Home মুখোমুখি তিন প্রজন্মের নাট্যকার- নির্দেশক-অভিনেতা- নাট্যজন দর্শকের মুখোমুখি

তিন প্রজন্মের নাট্যকার- নির্দেশক-অভিনেতা- নাট্যজন দর্শকের মুখোমুখি

SHARE

আলাপনের এক পর্যায়ে সারা যাকের নিজের কিছু কথা শেয়ার করেন নতুন প্রজন্মের জন্য। ইংরেজি মাধ্যমে পড়েছেন সারা যাকের। বাংলাটা তাঁর ভালো নয়। চাচা পরামর্শ দিলেন, নাটকের দলে যুক্ত হও। সারা যাকেরের শুরু হলো মঞ্চযাত্রা। সারা যাকেরের এমন কথার পর শিমুল ইউসুফ বলেন, ‘আমি সারা যাকের ও ফেরদৌসী মজুমদারের অভিনয় দেখে থিয়েটারে আগ্রহী হয়েছিলাম। তিয়াত্তর সালে ‘সৎ মানুষের খোঁজে’ নাটকে সারা ভাবির অভিনয় দেখি। তারপর আমি থিয়েটারে আসি। তার আগে দেখেছি ফেরদৌসী আপার ‘এখনও দুঃসময়’ নাটকটি। এই দুজনের অভিনয় দেখে সিদ্ধান্ত নিই, আমি অভিনয় করব। আমি সংগীতচর্চা করেছি, রেডিও টেলিভিশনে কাজের অভিজ্ঞতা ছিল। যদি বলি কার পথ ধরে মঞ্চে এসেছি, তাঁরা দুজন- ফেরদৌসী মজুমদার ও সারা যাকের। পরে গান ছেড়েই দিলাম। মঞ্চের এমন নেশায় আমাকে পেয়ে গেল যে সে নেশাতেই ডুবে গেলাম।’ এমন ছোট ছোট নানান বিষয় সেইদিন আলোচনায় ওঠে আসে। আজকের যে তরুণ-তরুণীরা স্বপ্ন দেখেন অভিনয়ে এই মানুষগুলোর মতো হওয়ার জন্য, তাদের জন্য অবশ্যই পথ প্রদর্শক তারা… সৈয়দ ইকবাল
মিলনায়তন কাণায় কাণায় পূর্ণ। সবাই মনোযোগ দিয়ে বক্তার কথা শুনছেন। মনে হচ্ছিলো যেনো কবিরা তাদের কবিতা পড়ে যাচ্ছেন, তা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে যাচ্ছেন তাদের প্রিয় শ্রোতারা। একটু পর পর তাদের কথায় শ্রোতারা আনন্দ পাচ্ছেন, কখনো অবাক হচ্ছেন আবার কখনোবা সাহসও খুঁজে পাচ্ছেন। হ্যাঁ, পাঠক নাট্যাঙ্গনের জন্য এমনি এক ঘটনার অবতারনা হয়েছে নগরীর বেইলী রোডের মহিলা সমিতিতে। যা ঢাকার থিয়েটারপাড়ার জন্য একটি ইতিবাচক ঘটনা। ছুটির এক সকালে নাট্যাঙ্গনের জনপ্রিয় দুই ব্যক্তি তাদের ক্যারিয়ারের শুরু থেকে এ পর্যন্ত নানান ঘটনার কথা বলেছেন নতুন প্রজন্ম তথা নাট্যাঙ্গনের মানুষদের জন্য। হ্যাঁ, পাঠক বলছি দেশের প্রবীণ নাট্যকর্মী শিমূল ইউসুফ ও সারা যাকেরের কথা। ‘থিয়েটার ডিরেক্টরস ইউনিটি বাংলাদেশ’-এর আয়োজনে তিন প্রজন্মের নাট্যকার, নির্দেশক, অভিনেতা, নাট্যজন ও দর্শকের মুখোমুখি আলাপনের আওতায় একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ আয়োজনে অংশ নিয়েছেন দেশের প্রবীণ দুই নাট্যব্যক্তিত্ব সারা যাকের ও শিমূল ইউসুফ। ১৯ জুলাই সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর বেইলি রোডের মহিলা সমিতিতে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সংগঠনটির প্রধান সমন্বয়কারী ও নাট্যনির্দেশক অনন্ত হীরা এই উদ্যোগ নেন। এর আগে নাট্যজন নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ও মামুনুর রশীদ এই আলাপনে অংশ নিয়েছিলেন। এ আয়োজনের মাধ্যমে জ্যেষ্ঠ নাট্যকর্মী শিমূল ইউসুফ ও সারা যাকের তাদের দীর্ঘ পথচলার গল্প বলেছেন এবং বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। সর্বোপরি তরুণদের উৎসাহিত করতে ও এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দিতে এ আলাপন অনুষ্ঠানে তাদের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করেন।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন অভিনেতা আজাদ আবুল কালাম। অনুষ্ঠানে গুণী এই দুজন নাট্যকর্মীর কথা শোনার জন্য নবীন-প্রবীন অনেক নাট্যকর্মীর পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন নাট্যজন ড. ইনামুল হক, লাকী ইনাম, নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, মোহাম্মদ বারী, তমালিকা কর্মকার সহ আরো অনেকে।
অবিচ্ছেদ্যভাবে পরম্পরাকে অনুসরণ করে থিয়েটারচর্চার সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে এ দেশের নাট্যকর্মীদের। জ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে তালিম নিতে নিতেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এখানকার নাট্যকর্মীরা নিজেদের এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের পথচলার শুরু থেকে আজ অবধি এভাবেই চলছে থিয়েটারচর্চা। এ কারণে জ্যেষ্ঠদের পথচলা, দর্শন সম্পর্কে জ্ঞাত থাকাও তরুণদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সেই গুরুত্বপূর্ণ চর্চাটি বজায় রাখতে প্রয়োজন এক প্রজন্মের সঙ্গে আরেক প্রজন্মের সেতুবন্ধ তৈরি করা।
থিয়েটার ডিরেক্টরস ইউনিটি বাংলাদেশের সমন্বয়কারী অনন্ত হিরা শুভেচ্ছা জানিয়ে মঞ্চে আহŸান করেন দুই নন্দিত অভিনয়শিল্পী সারা যাকের ও শিমূল ইউসুফকে।
এ রকম আয়োজনের প্রয়োজন ও আলাপনের অতিথি নির্বাচন সম্পর্কে অনন্ত হীরা বলেন, ‘স্বাধীনতা-পরবর্তী যে সময় আমাদের দেশে থিয়েটার চর্চা করা ভীষণ রকম প্রতিবন্ধকতার মধ্যে ছিল, বিশেষ করে নারীদের জন্য যে সময়টা সংকট ও চ্যালেঞ্জের ছিল সবচেয়ে বেশি, সে সময় যে কয়েকজন সাহসী নারী এগিয়ে এসে আমাদের মঞ্চকে এগিয়ে নিতে ভ‚মিকা রেখেছেন, তাদের অন্যতম শিমূল ইউসুফ ও সারা যাকের। আমরা আজ যে পথে হাঁটছি, আমাদের পরের আরো দু-তিন প্রজন্ম যারা থিয়েটারে কাজ করতে উৎসাহিত বোধ করছেন, সে পথটা তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল। বলতে গেলে তাদের হাত ধরেই এগিয়েছি আমরা। যে কারণে তাদের কর্মজীবন, থিয়েটারজীবন সম্পর্কে জ্ঞাত থাকা খুবই জরুরি। সে কারণেই আমরা ডিরেক্টরস ইউনিটির পক্ষ থেকে এমন একটি আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছি। তিনি আরো বলেন, ‘সারা যাকের ও শিমূল ইউসুফকে খুব কাছ থেকে দেখেছি, কত বড় মাপের অভিনেত্রী তারা। নতুনদের অনেকেই মঞ্চে তাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো দেখেননি কিংবা দেখার কোনো সুযোগও নেই, যেগুলো দর্শনীর বিনিময়ে প্রদর্শনী হতো সেই সময়। কিন্তু এই আলাপনের মধ্য দিয়ে তাদের কাজের পুনর্মূল্যায়ন, তাদের অবদান, তারা কী কাজ করেছেন, সেটাও জানানো যায়।’
সঞ্চালক আজাদ আবুল কালাম বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে তাঁদের জীবনে কিছু ঘটনা ঘটেছিল। যা তাঁদের শিল্পীজীবনে নিশ্চিতভাবে প্রভাব ফেলেছে। একইভাবে সারা যাকেরের জীবনেও হারানোর দুঃখ আছে। এমন আয়োজনে এসব কথা নতুন প্রজন্মদের জানা খুবই জরুরী।’
শিমূল ইউসুফ ১৯৭৪ সালে ঢাকা থিয়েটারে যোগদানের পর থেকে পুরোপুরি মঞ্চে নিজেকে নিয়োজিত করেন। পাশাপাশি শুদ্ধ সংগীতচর্চা অব্যাহত রাখেন। দীর্ঘ পাঁচ দশকের জীবনে শিমূল ইউসুফ দুই সহ¯্রাধিক নজরুলসংগীত, গণসংগীত, রেডিও, টেলিভিশন ও মঞ্চে পরিবেশন করেন। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য নাটক মুনতাসীর, কসাই, চর কাঁকড়া, শকুন্তলা, ফণীমনসা, কিত্তনখোলা, যৈবতীকন্যার মন ও দ্য টেম্পেস্ট। আড্ডায় এসব নাটকে অভিনয়ের নানান গল্প ওঠে আসে। এসব নাটকে অভিনয়ের সময় মহড়া থেকে শুরু করে শো পর্যন্ত কতো যে যজ্ঞ এবং নানান পরিশ্রমের বিষয় সেটাও ওঠে আসে আলাপনে। ঠিক তেমনি সারা যাকের ১৯৭৩ সাল থেকে মঞ্চে অভিনেত্রী হিসেবে সক্রিয়। তিনি নাগরিক নাট্য স¤প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত। তার অভিনীত মঞ্চ নাটকের মধ্যে রয়েছে বাকি ইতিহাস, ঈর্ষা ও কাঁঠাল বাগান। আড্ডায় তিনিও এসব নাটক নিয়ে নানান স্মৃতিচারণ করেছেন।
আলাপনের এক পর্যায়ে সারা যাকের নিজের কিছু কথা শেয়ার করেন নতুন প্রজন্মের জন্য। ইংরেজি মাধ্যমে পড়েছেন সারা যাকের। বাংলাটা তাঁর ভালো নয়। চাচা পরামর্শ দিলেন, নাটকের দলে যুক্ত হও। সারা যাকেরের শুরু হলো মঞ্চযাত্রা। সারা যাকেরের এমন কথার পর শিমুল ইউসুফ বলেন, ‘আমি সারা যাকের ও ফেরদৌসী মজুমদারের অভিনয় দেখে থিয়েটারে আগ্রহী হয়েছিলাম। তিয়াত্তর সালে ‘সৎ মানুষের খোঁজে’ নাটকে সারা ভাবির অভিনয় দেখি। তারপর আমি থিয়েটারে আসি। তার আগে দেখেছি ফেরদৌসী আপার ‘এখনও দুঃসময়’ নাটকটি। এই দুজনের অভিনয় দেখে সিদ্ধান্ত নিই, আমি অভিনয় করব। আমি সংগীতচর্চা করেছি, রেডিও টেলিভিশনে কাজের অভিজ্ঞতা ছিল। যদি বলি কার পথ ধরে মঞ্চে এসেছি, তাঁরা দুজন- ফেরদৌসী মজুমদার ও সারা যাকের। পরে গান ছেড়েই দিলাম। মঞ্চের এমন নেশায় আমাকে পেয়ে গেল যে সে নেশাতেই ডুবে গেলাম।’ এমন ছোট ছোট নানান বিষয় সেইদিন আলোচনায় ওঠে আসে। আজকের যে তরুণ-তরুণীরা স্বপ্ন দেখেন অভিনয়ে এই মানুষগুলোর মতো হওয়ার জন্য, তাদের জন্য অবশ্যই পথ প্রদর্শক তারা।
মঞ্চনাটক মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম ফসল। এই দুই অভিনয়শিল্পীরও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় শিমূল ইউসুফের বয়স ১৪ বছর। তাঁর সামনেই ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ভগ্নিপতি শহীদ আলতাফ মাহমুদকে। সেই দিনগুলোর স্মৃতিও মনে করেন তিনি। বলেন, ‘আলতাফ মাহমুদ আমার গুরু। তাঁর কাছে আমি গান শিখেছি। পাকিস্তানি আর্মিরা তাঁকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় আমার চোখে চোখ রাখেন তিনি, যাকে বলে অন্তর্দৃষ্টি। ওই দিন চার সেকেন্ডে আমাদের মধ্যে অনেক কথা হয়ে গিয়েছিল। আজ এত বছর পরে ভাবছি, ভাইয়া আমাকে বলতে চেয়েছিলেন, তোমাকে দায়িত্ব দিয়ে গেলাম, পালন কোরো। না হলে আমি কেন সংগীত ছেড়ে দিয়ে থিয়েটার করব। চুয়াত্তরে ঢাকা থিয়েটারে যোগ দিই। তখন মনে হয়েছিল, একদল মুক্তিযোদ্ধা ঢাকা থিয়েটারে। আমার জায়গা এটাই। যেহেতু যুদ্ধ করতে পারিনি, ছোট ছিলাম, সেহেতু যুদ্ধটা মঞ্চেই করি।’
শিমুল ইউসুফের সাথে সারা যাকের যোগ করে বলেন, ‘আমার ভাইয়ের বয়স তখন কুড়ি বছর। সে যুদ্ধে চলে গেল। আর ফিরে আসেনি। আমি যখন মঞ্চে যোগ দিই, তখন এটাই ভেবেছি- সে অভিনয় করত, দেশের জন্য কিছু করতে চেয়েছিল, আমি অভিনয় দিয়েই দেশের জন্য কিছু করব। আমাদের সবার কথা শুনলেই মনে হবে, সেই সময় আমরা যারা থিয়েটার শুরু করেছিলাম, সবার সঙ্গেই কোনো না কোনোভাবে মুক্তিযুদ্ধের যোগ ছিল।’
মহিলা সমিতির ইব্রাহীম মিলনায়তন তখন বেশ নি:স্তব্ধ। যেনো দুজনের মনে গভীর কোনো কষ্ট ছুঁয়ে গেলো। সঞ্চালক আজাদ আবুল কালামও কিছুটা সময় নিলেন। কিছুক্ষণ পর আবারো শুরু হলো দুজনের আলাপন। কথায় কথায় উঠে আসে মঞ্চে অভিনয়ের ব্যাপারে অধ্যাবসায়, পরিশ্রম আর সময়ানুবর্তিতার কথাও। তখন সারা যাকের বলেন, ‘থিয়েটার আসলে একজন মানুষকে পূর্ণাঙ্গ জীবন শৃঙ্খলা শেখায়। এজন থিয়েটারকর্মী যেই সেক্টরেই যাক না কেনো- তার কাজের মধ্যে কোনো না কোনো জায়গায় থিয়েটারের শিক্ষাটা ফুটে ওঠবে। এটাই থিয়েটার। আর জীবনে ধৈয্যশীলতা আর অধ্যাবসায় কি জিনিস তা থিয়েটার থেকে শেখা যায়।’ শিমুুল ইউসুফও তার কথায় সারা যাকেরের সঙ্গে একমত পোষন করেন।
সেদিনের আলাপনে আরো নানান বিষয় ওঠে আসে। দুজনের আলাপনে উঠে আসে থিয়েটারে নারী অভিনয়শিল্পীদের পথচলায় সংকট-সম্ভাবনা। আলাপন শেষে তাঁদের কাছে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন তরুণ মঞ্চকর্মীরা। জেনে নেন থিয়েটারচর্চার নানা দিক সম্পর্কে। এই আয়োজনের ইতি টানেন থিয়েটার ডিরেক্টরস ইউনিটি বাংলাদেশের সদস্য মলয় ভৌমিক। তিনি বলেন, ‘এই দুজনের মঞ্চ অভিজ্ঞতার কথা শুনে আমরা ঋদ্ধ হলাম। আমরা অনেককিছু জানলাম।