Home প্রতিবেদন গল্প টাইগারপাস রেলওয়ে কলোনী সমাচার

টাইগারপাস রেলওয়ে কলোনী সমাচার

SHARE
Abul--Hayat

আবুল হায়াত

কত স্মৃতিই তো মনে পড়ে। আমি ছেলেবেলার স্মৃতি নিয়েই কথা বলবো। পেছনে ফিরে তাকালে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে, দশ বছর বয়সে আমি জীবনে প্রথম অভিনয় করেছিলাম। নাটকটির নাম ছিল ‘টিপু সুলতান’। তখন চট্টগ্রামে থাকতাম। তখনই হয়তো ভাগ্যে লেখা হয়ে গিয়েছিল আমি অভিনয় করবো। বাবার চাকরির সুবাদে আমার পড়াশোনা ও যৌবনকাল চট্টগ্রামে কেটেছে। চট্টগ্রামে কলেজিয়েট স্কুল, চট্টগ্রাম কলেজে আমার অনেক স্মৃতি রয়েছে। সেখানকার সাংস্কৃতিক পরিমÐলের সঙ্গে আমার সম্পর্ক বহু পুরনো। অনেকটা সময়জুড়ে চট্টগ্রামে বসবাস করেছি বলেই কেউ কেউ মনে করেন আমি চাটগাঁইয়্যা। অবশ্যই চট্টগ্রামের স্মৃতি কখনও ভোলা যাবে না। আর তাই সেখানে সুযোগ পেলেই চলে যাই।
হ ১৯৬২ সালে আমি ঢাকায় আসি। তখন আমি বুয়েটে পড়ি। ঢাকায় এসে প্রথম অভিনয় করা নাটকের নাম ‘এক মুঠো আকাশ’। এখনও স্মৃতিতে ভেসে ওঠে সেই দিনটির কথা। কত আয়োজন, কত আকাক্সক্ষাই না কাজ করেছিল সেদিন।
হ ১৯৬৯ সালে ‘ইডিপাস’ নাটকের মাধ্যমে টিভি পর্দায় যাত্রা শুরু করি আমি। এখনকার মতো এত উন্নত প্রযুক্তি ছিল না তখন। ভালো একটি ক্যামেরাও ছিল না। অনেক কষ্টে নাটকটির শুটিং হয়েছিল। আজো মনে পড়ে সেই দিনটির কথা।
হ আমার জন্ম হয়েছিল শুক্রবারে। তাই আমার মা কখনো আমাকে শুক্রবারে চুল কাটতে দিত না। মা বেঁচে থাকা অব্দি এই নিয়ম মেনে চলতে হয়েছে। এখন এটা খুব একটা মানা হয় না। তবে মাঝে মধ্যে চেষ্টা করি তা মানতে। তাই জন্মদিন এলেই আমার মায়ের কথা মনে পড়ে।
হ আমার ৫০তম জন্মদিন বেশ আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হয়েছিল। আমার বোন থেকে শুরু করে পরিবারের সবাই উপস্থিত ছিল। নাগরিক নাট্য স¤প্রদায় ও চারুনিড়মÑএর যৌথ আয়োজনে আমার ৭০তম জন্মদিনও পালন করা হয়। এই দুটো জন্মদিন আমার কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
হ চট্টগ্রামে থাকার সময় আমার আরো কিছু স্মৃতি রয়েছে। আমি চট্টগ্রামে ছিলাম ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত। তাই রাজনৈতিক সময়কার খুব উত্তাল সময়গুলো দেখেছি চট্টগ্রামের। এ দীর্ঘ সময়ে আমার স্মৃতি বলতে গেলে অনেক। তিন বছর বয়সে আমি চট্টগ্রামে ঢুকেছি। আমার প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয়, কলেজ সবই চট্টগ্রামে। আমার বাবা আব্দুস সালাম (প্রয়াত) ছিলেন রেলওয়ে চাকরিজীবী। টাইগার পাস রেলওয়ে কলোনিতে আমরা থাকতাম। আব্বা চট্টগ্রামের রেলওয়েতে মোটামুটি বিখ্যাত লোক ছিলেন। ওয়াজীউল্লাহ ইনস্টিটিউটের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। রেলওয়ে গার্লস হাইস্কুলের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ভালো ব্রিজ খেলতেন। ভালো বিরিয়ানি পাকাতেন। ফলে ওনাকে অনেকে চিনতেন। বাবার এই স্মৃতিময় সময়গুলো আমাকে বেশ নাড়া দেয়। বাবার সঙ্গে সঙ্গে থাকা এবং একটু অন্যভাবে নিজেকে চেনা বাবার কাছ থেকেই শিখেছি।
হ স্কুল জীবন এবং ছেলেবেলার কিছু স্মৃতির কথা বলি। আমার আনুষ্ঠানিক বিদ্যালয়ে যাওয়াটাও টাইগার পাস কিÐার গার্টেন স্কুল থেকে। কলেজিয়েট স্কুলে পড়েছি। পাহাড়তলী রেলওয়ে স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেছি। চট্টগ্রাম কলেজে পড়ালেখা করেছি। টাইগার পাস কিÐার গার্টেন স্কুলে নার্সারি থেকে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি। বেড়ার স্কুল ছিল, টিনের ছাদ। মৌলভী সাহেবের পড়া না পারলে বেড়ার ফাঁক দিয়ে দৌঁড়ে পালাতাম। স্যারও আমাদের পিছে পিছে দৌঁড়াচ্ছেন আমরাও দৌঁড়াচ্ছি। নাম কিÐার গার্টেন হলেও এটার সঙ্গে আধুনিক কিÐার গার্টেনের কোনো মিল নেই। সপ্তাহে একদিন মসজিদে গিয়ে আজান দেয়া ছিল বাধ্যতামূলক। সেখানে জোহরের নামাজ স্যারের সঙ্গে পড়তে হতো। রেললাইন ধরে কলেজিয়েট স্কুলে হেঁটে হেঁটে আমরা যেতাম মাদারবাড়ি পর্যন্ত । স্কুলের একজন স্যারের কথা মনে পড়ে। সৈয়দ স্যার। তিনি পড়া পারলেও বেতের বাড়ি মারতেন, না পারলেও মারতেন। ওটা স্যারের একটা ‘আদরের মার’ ছিল। আমাদের আরেক স্যারের হাতের লেখা ছিল খুব খারাপ। বোর্ডে পেছন থেকে তিনি লেখার সময় এক ছেলে বলল, ‘ওডা কোয়াইশ করি লেখ (ভালো করে লেখ)।Ñএরপর থেকে স্যারের নাম হয়ে গেল ‘আব্দুল কোয়াইশ’। আমি ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছি পাহাড়তলী রেলওয়ে স্কুল থেকে। বিভিন্ন কারণে আব্বা মনে করতেন পাহাড়তলী স্কুলে যেহেতু তাঁর বন্ধু প্রধান শিক্ষক। সেখানে আমার লেখাপড়া ভালো হবে। নানান সময়ে স্কুল জীবনের স্মৃতিগুলোর কথা মনে পড়ে।
Abul--Hayat-1হ চট্টগ্রামে কলেজ জীবনেও আমার স্মৃতি কম নয়। চট্টগ্রাম কলেজে গিয়ে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলাম। কলেজে আড্ডা দেয়া হতো কম। আমি আড্ডার লোক না, মদ খাই না, তাস খেলি না, জুয়া খেলি না। আমার জীবনে একমাত্র নেশা নাটক। স্বাভাবিক কারণে কলেজে যাওয়ার পর মেয়েদের দেখে একটু উৎসাহ বোধ করলাম। কিন্তু এমন এক নিয়ম ছিল মেয়েরা আমাদের সঙ্গে মিশত না। স্যার আসতেন। মেয়েরা স্যারের পিছে পিছে আসতো। ওরা লাইন ধরে আসতো, লাইন ধরে যেতো। কলেজ জীবনের স্মৃতিগুলোও আমাকে মাঝে মাঝে নাড়া দেয়।
হ এরপর বুয়েটে পড়াশুনা করাটা আমার অন্যরকম এক জীবন। বলা যায় আমার জীবনটাকে অন্যভাবে চেনা শুরু করি বুয়েটে পড়ার মধ্যদিয়ে। তবে বুয়েটে পড়াশুনা করলেও চট্টগ্রামে আসা যাওয়ার মধ্যে ছিলাম। ছুটি হলেই চলে যেতাম চট্টগ্রামে। এখনো চট্টগ্রামে গেলে আমি একবার হলেও টাইগারপাস যাই। টাইগারপাস আমার জীবনে অন্যরকম এক স্মৃতির জায়গা।
হ ছোটবেলায় রেললাইন আমার কাছে বড় স্মৃতি। বাড়ির পাশেই রেললাইন। লাইনে কান পেতে রেলের শব্দ শোনা, গুলতি দিয়ে পাখি শিকার করা, চলন্ত ট্রেনে ওঠা-নামা করা এসব। বেশি মনে পড়ে রেললাইনে চকমকি পাথর দিয়ে আগুন জ্বালানো। ছেলেবেলায় সাইকেল চালিয়ে পতেঙ্গা সৈকতে যেতাম। পিকনিক করতাম। পাথর, কাঁকড়া কুড়াতাম। সাম্পানে চড়তাম। নাসির বলে এক বন্ধু ছিল, সে ফুটবল খেলতো, সিরাজ বলে এক বন্ধু, এখন তার বিপণি বিতানে দোকান আছে। মনসুর ছিল পাড়ার বন্ধু। তার কাছেই আমার নাটকের হাতেখড়ি।
হ আমি ১০ বছর বয়স থেকে অভিনয় শুরু করি। এটা আমার কাছে অনেক বড় একটি স্মৃতি। সেই ১০ বছর থেকে এখন পর্যন্ত আমি অভিনয় করেই যাচ্ছি। এটাও আমার কাছে কম বড় স্মৃতি না। তবে অভিনয়ের আগে আমি চট্টগ্রামের বেতারে ১৯৬৫ সালে খবর পড়তাম। আমার প্রথম মিডিয়ায় আসা খবর পড়ার মাধ্যমে।
হ টি- ৩৭ বি, টাইগারপাস রেলওয়ে কলোনি। ঠিকানাটা আমার সবসময় মনে থাকবে। এটা জীবনের সবচেয়ে বড় স্মৃতি।