SHARE

চায়ের কাপে এক চুমুক, ব্যাস শরীরের ক্লানিত্ম নিমিষেই দূর- চায়ের মাহাত্ম্য তো এখানেই। এক কাপ চা না হলে সকালটাই শুরু করতে পারেন না অনেকে। সকালের দৈনিক পত্রিকার সঙ্গে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপটা লাগবেই। সকালে একবার, অফিসে এসে একবার চা পান করেই কাজ শুরু করেন প্রায় সবাই। শুধু সকাল কেন, অফিসে কাজ করতে করতে কিংবা বিকেলে অফিস থেকে ফিরে সন্ধ্যার আড্ডা অথবা আয়েশ করে টিভি দেখা- সেটাও কি চা ছাড়া চলে? বাংলাদেশের কোথায় চায়ের দোকানা নেই? শহরের ওলিগলির মোড়ে মোড়ে চা, পাড়ার দোকানে চা, মহাসড়কের পাশে চা, গঞ্জে চা, রাজনীতিতে চা, এমনকি নির্বাচনী আমেজেও চা ছাড়া যেনো তক্কাতক্কিটা ঠিক জমে না।  শীত, বর্ষা কিংবা গরম সব মৌসুমেই চায়ের কদর সমান তালে চলে। পরিবারের সবার কাছেই এক কাপ চা যেন প্রশানিত্মর অনেক ভালো লাগার। হয়তো কোনো চা দামি কাপের আড্ডায় ঝড় তোলে আবার কোনো চা রাসত্মার ধারে জীবনের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব মিলাতে না পারা কোনো যুবকের স্ট্রাগলের কথা বলে। দুনিয়ার সবচেয়ে গণতান্ত্রিক এক পানীয়, চা! আর তাই তো কোনো খাদ্যাভ্যাস যখন প্রাত্যহিক হয়ে ওঠে, জীবনযাপনের অংশ হয়ে ওঠে, তখন একে কেন্দ্র করে সংস্কৃতিও গড়ে ওঠে। চীন বা জাপানের মতো দেশে চায়ের যে সংস্কৃতি কয়েক হাজার বছর ধরে গড়ে উঠেছে, সে তুলনায় আমাদের চা পান সংস্কৃতি হয়তো বেশি দিনের নয়। আমাদের দেশে হয়তো নোবেল বিজয়ী জাপানি সাহিত্যিক য়াসুনারি কাওয়াবাতার মতো চা পানের আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে হাজার সারসঞ উপন্যাস লেখা হয়নি। কিন্তু এ দেশেও নিজেদের মতো করে চা পানের এক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। নানা ধরনের চায়ের স্বাদ নেয়া, চা তৈরি বা পরিবেশন- সবকিছু মিলিয়েই গড়ে উঠেছে আমাদের ‘চা সংস্কৃতি’। যেনো এক কাপ চায়েই লুকিয়ে আছে জীবনের জয়ধ্বনি, আবেগ, অনুভূতি, আনন্দ কিংবা উল্লাস। আর তাই তো চায়ের প্রতি বাঙালির বিপুল আগ্রহ দেখে এই মুহূর্তে বলাই যায়- চা মানে লাইফটা একদম ভরপুর। লিখেছেন সৈয়দ ইকবাল।

Tea-1চা বলতে সাধারণত সুগন্ধযুক্ত ও স্বাদবিশিষ্ট এক ধরণের ঊষ্ণ পানীয়কে বোঝায় যা চা পাতা পানিতে ফুটিয়ে বা গরম পানিতে ভিজিয়ে তৈরি করা হয়। চা গাছ থেকে চা পাতা পাওয়া যায়। চা গাছের বৈজ্ঞানিক নাম ক্যামেলিয়া সিনেনসিস। ‘চা পাতা’ কার্যত চা গাছের পাতা, পর্ব ও মুকুলের একটি কৃষিজাত পণ্য যা বিভিন্ন উপায়ে প্রসত্মুত করা হয়। ইংরজিতে চা-এর প্রতিশব্দ হলো টি। গ্রীকদেবী থিয়ার নামানুসারে এর নাম হয় টি। চীনে ‘টি’-এর উচ্চারণ ছিল ‘চি’। পরে হয়ে যায় ‘চা’। পানির পরেই চা বিশ্বের সর্বাধিক ব্যবহৃত পানীয়। এর একধরণের স্নিগ্ধ, প্রশানিত্মদায়ক স্বাদ রয়েছে এবং অনেকেই এটি উপভোগ করেন। প্রসত্মুত করার প্রক্রিয়া অনুসারে চা’কে পাঁচটি প্রধান শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। যেমন – কালো চা, সবুজ চা, ইষ্টক চা, উলং বা ওলোং চা এবং প্যারাগুয়ে চা। এছাড়াও, সাদা চা, হলুদ চা, পুয়ের চা-সহ আরো বিভিন্ন ধরণের চা রয়েছে। তবে সর্বাধিক পরিচিত ও ব্যবহৃত চা হল সাদা, সবুজ, উলং এবং কালো চা। প্রায় সবরকম চা-ই ক্যামেলিয়া সিনেনসিস থেকে তৈরি হলেও বিভিন্ন উপায়ে প্রসত্মুতের কারণে একেক ধরণের চা একেক রকম স্বাদযুক্ত। পুয়ের চা একধরণের গাঁজনোত্তর চা যা অনেক ক্ষেত্রে ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিছু কিছু চায়ে ক্যামেলিয়া সিনেনসিস থাকে না। ভেষজ চা হল একধরণের নিষিক্ত পাতা, ফুল, লতা ও উদ্ভিদের অন্যান্য অংশ যাতে কোন ক্যামেলিয়া সিনেনসিস নেই। লাল চা সাধারণত কাল চা (কোরিয়া, চীন ও জাপানে ব্যবহৃত হয়) অথবা দক্ষিণ আফ্রিকার রুইবস গাছ থেকে তৈরি হয় এবং এতেও কোন ক্যামেলিয়া সিনেনসিস নেই।

বাঙালির আড্ডা মানেই এক কাপ চা

Tea-2চায়ের সঙ্গে আড্ডার একটা গভীর যোগসূত্র রয়েছে। বাঙালির আড্ডায় চায়ের কতটা প্রভাব রয়েছে তা অবশ্য বিশ্বের নামকরা বাঙালি পরিচালকদের চলচ্চিত্র দেখলেই বোঝা যায়। সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, জহির রায়হানসহ নামিদামি সব পরিচালকদের সেই সাদাকালোর আমল থেকে এখন অবধি তরুণ পরিচালক যতো চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন সেখানে নানানভাবে চায়ের চিত্র ঠিকই ফুটে উঠেছে। নকশাল, মাওবাদী কিংবা ছাত্র ইউনিয়নের নানান আড্ডা এবং তর্কে চা-টা পাসিং শট হিসেবে দারুণভাবেই ছিলো। আর বর্তমানের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ-তরুণীদের আড্ডা মানে চা থাকা চাই-ই চাই। আর এই চায়ের অবশ্য এখন অনেক পরিবর্তন এসেছে। যেমন বর্তমানে ছেলে মেয়েদের মধ্যে মাল্টা চা, পুদিনা পাতা চা, গুড়ের চা, লিকার চা, লেবু-আদা চা, সাত রঙের চাসহ আরো নানান রকমের চা। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনা কিংবা রাসত্মার মোড়ের চায়ের দোকান- সবখানেই তারুণ্যের আড্ডা জমে চায়ের কাপে। তাই দৈনন্দিন জীবনযাপন এবং আড্ডা, অভিমান, খুনসুটি সবকিছুর সঙ্গে চা এখন মিলেমিশে একাকার। নগরীর তরুণদের মধ্যে খুব কম ছেলে-মেয়েদেরই খুঁজে পাওয়া যাবে, যারা কিনা জীবনে একবার হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাকিম চত্বরে গিয়ে চা পান করেননি! আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তারুণ্যের দীপ্তময়তা তখনই চাঙ্গা হয় যখন মধুর ক্যন্টিনে বসে চায়ের কাপে চিনত্মার উন্মেষ ঘটে। এই চায়ের সঙ্গে অদৃশ্যভাবে দেশের অনেক ইতিহাসও জড়িত। ক্যাফে কালচার জোরালো হচ্ছে দেশে, সেখানেও নানা পদের চা নিয়েই বসছেন আজকের তরুণ-তরুণীরা। রাতে বাসায় ডিনার সেরে শুধু চা পান করতেই অনেকে যাচ্ছেন কোনো ক্যাফেতে, বন্ধুদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছেন আড্ডায়। উপলক্ষ চা, বাসা থেকে একটু বের হওয়াও হলো, আড্ডাও হলো। শুধু কী তাই! অনেক দিন বাদে কোনো বন্ধুর অফিসে গেলে কিংবা ব্যবসায়িক প্রয়োজনে কোথাও কয়েক বন্ধু-কলিগ একসাথে বসলেই প্রথমেই আপ্যায়ন হিসেবে চায়ের কথাই কিন্তু আসে। আর কর্পোরেট কালচারে চা বর্তমানে অন্যতম এক পানীয়। অফিস শেষে কলিগের সাথে রাসত্মার ধারে কোনো দোকানে চায়ের আড্ডাটা না জমলে অনেক কাজ করার পরও কী জানি বাকি থেকেই যায়!

চায়ের ধরন এবং স্বাদ

Tea-3দিন বদলেছে, বদলেছে অভ্যাস আর তার সাথে অভ্যসত্ম হতেই কালে কালে ঘটেছে চায়ের বিবর্তন। কোথাও স্বাদের প্রয়োজনে, কোথাওবা ঔষধি গুণের কারণে কিংবা সময়ের পরিবর্তনে চায়ের হয়েছে নানান রূপ নানান স্বাদ। তাই তো স্বাদের বৈচিত্র্যে পুরো পৃথিবীতে পাওয়া যায় প্রায় দেড় হাজারেরও বেশি পদের চা।

বাঙালি চা খায়, নাকি চা বাঙালিকে খায়- এ নিয়ে বেশ মজার বিতর্ক হতে পারে। বাঙালির চায়ের অভ্যাস যেমন খুব বেশি প্রাচীন নয়, তেমনি স্বাদ গ্রহণের দিক থেকেও একটুখানি পিছিয়ে। চায়ের স্বাদ নিয়ে গবেষণা চলেছে ঔপনিবেশিক সময়ে ব্রিটেনে, আর সেই প্রাচীন সময় থেকেই চীনে। দিন বদলেছে, বদলেছে অভ্যাস- আর তার সাথে অভ্যসত্ম হতেই কালে কালে ঘটেছে চায়ের বিবর্তন। বিশ্বায়নের এই সময়ে সুপার শপের যুগে বাংলাদেশেও চালু হয়েছে বিভিন্ন পদের চায়ের। তবে চায়ের তত্ত্ব আর সূত্র বলে আসল চা হয় চার পদের।  হোয়াইট টি, গ্রিন টি, উলং টি আর, ব্ল্যাক টি।

হোয়াইট টি: হোয়াইট টি মূলত কোনো মেশিন ছাড়াই হাতে হাতে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। কেবলমাত্র বসনত্মকালে যে দুটি পাতা একটি কুঁড়ি হয়- কেবল সেটা থেকেই হয় এই হোয়াইট টি। হোয়াইট টি মূলত পুরোই অপ্রক্রিয়াজাত চা, একই সঙ্গে সবচেয়ে স্বাস্থ্যকরও। হোয়াইট টিতে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও থেনাইনের (একধরনের অ্যামিনো অ্যাসিড যা কেবল ভালো মানের চাতেই পাওয়া যায়) পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট স্বাস্থ্য রক্ষা করে ও শরীরে বয়সের ছাপ পড়তে দেয় না। সেই সাথে রোগ প্রতিরোধ করে। থেনাইন শারীরিক ও মানসিক প্রশানিত্ম দেয়, মন উৎফুল্ল করে, হজমশক্তি বাড়ায় আর মনকে সতেজ রাখে।

গ্রিন টি: গ্রিন টি মূলত আগ্রহের কেন্দ্রতে আসে এর ঔষধি গুণের জন্য। গ্রিন টিতে থাকা অ্যান্টি- অক্সিডেন্ট শরীরের ভেতরে ভেসে বেড়ানো বিপজ্জনক রেডিক্যালগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। এই চায়ের স্বাদ সাধারণ ঘাসের মতো থেকে শুরু করে মিষ্টি হতে পারে। লিকারের রং হাল্কা সবুজাভ সোনালি। গ্রিন টিও ক্যামেলিয়া সিনেনসিস আর ক্যামেলিয়া আসামিকা গাছ থেকেই হয় বেশি। গ্রিন টি মূলত গাজন প্রক্রিয়াবিহীন চা-পাতা। প্রথমে সিদ্ধ করে তারপর প্যানফ্রাই করে এর গাজন প্রক্রিয়া ব্যাহত করা হয়। গ্রিন টি শরীরের মেদ হ্রাসে ভূমিকা রাখে। তাই তো এই চা বিশ্বের নানান দেশের মতো বাংলাদেশেও বেশ জনপ্রিয়। গ্রিন টিতে রয়েছে এপিগ্যালোক্যাটেচিন গ্যালাটে, যা প্রকৃতির অন্যতম সেরা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট।

উলং টি: চায়ের সমঝদারদের মাঝে এই চায়ের বেশ কদর রয়েছে। ধরনের ভিত্তিতে বলা যায় এই চা ব্ল্যাক টি আর  গ্রিন টির মাঝামাঝি। এই চায়ের দানা খানিকটা বড় ও খয়েরি রঙের হয়। স্বাদে বেশ মসৃণ আর গন্ধও বেশ। উলং চা কেবলমাত্র দক্ষিণ-পূর্ব চীন ও তাইওয়ানে উৎপাদিত হয়। কঠোর গোপনীয়তার সাথে তৈরি হয় বলে এই চায়ের প্রক্রিয়াজাতকরণ কৌশল এখনও অজানা। আর বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় বলে এর স্বাদ ও গন্ধের বৈচিত্র্যও বেশি। বলা হয় উলং টি কোলেস্টরেল হ্রাস করে মেটাবলিজম বাড়ায়, সেই সাথে ওজনও কমায়।

ব্ল্যাক টি: ক্যামেলিয়া সিনেনসিস আর ক্যামেলিয়া আসামিকা- এই দুই ধরনের চা গাছ থেকেই উৎপন্ন হয় ব্ল্যাক টি। এই চা প্রক্রিয়াজাত করার সময়ে ফার্মেন্টেশন বা গাজন প্রক্রিয়া বেশ দীর্ঘ হয়। ফলে এই চা বেশি সময় ধরে গরম পানিতে রেখে দিলে অনেক তিতা স্বাদ বের হয় এবং রংটাও বেশ গাঢ় হয়। এই চা মূলত দুধ বা রং চা হিসেবে আমাদের দেশে পরিবেশিত হয় কখনও দুধ-চিনি মিশিয়ে, কখনও বা আদা-লেবু মিশিয়ে। কেবল চীনেই প্রক্রিয়াজাত করার পর ১০ রকমের ব্ল্যাক টি পাওয়া যায়। টান ইয়াং গংফু মূলত ফুজিয়ান প্রদেশে উৎপাদিত ও প্রক্রিয়াজাত করা হয়। ১৮৫১ সালে এই চায়ের স্বাদ পেয়েছিল ব্রিটিশরা। ঝেঙ্গে গংফু চীনের ফুজিয়ান প্রদেশের ঝেঙ্গে কাউন্টিতে ও বেইলিন গংফু ফুজিয়ান প্রদেশের বেইলিন এলাকায় উৎপাদিত হয়। এই তিন পদের চা’কে একসঙ্গে বলা হয় ফুুজিয়ান রেডস।

এ ছাড়া চীনের আরও অনেক প্রদেশেই চায়ের চাষ হয়। ফুজিয়ান প্রদেশেই পাইন কাঠের আঁচে শুকানো হয় লাপসাং সচাং- পশ্চিমা ভাষায় যেটা স্মোকড টি। পাইন কাঠের গন্ধ এই চা’কে বিশেষায়িত করেছে।  ইন জুনমেই এই চায়ের আরেক পদ। জিন জুনমেই নামের আরও একধরনের চা রয়েছে, যা ফুজিয়ান এলাকার সবচেয়ে সেরা চা । সে কারণেই চীনের সবচেয়ে দামি চা এটা।

কিমেন চা মূলত আনহুই প্রদেশে উৎপাদিত হয়। ১৮৭৫ সালে এক সিভিল সার্ভেন্ট ফুজিয়ান প্রদেশে ব্ল্যাক টি সম্পর্কে জানতে এসে আবিষ্কার করে ফেলেন এই কিমেন। পাইনের সঙ্গে যোগ হয় বিভিন্ন শুকনো ফল। ডিয়ান হং পশ্চিমা বাজারে পরিচিত ইউনান রেড বা ইউনান ব্ল্যাক নামে। ইউনান প্রদেশের চা বলেই এই নাম। মূলত এই চায়ের সঙ্গে অন্য চায়ের পার্থক্য এর চায়ের পাতার কারণে। এই চায়ে কেবলই ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’ নীতি অনুসরণ করা হয়। লিচু, লংগান, গোলাপ ইত্যাদি দিয়ে ফার্মেন্টেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যায় এই চা-পাতা। ফলে এর ফ্লেভার, গন্ধ অন্য চায়ের থেকে একদম আলাদা। সে কারণে ইংলিশ ব্রেকফাস্ট টি এর অন্যতম উপকরণ এই চা। ইং ডে হং চা মূলত পরিচিত এর কোকো গন্ধ- মিষ্টি আর সামান্য ঝাল ঝাল স্বাদের জন্য। ১৯৫৯ সালে এই চা প্রক্রিয়াজাত করা হয়। জিউ কে হং মে চায়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এর চায়ের পাতার আকৃতি। বাংলাদেশেও এখন নানা পদের চা পাওয়া যাচ্ছে। দেশি কোম্পানিগুলোও চায়ে বৈচিত্র্য এনেছে, আনছে। সুপার স্টোরগুলোর র‌্যাক এখন দেশি-বিদেশি নানা পদের চায়ে ঠাসা। মিলছে ভেষজ চা-ও, তুলসী থেকে জিংসেন সবই। নামী-দামি কোম্পানিগুলোর প্যাকেটে চায়ের সঙ্গে বাড়তি কোনো কিছু যোগ করা হয়েছে কি না, তার যেমন উল্লেখ থাকে; তেমনি সেরা স্বাদটি পেতে গেলে কীভাবে বানাতে হবে, তার বর্ণনাও থাকে।

নানান দেশের নানান চা

Tea--4চীনা চা ছাড়াও বাজারে তাইওয়ানের ব্ল্যাক টি সানমুন লেকও বেশ জনপ্রিয় এর মধু, দারুচিনি, ফুল, পিপারমিন্ট স্বাদের জন্য। তিব্বতি চা মূলত আলাদা কোনো চা নয়। তিব্বতের আশপাশের এলাকায় উৎপন্ন চাকেই তিব্বতি কায়দায় পরিবেশিত হয় কেবল। পশ্চিমারা একে ব্রিক টিও বলে থাকে। মূলত মাখন দিয়ে পরিবেশিত হয় এই চা।

আসাম চা প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকেই আসামের আদিবাসীদের মধ্যে প্রচলিত ছিল, তবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময়ে এসে বাণিজ্যিক রূপ পায়। আগের সব চা ক্যামেলিয়া সিনেনসিস গাছ থেকে এলেও আসাম চা তৈরি হয় ক্যামেলিয়া আসামিকা গাছ থেকে। বাংলাদেশের সব চাও তৈরি হয় এই গাছ থেকেই। আসাম চায়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এর বড় দানা আর স্ট্রং মল্ট ফ্লেভার। আসামের উপত্যকায় এ চায়ের চাষ হয়। আনত্মর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সিলেট, চট্টগ্রামের চা’কেও এই আসাম চা বলেই চালানো হয়।

দার্জিলিংয়ের চা পৃথিবীর অন্যতম সেরা চা। এর গন্ধ আর স্বাদ দুটিই খুব সহজে আলাদা করা যায় অন্য যে কোনো চা থেকে। পাতলা চা-পাতা, চায়ের ফুলের অসাধারণ গন্ধ তাতে নতুন স্বাদ এনে দেয়। পৃথিবীর সবচেয়ে দামি চা এই দার্জিলিং চা। মূলত আবহাওয়া আর প্রতিকূল অবস্থানের (অধিকাংশ চা বাগানই খাড়া পাহাড়ের ঢালে) জন্যই এই চায়ের এত সুনাম আর দাম। দার্জিলিং চা ছাড়াও ভারতের কেরালা, হিমাচল ও তামিলনাড়ুতেও প্রচুর চায়ের চাষ হয় যেগুলো মান্নার, কাংরা ও নীলগিরি নামে পরিচিত।

শ্রীলংকার সিলন চা পৃথিবীর অন্যতম সেরা চাগুলোর মধ্যে একটি। শ্রীলঙ্কার এই চা বিভিন্ন উচ্চতায় চাষ হয়ে থাকে। পরিবেশের তারতম্য অনুযায়ী এর দাম আর লিকারের রঙেও প্রভাব পড়ে। যেমন একটু উঁচু পাহাড়ি এলাকার চায়ে সোনালি রঙের হাল্কা লিকার হয়। আবার সমতলের কাছাকাছি যেসব চা হয়, তার লিকারের রং হয় রক্তাভ খয়েরি, স্বাদও বেশ কড়া। আর এই দুইয়ের মাঝামাঝি উচ্চতার চায়ের লিকার হয় খয়েরি ধরনের আর স্বাদও হালকা আর কড়ার মাঝামাঝি। শ্রীলঙ্কার চা’কে পৃথিবীর অন্যতম সেরা চা বলা হয় এর লিকার, স্বাদ আর গন্ধের জন্য। এর বাইরেও ভালো মানের ব্ল্যাক টি উৎপাদন হয় কেনিয়া, ভিয়েতনাম, নেপাল, তুরস্ক, থাইল্যান্ড, ককেশাস দ্বীপ, রামিয়া, সুমাত্রা দ্বীপ, মালেশিয়া, গুয়েতেমালা আর ইরানে।

ইতিহাসের পাতা থেকে

পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি মানুষের কাছে এক কাপ চা প্রশানিত্মর সমার্থক হিসেবে খ্যাত। জনপ্রিয় এ পানীয়টির ইতিহাস যতটা দীর্ঘ ঠিক ততটা জটিলও। বিভিন্ন সভ্যতার বিভিন্ন সংস্কৃতিতে চা পানের প্রথা ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগে কয়েক হাজার বছর। ধারণা করা হয়, ১০৪৬ সাল থেকে ১৫০০ সালের মধ্যবর্তী কোনো এক সময় শাংদের রাজত্বকালে ঔষধি পানীয় হিসেবে চীনে প্রথম উৎপত্তি লাভ করে চা। সপ্তদশ শতাব্দীর দিকে ব্রিটেনে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে চা। ততদিনে চায়ের রমরমা ব্যবসা শুরু করে দিয়েছে চীনারা। আর এ ব্যবসায় ভাগ বসাতেই ভারতে চা নিয়ে আসে ব্রিটিশরা। পাশাপাশি চায়ের উৎপাদনেও কাজ শুরু করে তারা। চায়ের উৎপত্তি নিয়ে আরেকটি মজার গল্পও প্রচলিত আছে। শেনাং নামের চীনের এক সম্রাট একটি নিয়ম করেছিলেন। নিয়মটি ছিল, প্রজাদের অবশ্যই পানি ফুটিয়ে পান করতে হবে। এ রকম এক সময় শেনাংয়ের জন্য যে পানি ফোটানো হচ্ছিল তাতে কিছু পাতা উড়ে এসে পড়ে। এতে পানির রং পাল্টে যায়। আগ্রহের বশে সেই পানি পান করে মুগ্ধ হয়ে যান সম্রাট শেনাং। এ ধরনের আরো বেশ কিছু কাহিনী প্রচলিত আছে জনপ্রিয় এ পানীয়টির উৎপত্তি নিয়ে। তবে এসব কাহিনীর কোনোটিরই ঐতিহাসিক কোনো সত্যতা পাওয়া যায় না। তবে উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, ১৬৫০ সালে চীনে বাণিজ্যিকভাবে চায়ের উৎপাদন শুরু হয়। আর ভারতবর্ষে এর চাষ শুরু হয় ১৮১৮ সালে। ১৮৫৫ সালে ব্রিটিশরা বাংলাদেশের সিলেটে সর্বপ্রথম চায়ের গাছ খুঁজে পায়। এরপর ১৮৫৭ সালে সিলেটের মালনীছড়ায় শুরু হয় বাণিজ্যিক চা-চাষ।

বাঙালির চা সংস্কৃতি!

Tea-5প্রথম বাঙালি হিসেবে চা খাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর। সেই সাধু-সন্তুদের চা এখন পাড়ায়, মহল্লায়, রেস্টুরেন্টে। আর তাই তো চা ছাড়া একটা দিন শহুরে মানুষ কেন, গ্রামের মানুষেরাও এখন চিনত্মা করতে পারে না। ভারতবর্ষে চায়ের প্রচলন আসাম-অরুণাচলের আদিবাসীদের ভেতরেই কেবল সীমাবদ্ধ ছিল অনেককাল ধরে। আর ছিল চীনে। বাংলায় প্রথম চায়ের বীজ বপন করা হয়েছিল কলকাতার শিবপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনে। চীন থেকে বীজ আনা হয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লেফটেন্যান্ট কিডের তত্ত্বাবধানে। সে সময়ে চায়ের বাজারে একলাই রাজত্ব করত চীন।

১৮৩৪ সালে ভারতের গভর্নর জেনারেল উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক উদ্যোগ নেন চায়ের বাণিজ্যিকীকরণের। এর ধারাবাহিকতায় ১৮৩৬ সালে ‘রপ্তানিযোগ্য’ উপাধি পায় আসাম চা। ১৮৩৭ সালে ১২ বাক্স আসাম চা পাঠানো হলো লন্ডনে। তখনই প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা ধারণা ভেঙে যায় যে, কেবল চৈনিক চা (ক্যামেলিয়া সাইনেনসিস)-ই শুধু চা নয়, আসামের চা (ক্যামেলিয়া আসামিকা)-ও চা, এবং বেশ ভালো মানের চা। এই পর্যায়ে সমসত্ম উদ্যোগ নেয়া হয় সি এ ব্রুসের তত্ত্বাবধানে। তাই ভারতবর্ষে চায়ের জনক বলা হয় তাকে। এই সাফল্যের পর ব্রুসকে পুরো ভারতবর্ষে চা চাষের দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি চৈনিক চায়ের পাশাপাশি আসাম চা উৎপাদন শুরু করেন। তাতে দেখা গেল আসাম চা উৎপাদন বেশ লাভজনক। এরপর আসামের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপকভাবে চা আবাদ শুরু হলো। এ ছাড়া অনুসন্ধান চলতে থাকল বুনো চা গাছ ও চা উৎপাদন এলাকার। এর ফলে সিলেটের জৈনত্মা ও খাসি পাহাড়ে প্রচুর বুনো চা গাছের সন্ধান পাওয়া যায়।

সাতচল্লিশের দেশ ভাগের পর থেকেই উত্তর-পূর্ব ভারতীয় অঞ্চল ও বাংলাদেশে চা আলাদাভাবেই বিকশিত হতে থাকে। আজ থেকে প্রায় ১৭৫ বছর আগে ১৮৪০ সালে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে প্রথম চা আবাদের উদ্যোগ নেয়া হয়। চট্টগ্রাম ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টর মি. স্কন্স কিছু আসাম চায়ের বীজ ও কলকাতা বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে চীনা চায়ের চারা সংগ্রহ করে চাষ করার চেষ্টা করেন। এরপর মি. হুগ ব্যক্তিগতভাবে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরে কোদালায় চায়ের চাষ শুরু করেন। ১৮৪৩ সালে সর্বপ্রথম চট্টগ্রামে এই পাতা থেকে চা তৈরি করা হয়। তবে সেই উদ্যোগ বাণিজ্যিক ছিল না। ১৮৫৭ সালে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে সর্বপ্রথম সিলেটের মালনিছড়ায় চা বাগান প্রতিষ্ঠা ও চা উৎপাদনের সূত্রপাত ঘটে। এরপর ১৮৬০ সালে মৌলভীবাজার জেলার মিরতিঙ্গা ও হবিগঞ্জ জেলার লালচান্দ চা বাগান প্রতিষ্ঠা ও উৎপাদন শুরু হয়। এরপর ১৮৮০ সালে শ্রীমঙ্গলের বালিশিরা উপত্যকায় বাগান প্রতিষ্ঠা ও চায়ের চাষ শুরু হয়। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, নাগরিক সুবিধাবিহীন, বিদ্যুৎবিহীন জনপদে সসত্মা শ্রমের সুযোগে ব্রিটিশ পুঁজিপতিদের শোষণ-লুণ্ঠন-মুনাফা তথা বাণিজ্যিক স্বার্থ হাসিলের অদম্য ইচ্ছা, সাহস আর উৎসাহে গড়ে ওঠে চা বাগান।

চা বাগান প্রতিষ্ঠার পর রপ্তানির পালা এলে দেখা গেল ইউরোপে চা পাঠানোর খরচে মুনাফা অনেকটাই কমে আসে। শুরু হলো ভারতবর্ষের মানুষদের চা পান করানোর প্রক্রিয়া। ভৌগোলিক কারণেই বাঙালিরা পেল অগ্রাধিকার। রেল স্টেশনে, স্টিমার ঘাটে চা প্রসত্মুত প্রণালি আর চা খাওয়ার উপকারিতা নিয়ে বসানো হলো সাইনবোর্ড। বিনামূল্যে চা খাওয়ানো হলো সে জায়গাগুলোয়। সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন ছাপা হতে থাকল ‘প্রাণশক্তি ও উৎসাহের উৎস এবং ম্যালেরিয়ানাশক ভারতীয় চা। দরকার হইলেই ভারতীয় চা ব্যবহার করিয়া অচিরেই শরীর ও মন সতেজ করিয়া তোলা যায়, ইহা যে কত বড় সানত্মনা তা বলা যায় না। সমসত্ম দিনের কঠিন কায়িক শ্রম বা মসিত্মষ্কপ্রসূত কার্যের পরবর্তীতে এক পেয়ালা উত্তমরূপে প্রসত্মুতকৃত দেশী চা খাইলেই শরীর সজীব ও মন প্রসন্ন হইয়া উঠিবে। সত্যই চা জাগ্রত জীবনীশক্তির আশ্চয আধার। প্রত্যহ প্রভাতে নিয়ম করিয়া অনত্মত দুই পেয়ালা দেশী চা পান করুন, জড়তা দূরীভূত হইবে সমসত্ম দিন শরীর মজবুত থাকিবে। আবার দিনানেত্ম দুই পেয়ালা চা পান করিবেন, সমসত্ম দিনের পরিশ্রমের পর মধুময় বিশ্রামে কোনো ব্যাঘাত ঘটিবে না।’ এত এত বিজ্ঞাপন করার পরও চা জনসাধারণের পানীয় হয়ে ওঠেনি সে সময়ে। বাংলায় চায়ের চাষের আগে থেকেই ঢাকায় নবাব আবদুল গণি তার শাহবাগের বাগানবাড়িতে প্রতি সকালে চায়ের আসর বসাতেন। সেখানে দাওয়াত পেতেন কেবল অভিজাত রাজনৈতিক ব্যক্তিরা। চায়ের অভ্যাস কেবল বিলাসিতা আর টাকার অপচয় হিসেবেই ধরা হতো সাধারণ মধ্যবিত্ত সমাজে। তারপরও চায়ের অভ্যেস ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছিল বাংলায়। চায়ের বন্দনা করা কবি-সাহিত্যিকের সংখ্যা নিতানত্মই কম নয়। কবি প্রিয়ংবদা দেবী ১৯১২ সালে চা বন্দনা করেছেন ‘শুকান চায়ের পাতাকে জানিত তায়/সবুজ ফাগুন ছিল ভরা কবিতায়।’ এরপর চা-খোর নৃপেন্দ্র কুমার বসু বললেন, কৃষ্ণবর্ণা শুষ্কপর্ণা/ চিত্তহারিনী ললনা/ কেমনে অধীনে প্রণয়ের ডোরে/ বাঁধিয়াছ বল না? হেম ফেলে তব প্রেমসুধা চাই/ নধর কাপেতে অধর ডুবাই/ বিরহেতে তোর প্রাণে মরে যাই।’

Tea-6তারপর এলো মুলকরাজ আনন্দের চা শ্রমিকদের নিয়ে উপন্যাস যার বঙ্গানুবাদের নাম ‘দুটি পাতা একটি কুড়ি’। প্যারিসের ক্যাফের আড্ডাগুলো দেখে বাংলায় চায়ের দোকানের আড্ডাগুলো থেকে এক বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে ফেলেছিলেন অন্নদাশংকর রায়। ঠাকুরবাড়িও বাদ যায়নি চায়ের অভ্যেস থেকে। এমনকি যে কাজী নজরুল ইসলাম ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে জেল খেটেছেন, তাঁরও চায়ের নেশা ছিল প্রচন্ড রকমের। এই শুনে সিরাজগঞ্জের মুসলমান যুবসমাজের এক সভায় তাকে চা দিয়ে আপ্যায়িত করা হয় ১৯৩২ সালে। সেই চায়ের উপকরণ ছিল হলুদ, মরিচ আর মশলা। তবে চায়ের বিরোধিতা করে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ১৯৩৫ সালের ডিসেম্বর মাসের দেশ পত্রিকায় জ্বালাময়ী এক লেখা লিখেছিলেন ‘চা এর প্রচার ও দেশের সর্ব্বনাশ’ নামে। তিনি লিখেছিলেন: ‘শীতপ্রধান দেশে চা-পানের কিছু প্রয়োজন থাকিতে পারে সত্য, কিন্তু আমাদের উষ্ণ দেশে উহার কোনই সার্থকতা নাই। সাহেবরা যখন চা পান করে, তখন তাহার সঙ্গে অনেক কিছু পুষ্টিকর খাদ্যসামগ্রী পেটে পড়ে, কিন্তু কলিকাতা, বোম্বাই প্রভৃতি নগরের স্বল্প বেতনভুক, শীর্ণ কেরাণী আহায ও পানীয়ের উভয়বিদ প্রয়োজনে চা পান দ্বারাই মিটাইয়া থাকেন। আপিসে আসিয়া ২/১ ঘণ্টা কাজে বসিতে না বসিতেই ইহারা চা-এর তৃষ্ণায় কাতর হন। কঠোর পরিশ্রমের মধ্যে চা পান করিয়া ইহারা ক্ষণিকের জন্য কিঞ্চিত আরাম ও উত্তেজনা এবং স্ফূর্তি অনুভব করেন। আবার সেই একঘেয়ে হাড়ভাঙ্গা খাটুনির মধ্যে চা-এর পেয়ালায় চুমুক আর হাই হইল কেরাণীর দৈনন্দিন জীবন। এই প্রকারে সারা দিনরাত প্রায় পাঁচ ছয় পেয়ালা চা। এই বদ অভ্যাসের পক্ষে তিনি এই যুক্তি দেখাইয়া থাকেন যে, উহাতে ক্ষুধা নষ্ট হয়, সুতরাং ব্যয়সাধ্য পুষ্টিকর আহার্যেরও আর প্রয়োজন পড়ে না।’

চা নিয়ে ইংরেজদের বিজ্ঞাপনী ভাষার সমালোচনা করে তিনি আরেক জায়গায় বলেন, ‘অতিরঞ্জন, অতিভাষণ ও মিথ্যাভাষণ উক্ত প্রচারকার্য্যরে মূলমন্ত্র। ইউরোপে চায়ের বাজার মন্দা যাইতেছে, তাই সেখানকার মন্দা এতদ্দেশে উশুল করিবার জন্য টী অ্যাসোসিয়েশন জনসাধারণের মুখে চা-এর বিষপাত্র তুলিয়া ধরিতে মরিয়া হইয়া লাগিয়াছেন। ৫/৬ কোটি ভুখা, দারিদ্র্য ও উপবাস তাহাদের নিত্যসঙ্গী, পেট ভরিয়া আহার কাহাকে বলে জানে না, কিন্তু তাহাতে কি যায় আসে? অর্থলোলুপ স্বার্থান্বেষী ধনিক ও বণিক সমাজ স্বীয় কার্যসাধনে কোন হীন উপায় বা চাতুরীর আশ্রয় লইতে কুণ্ঠিত হয় না। মিথ্যা প্ররোচনায় মুগ্ধ করিয়া হতভাগ্যদিগকে ঊর্ণনাভের জালে জড়িত করিতেই ইহাদের উৎসাহের কমতি নাই। মুষ্টিমেয় নির্মম ধনিকের লালসা-বহ্নি, তাহাতে পতঙ্গের ন্যায় আত্মাহুতি দিতেছে সাধারণ জনগণ।’

তারপরও বাঙালির চা খাওয়া কমেনি। কলকাতা ও ঢাকায় দু’জায়গাতেই সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে চায়ের চাহিদা। ঢাকায় চায়ের ব্যাপক প্রচলন হয় বিংশ শতকের তিরিশের দশকে। পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকার রাসত্মায় তখন অনেকগুলো চায়ের স্টল তৈরি করা হয়েছিল খুরশিদ আলী নামের এক সম্ভ্রানত্ম ব্যবসায়ীর তত্ত্বাবধানে। এই সমসত্ম দোকানে কেবল বিকেলে ২-৩ ঘণ্টার জন্য চা তৈরি করা হতো আর বিনামূল্যে বিতরণ করা হতো। অনেকেই বিকেলে তাদের বাচ্চাদের নিয়ে চাওয়ালাদের কাছে পাত্র নিয়ে যেত। সে সময়ে ঢাকার জনসংখ্যা বেশি ছিল না, আর সব পরিবার বিনামূল্যে সরবরাহ করা চা খেতে পছন্দও করত না। তাই চা সংগ্রহ করতে আসা মানুষের সংখ্যাও খুব বেশি হতো না। আবার যারা বিনামূল্যের চায়ের নিয়মিত ভোক্তা ছিল, তাদের বিনামূল্যে চা-পাতা দেয়া হতো; যাতে করে পরদিন সকালে তারা ঘরে বসেই তৈরি করে নিতে পারে এই চা। ঢাকায় এই কার্যক্রম এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলেছিল। ঢাকাবাসীর পছন্দ ছিল দুধ আর চিনি দেয়া চা। ব্রিটিশ চা ব্যবসায়ীদের ধারণা সঠিক প্রমাণ করে দুধ আর ঘোলে অভ্যসত্ম ঢাকাবাসী চায়ে আসক্ত হলো। পুরান ঢাকার বয়স্করা অবশ্য দাবি করেন চায়ে খানিকটা আফিম মেশানোরও চল ছিল! যা হোক, চায়ে আসক্ত ঢাকাবাসী বিপদে পড়ে যখন এই বিনামূল্যে চা সরবরাহ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। তখন মহল্লার বড় বড় মুদি দোকান ব্রুক বন্ড (তখনকার একমাত্র ব্র্যান্ড) চা বিক্রি করতে থাকে।

নগর আড্ডা এবং চা

একঘেয়ে জীবনের চলমান ধারায় আড্ডা খুবই জরুরি। কী পুরুষ, কী নারী সবার মাঝেই আড্ডা মনের ভেতর প্রশানিত্মময় এক আবেগের সৃষ্টি করে। সৃজনশীল আড্ডা মানুষের মনকে সতেজ করে। আর যদি সেই আড্ডায় থাকে চায়ের আয়োজন তাহলে তো কথাই নেই। নির্ঘাত জমে যাবে আড্ডা।

Tea-7নগরজীবনে আড্ডার রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন রঙ ও রূপ। অফিসে কাজের ফাঁকে সহকর্মীর সঙ্গে লাঞ্চ ব্রেক কিংবা টি  ব্রেকে গল্পের আড্ডা জমে ওঠে মধুর মগ্নতায়। আড্ডাটা মূলত একটা শিল্পের রূপ পায় কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সংস্কৃতি কর্মী, রাজনীতিক, খেলোয়াড়, কলেজ-ইউনিভার্সিটির বন্ধুদের মধ্যে। নাওয়া-খাওয়া ভুলে চলে তুমুল ম্যারাথন আড্ডা। তবে এক্ষেত্রে প্রবল আড্ডাবাজ বলে প্রধানত এগিয়ে আছেন লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক, সংস্কৃতি কর্মীরাই। লেখক-শিল্পীর এই আড্ডার প্রচলন সেই মধ্যযুগ থেকে। তবে সে সময়ের আড্ডা আর আধুনিক যুগের আড্ডার মধ্যে রয়েছে অনেক পার্থক্য। লেখক, শিল্পী সংস্কৃতি কর্মীদের আড্ডার কোন টাইম ফ্রেম নেই। একবার আড্ডা জমে উঠলে সেই আড্ডার কখন পর্দা নামবে তা যেন নিজেরাও বেমালুম ভুলে যান। আবার কর্মজীবী মানুষের আড্ডাটা শুধু সন্ধ্যার জন্যই থাকে তোলা। কখনওবা তারা ছুটির দিনে অবসরে আড্ডায় মেতে ওঠেন। নগরীর শাহবাগ, ছবির হাট, হাকিম চত্বর, টিএসসি কিংবা মগবাজার মিডিয়া গলিতেও চলে শিল্প সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের জম্পেশ আড্ডা। আর সেই আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে চলে চায়ের কাপে ঝড় তোলা তক্কাতক্কি।

একসময় কবি সাহিত্যিকদের এক আড্ডাস্থল ছিল পুরান ঢাকার বিউটি বোর্ডিং। বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা ঘরোয়া রেসত্মরাঁয় এক সময় ঢাকার প্রখ্যাত কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীরা রোজ দু-বেলা কিংবা কখনও দিনরাত চুটিয়ে আড্ডা দিতেন। সেই আড্ডা আজ কেবলই স্মৃতি। বিউটি বোর্ডিং থাকলেও সেই চিরায়ত আড্ডার রূপ যেন বিলীন। পরবর্তীতে লেখকদের আড্ডা বোর্ড মার্কেটের মনিকা রেসেত্মারাঁয় ওঠে আসে। মনিকা থেকে শাহবাগের রেখায়ন এবং আজিজ সুপার মার্কেটে চলে আড্ডা আর চায়ের কাপে প্রশানিত্মর চুমুক। সর্বত্রই আড্ডার প্রধান অনুষঙ্গ ছিল চা আর চায়ের সঙ্গে সিগারেট। আড্ডা মানেই চা-এর উপস্থিতি। চা ছাড়া আড্ডা কল্পনাই করা যায় না।

ঢাকার আরেকটা আড্ডাস্থল ছিল পুরানা পল্টনের সন্ধানী প্রেস। প্রবীণ-নবীন লেখক-শিল্পীবৃন্দ ষাটের দশক থেকে সন্ধানী প্রেসের অফিসে আড্ডায় একবার এলেই সবকিছু যেন ভুলে যেতেন। বিরামহীন আড্ডায় শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির গতি প্রকৃতিই আলোচনা হত বেশি। থাকত রাজনীতির আলোচনাও।

ঢাকার পাশাপাশি জেলা শহরগুলোতেও ছিল এমন অনেক আড্ডা চলত রেসত্মরাঁ কিংবা চা স্টলে। যেখানে এখন আর আগের মতো লেখকরা সমবেত হয়ে আড্ডায় মেতে ওঠেন না। এমনই এক প্রখ্যাত রেস্টুরেন্ট হলো নারায়ণগঞ্জের শতবর্ষী বোস কেবিন। আরো আছে রাজশাহীর সাহেববাজারের রাজশাহী কেন্টিন, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট বাজারের ইংরেজ দা’র চা স্টলেও সকাল-বিকেল, সন্ধ্যায় জমত স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীদের প্রাণবনত্ম আড্ডা।

Tea-8এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাকিম চত্বর চা আড্ডার মধ্য দিয়েই হয়ে উঠেছে বিখ্যাত। আড্ডা চলে মধুর ক্যান্টিনে এবং টিএসসির মাঠেও। এমনি অনেক আড্ডা হতো এক সময় ঢাকা। মাঝে মধ্যে আড্ডা হতো গুলিসত্মানের উল্টোদিকে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের অধুনা বিলুপ্ত বিখ্যাত ঢাকা রেসেত্মারাঁয়। যেখানে সাহেবী কায়দায় চা কফি পরিবেশন করা হতো। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে ঐতিহ্যবাহী পিঠাঘরের আড্ডা ছিল সংস্কৃতি কর্মীদের কর্মের প্রেরণা। আজ যারা শিক্ষা সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র ও সাহিত্য অঙ্গনের বড় তারকা তাদের সবার প্রেরণার আড্ডাস্থল ছিল বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের পিঠাঘর। এখন আড্ডা চলে শাহবাগের আজিজ মার্কেটে। নবীন-প্রবীণ সব বয়সী লেখক, শিল্পী, সংস্কৃতি কর্মীদের এক মিলনস্থল হলো আজিজ মার্কেট। নানা ব্যসত্মতার ফাঁকে সুযোগ পেলেই অনেকে ছুটে যান লেখক-শিল্পী বন্ধুটির সঙ্গে দেখা করে এককাপ চা-সিগারেট পানের ফাঁকে একটু আড্ডা দিয়ে মনকে সতেজ করে বাড়ি ফিরে যাওয়া। এছাড়া পাড়া-মহল্লায় নানা পেশার নানা বয়সী মানুষের আড্ডাতো আছেই। আছে গ্রামে-গঞ্জে দিন শেষে বিকেল সন্ধ্যায় অবসরে চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে বসে আড্ডায় চায়ের কাপে নানান বিষয়ে আলোচনার তুফান তোলা। রাজনীতিসহ নানা বিষয়ে তর্কে জড়িয়ে পড়ে আড্ডা শেষে ঘরে ফেরার তাগিদ। আছে খেয়াঘাটের আড্ডাও। শহর ছাড়িয়ে দূর গ্রামের নিঝুম রেলস্টেশনে বন্ধুদের নির্জন আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে আপ আর ডাউন ট্রেনের আসা-যাওয়া। শহরের বড় দালানের ছাদে বসে বৈকালিক আড্ডার চিরায়ত দৃশ্যের ভিতরেও ফুটে ওঠে বন্ধু কিংবা কাছের মানুষের সান্নিধ্যে কিছু সময় কাটানোর চমৎকার মুহূর্তগুলো। কখনো বা দলবেঁধে নদী তীরে বসে আড্ডা দেয়ার মায়াবী দৃশ্যের ভেতর বেজে ওঠা জাহাজের ভেঁপু ওই আড্ডায় যেন নতুন প্রাণের স্পন্দন জাগিয়ে দেয়। রিফ্রেশমেন্টের এক প্রধানতম অনুসঙ্গ হলো প্রিয় মানুষদের সঙ্গে কিছু সময় গল্পের আসর জমানো। আর সেখানে চা এবং চা-এর উপস্থিতিই হয়ে ওঠে মুখ্য। চা ছাড়া আড্ডা… ইমপসিবল…।

চা এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি

বাংলাদেশে চা-খোর মানুষের সংখ্যা প্রতি বছর বাড়ছে ৬ শতাংশ হারে। সেই হারে বাড়ছে না চায়ের উৎপাদন। দেশে বর্তমানে চায়ের বাগানের সংখ্যা ১৬৬টি। যার মধ্যে মৌলভীবাজার জেলায় রয়েছে ৯২টি, সিলেটে ২১টি, হবিগঞ্জে ২৫টি, চট্টগ্রামে ২২টি, একটি করে রাঙামাটি ও ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ায়। ১৯৯৮ সালে পঞ্চগড়ে কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেট প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে পঞ্চগড়ে আরও ৪টি সমতলের চা বাগান গড়ে ওঠে। হিমালয়ের পাদদেশে আর ভারতের দার্জিলিং জেলার লাগোয়া এই জেলায় বাংলাদেশের একমাত্র অর্গানিক চায়ের আবাদ করা হয়। গাছের পোকা নিধনের জন্য নিমপাতার রস, আর শেড ট্রি হিসেবে ঔষধি জাতীয় বৃক্ষ লাগানো হয়েছে এই জেলার চা বাগানে। যেখানে অন্যান্য চা বাগানে শেড ট্রি হিসেবে ইপিল ইপিল আর পোকা নিধনের জন্য রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহৃত হয়। আয়তনের দিক থেকে এশিয়ার সবচেয়ে বড় চা বাগান এখন ফেনুয়া বা কর্ণফুলী চা বাগান। এই বাগানটির আয়তন প্রায় ৬ হাজার ৫৭২ একর। আর দেশে মোট ২ লাখ ৪৯ হাজার ১১৪ একর জমিতে চলছে চায়ের চাষাবাদ।  ২০১২-১৩ অর্থবছরে চায়ের উৎপাদন ছিল প্রায় ৬ কোটি কেজি, আর চাহিদা ছিল ৬.৫ কোটি কেজির। ফলে বাংলাদেশের চা আর সেভাবে দেশের বাইরে যেতে পারছে না। বরং ভারত ও অন্যান্য দেশ থেকে চা আমদানি করা হচ্ছে। বাংলাদেশের চা এখন খুব অল্প পরিমাণে পাকিসত্মান, কাজাকিসত্মান ও উজবেকিসত্মানে রপ্তানি হচ্ছে। অবশ্য পঞ্চগড়ের অর্গানিক চায়ের চাহিদা বাড়ছে ইউরোপ আর আমেরিকায়।

Tea-9চা রপ্তানি হ্রাসের কারণ হিসেবে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে দায়ী করা হচ্ছে। এ ছাড়া দেশে চায়ের উৎপাদন কমে যাওয়া, দেশীয় বাজারে চায়ের চাহিদা বেড়ে যাওয়া, চা বাগানের গাছের বয়স বৃদ্ধি পাওয়া, চায়ের জন্য জমি ইজারা নিয়ে অন্য কাজে ব্যবহার করা, পুরনো জাতের বীজের ব্যবহার অব্যাহত থাকা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার না করা, চা বাগানে কর্মরতদের জীবনমানের উন্নতি না হওয়াসহ নানা কারণে দেশে চায়ের উৎপাদন বাড়ছে না। এদেশে চা চাষের আওতা বৃদ্ধির সুযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি সুযোগ রয়েছে একরপ্রতি উৎপাদন বাড়ানোর। চা শিল্পের বিকাশ ও সম্প্রসারণ আমাদের দেশের অর্থনীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম। তাই বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা অপসারণ ও চা বাগান সম্প্রসারণ ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। বাগানগুলোতে খরা মৌসুমে জলসেচের ব্যবস্থা করতে হবে। শ্রমিকদের উপযুক্ত মজুরি নিশ্চিত করা এবং তাদের সনত্মানদের জন্য শিক্ষার সুযোগ দেয়া দরকার। শ্রমিকদের যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা ও পাশাপাশি বিনোদনের ব্যবস্থা প্রয়োজন। রাসত্মা-ঘাটসহ প্রয়োজনীয় সকল অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। এজন্য শিল্প ব্যাংক বা অন্য যে কোনো ব্যাংক বা সংস্থা থেকে সহজ ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সম্ভাবনাময় চা শিল্পের সর্বোচ্চ বিকাশের জন্য রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানো দরকার। চা শিল্পের সঠিক উন্নয়ন হলে দেশের অভ্যনত্মরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি রপ্তানি আয়ও যথেষ্ট বাড়বে। একই সাথে বহু দক্ষ ও অদক্ষ লোকের কর্মসংস্থান হবে। চা শিল্পের সম্ভাবনার সঠিক ব্যবহার দেশের কাঙ্খিত অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে বহুলাংশে এগিয়ে নেবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

চায়ের চুমুকে ভালোবাসা

Tea-10‘এক কাপ চায়ে আমি তোমাকে চাই/ ডাইনে ও বাঁয়ে আমি তোমাকে চাই/ দেখা না দেখায় আমি তোমাকে চাই/ না-বলা কথায় আমি তোমাকে চাই…’ কবির সুমনের গাওয়া জনপ্রিয় এই গানটির সঙ্গে চায়ের প্রতি ভালোবাসার চিত্র ফুটে উঠে। একবার চিনত্মা করুনতো প্রেমিক যুগল বসে আছে আলোআধারি পরিবেশে। নেপথ্যে বাজছে রোমান্টিক এই গানটি। চায়ের চুমুকে ক্ষণে ক্ষণে চলছে ভালোবাসার আলাপচারিতা। ঘন্টার পর ঘন্টা পার হয়ে যাচ্ছে তবুও বাড়ি যাওয়ার নাম নেই তাদের। যেনো কোনো তাড়াও নেই। কাপের পর কাপ চাও শেষ হচ্ছে। ভালোবাসার ক্ষণটি যেনো হচ্ছে আরো মধুময়। কী অবাক বিষয় তাই না? চা আর ভালোবাসার কোথায় যেনো একটা বন্ধন রয়েছে। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের ভালোবাসায় ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এই চা। গল্প-উপন্যাস-চলচ্চিত্র কিংবা নাটকেও রয়েছে এই চায়ের প্রভাব। শাহবাগ, টিএসসি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন, ছবিরহাট, রবীন্দ্রসরবর কিংবা রমনার বটমূলে কপোত কপোতীর প্রেমের সঙ্গে এক কাপ চায়ের অনেক স্মৃতিই থেকে যায়। আবার এমন অনেক প্রেমিক রয়েছেন প্রিয়তমাকে মনের কথা বলতে বার বার হোঁচট খেয়েছেন। মনের কথা বলতে গিয়ে গলা শুকিয়ে কাঠ। মনের কথা খুলে বলতেও শত দ্বিধা। হয়তো এটা ভলোবাসার জন্যই হয় কিন্তু এটা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করে এবং একটা সময় পর ভালবাসায় একটা খারাপ প্রভাব ফেলে। তাই চটপট একটা ফোন দিয়ে প্রিয়তমাকে জিজ্ঞেস করে নিন, আপনার সঙ্গে বিকেলে  চা কিংবা কফি খেতে যেতে কোনো আপত্তি আছে কিনা? পরপর কয়েকদিন আপত্তি থাকলেও একদিন ঠিকই রাজি হবে। এবার চা অথবা কফির সঙ্গে চলতে থাকুক আপনাদের ভালোবাসার আড্ডা। আর এই ফাঁকে তার কাছে জেনে নিন আরও কিছু পছন্দ অপছন্দ। যা ভবিষ্যতে আপনার কাজে লাগতে পারে। একদিন দেখবেন ভালোবাসার সঙ্গে চায়ের চুমুকও জড়িয়ে গেছে স্মৃতির পাতায়।

প্রেমিক-প্রেমিকার ঝগড়া-খুনসুটি আর মান-অভিমানেও চায়ের এক অদ্ভুদ ভালোবাসার হাতছানি রয়েছে। দেখা গেছে, প্রচণ্ড ঝগড়া হওয়ার পর পার্কে কিংবা রাসত্মার ধারে চায়ের দোকানে দু’জনই দুই দিকে ফিরে বসে আছে। খানিকবাদে চা অর্ডার করলো ছেলেটি। বাধ্য হয়েই ছেলেটি মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করল- ‘কী চা খাবে, রং চা নাকি দুধ চা?’ মেয়েটি অবশ্যই একটা না একটা উত্তর দিবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই কাপ ভর্তি চা এলো। এক কথায় দু’কথায় বাড়তে থাকলো তাদের আলাপচারিতা। মুহূর্তেই তারা দু’জন ভুলে গেলো কিছুক্ষণ আগের দু’জনের মান-অভিমানের কথা। এমনিভাবেই চা ভালোবাসার ব্যাকরণে অদৃশ্য এক উপাদান। শিল্পকলায় নাটক দেখার পর চায়ের চুমুকে ভালোবাসার বিনিময়টাও বোধকরি হয়েছে অনেক প্রেমিক জুটির মধ্যে।

এমনিভাবেই বাঙালির চা-এর প্রতি একটা আলাদা ভালোবাসা জন্মে গেছে বহুবছর ধরে। আর এই ভালোবাসার সাথে আরও বেশকিছু সংস্কৃতির চর্চাও চলে এসেছে। চায়ের টেবিলে আড্ডা-ভালোবাসা এরকমই একধরণের সংস্কৃতি। আড্ডা যেকোন জায়গায়ই হতে পারে। কিন্তু হাতের কাছে এক কাপ ধোঁয়া তোলা চা থাকলে আড্ডাটা যেন জমে বেশি।