Home সাক্ষাৎকার জীবনে হয়তো আর কোনো সিনেমায় অভিনয় করা হবে না-মোশাররফ করিম

জীবনে হয়তো আর কোনো সিনেমায় অভিনয় করা হবে না-মোশাররফ করিম

SHARE
mosharraf

আলমগীর হোসেন
একটা ছোট্ট ঘটনার কথা বলি। রাতে বাসে চড়ে ঢাকার বাইরে যাচ্ছি। ঝকঝকে তকতকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস। গাইডদের আচরণ অনেকটাই আকাশ পথের উড়োজাহাজে কাজ করা স্মার্ট কর্মীদের মতো। ডাকলেই বিনীত হয়ে ছুটে আসেÑ স্যার কিছু লাগবে? কোনো সমস্যা… বাস ছুটে চলছে। হঠাৎ টিভিতে একটি নাটক শুরু হলো। এটি বাসের ভিতরেই নিজস্ব নেটওয়ার্কের টিভি আয়োজন। একজন জনপ্রিয় অভিনেতার নাটক চলছে। হাসির নাটক। বাসের ভিতর তখন অনেকেই তন্দ্রাচ্ছন্ন। আবার কেউ কেউ জেগে আছেন। মোবাইল চর্চায় ব্যস্ত। হঠাৎ বাসের পিছন থেকে একজন যাত্রী চেচিয়ে উঠলেন, এই যে ভাই টিভিটা বন্ধ করেন। কী সব নাটক চালাইতেছেন? হাসির নাটকের নামে কাতুকতু দেয়। টিভি বন্ধ করেন মিয়া? তার কথা শুনে বাসের একজন গাইড টিভিতে অনুষ্ঠান বদলে দিল। দেশীয় নাটকের পরিবর্তে শুরু হলো হিন্দী সিনেমা। বোধকরি ৫/৭ মিনিট সিনেমাটি চলেছে। হঠাৎ বাসের পিছন থেকেই আরেকজন দর্শক চেচিয়ে বললেন, অয় মিয়া হিন্দী ছবি বন্ধ করেন। আগের নাটকটা ছাড়েন। বাসের গাইড পড়ে গেল বিপদে। কী করবে? কার কথা রাখবে? বাসের মাঝখান থেকে অন্য একজন যাত্রী বলে উঠলেন, আগের নাটকটাই ছাড়েন। সাথে সাথে আরও একজন যাত্রী তাকে সাপোর্ট করলো। বাসের গাইড আগের নাটকটিই টিভিতে ছেড়ে দিল। সাথে সাথে বাসের অধিকাংশ যাত্রী হাত তালি দিয়ে উঠলো। বাসের পেছন দিক থেকেই কেউ একজন চিৎকার দিয়ে বলল, জয়গুরু…
বলা বাহুল্য, বিশিষ্ট অভিনেতা মোশাররফ করিম অভিনীত কোনো এক ঈদের বিশেষ নাটক ছিল এটি। বাসের টিভিতে যতক্ষণ নাটকটি চলল ততক্ষনই একটা আনন্দময় পরিবেশ ছিল। একজন অভিনেতা কিভাবে দর্শককে মোহমুগ্ধ করে রাখেন সেটাই আরেকবার দেখলাম। আসলে এ ধরনের মোহমুগ্ধ অভিনয় করে দেখানো মোশাররফ করিমের পক্ষেই সম্ভব। বলতে গেলে তিনিই এখন আমাদের টিভি নাটকের যুবরাজ। রাত দিন ২৪ ঘণ্টা নাটকের মাঝেই আছেন। অভিনয়ের নানান দিক নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। আসুন শুনি গুণী অভিনেতা মোশাররফ করিমের কথা।
প্রশ্ন: এই যে প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন কাহিনীর নাটকে অভিনয় করেন। কী ধরণের কাজ আপনাকে তৃপ্তি দেয়?

Mossarof-Korim

উত্তর: এটা আনলিমিটেড ব্যাপারে একজন অভিনেতার চাওয়া-পাওয়া আনলিমিটেডই হওয়া উচিত। কিন্তু আমাদের উপমহাদেশে একটা জিনিস দেখা যায়, কিছু একটা হিট হলে সবাই তার পিছনেই ছোটে। মাথা না খাটিয়ে ওই অনুকরণে চলতে থাকে। এতে হয় কি, যারা ক্রিয়েটিভ না তাতেই তাদের হয়ে যায়। কিন্তু আমরা যারা একটু সৃষ্টিশীল কাজ করতে চাই, শিল্পসম্মত কাজ চাই তারা একটু অসহায় হয়ে যাই মাঝে মাঝে।
প্রশ্ন: অনেকের অভিযোগ নাটকের মধ্যে অশ্লীল সংলাপ, পোশাক এবং সুড়সুড়ি মূলক দৃশ্য বাড়ছে। আপনার কাছে বিষয়টি কেমন মনে হয়?
উত্তর: খেয়াল রাখতে হবে নাটকের দর্শক কারা? বাবা, মা, ভাই, বোন সবাই একসঙ্গে বসেই কিন্তু নাটক দেখে। সেজন্য আমাদের এমনকিছু করা উচিত নয় যে বাবা, ছেলে, মেয়ে, মা পাশাপাশি বসে নাটক দেখতে শুরু করে হঠাৎই প্রত্যেকেই উঠে গেল। আমার কাছে মনে হয়, এগুলো না হওয়াই ভালো। তবে কখনও কখনও কোনো ভিন্ন গল্প বলতে গেলে দু-একটি ‘¯ø্যাং ওয়ার্ড’ অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়! এতে আরও বেশি জীবন্ত হয়ে ওঠে ব্যাপারটা। সেক্ষেত্রে ওই শব্দ ব্যবহার করে ‘মিউট’ করা যেতে পারে। অন্যথায় শুধুশুধু গালমন্দের প্রয়োজন নেই। যদি কারও উদ্দেশ্য থাকে ‘¯ø্যাং ওয়ার্ড’ ব্যবহারের ফলে কিছু ভিউজ বাড়বে তাহলে সেটা ভালো উদ্দেশ্য না। সবকিছুর সঙ্গে শিল্প সচেতনার পাশাপাশি সমাজ সচেতনা থাকতে হবে।
প্রশ্ন: এক্ষেত্রে দায়বদ্ধতা বেশি কার, নির্মাতা নাকি অভিনেতা-অভিনেত্রীর?
উত্তর: প্রধানত নির্মাতার। কারণ এটা ডিরেক্টরস মিডিয়া। তবে এক্ষেত্রে একজন শিল্পীর সততা সবচেয়ে বেশি জরুরী। যেহেতু কাজটির বিচার করা যাচ্ছে না, তাই শিল্পী নিজেই বিচারক। কোন উদ্দেশ্যে ‘¯ø্যাং’ ব্যবহার করা হচ্ছে ওই শিল্পীই ভালো জানেন। তিনি কি একটি নির্দিষ্ট জেনারেশনের দর্শক ধরার জন্য বলছেন নাকি আসলেই ¯ø্যাং শব্দটা অপরিহার্য ছিল! সবকিছুর সাথে ভাবতে হবে কাজগুলো দেখবে কারা।
প্রশ্ন: অনেক সংকটের মধ্যেও নাটকের সার্বিক অবস্থা কেমন দেখছেন?
উত্তর: নাটকের সার্বিক অবস্থার কথা বলতে গিয়ে ‘আমি আনন্দিত’, এমনটা বলতে পারলে ভালো লাগতো। কিন্তু তা পারছিনা। কারণ, এভাবে চলা উচিত না। পরিবেশ পরিস্থিতি দেখে আমি সত্যি বিস্মিত। এ জন্য বিস্মিত যে, মহা সংকটের মধ্যেও এতো ভালো নাটক হচ্ছে কীভাবে! বাজে কিছু কাজ হলেও অসংখ্য ভালো কাজ হচ্ছে। সে কারনে আমি বিস্মিত। এখানে ভালো কাজ উপহার দেয়ার মতো সেই মানের কোনো ইন্সটিটিউশন নেই। যেখানে থেকে বড়বড় ক্যামেরাম্যান বের হবে, এডিটর বের হবে, অভিনেতা বের হবে, পরিচালক বের হবে। ভারতে শতশত ইন্সটিটিউশন। সেখান থেকে লেখাপড়া করে শিখছে বিধায় তারা ভালো কাজ উপহার দিতে পারছে। আমাদের এখানে অভিনয় শেখার প্রতিষ্ঠান কোথায়? তাহলে ভালো কাজ আসবে কোথা থেকে? তারপরেও এতো ভালো ভালো কাজ হচ্ছে যা দেখে বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই। আমাদের দেশে গোটা বিশেক ক্যামেরাম্যান আছেন একেবারে আন্তর্জাতিকমানের। তারা কিভাবে কোথা থেকে তৈরি হলো? তারা কিন্তু নিজেরাই নিজেদের তৈরি করেছেন দেখে, শিখে। এভাবে পরিচালক, অভিনেতাও তৈরি হচ্ছে। তবে অভিনেতাদের ক্ষেত্রে থিয়েটার আছে শেখার জন্য। কিন্তু থিয়েটার কখনও ক্যামেরাম্যান বানাতে পারবে না। আমরা এই দিকগুলো ভাবছি না। শুধু বলছি, এখানে ভালো নাটক হচ্ছে না। আমার প্রশ্ন হলো, হতেই হবে কেন? তেমন কিছু তো নেই, তাহলে কোথা থেকে হবে? শিক্ষার জায়গায় নাই বিধায় ‘প্রফেশনাল অ্যাটিচিউট’ বা সঠিক কাজের প্রক্রিয়া তৈরি হয়নি।
প্রশ্ন: নাটকে নাকি গ্রæপ্রিং চলছে! কোরামের বাইরে কয়েকজন কাজ ই করছেন না এমন অভিযোগ শোনো যায়। কিছু বলবেন?
উত্তর: আমি এসব বিষয়ে খুব একটা জানি না। তবে আমার কাছে মনে হয় আর্টের জায়গাটা খুব বেশি বদ্ধ করতে পারিনা। আমি মনে করি, আমি যে নাটকে অভিনয় করি আমার বিপরীতে কে অভিনয় করবে সেটি প্রধানত নির্ধারণ করবেন পরিচালক। তার আগে তিনি আমার সাথে আলোচনা করতে পারেন যে অমুককে নেয়ার কথা ভাবছি। এটা হতে পারে! কিন্তু আমরা আর মামারা মিলে কাজ করলাম, আর কেউ করবে না; পৃথিবীর কোথাও এমনটা আছে কিনা আমার জানা নেই। এর আগে একই নাটকে ফরিদী ভাই, আফজাল ভাই, তারিক আনামকে দেখেছি। আমি, চঞ্চল, মিলনসহ অনেকেই একই নাটকে কাজ করেছি। আমি আমার ক্ষেত্রে বলছি, পৃথিবীর কোনো শিল্পীর সঙ্গে আমার কাজ করতে অসুবিধা নেই যদি কাজটি ভালো হয় এবং আমার মনে তৃপ্তি এনে দেয়ার ক্ষমতা রাখে।
প্রশ্ন: অনেকেই চড়া পারিশ্রমিক দাবী করেন। এতে নাটকের বাজেটের অর্ধেকই চলে যায়, এর প্রভাব কি সামগ্রিকভাবে একটি ভালো নাটক না হওয়ার অন্তরায় নয়?
উত্তর: একজন শিল্পী পারিশ্রমিক চাইতেই পারে। কারণ তিনি কারও চাকরী করেন না। তিনি তার পেমেন্টই নিচ্ছেন। তবে শিল্পীর পারিশ্রমিক চাহিদার ধরণটা সবক্ষেত্রে একই হওয়া উচিত। এতে বাকি শিল্পীদের পেমেন্ট থাকছে না কারণ সেখানে বাজেট সংকট। এই সংকটের কারণে বহু আগেই নাটক থেকে ভালো মেকআপ আর্টিস্ট, শিল্প নির্দেশক, কস্টিউম ডিজাইনার সরে গেছে।
প্রশ্ন: বর্তমান সময়ে দেখা যাচ্ছে ফেসবুক সেলেব্রেটি থেকে অভিনেতা-অভিনেত্রী বনে যায়। এই প্রক্রিয়াটা কীভাবে দেখেন?
উত্তর: কয়েখদিন আগে আমাকে ঠিক এমনই একজন বলেছিল, আমাকে একটু সুযোগ দেন আমি অভিনয় করবো। মজা করে আমি তাকে বলেছিলাম, মনে করেন আপনি অসুস্থ। এখন আমি ডাক্তার হয়ে আপনার চিকিৎসা করবো! ব্যাপারটা তো তাই!
প্রশ্ন: নতুন সিনেমায় কাজে খবর?
উত্তর: নতুন কোনো সিনেমা নিয়ে খবর নেই। এটা যে করতেই হবে আমার কাছে বিষয়টা এমন না। চরিত্র আর গল্প ভালো হলে কাজ করবো। আর তা না হলে জীবনে হয়তো আর একটি সিনেমাও করা হবে না। কয়েক বছরে বেশ কিছু ভালো সিনেমা হয়েছে আমাদের দেশে। এই ধারাবাহিকতা ধরা রাখা প্রয়োজন। এই তো আজ শুটিংয়ে আসার সময় দেখলাম ভিনদেশি সিনেমার পোস্টার রাস্তায়, দেয়ালে দেয়ালে ঝুলছে। অথচ আমাদের দেশের একটি সিনেমার পোস্টার কোথাও চোখে পড়লো না। আমি অবাক হয়ে গেলাম। হা: হা: হা:…