Home শীর্ষ কাহিনি প্রচ্ছদ মুখ ১৭ বছরে আনন্দ আলো : চলো এগিয়ে যাই

১৭ বছরে আনন্দ আলো : চলো এগিয়ে যাই

SHARE

রেজানুর রহমান
১৬ বছর চলে গেল। যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না। একটা, দুইটা বছর নয়, এক নাগাড়ে ষোল বছর পার করলো আনন্দ আলো। ইমপ্রেস এর দেশ সেরা বিনোদন পাক্ষিক ষোল বছর পার করে ১৭ তে পা দিয়েছে। হই চই, আনন্দ কোথায়? আনন্দ আলোর জন্মদিন মানেই ‘এক ব্যাগ আনন্দ এক ব্যাগ আলো’র বর্নাঢ্য সংখ্যা পৌঁছে যাবার কথা পাঠকের কাছে। কোথায় সে আয়োজন?
উত্তরটা অবশ্য সবার জানা। কোভিড-১৯ এর কারণে পৃথিবী জুড়ে সকল আনন্দই যেন ফিকে হয়ে গেছে। অদৃশ্য এক ভাইরাস কাবু করে ফেলেছে গোটা পৃথিবীকে। করোনার আতংকে গত বছরও আনন্দ আলোর বর্নাঢ্য জন্মদিন সংখ্যা প্রকাশ হয়নি। একই কারনে এবারও নির্ধারিত দিনে আনন্দ আলোর জন্মদিন সংখ্যা প্রকাশ হয়নি। তবে প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু দেশে করোনা সংক্রমন বেড়ে যাওয়ায় সরকার লক ডাউন ঘোষনা করে। সঙ্গত কারনেই ১৪ এপ্রিল অর্থাৎ পহেলা বৈশাখ আনন্দ আলোর জন্মদিন সংখ্যার প্রকাশনা পিছিয়ে যায়।
পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। আজ থেকে ষোল বছর আগে রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে হাজার-হাজার মানুষের উপস্থিতিতে আনন্দ আলোর উদ্বোধনী সংখ্যা বিপুল আনন্দ-উচ্ছ্বাসের সাথে উচিয়ে ধরেছিলেন দেশবরেন্য শিশুসাহিত্যিক, চ্যানেল আই’এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর। প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে সেদিন তার পাশে দাঁড়ানোর সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। সামনে হাজার-হাজার দর্শক, আর টেলিভিশনের পর্দায় সারাবিশ্বের কোটি কোটি দর্শক সেদিন আনন্দ আলোকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। আমরা অঙ্গীকার করেছিলাম, আনন্দ আলো হবে বাংলাদেশের অগ্রসরমান প্রতিটি পরিবারের একজন সদস্য। আনন্দ আলো পরিবার ও বন্ধুর কথা বলবে। সেজন্যই আনন্দ আলোর শ্লোগান নির্ধারণ করা হয় ‘বিনোদনে বন্ধু আমার’। এই শ্লোগানটি পাঠকের বেশ পছন্দ। তার একটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরছি আপনাদের সামনে।

আনন্দ আলোর ৫ম জন্মদিন। দিনব্যপি আনন্দ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল আনন্দ আলোর ইস্কাটন অফিসে। মুড়ি মুড়কি, বাতাসা, হরেক রকমের মিষ্টি আর তরমুজ দিয়ে সাজানো আপ্যায়ন টেবিল। তারকারা আসছেন, আপ্যায়ন টেবিলে ভীড় করছেন। আড্ডা দিচ্ছেন। নারায়নগঞ্জ থেকে এসেছে পাঁচজন তরুণ। সাথে পাঁচ হাড়ি মিষ্টি আর জন্মদিনের একটি কেক। সবার মাথায় আনন্দ আলো’র লোগো সম্বলিত ক্যাপ। হাতে একটা লাঠিতে পেচানো কিছু কাগজ। কেকটি কাটা হল! কেকের সাথে মিষ্টিও বিতরণ করা হল। এবার কাগজে কী আছে তা দেখার পালা। তরুণদেরই একজন গোল করা কাগজের লাঠিটি দুই হাত দিয়ে ধরলো। আরেকজন কাগজের মাথা ধরে টান দিল। লাঠিটি সমান তালে ঘুরছে আর গোলকরা কাগজ লম্বা দড়ির মতো বের হয়ে আসছে। এক সময় দেখা গেল কাগজের দৈর্ঘ্য প্রায় ১০০ কিলোমিটার। পুরো কাগজ জুড়ে একটাই কথা লেখা রয়েছেÑ আনন্দ আলো, বিনোদনে বন্ধু আমার। ওই তরুণদের জিজ্ঞেস করেছিলাম-এই যে তোমরা এত বড় আয়োজন করেছ, মিষ্টি আর কেক নিয়ে আনন্দ আলোর অফিসে এসেছ, অনেক টাকা খরচ হয়েছে। নিশ্চয়ই চাকরি বাকরি করো না। ম্যানেজ করলে কিভাবে? পাঁচজনই সমস্বরে বলেছিল, আনন্দ আলো আমাদের অনেক প্রিয় পত্রিকা। নতুন সংখ্যার জন্য আমরা গভীর আগ্রহে অপেক্ষা করি। নতুন সংখ্যা হাতে পাওয়ার পর পাঁচ বন্ধুর নামে লটারী করা হয়। যার নাম আগে ওঠে সেই প্রথম বাসায় নিয়ে যায় পড়ার জন্য।

আমি একটু আবেগী মানুষ। সেদিন ওই পাঁচ তরুণের কথায় আনন্দে চোখে পানি এসে গিয়েছিল।আরেক জন্মদিনের কথা বলি। সম্ভবত ৭ম জন্মদিন। সকাল হতে না হতেই আনন্দ আলোর দফতরে একজন বয়স্ক লোক এসে হাজির। হাতে একগুচ্ছ গোলাপ। সম্পাদকের হাতে দিতে চায়। ওইবার জন্মদিনের অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা ছিল সকাল ১০টা থেকে। কিন্তু লোকটি এসেছিলেন সকাল ৮টায়। ব্যস্ততার কারণে অফিস পিয়নরা তাকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। দশটার আগেই অফিসে পৌছে যাই। প্রবেশ মুখে লোকটির সাথে দেখা। এক গুচ্ছ গোলাপ উপহার দিয়ে বললেন, শুভ জন্মদিন! আমি অভিভূত। তাকে স্বসম্মানে আমার অফিস কক্ষে এনে বসালাম। মিষ্টি খেতে দেয়া হল। ভেবেছিলাম ভদ্রলোক মিষ্টি খেয়ে চলে যাবেন। কিন্তু তিনি গেলেন না। সারাদিন আমাদের সঙ্গে কাটালেন। অতিথিদের আপ্যায়ন করলেন। যেন আনন্দ আলো পরিবারেই একজন। বিকেলে যাবার সময় বললেন, আমি নিয়মিত আনন্দ আলো পড়ি। শুধু আমি নই আমার পরিবারের সকলেই আনন্দ আলো পড়ে। আনন্দ আরোর নতুন সংখ্যা বাসায় আসা মাত্রই কে আগে হাতে নিবে এই নিয়ে রীতিমত ‘কাড়াকাড়ি’ শুরু হয়ে যায়। আনন্দ আলো এ বাড়ি ও বাড়ি বেড়াতেও যায়…ভদ্রলোককে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম-আনন্দ আলো বেড়াতে যায় মানে? আনন্দ আলোর কি হাত পা আছে?

ভদ্রলোক হাসতে হাসতে বললেন- আনন্দ আলোর নতুন সংখ্যা বাসায় এলেই আমার পরিবারের প্রতিটি সদস্য পড়ার জন্য যেমন অস্থির হয়ে ওঠে তেমনই পাশের বাড়ি থেকেও পত্রিকাটিকে পাঠানোর আবদার আসে। এভাবেই এ বাড়ি ও বাড়ি বেড়াতে যায় আনন্দ আলো।সম্ভবত আনন্দ আলোর নবম জন্মদিনে খুলনা থেকে এক তরুণ এসে হাজির। সে নিয়মিত আনন্দ আলো পড়ে ও আনন্দ আলো সংগ্রহ করে রাখে। কোনো কারণে দুটি নিয়মিত সংখ্যা সে সংগ্রহে রাখতে পারে নাই। ফোনে আনন্দ আলোর সার্কুলেশন বিভাগে যোগাযোগ করেছে। কিন্তু কাজ হয়নি। তাই বাধ্য হয়ে নিজেই এসেছে। সার্কুলেশন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ডাকা হল। তিনি স্বীকার করলেন ওই তরুণ একবার ফোন করেছিলেন। তার জন্য পত্রিকাও রাখা হয়েছে। কিন্তু ঠিকানার অভাবে পত্রিকা দুটি তার নামে পাঠানো যায়নি। পত্রিকা দুটি তরুণের হাতে তুলে দেয়া হল। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম তরুণের চোখে আনন্দ্রাশ্রু। চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল, আপনাদেরকে অনেক ধন্যবাদ। জয়তু আনন্দ আলো…

তখনও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এতটা জনপ্রিয় ও গুরুত্বপুর্ণ হয়ে ওঠেনি। ডাক বিভাগের চিঠিই ছিল পত্র যোগাযোগের জরুরি মাধ্যম। আনন্দ আলোর দফতরে প্রতিদিন অসংখ্য চিঠি আসত। অধিকাংশ চিঠিতে আনন্দ আলো নিয়ে ভালো লাগার কথা থাকতো। আবার কেউ কেউ পরামর্শও পাঠাতেন। পাঠকের প্রতিটি চিঠিই আমি পড়তাম। একদিন একটি চিঠি আমাকে অবাক করলো। একজন মহিলা চিঠিখানা লিখেছেন। আনন্দ আলোয় ‘ পানসুপারি’ নামে একটি বিভাগ আছে। বেশ জনপ্রিয়। বিশ্বের অবাক করা ঘটনার ছবি সহ তথ্য প্রকাশ করা হয় এই বিভাগে। কোনো একটি সংখ্যায় ‘ দু মুখো’ সাপের ছবি ছাপা হয়েছিল। এই ছবির ব্যাপারেই আপত্তি জানিয়েছেন ওই ভদ্রমহিলা। তিনি চিঠিতে লিখেছিলেন, আনন্দ আলো আমাদের পরিবারের অনেক প্রিয় একটি পত্রিকা। আমার স্কুল পড়ুয়া ছোট্ট মেয়েটিও আনন্দ আলোর ভক্ত। পত্রিকা হাতে এলে সেই আগে পত্রিকাটি পড়ে। পানসুপারি তার প্রিয় বিভাগ। কিন্তু পানসুপারিতে দুমুখো সাপের ছবি দেখে সে দারুণ ভয় পেয়েছে। তার জ্বর হয়েছিল। আনন্দ আলোয় ছবি ছাপানোর ক্ষেত্রে সম্পাদকের আরও সতর্ক থাকা উচিৎ। সত্যি বলতে কী ওই একটি চিঠিই সম্পাদক হিসেবে আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। তখন থেকে আনন্দ আলোয় শুধু ছবি ছাপানো নয় শব্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রেও আমরা সতর্ক হয়ে উঠি।
নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের কথা খুউব মনে পড়ছে। আনন্দ আলোর সূচনা সংখ্যা অর্থাৎ জন্মদিন সংখ্যা তার হাতে তুলে দেয়ার জন্য ধানমন্ডির বাসায় গেলাম। তিনি বাসায় নেই। ঢাকা ক্লাবে একটা অনুষ্ঠানে গেছেন। ফোন করতেই বললেন, ঢাকা ক্লাবে চলে আসো। আমরা ছুটে গেলাম ঢাকা ক্লাবে। পত্রিকা তার হাতে তুলে দিলাম। তাৎক্ষনিকভাবে কোনো মন্তব্য করলেন না। আমার মন একটু খারাপ। ভালো অথবা মন্দ কিছু একটা তো বলতে পারতেন হুমায়ূন আহমেদ। তার মানে পত্রিকা কি তার পছন্দ হয়নি? কয়েকদিন পর তার ফোন পেলাম। বললেন, একদিন বাসায় আসো। পরের দিনই তার বাসায় গেলাম। তার বাসার সদর দরজা সাধারনত খোলাই থাকে। কাজের ছেলেটি বসতে বলে বাসার ভিতরে চলে গেল। আমি একা সোফায় বসে আছি। এর মধ্যে কাজের ছেলেটি দু’বার আমার সামনে দিয়ে হেঁটে এ ঘর থেকে ও ঘরে গেছে। হুমায়ূন আহমেদের উপস্থিতি টের পাচ্ছি না। চলে আসব ভাবছি। হঠাৎ হুমায়ূন আহমেদ ড্রয়িংরুমে ঢুকলেন। সোফায় বসে জিজ্ঞেস করলেনÑ
কেমন আছো?
জ্বি স্যার ভালো…
তোমাকে চা দিয়েছে?
জ্বি স্যার দিয়েছে। (মিথ্যা বললাম। আসলে আমাকে চা দেয়া হয়নি। কিন্তু একথা জানতে পারলে যদি হুমায়ূন আহমেদ হইচই শুরু করে দেন তাই মিথ্যা বললাম)
তোমার লেখালেখি কেমন চলছে?
জ্বি স্যার ভালো…
পড় তো নিয়মিত?
জ্বি স্যার পড়ি।
শেষ কার লেখা পড়েছ?
সত্যি কথা বলতে কী আমি এ ধরনের প্রশ্নের জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। তাছাড়া গত এক মাসে সেই অর্থে কারও লেখা পড়ার সুযোগ আমার হয়নি। আনন্দ আলোর উদ্বোধনী সংখ্যা প্রকাশ নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম।
সে কথাই বললাম। ‘স্যার গত এক মাসে নতুন কোনো বই পড়া হয়নি। আনন্দ আলোর উদ্বোধনী সংখ্যার জন্য ব্যস্ত ছিলাম’…
হুমায়ূন আহমেদ বোধকরি আনন্দ আলোর কথাই ভাবছিলেন। প্রসঙ্গ তুলতেই বললেন, তোমাদের আনন্দ আলো পড়লাম। এক কথায় দুর্দান্ত। এমন একটা পত্রিকা এই মুহূর্তে দরকার ছিল। কিন্তু এতদামী পত্রিকা কি তোমরা কনটিনিউ করতে পারবে? অবশ্য সাগর (ফরিদুর রেজা সাগর) জড়িত আছে বলে সাহস পাচ্ছি। সাগর যেখানেই হাত দেয় সেখানেই সোনা ফলে। তাকে আমার শুভেচ্ছা দিও…
বলেই সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তার মানে আমাকে এখন বিদায় নিতে হবে। আমিও যাবার জন্য উঠে দাঁড়ালাম। দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন হুমায়ূন আহমেদ। শেষে বললেন, পত্রিকা করতে গিয়ে নিজের লেখালেখির কথা ভুলে যেও না। তোমার লেখার হাত বেশ ভালো…
হুমায়ূন আহমেদের শেষ কথাটা আমি রাখতে পারিনি। নিজের লেখালেখির প্রতি চরম অবহেলা হয়েছে। কিন্তু আনন্দ আলোর ব্যাপারে আমি অত্যন্ত সৎ থাকার চেষ্টা অদ্যাবধি অব্যাহত রেখেছি।
বিশিষ্ট সঙ্গীত তারকা আইয়ুব বাচ্চুর কথা খুব মনে পড়ছে। আনন্দ আলোয় শুরুর দিকে কৌতুক কার্টুন ছাপা হতো। একটি সংখ্যায় ব্যান্ড গুরু জেমস ও আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে একটি কাটুর্ন ছাপা হয়। কার্টুনের পাশে লেখা ছিল ‘বাচ্চু বলেন জেমস ভাই চলেন বসে ‘হাচ্চু’ খাই। এই কার্টুন নিয়ে সঙ্গীতাঙ্গনে বেশ হইচই পড়ে গেল। একদিন আইয়ুব বাচ্চু ফোন করলেন- ভাই এইটা একটা কাজ করলেন? কার্টুনটা এইভাবে না ছাপালে চলত না? আনন্দ আলোর কাছ থেকে আমি এটা আশা করিনি। সাগর ভাইয়ের কাছে আমি কমপ্লেইন করবো।
বিনীত ভাবে বললাম, আপনার যদি মনে হয়ে থাকে যে আনন্দ আলো কাজটা ভালো করেনি তাহলে আপনি কমপ্লেইন করতেই পারেন। তবে আমরা কার্টুনটি ছেপেছি স্রেফ আনন্দ করার জন্য। তবুও আপনি যদি কষ্ট পেয়ে থাকেন তাহলে দুঃখ প্রকাশ করছি।
আনন্দের ব্যাপার হলো ব্যান্ড লিজেন্ড আইয়ুব বাচ্চুই আনন্দ আলোর অনেক বড় ফ্যান হয়ে উঠেছিলেন। এক সময় আনন্দ আলোর জন্মদিনের কেক কাটার নির্ধারিত অতিথি হয়ে উঠেছিলেন তিনি। চ্যানেল আই ও সুরের ধারার যৌথ উদ্যোগে আগারগাঁওয়ে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলা নববর্ষ পালন উপলক্ষে ‘হাজার কণ্ঠে বর্ষ বরণ অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা হয়।’ প্রতি বছর আইয়ুব বাচ্চু ওই অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে সঙ্গীত পরিবেশন করতেন। একই সাথে তিনি আনন্দ আলোর জন্মদিনের কেক কাটা পর্বটিরও অতিথি হয়ে ওঠেন।
একটি সুখ স্মৃতি উল্লেখ না করে পারছি না। কলকাতা থেকে ঢাকায় ফিরছি। কলকাতা এয়ারপোর্টে আইয়ুব বাচ্চুর সাথে দেখা হয়। কলকাতার একটি ব্যান্ড উৎসবে আসর মাতিয়ে দলের সদস্যদের নিয়ে ঢাকায় ফিরছিলেন। আমাকে দেখে এতটাই উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিলেন যে এয়ারপোর্টে বিদায় জানাতে আসা কলকাতার বন্ধুদের যাকেই কাছে পাচ্ছেন তাকেই আমার পরিচয় দিচ্ছেন। ‘ইনি হলেন আমাদের রেজানুর ভাই’। আমাদের দেশের নামকরা সাংবাদিক। একটি বড় পত্রিকার সম্পাদক। পত্রিকার নাম আনন্দ আলো। আমার অনেক প্রিয় পত্রিকা…

আনন্দ আলোর আরেকজন শুভাকাঙ্খী, বন্ধুর কথা না বললেই নয়। তিনি বলেন বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক আমীরুল ইসলাম। ফরিদুর রেজা সাগর হলেন আনন্দ আলোর প্রাণ শক্তি। সকল প্রেরনার উৎস। দেশে-বিদেশে যেখানেই থাকেন না কেন আনন্দ আলোর প্রতি সংখ্যার শীর্ষ কাহিনী তাঁর পরামর্শেই নির্ধারণ করা হয়। মাঝে মাঝে কিছু দায়িত্ব পড়ে যায় আমীরুল ইসলামের প্রতিও। খেয়াল করেছি আমীরুল ইসলাম আনন্দ আলোর ব্যাপারে খুবই উদার। তার এই উদারতা আনন্দ আলো কর্মীদের জন্য অনেক আনন্দের।
দেশে একটি পারিবারিক বিনোদন পত্রিকার প্রচন্ড অভাব ছিল। পাশের দেশে বিনোদন পত্রিকার প্রতি আমরা এতটাই আকৃষ্ট হয়ে উঠেছিলাম যে নিজেরাও যে এটা পারি সেটা ভুলে গিয়েছিলাম। এগিয়ে এলেন বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক, চ্যানেল আই এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর। আনন্দ আলো বাজারে এলো। আমরাও পারি একথা প্রমাণ করলো ইমপ্রেস এর আনন্দ আলো। দেশের বিনোদন পত্রিকার জগতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন সূচিত হলো। প্রশংসায় ভাসছে আনন্দ আলো। তবে কেউ কেউ আনন্দ আলোর টিকে থাকা নিয়ে কিছুটা শংকা প্রকাশ করেছিলেন। এত দামী পত্রিকা কতদিন টিকে দেখো… এমন মন্তব্য করেছিলেন একজন প্রয়াত সম্পাদক। মহান সৃষ্টিকর্তার রহমতে আনন্দ আলো এখনও টিকে আছে। সম্ভাববনার ১৭ বছরে পা দিয়েছে। এজন্য অগনিত পাঠক, লেখক, বিজ্ঞাপন দাতা প্রতিষ্ঠান ও বন্ধুদের প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।
লেখাটি শেষ করতে চাই। তার আগে একটি জরুরি প্রসঙ্গ উল্লেখ করা প্রয়োজন। ১৭ বছরে পা দিল আনন্দ আলো। অর্থাৎ ১৬ বছর পার করেছে আনন্দ আলো। এই ১৬ বছরে আনন্দ আলোর অর্জন কী? আমরা মনে করি একটি বিনোদন পত্রিকা হিসেবে আনন্দ অলোর অর্জন অনেক। একথা হয়তো সকলেই স্বীকার করবেন বিনোদন পত্রিকার জগতে একটি পরিবর্তন এনে দিয়েছে আনন্দ আলো। একটা সময় ছিল যখন বিনোদন পত্রিকা মানে বোঝাত পিন মারা পত্রিকা। প্রচ্ছদে নারীর খোলামেলা শরীর থাকবে। বাড়িতে নিয়ে লুকিয়ে পড়ার বিষয়। আনন্দ আলো সেই ধারনা বদলে দিয়েছে। বিনোদন পত্রিকা মানেই নারীর খোলা মেলা শরীর তথাকথিত এই মানসিকতার বিপরীতে দাঁড়িয়েছে আনন্দ আলো। আর তাই এখন বাজারে পিন মারা পত্রিকা আর দেখা যায় না।
দেশের সাহিত্য ক্ষেত্রে একটি উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে আনন্দ আলো। একথা এখন সকলেই জানেন যে ফেব্রুয়ারির একুশে বইমেলায় শুধুমাত্র বইমেলাকে নিয়েই একমাত্র দৈনিক পত্রিকাটি প্রকাশ করে আনন্দ আলো। আনন্দ আলো বইমেলা প্রতিদিন নামে এই দৈনিকের আওতায় প্রতিবছর একাধিক সাহিত্য পুরস্কারের ব্যবস্থা থাকে। সিটি আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার তার মধ্যে অন্যতম। দেশের প্রায় শতাধিক নবীণ প্রবীণ কবি সাহিত্যিক ইতিমধ্যে এই সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন। পরবর্তিতে সিটি ব্যাংক আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার প্রবর্তণ করা হয়। বর্তমানে এই পত্রিকার আওতায় পাঞ্জেরী ছোটকাকু শিশুসাহিত্য পুরস্কার ও আনন্দ আলো গোলন্দাজ সাহিত্য পুরস্কার ক্রিয়াশীল রয়েছে। এছাড়াও আনন্দ আলো সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ভূমিকা পালনকারী বর্তমানে বিপদগ্রস্থ কয়েকজন শিল্পী ও তারক কে প্রতি মাসে আর্থিক সহায়তা প্রদান করে আসছে। চিত্র নায়িকা কবিতা ও রানী সরকার তাদের জীবদ্দশায় আনন্দ আলোর আর্থিক সহায়তা তালিকায় যুক্ত ছিলেন।
আমাদের সাংস্কৃতিক অর্জন ও বাস্তবতার ক্ষেত্রে একজন সংবাদকর্মী হিসেবে আমার বিশ্লেষণটা একটু অন্যরকম। অনেকের হয়তো ভালো নাও লাগতে পারে। তবুও বলি। দেশের বিনোদন জগৎ বর্তমানে একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। দেশের সিনেমা ধ্বংসের পথে। অনেক বিভাগীয় শহরেও এখন সিনেমা হল নাই। অথচ একটা সময় দেশের মানুষের আনন্দ বিনোদনের প্রধান উৎস ছিল সিনেমা। দল বেধে মানুষ সিনেমা হলে সিনেমা দেখতে যেত। এখন দল বেধে কোনো হোটেলে খেতে যায়। হয়তো দেখা যাবে কোনো সিনেমা হল ভেঙ্গে ফেলার পর খাবারের হোটেলটি সেখানেই নির্মাণ করা হয়েছে। সিনেমার এই দুর্দিনেও সংশ্লিষ্টদের কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। এফডিসি আছে। কিন্তু সেখানে শ্যুটিং হয় না। প্রযোজক, পরিচালক, অভিনেতা, অভিনেত্রী সকলেই আছেন। অথচ নতুন সিনেমা নির্মিত হচ্ছে না। তবে নির্বাচন এলে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট প্রতিটি সংগঠনের মাঝে নেতা হওয়ার দৌড় ঝাপ এতটাই প্রকট হয়ে ওঠে যে তখন মেন হয় এই বুঝি সিনেমার সুদিন এলো। নির্বাচন শেষ হয়। সুদিন আর আসে না।
চলচ্চিত্রের পরই আসে টিভি নাটক প্রসঙ্গ। দেশে অনেক গুলো টেলিভিশন চ্যানেল। প্রতিদিন অনেক নাটক প্রচার হয়। তবুও পাশের দেশের টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠানের প্রতিই দেশের এক শ্রেণীর দর্শকের ঝোক বেশি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর ভর করে নাটক প্রচারের কিছু স্বাধীন মাধ্যমের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। ফলে টিভি নাটকের শরীরেও অশ্লীলতার দুর্নাম রটে যাচ্ছে। অভিজ্ঞ মহলের ধারনা লাগামহীন অশ্লীলতা এক সময় দেশের চলচ্চিত্রকে নষ্ট করেছে। এবার টিভি নাটককেও নষ্ট করবে। বাকী থাকলো গান আর নাচ এবং মঞ্চ নাটক। দেশের গান শোনে কয়জন? আর নাচ? দেখে কয়জন? মঞ্চ নাটক ধুকে ধুকে নিজেকে সচল রাখার চেষ্টায় রত। এই ধরনের পরিস্থিতিতে একটি বিনোদন পত্রিকার দায়িত্ব কি হতে পারে?
এই প্রশ্নের সহজ উত্তর আছে কি কারও কাছে?
লেখাটি শেষ করি একটি অভিজ্ঞালদ্ধ গল্প দিয়ে। আনন্দ আলো মূলতঃ পজিটিভি দৃষ্টিভঙ্গির একটি বিনোদন পত্রিকা। তারকার অন্ধকার জগতের কথা বলার জন্য আনন্দ আলো কাজ করে না। আনন্দ আলো স্বপ্ন ছড়াতে চায়। ভালো স্বপ্ন। যে স্বপ্ন পাঠকের মনে ভালো হবার উদ্দীপনা ছড়াবে। কিন্তু এই কাজটি করতে গিয়ে দেখেছি অনেকেই রেসপন্স করেন। ভালো কথা লিখলেও ধন্যবাদ টুকুও পাওয়া যায় না। অথচ কোনো শিল্পীর অন্ধকার জগতের কথা বলতে গেলেই শুরু হয় যোগাযোগের পর যোগাযোগ। ফোনের পর ফোন। আনন্দ আলোর কাছ থেকে এই ধরনের নিউজ আশাকরি না। এই ধরনের কত যে কথা বলা হয়…
এখানেই একটা প্রশ্ন-ভালো কথা লিখলে একটু ধন্যবাদ তো পেতে পারি আমরা? প্রিয় পাঠক, আনন্দ আলোর ১৭ তম জন্মদিনের শুভেচ্ছা নিন। সবার জন্য রইল অনেক শুভ কামনা।