SHARE

রবিউল হুসাইন। বাংলাদেশের খ্যাতিমান কবিদের একজন ছিলেন। জাতীয় কবিতা পরিষদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সভাপতি, বেসরকারি উদ্যোগে গড়া মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি হিসেবে গুরু দায়িত্ব পালন করেছেন। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে গড়ে ওঠা ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্ম শহীদুল্লাহ অ্যান্ড এসোসিয়েটস লিমিটেডের প্রধান স্থপতি, গণসংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী রবিউল হুসাইন এদেশের নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম ডিজাইনারও। এতসব কাজের ভিড়ে নিজেকে তিনি প্রকৃতির সন্তান হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। আর তাই তার প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ডিজাইনিং-এ থাকতো ফুল, প্রকৃতি, লেক বা নৈসর্গিক কোনো দৃশ্য। তিনি আজ আর আমাদের মাঝে নেই। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লেখাটি প্রকাশ করা হলো। লিখেছেন শাহজাহান শাহীম
নিসর্গ, প্রকৃতি আর বিমূর্ততা তাকে ভীষণভাবে আলোড়িত করতো। তাই তো তার কথায়, কাব্যে ভেসে উঠেছে প্রকৃতি, প্রেম, নদী, সাগর আর পাহাড়ের কথা। যেখানে সীমারেখার বিভক্তি নেই, যেখানে ক্ষুদ্র চিন্তা নেই। মানুষে মানুষে বিভেদ নেই। তার বড় পরিচয় কবি হিসেবে। এদেশের কবিতা আন্দোলনে, যেকোনো সঙ্কটকালে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। দাবি আদায়ের কিংবা মানুষের স্বাধিকার রক্ষায় তাই রবিউল হুসাইনকে দেখা যেতো মিছিলের অগ্রভাগে। সব পরিচয় ছাপিয়ে পেশাগত জীবনে একজন দক্ষ ও সফল স্থপতি রবিউল হুসাইনের ছিল বহুমুখী প্রতিভা। অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জাদুঘর কিংবা প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের স্থপতি রবিউল হুসাইন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ স্থাপনা, খামারবাড়ি, পার্ক বিল্ডিং, এয়ারফোর্স হেড কোয়ার্টার, দিনাজপুরের ইনস্টিটিউট অফ ভেটেরিনারি কলেজ, হাজী দানেশ কলেজ, বিকেএসপি, সাভার শুটিং কমপ্লেক্স, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহিলা হোস্টেল, মহিলা পলিটেকনিক কলেজ খুলনা, রাজশাহী ও চট্টগ্রামসহ দেশের অসংখ্য শহীদ মিনারের স্থপতি রবিউল হুসাইন। এর মধ্যে রয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শহীদ মিনার, ইসলামিক ইউনিভার্সিটি শহীদ মিনার, পিলখানায় অবস্থিত বিডিআর এর প্রথম শহীদ মিনারের ডিজাইনারও রবিউল হুসাইন। এছাড়া অসংখ্য হাসপাতাল, এগ্রিকালচারাল সেন্টারসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সফল স্থপতি রবিউল হুসাইনের জন্ম ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা থানার রতিকান্ত গ্রামে ১৯৫৩ সালের ৩ জানুয়ারিতে বাবা মৃত তোফাজ্জল হোসেন ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা। সে সূত্রে বাবার বিভিন্ন কর্মস্থলে ঘুরেছেন। দেখেছেন দেশের দর্শনীয় স্থান, সংস্কৃতি আর কৃষ্টি। বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ জীবনে তাই কবিতা হয়ে উঠেছে বড় পরিচয়ের মাধ্যম। সাংস্কৃতিক আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, স্বৈরাচারবিরোধী কিংবা ঘাতক দালাল নিমূর্লের মতো কর্মসূচিতে তিনি বরাবরই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। কবিতাই হতে পারে প্রতিবাদের শ্রেষ্ঠ উপায় এ বিশ্বাসে তিনি লিখেছেন প্রতিবাদী কবিতা। এছাড়া দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখতে কিংবা নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে ক’বন্ধু মিলে গড়ে তুলেছেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এখন বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় সংগ্রহশালা। তিনি এর অন্যতম ট্রাস্টি ছিলেন।

রবিউল হুসাইনের শিক্ষাজীবন কেটেছে বাংলাদেশের নানান জেলায়। বাবার বদলির চাকরির সুবাদে আজ এ স্কুল তো কাল আরেক স্কুল। শেষে কুষ্টিয়া সরকারি স্কুল থেকে এসএসসি এবং ১৯৬২ সালে কুষ্টিয়া কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন। এরপর একই বছর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্কিটেক্ট ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হন। ওই বছরই প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়টিতে আর্কিটেক্ট ডিপার্টমেন্ট খোলা হয়। ভালো ছবি আঁকতেন। ড্রয়িংয়ে ভালো দক্ষতা থাকার কারণে দ্বিতীয় বর্ষে পড়াকালে চাকরির খোঁজ শুরু করেন। এসময় এক বিহারী ভদ্রলোক তাকে ঘণ্টায় ১ টাকা হিসেবে ড্রাফটিং এ কাজ করার সুযোগ করে দেন। ফলে প্রায় প্রতিমাসে ওখান থেকে ৯০ টাকার মতো আয় করে নিজের মেস খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবার এর সদস্যদের সহযোগিতা করতেন। দুভাই একইসঙ্গে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার কারণে বাবার ছেলেদের পড়ানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য ছিল না। এছাড়া ২য় বর্ষে পড়াকালে বাবার মৃত্যু পুরো সংসারটিকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যে ঠেলে দেয়। এসময় রবিউল হুসাইনের এক চাচার সহযোগিতা তাদের এই অনিশ্চিত গন্তব্য থেকে অনেকটাই রক্ষা করে। বাংলাদেশে স্থপতিদের আইডল বলে খ্যাত মাজহারুল ইসলাম বাস্তুকলাবিদ নামে একটি ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্ম প্রতিষ্ঠা করেন। রবিউল হুসাইন ছিলেন মাজহারুল ইসলামের অত্যন্ত স্নেহভাজন। একসময় তিনি বাস্তুকলাবিদে পার্টটাইম কাজ নেন। শুরু হয় জীবনের নতুন গতিপথে এগিয়ে চলা। জুনিয়র আর্কিটেক্ট হিসেবে এ প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি মাসে বেতন পেতেন এক হাজার টাকা। পরিবারের সব সদস্য নিয়ে একান্নবর্তী সংসারে রবিউল হয়ে ওঠেন নির্ভরতার প্রতীক। কেটে যায় দুঃখের দিন। সবাই যার যার অবস্থানে দাঁড়িয়ে যায়। বাংলাদেশের অন্যতম স্থপতি মোঃ শহীদুল্লহ ১৯৬৭ সালের দিকে নিজ নামে শহীদুল্লাহ এন্ড এসোসিয়েটস নামে ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্ম গড়ে তুললে রবিউল হুসাইনসহ ৮ জন এ ফার্মে যোগ দেন। একের পর এক সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তারা আর্কিটেক্ট হিসেবে কাজ করতে থাকেন। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জাদুঘর, প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের অবকাঠামো তৈরিতে এই প্রতিষ্ঠানটি ব্যাপক অবদান রেখে চলেছে। একসময় শহীদুল্লাহ অ্যান্ড এসোসিয়েট ভাগ হয়ে গেলে মূল অংশে তিনি থেকে যান। এ প্রতিষ্ঠানটির প্রধান স্থপতি এবং একমাত্র আর্কিটেক্ট ছিলেন।

বহু দেশ ঘুরেছেন রবিউল হুসাইন। নানান অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ জীবনে তাই টুকরো টুকরো স্মৃতি নিয়ে লিখে চলেছেন একের পর এক কবিতা। আর কবিতার মতোই ইটের পর ইট সাজিয়ে গড়ে তুলেছেন দৃষ্টিনন্দন ও আধুনিকমানের সব ইমারত। আর এসব প্রতিষ্ঠানে তাই প্রকৃতি, নিসর্গ, লেক বা সবুজ বৃক্ষরাজির আধিক্য চোখে পড়ে। রবিউল হুসাইন ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্ট বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। এছাড়া তিনি ৪ বার এই সংগঠনের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছেন। একই সঙ্গে এশিয়া মহাদেশের আর্কিটেক্টদের সংগঠন আর্কেশিয়ার তিনি কনভেনরও। পাশাপাশি এই সংগঠনের তিনি একজন অন্যতম ফেলো। প্রাতিষ্ঠানিক সব আয়োজনের বিরোধিতা করে একসময় কয়েক বন্ধু মিলে ‘না’ আন্দোলন শুরু করেছিলেন। ভালো খেলোয়াড় হিসেবেও বেশ সুনাম ছিল তার। হকি খেলতে গিয়ে সামনের দাঁত খুইয়ে অবশেষে সব খেলাধুলা বন্ধ করেছেন। ১৯৯৮ সালে স্ত্রী বিয়োগের পর প্রায় অধিকাংশ কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে গুটিয়ে এনেছিলেন। সময় কাটতো বই পড়ে, কবিতা লিখে। পুত্র জিসান হুসাইন রবীন ছিল তার একমাত্র সঙ্গী। তাকে নিয়েই কাটাতেন বাকি অবসর। স্বপ্ন দেখতেন এক অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের। তাঁর বিশ্বাস বাংলাদেশ বদলে যাবেই। এ বদল ঘটাবে এদেশের তরুণেরাই। দিনবদলের সেই সুদিনের অপেক্ষায় ছিলেন আমাদের কবি, স্থপতি কবি রবিউল হুসাইন। না ফেরার দেশে অনেক ভালো থাকবেন কবি, অনেক ভালো থাকবেন।