাপারে কথা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে যা করছি তা কিন্তু অনেকটা অপ্রতাশিত। সিয়াম ভাই যেমন বললেন, কাজের প্রেসারে আমাদের যেভাবে প্রস্তুতি নেয়া উচিত আমরা সেটা পারছি না। যেমন টানা একটি ছবির শুটিং হচ্ছে না। একটি ছবির কাজের মাঝেই আরেকটি ছবি শুরু করতে হচ্ছে। ফলে চরিত্রের লুকস, চরিত্রায়নে আমরা তেমন সুবিধা করে উঠতে পারছিনা। এই পরিস্থিতিটুকু বাদ দিলে আমরা বাকী কাজটা এনজয় করছি এটা জোড় দিয়েই বলতে পারি। সবকিছুর মধ্যেই পজেটিভ, নেগেটিভ দুটো দিকই থাকে। এই দুটো সঙ্গে নিয়েই এখনকার পথচলা।
আনন্দ আলো: আপনাদের দু’জনেরই কথায় যেটা উঠে এসেছে সেটা হলো আপনারা এখন যথেষ্ট ব্যস্ত। এবং এই ব্যস্ততাটাকে এনজয় করছেন। ব্যস্ততাকে এনজয় করা একটা ব্যাপার। আর কাজটাকে এনজয় করা অন্য একটা ব্যাপার। এক সময় আমাদের এখানে অনেক ভালো ভালো ছবি হতো, ভালো পরিচালক ছিল। বড় বড় প্রযোজনা সংস্থা ছিল। এখন তেমনটা আর নেই। এই সব বিবেচনায় নিজেদেরকে কিভাবে জাজমেন্টে আনবেন?
রোশান: আমাদের এখানে বাজেটের লিমিটেশন তো আছেই। বাজেট চাইলেই তো হবেনা। বড় বাজেটের একটি ছবি নির্মাণ করতে হলে সেই রকম মার্কেটও দরকার। ছবির ক্ষেত্রে আমাদের এখন সেই রকম মার্কেট নেই। একজন প্রযোজক যখন ইনভেস্ট করেন তখন তার একটা প্রত্যাশা থাকে। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ না হলে ইনভেস্ট কিভাবে করবেন? অনেক সময় ছবি ভালো হলেও, ব্যবসা হয় না। প্রযোজকের লগ্নিও ফেরত আসে না। অনেক সময় দেখা যায় ছবি হৈ চৈ ফেলে দিচ্ছে। সবার প্রশংসা কুড়াচ্ছে। কিন্তু প্রযোজকের ঘরে পয়সা উঠছে না। তাই এখন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যেটা হচ্ছে কম বাজেটে বা লিমিটেশনের মধ্যে থেকেই ভালো কিছু করার চেষ্টা। আমাদের ছবি বানাতে হবে। ছবির সংখ্যা বাড়াতে হবে। দর্শক যেন হলে গিয়ে ভালো ছবি পায়। আমরা যেন ছবি শূন্য না হয়ে পরি।
সিয়াম: আমি সোজাসুজি যেটা বিশ্বাস করি, আমাদের সামর্থ্যরে মধ্যে থেকেই নিজেদের যে ইউনিক গল্প আছে সেটাকে ফুটিয়ে তুলতে হবে। ওয়ার্ল্ড সিনেমার ল্যাংগুয়েজ বদলে গেছে। অডিয়েন্স এর টেস্ট লেভেল নিয়ে বাজারে একটা কথা বলা হয়, দর্শক এটা খায় না। আমি একথা বিশ্বাস করি না। আপনি যদি কোন জিনিস আপনার মত করে সুন্দর ভাবে পরিবেশন করতে পারেন, কেউ না কেউ থাকবে আপনার সেই সুন্দর পরিবেশনাকে গ্রহণ করতে। আপনার টেস্ট এর সঙ্গে মিলে যাবে বা মিলিয়ে নেয়ার চেষ্টা করবে। যেমন কেউ রান্না করলো তার টেস্ট অনুযায়ী বেশি ঝাল দিয়ে। যারা ঝাল পছন্দ করে তারা সেটা খাবে। আর যারা ঝাল পছন্দ করে না তারাও কিন্তু আসবে ভিন্ন কিছু খাওয়ার প্রত্যাশায়। এখানে একটা গ্যাপ তৈরি হচ্ছে। আমাদের এখানে বেশ কিছু ভালো ছবি তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু এসব ছবিকে অনেকেই ছবি বলতে নারাজ। তারা এই ধরনের ছবিকে নাটক বা টেলিফিল্ম হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন। নাটক, টেলিফিল্ম কিন্তু ফিল্ম মেকিং এরই অংশ। আলাদা কিছু না। আমার মনে হয় আপনারা দেখেন গল্পের কনসেপ্ট কি, গল্পের ম্যারিট কি? গল্পের ম্যারিট অনুযায়ী পারফরমার কি ফারফর্ম করলেন। গল্পের গাঁথুনী কেমন, প্রেজেন্টেশন কেমন। এসব মিলিয়েই তো একটা ছবি হয়। আমি কিন্তু ওই জায়গাটাতেই আসার চেষ্টা করছি এবং আমি কখনোই এই জায়টার পক্ষপাতি না যে আমাকে তিন/চার কোটি টাকা দিয়ে সিনেমা বানাতে হবে এই মার্কেটে।

কারণ আমি জানি অনেক আগে অনেক ছবি ব্যবসা করেছে তার বড় একটা কারণ ছিল। তখন সেই টাকা উঠে আসতো। সেটা উঠে আসার মাধ্যম ছিল। প্রচুর হল ছিল তখন। সারাদেশে হাজার বারোশো হল ছিল। এখন নেই। কিন্তু আমাদের এখন একটা পাওয়ার আছে। সেটা সিনেপ্লেক্স অথবা মাল্টিপ্লেক্স গুলো। সেটা থাকার কারণে একটা জিনিস ভালো হয়েছে, কোন ছবি কত টাকা ব্যবসা করছে সেটার হিসাব কিন্তু মাল্টিপ্লেক্স/সিনেপ্লেক্সে ক্লিয়ার। প্রোডিউসার কিন্তু জানতে পারে তার ছবি কতটাকা লগ্নি করে কত টাকা ব্যবসা করছে। আমি একটা কথাতেই বিশ্বাসী যে, আমাকে এখন আইডিয়া জেনারেট করতে হবে। আমাকে মাথা খাটাতে হবে। এখন এমন কনটেন্ট মানুষের সামনে আনতে হবে যেটা তার জীবনের সঙ্গে ঘটেছে, বা তার আশে পাশেই এমন ঘটেছে। যে কনটেন্টটা প্রেজেনটেবল এবং ইন্টারটেইনিং ওয়েতে তার সামনে আনতে হবে। পরিবেশনা যখন সুন্দর হবে তখন খুব বেশি খরচের প্রয়োজন নেই। অবশ্যই লিমিটেশনের মধ্যে সুন্দর কিছু তুলে ধরতে হবে। সেটা যেভাবেই হোক প্রযোজক যদি এক কোটি টাকা ইনভেস্ট করে তাহলে আমরা তাকে যেন অন্তত এক কোটি এক টাকা হলেও ফেরত দিতে পারি এবং তাকে বলতে পারি আরেকটি ছবি করার জন্য।
আনন্দ আলো: আপনাদের কথাতেই মনে হয় আপনারা স্বপ্নবাজ তরুণ। নিজেদের যথেষ্ট যোগ্যতা নিয়ে এই মাধ্যমে এসেছেন। কিন্তু অনেকেই মনে করেন, আপনাদের মধ্যে যে প্রতিভা বা যোগ্যতা আছে তা ব্যবহার করার মত এই ইন্ডাস্ট্রির সার্বিক পরিস্থিতি যথেষ্ট উপযোগি নয়। যেমন ভালো পরিচালক নেই, প্রযোজক বা প্রযোজনা সংস্থাও নেই। হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, দর্শক নেই। এক ইন্টারভিউতে শাকিব খান বলেছিলেন ফেরদৌস, রিয়াজদের যুগ পর্যন্ত যে মানের ডিরেক্টর ছিল শাকিব সেটা পাননি। পেলে হয়তো তিনি আরো ভালো ছবি বা ভালো মানের কাজ করতে পারতেন। আপনাদের কি মনে হয় যে, এইসব দিক বিবেচনায় আপনারা একটা ভুল সময় এসেছেন অথবা কোন আফসোসের জায়গা আছে কিনা এই সব শূন্যতার মাঝেই আপনাদের এগিয়ে যেতে হবে?
সিয়াম: কিছু কিছু ক্ষেত্রে সেখান থেকে তো খারাপ লাগার জায়গা থেকেই যায়। আমি প্রথমেই একটা কথা বলেছি। আমি শিখতে এসেছি, শিখতে চাই। আমার কাজের প্রক্রিয়াটা এমন নয় যে আমি আজকেই বেস্ট হয়ে যাব বা একবারেই সব শিখে ফেলবো। আমি প্রতিদিন কিছু না কিছু শিখতে চাই। দিনের শেষে কিছু একটা নিয়ে যেতে চাই। সেটা যে কারো কাছ থেকে হতে পারে। একজন টেকনিশিয়ানের কাছ থেকেও হতে পারে। আমার খুব কষ্ট লাগে যখন দেখি আমাকে শিখার জায়গাটা দেয়া হয় না। আমি সেটা তখনই পাই না যখন আমাকে প্রতিদিন গড়পড়তায় একই কাজ করতে হয়। একই ভাবে কথা বলা, একই ভাবে হাসা। একই ভাবে দৌড়ে নায়িকার কাছে ছুটে যাওয়া। না, এটার জন্য আমার এখানে আসা না। তাহলে এর চেয়ে অনেক বেটার অনেক এন্টারটেইনিং কাজ আমার জন্য ছিল। অনেক চ্যালেঞ্জিং কাজ ছিল আমার জন্য। এখানে এই জন্যই আসা, শিখতে যেন পারি। সেটা যে ম্যধ্যমেই হোক। আমাদের সিনিয়র অভিনেতারা, যারা আমাদের থেকে অনেক বেশি অভিজ্ঞ তারা প্রায় অপকটেই বলেন তোদের ভাগ্যটা খুব খারাপ। আমরা যে ধরনের ফাউন্ডেশন পেয়েছি সেটা তোরা পাচ্ছিস না। আমাদেরকে আমাদের ডিরেক্টররা যে ভাবে মেরে বকে শিখিয়েছে সেটা থেকে তোরা বঞ্চিত হচ্ছিস। এটা খারাপ লাগে। আবার এটাও খেয়াল করে দেখেন, এখন যারা ইয়াং ডিরেক্টর আছেন, ছবি বানাচ্ছেন তারা অনেক প্রতিবদ্ধকতার মাঝেও ছবি বানাচ্ছেন। সে ছবি টাকাও তুলছে, দর্শকের প্রশংসাও কুড়াচ্ছে। সে ছবি দর্শক মনেও রাখছে। সব সময় না হলেও মাঝে মাঝে রাখছে। আমার কাছে মনে হয় এরাতো যোদ্ধা। তাহলে এই যোদ্ধাদের সঙ্গে যদি আমরা পারটিসিপেট করতে পারি, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যেতে পারি সেটা তো গর্বের ব্যাপার।
সময়টা প্রকৃতিই নির্ধারন করে দেয়। সময়ের আগে কিছু করা প্রকৃতি পছন্দ করে না। আমরা যারা এখন কাজ করছি, আমি, রোশান, শরিফুল রাজ, ইয়াশ রোহান, মনোজও কাজ করছে। এই যে আমরা যারা ইয়ং এখন কাজ করছি এটার পিছনে নিশ্চয়ই কোন লজিক আছে। সেটা প্রকৃতি হয়তো একদিন এর উত্তর দিয়ে দিবে। কিন্তু এখন আমার মনে হয় চোখ বন্ধ করে হাসি মুখে কাজ করার সময়, কাজ করে যেতে হবে।
রোশান: এই কথা আমাকেও প্রায় শুনতে হয় যে আমরা ভুল সময় এসেছি। খারাপ সময় এসেছি। কিন্তু আমি এটা খুব কমই ফিল করি। বা আমি এটাকে নেগেটিভলি ফিল করতে চাই না। তবে এই প্রশ্নটা যখন করে যে আমরা ভুল সময়ে এসেছি তখন ওই সময়টা খুব মিস করি। তখন মনে হয় এই সময়টায় না এসে আমরা তখন আসতে পারতাম। তখন বিষয়টা হয়তো অন্যরকম হতে পারতো। এই সময়টা সত্যিই আমাদের জন্য বড় একটা চ্যালেঞ্জ। এই সময়টাতে দর্শকদের প্রত্যাশা অনেক বেশি। আর চ্যালেঞ্জটাতে জয়ী হওয়ার জন্য দর্শকরাই আমাদের সহযোগিতা করতে পারে। আমাদের সময়ে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করার চেষ্টা যেমন ডিরেক্টররা করছে তেমনি অভিনেতারাও করছে। প্রযোজকরাও চাচ্ছেন ভালো ভালো ছবি নির্মিত হোক। তার কারনেই দেখেন আমাদের ছবির চিত্রটা বেশ চেইঞ্জ হয়ে যাচ্ছে।
কিছু ভালো ছবি কিন্তু গত তিন-চার বছরে নির্মিত হয়েছে। ভারতের সঙ্গে কম্পিটিশন দিয়ে সিনেমা বানানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন অনেকে। আমার মনে হয় কখনো কখনো আমরা সেই ক্ষেত্রে সফলও হচ্ছি। সে ক্ষেত্রে আমাদের সর্বোপরি পুরো ইন্ডাস্ট্রির একটা সাপোর্ট দরকার। ফ্রেন্ডলি একটা ইনভায়রোমেন্ট দরকার। কারো প্রতি কারো কোন বিদ্বেস থাকবে না। এই যে আমি আর সিয়াম ভাই দু’জন এক সঙ্গে কাজ করছি। একই ছবিতেও কাজ করছি। ছবির নাম ‘সুন্দরবন অপারেশন’। এখানে আমাদের মধ্যে একটা সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক বন্ধুর মত। আপন দুই ভাইয়ের মত। এই পারস্পরিক সুন্দর সম্পর্ক, সহযোগিতা পরায়ন মনোভাব আর সুন্দর সুন্দর কাজ দিয়ে আমাদের ইন্ডাস্ট্রিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে, এবং দর্শকদের হলে এনে সিনেমা দেখার প্রবনতা তৈরি করতে হবে। আমাদের কিন্তু এখানে আসার কথা ছিল না। আমি একটা ভালো জব পেয়েছিলাম। তখনই জাজ মাল্টিমিডিয়ার আজিজ ভাই ডাকলেন। একটা ছবিতে সুযোগ দিলেন। তখন ভেবেছিলাম একটা কাজ করি, দেখি দর্শক কিভাবে নেয়। দর্শক নিলে থাকবো, না হলে চলে যাব জব করতে। কিন্তু কাজটা করতে করতেই একটা ভালো লাগা তৈরি হয়ে গেল। মনে হলো এটাই আমার জন্য গুড প্লাটফর্ম। এখন একটা চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করতে যাচ্ছি। ভবিষ্যতে কি হবে জানি না। শুধু সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রত্যাশা থাকবে, প্লিজ হেল্প…। আর আমরা চোখ বন্ধ করে চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করে যাব।
আনন্দ আলো: এখন সারা বিশ্বের বিনোদন মানুষের হাতের মুঠোয়। সারা বিশ্বের বিনোদন এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। এটা মাথায় রেখে বিনোদনকে দিনে দিনে আপডেট করার চেষ্টা সারা বিশ্ব জুড়েই। আমাদের পাশের দেশও আপডেট নিয়ে মুখোর হয়ে আছে। সেই তুলনায় আমাদের ইন্ডাস্ট্রিই ব্যতিক্রম। আপডেটের চেষ্টাতো নাই-ই । বরং ক্রমশ নিম্ন মুখিই হচ্ছে। এটা কেন হচ্ছে বলে মনে করেন?
রোশান: আমি যতদূর শুনেছি হলিউডে বা বলিউডে যেখানেই হোক একটি ছবি বানানোর আগে ছবির গল্প বা ক্রিপ্ট নিয়ে প্রচুর গবেষনা হয়, রিসার্চ হয়। গল্প কেমন, গল্পটা দর্শকরা কতটা দেখবে বা গ্রহণ করবে তা নিয়ে একটা রিসার্চ টিম কাজ করে। তারপর সেটা নিয়ে তারা এগোয়। আমাদের এখানে এখন দর্শকদের মাথায় রেখে স্ক্রিপ্টিং হচ্ছেই না। দর্শকদের চাহিদাকে আগে গুরুত্ব দিতে হবে। দর্শকদের সঙ্গে কমিউনিকেশন তৈরি করতে হবে। আমাদের ডিরেক্টররা ভালো কাজ করতে চান। কিন্তু তাদের যে পৃষ্টপোষকতা দরকার সেটা তারা পান না। এক্ষেত্রে সরকারের সহযোগিতা বেশি দরকার। এটা পেলে হয়তো আমাদের এখানেও একটা পরিবর্তন আসবে।
সিয়াম: এই প্রশ্নটার উত্তর দেয়ার মত সময় বা যোগ্যতা কোনটাই আমার হয়নি। আমি এখানে এসেছি মাত্র কিছুদিন হলো। এর উত্তর আমাদের সিনিয়ররাই ভালো দিতে পারবেন যারা ইন্ডাস্ট্রির সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। তবে রোশানের যে কথাটা আমার ভালো লাগলো সেটা হচ্ছে, যুগের জন্য যা দরকার তা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। আগে আমাদের সরকারি অফিসে যে ভাবে কাজ হতো এখন কিন্তু সেই ভাবে হয় না। এখন ডিজিটালএ কাজ হয়। তা হলে আমাদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে কেন হবে না। সারা বিশ্বে যা দেখা যায় স্ক্রিপ্ট নিয়ে প্রচন্ড এনালাইসিস করা হয়। অনেক পড়াশোনা করা হয়, অনেক গবেষনা করা হয়। হিউম্যান লাইফের ক্রাইসিস গুলো আমি কিভাবে তুলে ধরতে পারি সেটা নিয়ে গবেষনা হয়। সিনেমা কিন্তু জীবনের বাইরে কিছু না। আমাদেরই জীবনের প্রতিচ্ছবি। সেই প্রতিচ্ছবিটা যদি আমার জীবনকে রিফ্লেক্ট না করে বা আমার পরিচিত কারো জীবনকে রিফ্লেক্ট না করে তাহলে সেটার সাথে তো আমি খাপ খাইয়ে নিতে পারব না। সেই কানেকশনটার জন্য ইমপোর্টেন্ট হচ্ছে স্ক্রিপ্ট নিয়ে রিসার্চ বা এনালাইসি করা। সারা পৃথিবীতে একটা ছবির কাজের পঞ্চাশ ভাগ কিন্তু টেবিলেই শেষ হয়। শুটিং এ এসে শট নেয়ার প্ল্যান করা কোনো কাজের কথা নয়। শটটা কিভাবে নিব বা কতটা যোক্তিক ভাবে নিচ্ছি, বা এটা আমার সমাজ বা পরিবেশের সঙ্গে কতটা মানান সই সেটা নিয়ে গবেষনা কিন্তু টেবিলেই করতে হবে। লোকেশনে নয়। মানুষ কিন্তু সেটাই দেখতে চায় যার সঙ্গে সে রিলেটেড। আমি মনে করি এই পয়েন্ট খুব ইমপোর্টেন্ট। চাহিদা ও যোগানের সমন্বয় রাখতে হবে। প্রচুর পড়াশোনা করতে হবে। আমি নিজের কথা বলি, আমি অনেক পড়াশোনা করার চেষ্টা করি। ভালো ছবি দেখি, মেকিংস ভিডিও দেখি।
আনন্দ আলো: একটা স্বপ্ন নিয়েই তো সিনেমাতে আসা। কাজ করতে গিয়ে কি মনে হচ্ছে সবকিছু ভালো দিকে যাবে?
সিয়াম: প্রথমেই আমি বলবো আমি কোন স্বপ্ন নিয়ে আসিনি। আমি সিনেমা করবো এমন কোন প্ল্যান আমার ছিল না। আমি সৌভাগ্যবশত সিনেমায় জড়িয়ে গেছি। আমি স্বপ্ন দেখা শুরু করেছি তখন থেকে যখন আমার প্রথম ছবিটা দেখে দর্শক আমাকে কতটা ভালোবাসা দিয়েছে। আমি স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি যখন আমার ছবি দেখে আমার নানু/দাদুর বয়সী একজন বৃদ্ধা আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছে।
‘ফাগুন হাওয়া’ দেখতে গিয়েছিলাম বলাকা হলে। সেখানেও একজন বয়স্ক মহিলা আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছেন, আমাদের ভাষা আন্দোলনে এত ত্যাগ ছিল তা এই ছবিটা আবার আমাকে মনে করে দিয়েছে। কতটা সাহস নিয়ে তোমরা ছবিটা করেছো। তাই তোমাদের জন্য আমার অনেক দোয়া। এই অনুভূতি টাকা বা অ্যাওয়ার্ড দিয়ে মূল্যায়ন করা যাবে না। এটা অন্যরকম পাওয়া। স্বপ্নগুলো তখন শুরু হয়। আমি প্রথম থেকে প্ল্যান করে আসিনি যে আমাকে এটা হতে হবে বা ওই পর্যন্ত যেতে হবে। এখনো তা মনে করিনা। শুধু এইটুকুই লক্ষ্য আছে প্রজেক্ট বাই প্রজেক্ট যেন আমি আমার টিমের সবার সঙ্গে হাসিমুখে কাজ শেষ করে দর্শকদের সামনে প্রেজেন্ট করতে পারি এবং দর্শক যেন তার পরিবার নিয়ে ছবিটা দেখতে পারে। পরিবার নিয়ে যেন একটা আনন্দঘন মূহুর্ত কাটাতে পারে। আমি কোন দৌড় বা প্রতিযোগিতায় সামিল হতে চাইনা। আমাকে এক নাম্বার হতে হবে বা শীর্ষে থাকতে হবে এটা ভাবিনা। এগুলো জীবনের খুব বাজে জিনিস। এগুলো মানুষের মধ্যে জেলাসি তৈরি করে। আমার কাছে মনে হয় লাইফ ইস বিউটিফুল জার্নি। এটাকে নিজের মত করে এনজয় করাই ভালো।
আনন্দ অলো: একটা কম্পিটিশন তো থাকতেই পারে। হেলদি কম্পিটিশন। যা কাজের মানকে উন্নত করতে পারে।
সিয়াম: হেলদি কম্পিটিশন তখনই হবে যখন আমার অন্য কলিগের সঙ্গে কাজের মান নিয়ে কথা হবে। আমি দেড় কোটি টাকার গাড়ি কিনলাম, আর আমার কলিগ দশ লক্ষ টাকার গাড়িতে চড়ে। এটাতো কম্পিটিশন না। আমি এটা খুব ফেস করেছি, বা রোশানও দেখেছে। হয়তো শুটিং গেলে ফাইভস্টার হোটেলে প্রেসিডেনসিয়াল রুমে দিতে হবে। এটা কেন? ফাইভস্টার হোটেলের রুমে আমার যে ঘুম হবে একটা সাধারন বিছানাতেও সেই ঘুম হবে। তাহলে কেন প্রযোজকের উপর চাপ সৃষ্টি করে এই সুবিধা নিতে হবে? বরং আমি এটা নিয়ে প্রযোজককে চাপ সৃষ্টি করতে পারি যে এই জায়গায় বা এই গানে রেড ক্যামেরা না নিয়ে অ্যালেক্সা নিয়ে কাজ করি। অথবা বাইরে থেকে আরো উন্নত কারিগরি যন্ত্রপাতি নিয়ে আসি। আমি কেন প্রেসিডেনসিয়াল স্যুটের জন্য বা ফাইভস্টার হোটেলে খাওয়ার জন্য প্রযোজকের উপর চাপ সৃষ্টি করবো? এটাতো টিম ওয়ার্ক হয় না। আমি কেন প্রযোজকের টাকায় বিলাসিতা করবো? বিলাসিতা করতে হলে নিজের টাকায় করবো। অন্যের টাকায় নয়।

আনন্দ আলো: রোশান, আপনি বলেছিলেন সিনেমায় কাজ করার জন্য জব ছেড়েছেন। তার মানে আপনার একটা স্বপ্ন ছিল। সেটাতে কতদূর যেতে পারবেন এই পরিস্থিতিতে?
রোশান: সিয়াম ভাইয়ের মত আমারও একটা অভ্যাস আছে যে, আমি আগে থেকেই ভবিষ্যতে নিয়ে ভাবতে চাইনা। এই গুনটা আমি আমার বাবার কাছ থেকে পেয়েছি।
আনন্দ আলো: কিন্তু একটা জব একটা নিশ্চিত জীবন। সেটা ছেড়ে আপনি ফিল্ম-এর এই অনিশ্চিত জীবনে পা রেখেছেন। নিশ্চয়ই কিছু একটা ভেবে?
রোশান: আসলে সিনেমার জগতটা তো খুব রঙ্গীন। ছোট বেলায় যখন সিনেমা দেখাতাম সালমান শাহ, মান্না ভাই বা রাজ্জাক স্যার এর, ওনাদের ছবি দেখে বড় হয়েছি। সিনেমাতো আসলে একটা স্বপ্নের জগতই। তবে ওই স্বপ্নের জগতে নিজেকে রাখবো এমন চিন্তা কখনোই ছিল না। এই জগতে এসে অনেকের অনেক স্ট্রাগলের কথা শুনেছি তাদের স্বপ্ন পুরনের জন্য। কিন্তু আমার এখানে আসার স্বপ্নটা খুব সহজেই পুরুণ হয়ে গেছে। আমাকে তেমন স্ট্রাগল করতে হয়নি। তবে প্রত্যাশার মধ্যে ছিল না যে আমাকে এটাই হতে হবে। আমি বর্তমানে বিশ্বাসী, হাতে বেশ কিছু কাজ আছে। আমি ছবিগুলো সুন্দর ভাবে শেষ করতে চাই। তারপর কি হবে সেটা নিয়ে ভাবতে আমার ভালো লাগেনা। ভাবতে চাইও না।
আনন্দ আলো: দীর্ঘ প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আমাদের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি এক নায়ক কেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। যেটা আমাদের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তো বটেই অন্য কোথাও তেমন দেখা যায় না। শাকিবের পর অনেকেই এসেছেন। কিন্তু তার ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলার মত অবস্থানে কেউ যেতে পারেননি। এটার ব্যাখ্যা আপনাদের কাছে কি?
সিয়াম: শাকিব খান অবশ্যই সবদিক দিয়ে একজন প্রেজেন্টেব্যাল নায়ক। এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। একজন কমার্শিয়াল হিরো হওয়ার যে প্যার্টানটা উনি তৈরি করেছেন আমার মনে হয় এই প্যাটার্নের আশে পাশে পরে যারা এসেছেন তারা যেতে পারেন নাই। আমাদের ব্যাক্তিগত জায়গা থেকেই বলবো এটা আমাদের ব্যার্থতা। সেই পর্যন্ত আমরা যেতে পারিনি। আসলে ম্যাস আপিলটা একটা অদ্ভুত জিনিস। একজন ম্যাস হিরোকে দর্শক কেন পছন্দ করবে এটা ডিফাইন করা কিন্তু টাফ।
এখন শাকিব ভাই নিজের কোয়ালিটি যে জায়গায় নিয়ে গেছেন পরে যারা এসেছেন তারা হয়তো সেটা পারেননি। এর বাইরেও কিছু ব্যাপার থাকে। একটা স্মুথ কম্পিটিশন যদি থাকে সেটা অন্য ব্যাপার। আরেকটা ব্যাপার আমরা কম বেশি সবাই জানি সেটা হলো আমাদের ইন্ডাস্ট্রির এমন কিছু প্রভাব আছে যা সব সময় এই ইন্ডাস্ট্রির জন্য মঙ্গল জনক নয়। সেটা সবাই বা যে কেউ কন্ট্রোল করতে পারে না। সবাই সব কিছু করতে পারে না। একজন নায়ক একটা ছবিতে কিভাবে নিজেকে প্রেজেন্ট করবে বা ৩০ দিনের জায়গায় ৬০ দিন সিডিউল দিবে কিনা এটা তার নিয়ন্ত্রনেই থাকে। বাট ছবি রিলিজের সময় যে গেমটা খেলা হয় সেটা দেখা বা নিয়ন্ত্রন করা ওই নায়কের জব না। ওইটা সবাই কন্ট্রল করতে পারে না। বেসিক কি হচ্ছে আর মানুষের সামনে কি আসছে এই দুটোর মাঝখানে কিন্তু একটা গল্প আছে। সব সময় কিন্তু দর্শক ক্লিয়ার পিকচারটা জানে না।
রোশান: এ প্রসঙ্গে আমি যেটা বলবো আমাদের মৃত প্রায় একটা ইন্ডাস্ট্রিকে শাকিব ভাই লাস্ট প্রায় ১০/১৫ বছর ধরে একা টেনে নিচ্ছেন এর জন্য উনাকে স্যালুট দেই। তারপর উনার নিজের যোগ্যতা নিয়েতো কোন প্রশ্নই নেই। এই বয়সেও নিজেকে যতটা সুন্দর ভাবে উনি প্রেজেন্ট করছেন, সেটা হয়তো অন্যদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছেনা। এর পেছনে অন্য কোন কারণ থাকতে পারে কিনা সেটা দেখার মত বা বলার মত বয়স বা সাহস কোনটাই আমার হয়নি।