SHARE

সৈয়দ ইকবাল
একসাথে এক ছাদের নীচে এতোজন ধারাভাষ্যকার! সবাই সদ্য শেষ হওয়া ক্রিকেট বিশ্বকাপের ধারাভাষ্য দিয়েছেন। হ্যাঁ, পাঠক সম্প্রতি রেডিও ভূমি ও আনন্দ আলোর উদ্যোগে ‘ক্রিকেটান্দ’ শিরোনামে এমনই একটি আনন্দ আয়োজন হয়ে গেলো চ্যানেল আই এর ছাদ বারান্দায়। যেখানে বাংলাদেশ বেতার থেকে শুরু করে প্রায় দেশের সব’কটি এফএম রেডিও এর ধারাভাষ্যকাররা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে ধারাভাষ্যকারদেরকে সম্মাননা প্রদান সহ ধারাভাষ্য নিয়ে বর্তমান অবস্থা এবং রেডিও ধারাভাষ্যে আরও কী করণীয় থাকতে পারে সেই বিষয়ে আলোচনা করা হয়। অনুষ্ঠানে নবীন প্রবীণ ধারাভাষ্যকারদের মাঝে উপস্থিত ছিলেন ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ও চ্যানেল আই এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, রেডিও ভূমি এর ষ্টেশন ইনচার্জ শামস সুমন, আনন্দ আলোর সম্পাদক রেজানুর রহমান, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম ম্যানেজার শাহরিয়ার মান্নান সহ অনেকে।
জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর সকল মহা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে ধারাভাষ্যের ক্ষেত্রে কিভাবে শ্রোতাদের অবুঝ শ্রোতা থেকে জ্ঞানী শ্রোতা হিসেবে তৈরি করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করা হয়। দেখা গেছে একজন দর্শক হয়তো আবেগে কোনো ক্রিকেট খেলোয়াড় আউট হয়ে যাওয়াতে বেশ কষ্ট পান। এমনকি অনেকে এটাও বলে থাকেন- ‘বলটা এভাবে না খেললেও পারতেন, কেনো এই বল খেলতে গেলেন ইত্যাদি ইত্যাদি।’ কিন্তু এখানে ধারাভাষ্যকাররা ঐ শ্রোতার ভুল ভাঙ্গাবে কিভাবে এবং তাকে বুঝদার শ্রোতা তৈরি করার কাজটি করবেন কিভাবে। মানে বলটি যে বোলার করেছে এবং তার বলটির মান নিয়ে কথা বলে শ্রোতার ভুল ভাঙ্গাতে হবে। কেননা বোলার এরও তো একটা ভূমিকা রয়েছে আউট করার জন্য। ক্রিকেটে আবেগটাকে কিভাবে কমিয়ে রেখে ধারাভাষ্য দেয়া যায় সে বিষয়েও আলোচনা হয় এই আয়োজনে। দেখা গেছে, বাংলাদেশের খেলার সময় ধারাভাষ্যকাররা বেশি আবেগী হয়ে যান। দেশের প্রতি টান থেকে অন্য দেশের খেলোয়াড়কে ছোট করে কিছু বলা যাবে না। আবার নিজের দেশ হেরে যাওয়ার সময়েও আবেগে এমন কথা বলা যাবে না- যাতে সাধারণ মানুষের উপর প্রভাব ফেলে। আশার বাণী শুনিয়ে কিভাবে দর্শক ধরে রাখতে হবে সেটাও আয়ত্ব করতে হবে। এমন সব নানান বিষয়ে আলোচনা হয় এই অনুষ্ঠানে।
ক্রিকেটে শুধু ক্রিকেটারই নয়। ধারাভাষ্যকারও হতে পারেন তারকা। যে কোন খেলাকে আকর্ষণীয় ও উপভোগ্য করতে খেলোয়াড়, খেলার মান, মাঠের দর্শক, সম্প্রচারের কারিশমার পাশাপাশি দক্ষ ধারাভাষ্যকারের গুরুত্ব কোন অংশেই কম নয়, বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে বেশিই! তাই অনুষ্ঠানে ক’জন ধারাভাষ্যকারের ভূমিকা নিয়ে নানান কথা উঠে আসে।

অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে রেডিও ভূমির ষ্টেশন ইনচার্জ শামস সুমন বিশ্বকাপ ক্রিকেট এবং বাংলাদেশে এবারের ধারাভাষ্য নিয়ে চমৎকার কিছু তত্ত¡ উপাত্ত উপস্থাপন করেন। যা উপস্থিত সবাইকে আনন্দের পাশাপাশি অবাকও করেছে। ক্রিকেট বিশ্বকাপ-২০১৯ এ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ১৮ টি ভাষায় ধারাভাষ্য প্রদান করা হয়েছে। অন্যান্য দেশে ১ টি বা ২ টি রেডিও ধারাভাষ্যে অংশ নিয়েছে। তবে বাংলাদেশে সর্বাধিক ৭ টি রেডিও এবারের বিশ্বকাপে বাংলায় ধারাভাষ্য দিয়েছে। বাংলাদেশের গ্রæপ পর্বে মোট ৯ টি খেলা ছিল, এর মধ্যে ৮টি খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১টি ম্যাচ বৃষ্টির কারণে বিঘিœত হয়েছে। খেলা চলাকালীন অর্থাৎ ৮*৮ = ৬৪ ঘন্টায়, তারিখ- ২,৫,৮,১৭,২০,২৪ জুন এবং ২ ও ৫ জুলাই দেশে হত্যা, ধর্ষন, চুরি, ডাকাতি, দুর্ঘটনা অন্যান্য দিনের তুলনায় ৭০ শতাংশ কম ছিল। রেডিওতে প্রায় ৫ কোটির বেশী (সূত্র: রেডিও ভ‚মি’র গবেষণা দল) শ্রোতা বাংলা ক্রিকেট ধারাভাষ্যের সাথে ছিলেন।
অনুষ্ঠানে রেডিও ধারা ভাষ্যের ইতিহাসও উঠে আসে। পূর্ববঙ্গে ১৯৬৩ সালের আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহে ঢাকা লীগের ফুটবল ম্যাচে ধারাভাষ্য দিয়ে প্রথম বাংলায় ধারাভাষ্য শুরু হয়। ১৯৬৫ সালের ১৭-১৯ ডিসেম্বর ৩ দিনের একটি প্রদর্শনী ম্যাচে বাংলা ধারাভাষ্য দিয়ে ক্রিকেটে পূর্ববঙ্গে বাংলা ধারাভাষ্য শুরু হয়। ২০১২ সালের বিপিএল-এ পিপলস্ রেডিও বেসরকারী ভাবে প্রথম রেডিওতে বাংলা ধারাভাষ্য শুরু করে। এরপর ২০১৩ সালের ৬ জুন রেডিও ভ‚মি ৯২.৮ চ্যাম্পিয়নস্ ট্রফির বাংলা ধারাভাষ্য প্রদানের মাধ্যমে বেসরকারী এফএম রেডিওতে এখন পর্যন্ত বাংলায় নিয়মিত ভাবে ক্রিকেট ধারাভাষ্য প্রদান করে আসছে। এর সাথে পরবর্তীতে রেডিও স্বাধীন, জাগো এফএম, রেডিও ধ্বনি, রেডিও এইজ, রেডিও নেক্সট, এবিসি রেডিও, রেডিও টুডে, ঢাকা এফএম বিভিন্ন সময়ে ধারাভাষ্য প্রদান করেছে এবং করছে। আগামী বইমেলায় ধারাভাষ্য বিষয়ক একটি বই বের করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে রেডিও ভূমি- এই তথ্যও অনুষ্ঠানে জানানো হয়।

২০১৩ সালে রেডিও ভ‚মি যখন ধারাভাষ্য শুরু করে তখন বেতারের নিবন্ধিত অনেক ধারাভাষ্যকারের সাথেই রেডিও ভ‚মি’র কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়। শামস সুমন জানান, ‘সে সময় অনেক ধারাভাষ্যকারই আক্ষেপ পোষণ করেছিলেন যে, টেলিভিশন দেখে পূর্ণ আবেগে ধারাভাষ্য সম্ভব নয়। বেসরকারী রেডিও হিসেবে রেডিও ভ‚মি’র অর্থনৈতিক সামর্থ ছিলনা- বিদেশ তো দূরের কথা, দেশের শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়াম থেকেও ধারাভাষ্য সম্প্রচার করা। এক সময় দেখা গেল রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা বাংলাদেশ বেতার আর দেশের বাইরে স্টেডিয়াম থেকে ধারাভাষ্য প্রচার করছে না।
যার ফলে বাংলাদেশ বেতার আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে নিজের অবস্থান তৈরী করতে পারছিল না। আজ যদি বাংলাদেশ বেতার লন্ডন থেকে বিশ্বকাপ ক্রিকেট ধারাভাষ্য প্রদান করতো, তবে শ্রোতারা আরও বেশী ক্রিকেটের আনন্দ উপভোগ করতে পারতেন। এর প্রেক্ষিতে বেসরকারী রেডিও গুলোর পক্ষ থেকে আমি বাংলাদেশ বেতারে তালিকাভ‚ক্ত সকল ধারাভাষ্যকারদের আকুল আবেদন করছি- আপনারা কর্তৃপক্ষকে বোঝান এবং আগামী শ্রীলংকা সিরিজে প্রেমাদাশা স্টেডিয়ামে বসে ধারাভাষ্য প্রদান করুন এবং আমাদের মতো বেসরকারী রেডিওকে বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সগযোগিতা করুন।’
অনুষ্ঠানে যে যে ধারাভাষ্যকাররা আলোচনায় অংশ নেন তারা হলেন- ফাহিম রহমান (বায়োস্কোপ, জিটিভি), কুমার কল্যাণ (ঢাকা এফএম), মো. সামসুল ইসলাম (রেডিও ভূমি), মো. কামরুজ্জামান (বাংলাদেশ বেতার/ রেডিও ভূমি), মো. পলাশ খাঁন (বাংলাদেশ বেতার), আনোয়ার কবির (বাংলাদেশ বেতার), এম এ মুরাদ (বাংলাদেশ বেতার), ইমরান জামিল (রেডিও ধ্বনি), মো. মোজাহিদুর রহমান (রেডিও ধ্বনি), লিংকন আহমেদ (রেডিও ধ্বনি), সাথিরা জাকির জেসি (রেডিও স্বাধীন), এস.এম. আবদুস শাকুর (বাংলাদেশ বেতার/ রেডিও টুডে), প্রান্তর দাস অনয় (এবিসি রেডিও), রোজেল আহমেদ (এবিসি রেডিও), মো. মাহমুদুন নবী সুমন (এবিসি রেডিও), মাইমুনা ফেরদৌস মম (রেডিও ভূমি), ফারহাদ রাকিব (রেডিও স্বাধীন), সামি (রেডিও ভূমি), সাজ্জাদ উদাস (রেডিও স্বাধীন), আহমেদ বিন পারভেজ (রেডিও স্বাধীন), মো. জাহিন আলম (রেডিও স্বাধীন), শফিকুল ইসলাম শান্ত (রেডিও ধ্বনি), কাজল সরকার (রেডিও ধ্বনি), আনোয়ারুল আলম (রেডিও ভূমি), সজল মিত্র রিচার্ড (ঢাকা এফএম), নিখিল রঞ্জন দাস (বাংলাদেশ বেতার), শামীম আল জাবের (রেডিও ধ্বনি), মোস্তফা কামাল তোহা (রেডিও ধ্বনি), আজমল তানজীম (রেডিও টুডে), সাঈদুর রহমান (বাংলাদেশ বেতার), মো. ফারুকুজ্জামান (বাংলাদেশ বেতার), তামান্না সিদ্দিকী (রেডিও ভূমি), রবিউল ইসলাম রবি (রেডিও ধ্বনি)।