SHARE

একসময় ধারাবাহিক নাটকে সমাজচিত্র দারুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হতো। হুমায়ূন আহমেদের গল্প তাতে নতুন মাত্রা যোগ করে। একটি পরিবারের প্রতিটি চরিত্রকে দারুণভাবে তুলে ধরা হতো সেসব নাটকে। নব্বই দশকে প্যাকেজ নাটক শুরু হলেও, তাতে ছিল পারিবারিক বন্ধনের গল্প। তখন নাট্যকার ও পরিচালকরা একটি পরিবারকে অনেক চোখ দিয়ে দেখতেন। কিন্তু গত এক দশকে নাটকের গল্প হয়ে উঠে দুটি চরিত্রকেন্দ্রিক। বেশিরভাগ নাটকে যেন শুধু প্রেমিক-প্রেমিকার চোখ দিয়েই সবকিছু দেখানো হচ্ছে। এভাবে নাটক তার পুরনো ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলেছে।

অনেকেই অভিযোগ করেন, নাটকে এখন আর পারিবারিক গল্প দেখা যায় না। অনেক সিনিয়র শিল্পী ভালো চরিত্রের অভাবে শোবিজ ছেড়েছেন। আর যারা কাজ করছেন তাদের দু-একটি দৃশ্যে অভিনয় করেই তৃপ্ত থাকতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে নাটক আরও সংকীর্ণ হয়ে গেছে। ঘুরে-ফিরে দু-চারজন নায়ক-নায়িকা নিয়ে বেশি নাটক নির্মিত হচ্ছে।

গত ঈদে মিজানুর রহমান আরিয়ানের কয়েকটি নাটকে বেশ কয়েকজন সিনিয়র শিল্পীকে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে কাজ করতে দেখা যায়। বিষয়টি তখন প্রশংসা কুড়ায়। এবার শুধু আরিয়ান নন, অন্য অনেক নির্মাতাই গল্পে ভিন্নতা এনেছেন। এগুলোতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সিনিয়র শিল্পী কাজ করেছেন। করোনার অনেক নেতিবাচক দিকের মধ্যে নাটকের জন্য এটা একটা ইতিবাচক দিক। এবার বেশ কিছু নাটকে দাদা, দাদি, চাচা, চাচি, ফুপু, ফুফা, বড় বউ, ছোট বউ, বাড়ির জামাই, নাতি-নাতনি নানা চরিত্রের সমাবেশ ঘটেছে। যৌথ পরিবারের সব চরিত্রই থাকছে এখানে। তেমনি একটি নাটক ‘হয়তো তোমারি জন্য’। পরিচালনা করেছেন হাসান রেজাউল। এতে অভিনয় করেছেন দিলারা জামান, খালেকুজ্জামান, মুনিরা মিঠু, শাহেদ আলী, সাজ্জাদ রেজা, মনোজ প্রামাণিক, পায়েল, মৌ শিখা, ফাহমিসহ অনেকে। নাটকটির প্রযোজক ও লেখক সাদিয়া জাফরীন বলেন, ‘পরিবারের প্রতিটি সদস্য আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এই নাটকে তাদের রাখা হয়েছে, যারা ক্রমেই পর্দা ও পরিবার থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন। প্রেম, ভালোবাসা, বিশ্বাস, শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ এসব নিয়েই আমাদের এই নির্মাণ। আশা করি এবার ঈদে একটু ভিন্ন স্বাদ দিতে পারবে নাটকটি। একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে ও জাফরীন স্টুডিও নামের ইউটিউবে চ্যানেলে এটি প্রকাশ হবে ঈদে।’

বৃন্দাবন দাসের লেখা ও শামীম জামানের পরিচালনায় ‘টাম কাড’ নাটকে অভিনয় করলেন চঞ্চল চৌধুরী, আ খ ম হাসান ও শাহনাজ খুশি। এক দশক পর একসঙ্গে কাজ করলেন তারা। ‘হাড়কিপ্টা’ নাটকে সর্বশেষ একত্রে দেখা গিয়েছিল এই তারকাদের। শামীম জামান বলেন, ‘হাড়কিপ্টা নাটকের শ্যুটিংয়ের সময়ই পরিচালক সালাহউদ্দিন লাভলু ও নাট্যকার বৃন্দাবন দাসের মধ্যে মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়। নাটকের বাজেট তখন কম ছিল। গল্পে ছিল একাধিক বড় তারকা। নাট্যকারকেও দিতে হতো বড় অঙ্কের সম্মানী। এই ব্যয় নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। তবে আমাদের এই টিমের মধ্যে বোঝাপড়াটা ভালো ছিল। সেটা ফিরিয়ে আনতে বৃন্দাবন দাদার সঙ্গে আবার যোগাযোগ করি।’

আশির দশকে চট্টগ্রামের এক সত্যিকারের প্রেমকাহিনী নিয়ে নির্মিত হয়েছে টেলিছবি ‘কেন?’। সেখানে রাইমার চরিত্রে অভিনয় করেছেন মেহজাবীন এবং ঈশিতা। শুধু তা-ই নয়, রাইমার প্রেমিক আবিরের চরিত্রে অভিনয় করেছেন তৌসিফ মাহবুব ও আফরান নিশো। হারিয়ে ফেলা প্রেয়সী রাইমাকে খুঁজে পেয়েছিলেন আবির, আবার ফিরিয়েও দিয়েছিলেন। তারপর সময় গড়িয়েছে অনেক। আবির আজও তাকে ভোলেননি। আর রাইমার মনেও ছিল প্রশ্ন, কেন তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হলো! গীতিকবি আসিফ ইকবালের গল্পে ‘কেন?’ টেলিছবিটি পরিচালনা করেছেন মাহমুদুর রহমান। নির্মাতা বললেন, একই চরিত্রে দুজন বড় তারকার অভিনয়, বাংলাদেশে সম্ভবত এবারই প্রথম। ঈদের দিন রাত সাড়ে ১১টায় আরটিভিতে দেখা যাবে এই টেলিছবি। পরে গানচিল ড্রামা ও সিনেমার ইউটিউব চ্যানেলে রাখা থাকবে এটি।

গত শুক্রবার দীপ্ত টেলিভিশনের ঈদের ধারাবাহিক নাটক ‘গিরগিটি’র শ্যুটিং শেষ হয়েছে। এই নাটকে অভিনয় করছেন মোশাররফ করিম, তারিক আনাম খান, ইন্তেখাব দিনার ও জুঁই করিম প্রমুখ। এক নাটকে এতগুলো জনপ্রিয় তারকাকে একসঙ্গে এখন প্রায় দেখাই যায় না।

‘নাম বললে চাকরি থাকবে না’ নামের একটি নাটকে অভিনয় করেছেন ফারহান আহমেদ জোভান, মুমতাহিনা চৌধুরী টয়া ও মুকিত জাকারিয়া। নাটকটি লিখেছেন শফিকুর রহমান শান্তনু ও পরিচালনায় আছেন সরদার রোকন। প্রেমিক-প্রেমিকার বাইরে এই নাটকে মুকিতের মজার চরিত্রটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘এখন বেশির ভাগ নাটকের চরিত্রে পছন্দ হয় না। তাই আগের তুলনায় কাজ করি কম। কিন্তু এই নাটকে আমার চরিত্রটি দারুণ। আমার চরিত্র ছাড়া নাটকই অসম্পূর্ণ। এ ধরনের গল্প নিয়ে আরও নাটক হলে আমাদের মতো অনেক শিল্পী আবার কাজে ফিরবেন।’

মারজুক রাসেল একসময়ের জনপ্রিয় টিভি নাটকের অভিনেতা। তিনি সব সময় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রেই কাজ করেন। কিন্তু মাঝের কটা বছর তিনি প্রায় অনুপস্থিত ছিলেন। এবার একাধিক নাটকে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে তাকে দেখা যাবে। বদরাগী বেদানা বিবির হাউকাউ এবং তার মেয়ে বিন্নির লজিং মাস্টার আজগরের সঙ্গে লুকিয়ে প্রেমের গল্প নিয়ে নির্মিত হলো ঈদের নাটক ‘বেদানা বিবির বিন্নি’। নাটকে আজগর চরিত্রে অভিনয় করেছেন মারজুক রাসেল। বেদানা বিবি চরিত্রে আছেন মনিরা মিঠু, বিন্নি চরিত্রে টয়া। নাটকে আরও আছেন সোহেল খান, মোনালিসা দীপা, ইকবাল হোসেন, চাষি আলম, রাজু আহসান, দাউদ প্রমুখ। ক্রাউন এন্টারটেইনমেন্টের ব্যানারে নাটকটি রচনা ও নির্মাণ করেছেন হিমু আকরাম। ঈদে চ্যানেল আইয়ে প্রচার হবে ‘বেদানা বিবির বিন্নি’। এ ছাড়া জনপ্রিয় নির্মাতা কাজল আরেফিন অমির ‘মাস্ক’ নাটকে কাজ করেছেন মারজুক রাসেল। নির্মাতা জানালেন, এটি একটি ডার্ক কমেডি নাটক। এখানে প্রেমিক-প্রেমিকার কোনো গুরুত্ব নেই। বিভিন্ন বয়সের কয়েকজন পুরুষের কাণ্ড নিয়ে গল্প।

জনপ্রিয় নির্মাতা শিহাব শাহীন এবার মাত্র একটি নাটক নিয়েই হাজির হবেন। ‘ঘরবন্দি সময়ের গল্প’ সিরিজের এই নাটকের নাম ‘করোনা বলে কিছু নেই’। দীপ্ত টিভির জন্য নির্মিত এ নাটকে অভিনয় করেছেন মাসুম আজিজ, সাবিহা জামান ও তাসনুভা তিশা। নির্মাতা বলেন, ‘এ নাটকে একটি পরিবারের গল্প বলা হয়েছে। যেখানে বাবা, মা ও মেয়ে তিনটি চরিত্রই মুখ্য। এতে প্রেমকে প্রাধান্য দেওয়া হয়নি।’ আরেক ব্যস্ত নির্মাতা ইমরাউল রাফাত নির্মাণ করেছেন ভিন্ন গল্পের নাটক গ্যাং। এটি কয়েকজন তরুণ-তরুণী একটি গ্যাংয়ের সদস্য।