Home বইমেলা প্রতিদিন দরবার হলে বসে ফাগুন হাওয়ায় দেখলেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি!

দরবার হলে বসে ফাগুন হাওয়ায় দেখলেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি!

SHARE
Fagun-hawya

রেজানুর রহমান
বঙ্গভবনের দরবার হল। ইমপ্রেস টেলিফিল্ম-এর একটি নতুন সিনেমা দেখবেন দেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি। বড়ই আনন্দের সংবাদ। দেশের সাধারন মানুষের ভাবনায় কত কিছুই না খেলা করে। আর তাই বঙ্গভবনের দরবার হলে বসে সত্যি কি সিনেমা দেখবেন আমাদের প্রিয় রাষ্ট্রপতি? তাঁর কি এতো সময় আছে? এমন প্রশ্নও অনেকের মনে দেখা দিয়েছিল। কিন্তু একথা সবাই জানেন… আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতি মানুষ হিসেবে অনেকটাই সাধারনের মতো। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি তিনি। সঙ্গত কারনেই একটি সতর্ক নিরাপত্তা বলয় তাঁকে ঘিরে থাকে। ইচ্ছে করলেই সাধারনের কাছে যাওয়া যায় না। উচিৎও নয়। কিন্তু যখনই সাধারন মানুষের কাছে মিশে যাবার সুযোগ হয় তাঁর তখন কি যে এক মায়ায় জড়িয়ে রাখেন সবাইকে। যেন পরিবারের আপন মানুষটির সাথে অনেকদিন পর দেখা হয়েছে। সেরকমই উচ্ছ¡াস আর মায়া ছড়ানো আবেগ ছড়িয়ে যায় নিমিষে। আর তাই তাঁকে শুধুমাত্র এক নজর দেখার জন্য, তাঁর মুখের কথা শোনার জন্য উম্মুখ থাকেন সবাই। এমনই উদার ও আন্তরিক ভাবনার সহজ সরল মানুষ আমাদের প্রিয় রাষ্ট্রপতি। তিনি একটি নতুন সিনেমা দেখবেন বলে সম্মতি দিয়েছেন। এর পেছনে অবশ্য একটি বিশেষ কারণও রয়েছে। সিনেমাটি আর দশটা সাধারন মানের কোনো সিনেমা নয়। মহান ভাষা আন্দোলনের সময়কাল নিয়ে রচিত গল্পের সিনেমা। মহান ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আপোষহীন নেতৃত্বে পৃথিবীর একমাত্র ভাষা ভিত্তিক রাষ্ট্র বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। অথচ মহান ভাষা আন্দোলনকে ঘিরে সেই অর্থে দেশে কোনো পূর্ণাঙ্গ সিনেমা নির্মিত হয়নি। ‘ফাগুন হাওয়ায়’ ইমপ্রেসের নতুন সিনেমা। নির্মাণ করেছেন গুণী নির্মাতা তৌকীর আহমেদ। মহান ভাষা আন্দোলনের সময়কাল নিয়ে প্রথম কোনো পূর্ণাঙ্গ সিনেমা। এজন্যই সিনেমাটি সবার সাথে এক সাথে দেখবেন বলে কথা দিয়েছেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি।
বঙ্গভবনের এতিহাসিক দরবার হল প্রস্তুত। দর্শক সারির সামনে সিনেমার বড় পর্দা টানানো। ইমপ্রেস পরিবারের সদস্যরা সহ আমন্ত্রিত অতিথিরা সকলে এসে পড়েছেন। অপেক্ষা প্রিয় রাষ্ট্রপতির জন্য। নির্ধারিত সময়েই দরবার হলে এলেন সবার প্রিয় রাষ্ট্রপতি মো: আব্দুল হামিদ। চ্যানেল আই-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, পরিচালক ও বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ অন্যান্যদের সাথে নিয়ে দরবার হলের মূল ফটকে রাষ্ট্রপতির জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তাদেরকে দেখে রাষ্ট্রপতি খুবই খুশি হলেন। যেনো পরিবারের প্রিয় সদস্যের সাথে দেখা হয়েছে এমন মায়া ছড়িয়ে বললেন, কেমন আছ সাগর? আরে সিরাজও আছেন দেখছি…
প্রিয় রাষ্ট্রপতিকে একনজর দেখার জন্য উম্মুখ সবাই। নির্ধারিত আসনে বসার আগে অতিথিদের সামনে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে সাদর সম্ভাষণ জানাতে গিয়ে সুঅভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার দিকে চোখ পড়তেই মহামান্য রাষ্ট্রপতি পরম মমতায় বললেন, আরে তিশাকে তো চিনি!
রাষ্ট্রপতির এই সহজ-সরল আন্তরিক উচ্ছ¡াস নিমিষেই গোটা দরবার হলে এক মায়ার পরিবেশ সৃষ্টি করে। তিশা অভিভ‚ত। বলা যায় আনন্দে বাকরুদ্ধ। পিছনে বসেছিলেন তার স্বামী গুণী চিত্র পরিচালক মোস্তফা সরয়ার ফারুকী সহ অন্যান্যরা। তিশা বার বার ফারুকীর দিকে তাকাচ্ছিলেন। দেশের প্রেসিডেন্ট তার নাম ধরে কথা বললেন? এ যেন বিশ্বাসই হচ্ছিলো না। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিদের মধ্যে অনেকেই আপন মনে বলে ওঠেন, এই না হলে আমাদের রাষ্ট্রপতি! হ্যা আমাদের প্রিয় রাষ্ট্রপতি এমনই সহজ সরল প্রাণের মানুষ!
সিনেমা দেখার আগে আনুষ্ঠানিক বক্তৃতা পর্ব শুরু হলো। স্বাগত বক্তব্য রাখলেন ইমপ্রেস পরিবারের পক্ষে চ্যানেল আই-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, পরিচালক ও বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ। ‘ফাগুন হাওয়ায়’ চলচ্চিত্রের পরিচালক তৌকীর আহমেদের বক্তৃতার পরই এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সবার প্রিয় রাষ্ট্রপতি মো: আব্দুল হামিদ এবার বক্তব্য রাখবেন। অনেকেই ধারনা করেছিলেন রাষ্ট্রপতি হয়তো তাঁর লিখিত বক্তব্যের বাইরেও সহজ সরল ভাষায় কিছু কথা বলবেন। মাঝে মাঝেই তিনি তা করে থাকেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি তাঁর লিখিত ভাষণই পড়ে শোনালেন সবাইকে। তাঁর ভাষণ শুনে সকলে মুগ্ধ। মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো: আব্দুল হামিদ তাঁর ভাষণে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম এর নতুন ছবি তৌকীর আহমেদের ফাগুন হাওয়ায় এর প্রশংসা করে বললেন, আমি মনে করি ‘ফাগুন হাওয়ায়’ তরুণ প্রজন্মকে মহান ভাষা আন্দোলন ও ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে যারা বিভিন্ন ভাবে অবদান রেখেছেন তাদের সম্পর্কে জানতে ভ‚মিকা রাখবে। এতে আমাদের নতুন প্রজন্ম দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হবে এবং দেশপ্রেমের চেতনা আরও শানিত হবে। রাষ্ট্রপতি আরও বললেন, ভাষা আন্দোলন শুধু আমাদের মাতৃভাষার অধিকারই দেয়নি। দিয়েছে আমাদের গল্প, নাটক, চলচ্চিত্র রচিত সহ সাহিত্য সংস্কৃতির নতুন মাত্রা। আমি আশা করবো আমাদের নাট্যকার, চলচ্চিত্রকার, লেখক, গবেষক সহ বুদ্ধিজীবীগণ মহান ভাষা আন্দোলনকে নিয়ে আরও বেশী কাজ করবেন। সবার মাঝে ছড়িয়ে দিবেন ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও ঐতিহ্য।
ফরিদুর রেজা সাগর বলেন, ৫২’র ভাষা আন্দোলন নিয়ে সেই অর্থে এর আগে পূর্ণাঙ্গ কোনো ছবি নির্মিত হয়নি। ‘ফাগুন হাওয়ায়’ প্রথম ছবি যে ছবিতে ভাষা আন্দোলনের ছোঁয়া রয়েছে। শাইখ সিরাজ বলেন, সুস্থধারার চলচ্চিত্র নির্মাণই ইমপ্রেস এর মূল লক্ষ্য। ইমপ্রেস তার শুরু থেকেই শিক্ষা, সাহিত্য ও মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মৌলিক গল্পের ছবি নির্মাণ করে আসছে।
তৌকীর আহমেদ স্কুল পর্যায়ের পাঠ্যসূচিতে বিষয় হিসেবে চলচ্চিত্রকে অন্তভর্‚ক্ত করার আহবান জানিয়ে বলেন, এটা করা গেলে আমাদের ছেলে-মেয়েরা হয়তো খেলাচ্ছলে, হাসিচ্ছলে আনন্দ করতে করতে অনেক কিছু শিখতে পারবে এবং আমরা সংস্কৃতিবান জাতি নির্মাণে সক্ষম হবো।

সংক্ষিপ্ত সময়ের বক্তৃতা পর্ব শেষে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠানÑ ফাগুন হাওয়ায় এর বিশেষ প্রদর্শনী। অতিথিদের সাথে নিয়ে মহামান্য রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ স্বস্ত্রীক ছবিটি দেখেন। ছবি শেষে অভিভ‚ত রাষ্ট্রপতি ছবির সাথে জড়িত সকলকে অভিনন্দন জানান। ইমপ্রেস পরিবারের সদস্য সহ অন্যান্য অতিথিদের সাথে একটি ফটোসেশনে অংশ নেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে মহামান্য রাষ্ট্রপতির হাতে ইমপ্রেসের পক্ষ থেকে স্মারক উপহার তুলে দেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর ও পরিচালক ও বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, ইমপ্রেস পরিবারের পক্ষে আব্দুর রশিদ মজুমদার, জহির উদ্দিন মাহমুদ মামুন, মুকিত মজুমদার বাবু, নারী উদ্যোক্তা কনা রেজা, রন্ধন বিশেষজ্ঞ কেকা ফেরদৌসী, ইনসেপ্টা ফারমাসিউটিক্যালস-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল মুক্তাদির, চ্যানেল আই-এর পরিচালক (বিক্রয় ও বিপণন) ইবনে হাসান খান, বিশিষ্ট অভিনেতা আবুল হায়াত, আফজাল হোসেন, বিপাশা হায়াত, সানাউল আরেফিন, লুৎফর রহমান রিটন, আমীরুল ইসলাম, গোলাম মোর্তুজা, ফজলুর রহমান বাবু, আফরোজা বানু, নরেশ ভুঁইয়া, সময়ের আলোচিত তরুণ অভিনেতা সিয়াম সহ অন্যান্যরা এসময় উপস্থিত ছিলেন।
বঙ্গভবনের দরবার হল থেকে যখন বেরিয়ে আসছিলাম তখনও ফাগুন হাওয়া এর নানা দৃশ্য চোখের সামনে ভাসছিল। কাহিনীর বিশ্বস্ততাকে পরম মমতায় সিনেমার পর্দায় তুলে ধরেছেন গুণী নির্মাতা তৌকীর আহমেদ। ৫২’র ভাষা আন্দোলনের সময়কালে কেমন ছিল আমাদের প্রিয় এই দেশটি? দেশের মানুষেরা কেমন ছিলেন? কিভাবে মহান ভাষা আন্দোলন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ল? ইত্যাদি যাবতীয় বিষয় বিশ্বস্ততার সাথে তুলে ধরেছেন। এজন্য ছবির পরিচালক হিসেবে তৌকীর আহমেদকে অনেক সাধুবাদ জানাই। সেই সাথে ধন্যবাদ দিতে হবে ইমপ্রেস টেলিফিল্মকে। বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার ফরিদুর রেজা সাগরকে। ইমপ্রেস টেলিফিল্ম থেকে এরই মধ্যে ১৭২টি পূর্ণাঙ্গ সিনেমা নির্মিত হয়েছে। তার অধিকাংশই মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা। মুক্তিযুদ্ধের সিনেমার প্রতি ফরিদুর রেজা সাগরের অনেক আগ্রহ। ফাগুন হাওয়ায় যখন বঙ্গভবনের দরবার হলে দেখানো হচ্ছিলো তখন তিনি শেষ সারিতে বসে সিনেমাটি দেখছিলেন, পাশাপাশি দর্শকদের প্রতিক্রিয়াও বোঝার চেষ্টা করছিলেন। প্রদর্শনী শেষে চলে এলেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো: আব্দুল হামিদের কাছে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি পরম মমতায় ফরিদুর রেজা সাগরের হাত ধরে বললেন, ছবি ভালো হয়েছে। এর চেয়ে খুশির সংবাদ আর কী কিছু হতে পারে। জয় হোক বাংলা চলচ্চিত্রের।